অন্ধকারে আলো দেবে নাইট ভিশন গগলস

টিবিটি টিবিটি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ৯:৪৪ অপরাহ্ণ, জুলাই ২, ২০২০ | আপডেট: ৯:৪৪:অপরাহ্ণ, জুলাই ২, ২০২০
রাতে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর হেলিকপ্টার থেকে তোলা ঢাকার ছবি। ইনসেটে নাইট ভিশন গগলস। ছবি: সংগৃহীত

উড্ডয়ন ও অবতরণের সময় ঠিকমতো দেখতে না পাওয়া সারা বিশ্বেই হেলিকপ্টার দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে বিমান বাহিনীতে যুক্ত হয়েছে নাইট ভিশন গগলস যা অন্ধকারে আলো দেবে। এই গগলস চোখে দিলে বৈমানিকরা অন্ধকারের মধ্যে নিচের সবকিছু পরিষ্কার দেখতে পাবেন। শুধু তাই নয়, এটা রাতে দুর্গম অঞ্চলে অপারেশন চালাতে সাহায্য করবে। যে কোনো দুর্যোগে উদ্ধার অপারেশনও সহজ হয়ে যাবে। গগলস-এর অন্তর্ভুক্তি হেলিকপ্টার চলাচলে নতুন অধ্যায় সূচনা করেছে।

ফোরথ জেনারেশনের এই গগলস সারা বিশ্বেই সামরিক বাহিনীতে ব্যবহার হচ্ছে। যুদ্ধেও এটা ব্যবহার হচ্ছে। এই প্রযুক্তির ফলে উড্ডয়ন ও অবতরণ নিরাপদ হয়েছে। বৈমানিকের মনোবল বৃদ্ধি, অপারেশনাল সক্ষমতা, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনীতে অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়েছে। এটা আধুনিক প্রশিক্ষণের একটা ব্যবস্থা। নাইট ভিশন গগলস চোখে থাকলে বৈমানিকদের আর দিন-রাত থাকছে না। সমানভাবেই দেখতে পাচ্ছেন।

মঙ্গলবার রাতে কয়েকজন সাংবাদিককে একটি এনভিজি স্পেশাল হেলিকপ্টারে করে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল মাওয়া এলাকায়। সেটির দায়িত্বে ছিলেন গ্রুপ ক্যাপ্টেন মাহফুজুর রহমান ও উইং কমান্ডার সালাউদ্দিন আহমেদ। আর ভেতরে থেকে সাংবাদিকদের বিভিন্ন বিষয়ে বুঝিয়ে দেন উইং কমান্ডার চৌধুরী ওমর হায়দার ও স্কোয়াড্রন লিডার মির্জা মোস্তফা জামাল। ফিরে আসার পর সাংবাদিকদের ধন্যবাদ জানান বিমানবাহিনীর ঘাঁটি বাশারের অধিনায়ক এয়ার ভাইস মার্শাল নজরুল ইসলাম।

রাত ৮টার দিকে মাওয়া এলাকায় পদ্মার ওপরে গিয়ে ১ হাজার ফুট ওপর থেকে নাইট ভিশন গগলস ব্যবহার করে দেখা গেল পদ্মা ব্রিজের খুঁটি, পদ্মার চরসহ নানা এলাকা। অথচ গগলস থেকে চোখ সরালেই অন্ধকারে সেখানে কিছু দেখা যাচ্ছে না। এই প্রযুক্তি বাংলাদেশে এসেছে ২০১৮ সালে। এটা ব্যবহার করে সাত জন মুমূর্ষু করোনা রোগীকে রাতের বেলা সিলেট, যশোর, খুলনা, ভোলা, ময়মনসিংহ ও বান্দরবান থেকে ঢাকায় আনা হয়েছে। এ ছাড়া চট্টগ্রামে গত বছর ১৯ জুন বান্দরবানে সেনাবাহিনীর সেনাভর্তি একটি পিকআপ রাত্রীকালীন অপারেশন চালানোর সময় দুর্ঘটনায় পড়ে। খবর পেয়ে বিমানবাহিনীর এডব্লিউ-১৩৯ হেলিকপ্টার বান্দরবানের দুর্গম এলাকা হতে মুমূর্ষু ছয় জন সেনাকে রাতের আঁধারