অনিয়ম দুর্নীতি জেঁকে বসেছে যশোর শিক্ষাবোর্ডে

শহিদ জয় শহিদ জয়

যশোর প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ৪:৪৩ অপরাহ্ণ, জুলাই ১৪, ২০২০ | আপডেট: ৪:৪৩:অপরাহ্ণ, জুলাই ১৪, ২০২০
সংগৃহীত

অনিয়ম দুর্নীতি জেঁকে বসেছে যশোর শিক্ষাবোর্ডে। কর্মকর্তা-কর্মচারীরা যে যার মতো দুর্নীতি করে যাচ্ছেন। চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়ার কারণে এমনটি হচ্ছে বলে বেশিরভাগ কর্মকর্তা-কর্মচারীর বক্তব্য।

শিক্ষাবোর্ডের কর্মকর্তারা বর্তমানে নিজেদের মতো করে অফিস চালাচ্ছেন। কোনো শৃঙ্খলা আছে বলে মনে হচ্ছে না। সরকারি ফিসের টাকা জমা না করে পকেটে ভরছেন কোনো কোনো কর্মকর্তা। আবার মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে রাতারাতি আদেশ পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে। এতে অনেকেই বিস্মিত হচ্ছেন। প্রশ্ন তুলছেন ‘এ ধরনের কাজ হচ্ছে কীভাবে’।

বেশকিছু দিন ধরে শিক্ষাবোর্ডে সার্টিফিকেট যাচাইয়ের সরকারি ফিস অফিসে জমা হচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। সহকারী পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক (ডকুমেন্টস) মনির হোসেন সরকারি এ ফিস নিজের পকেটে ভরছেন। বোর্ডের বিধি অনুযায়ী, মূল সার্টিফিকেট যাচাই করতে দুশ’ টাকার ব্যাংকড্রাফট জমা দিতে হবে। আর ফটোকপি যাচাই করতে ফিস লাগবে একশ’ টাকা। সহকারী পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মনির হোসেন এই ফিস অফিসে জমা না দিয়ে নিজেই আত্মসাৎ করছেন বলে একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী অভিযোগ করেছেন।

গত ৫ জুলাই এমন একটি ঘটনা ধরা পড়েছে। এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার মূল সার্টিফিকেট যাচাইয়ের জন্যে বোর্ডে আবেদন করেন হাসি আক্তার নামে এক নারী। যিনি ১৯৯৬ সালে এসএসসি ও ১৯৯৯ সালে এইচএসসি পাস করেন। তার পিতার নাম মোসলেম আলী। তার এসএসসির রোল নম্বর ছিল ৫০৪৮০৩। কেন্দ্র ছিল বেতাগী (১২৪)। তিনি বিজ্ঞান শাখায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। এইচএসসিতে তার রোল নম্বর ছিল ৩০৪৬৫০। কেন্দ্র ছিল বরগুনা বি (১২১)। এইচএসসিতে মানবিকে দ্বিতীয় বিভাগে পাস করেন তিনি। এই নারী তার দু’টি সার্টিফিকেট যাচাইয়ের জন্যে যশোর শিক্ষাবোর্ডে আবেদন করেন। বিধি অনুযায়ী ব্যাংকড্রাফটের মাধ্যমে তার কাছ থেকে ফিস নিতে হবে। অথচ সহকারী পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মনির হোসেন সেটি না করে নিজে নগদ টাকা গ্রহণ করে পকেটে ভরেছেন। এ ধরনের ঘটনা নাকি প্রতিনিয়ত ঘটছে। সরকারি টাকা এভাবে পকেটে ভরায় বোর্ডের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। তাদের বক্তব্য, পরিমাণ যতই কম হোক না কেন এটিতো সরকারি ফিস। ফলে, কোনোভাবে এদিক-ওদিক করার সুযোগ নেই।

প্রশ্ন উঠেছে, যশোর সদর উপজেলার রুদ্রপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের বরখাস্ত আদেশ প্রত্যাহার সংক্রান্ত দু’টি পত্র নিয়েও।

অভিযোগ, মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে রুদ্রপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের বরখাস্তকৃত প্রধান শিক্ষককে স্বপদে পুনর্বহাল করতে শিক্ষাবোর্ড থেকে পত্র ইস্যু করা হয়। গত ২২ এপ্রিল এই পত্র ইস্যু করেন বিদ্যালয় পরিদর্শক ডক্টর বিশ^াস শাহিন আহম্মদ। যার নথি নম্বর ৩৭.১১.৪০৪১.৫০১.০১.৬.২০.১৮৪। ওইপত্রে উল্লেখ করা হয়,‘বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারী বিধি অনুযায়ী কোনো শিক্ষক-কর্মচারীকে চূড়ান্ত বরখাস্ত করতে হলে বোর্ডের আপিল এন্ড আরবিট্রেশন কমিটিতে প্রস্তাব বিবেচিত ও বোর্ড কমিটি কর্তৃক অনুমোদিত হতে হয়। কিন্তু চূড়ান্ত বরখাস্তকৃত প্রধান শিক্ষকের চূড়ান্ত বরখাস্তের পূর্বে কোনো প্রস্তাব আপিল এন্ড আরবিট্রেশন কমিটি ও বোর্ড কমিটি কর্তৃক অনুমোদিত হয় নাই। সুতরাং প্রধান শিক্ষকের চূড়ান্ত বরখাস্ত আদেশ অবৈধ ও বেআইনি। এমতাবস্থায় চূড়ান্ত বরখাস্তকৃত প্রধান শিক্ষকের চূড়ান্ত বরখাস্ত আদেশ প্রত্যাহারপূর্বক বকেয়া বেতন-ভাতাসহ স্বপদে পুনর্বহাল করে ১০ কর্মদিবসের মধ্যে নি¤œস্বাক্ষরকারীকে অবহিত করার জন্যে অনুরোধ করা হলো।’ এই পত্রটি বিদ্যালয়ের সভাপতিকে দেয়া হয়।

এরমাত্র ১৪ দিন পর ৭ মে আগের পত্র স্থগিত করে আরেকটি পত্র ইস্যু করা হয় শিক্ষাবোর্ড থেকে। সেই পত্রে বলা হয়,‘এ বোর্ড হতে প্রেরিত ২২.০৪.২০২০ তারিখের ৩৭.১১.৪০৪১.৫০১.০১.৬.২০.১৮৪ স্মারকপত্রটি স্থগিত করা হলো। পরবর্তী আপিল এন্ড আরবিট্রেশন কমিটির সভায় সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত চূড়ান্ত বরখাস্তের সিদ্ধান্তও সে পর্যন্ত স্থগিত রাখা হলো এবং ততদিন পর্যন্ত চূড়ান্ত বরখাস্তকৃত প্রধান শিক্ষক সাময়িক বরখাস্ত হিসেবে গণ্য হবেন।’ এই পত্রের নথি নম্বর ৩৭.১১.৪০৪১.৫০১.০১.৬.২০.২৪৬। অভিযোগ রয়েছে ফের বড় অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে মাত্র ১৪ দিনের ব্যবধানে আগের পত্র স্থগিত করা হয়েছে। এ নিয়ে বোর্ডের সংশ্লিষ্ট শাখার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। অনিয়ম দুর্নীতি এখানেই শেষ না।

বর্তমানে নাকি অর্থের বিনিময়ে ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি করা হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে নাসির উদ্দিন নামে একজন শ্রমিক লীগ নেতা একাজটি করছেন। তিনি বিভিন্ন লোকের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়ে নাকি বিভিন্ন লোককে সভাপতি করছেন। অনৈতিক সুবিধা নিয়ে তাকে সহযোগিতা করছেন বোর্ডের কতিপয় কর্মকর্তা। এমন অভিযোগ করেছেন খোদ আওয়ামী লীগ নেতা চাঁচড়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুর রাজ্জাক ফুল। তিনি অভিযোগ করেছেন, তাকে ভাতুড়িয়া স্কুল এন্ড কলেজে সভাপতি করে দেয়ার কথা বলে নাসির উদ্দিন ৩০ হাজার টাকা দাবি করেন। তার দাবি পূরণ না করায় সভাপতি করা হয়নি মি. ফুলকে। নাসির উদ্দিন গত কয়েক মাস ধরে এ ধরনের কাজ করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

রুদ্রপুর স্কুলের প্রধান শিক্ষকের স্বপদে পুনর্বহাল সংক্রান্ত দু’টি পত্র ইস্যুও বিষয়ে স্কুল পরিদর্শক ডক্টর বিশ^াস শাহিন আহম্মদের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন,‘আমরা চেয়ারম্যান স্যারের নির্দেশ অনুযায়ী কাজ করি। তাছাড়া, বিষয়টি অনেক দিন হয়ে গেছে। ফাইল না দেখে কিছু বলা যাবে না।’

সহকারী পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মনির হোসেনের দু’টি মোবাইল ফোন নম্বরে একাধিকবার ফোন করলেও সেগুলো বন্ধ পাওয়া যায়। শ্রমিক লীগ নেতা নাসির উদ্দিনের কাছে এসব বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ ভিত্তিহীন। এমপি ডিও লেটারের মাধ্যমে সবকিছু হয়েছে।

অনিয়ম দুর্নীতির বিষয়ে যশোর শিক্ষাবোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর মোল্লা আমির হোসেন সাংবাদিকদের বলেন,‘সার্টিফিকেট যাচাইয়ের অর্থ জমা না হওয়ার বিষয়টি আমার জানার বাইরে ছিল। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। রুদ্রপুর স্কুলের প্রধান শিক্ষকের স্বপদে পুনর্বহালের বিষয়ে পত্রের বিষয়টি ফাইল না দেখে বলা যাবে না।’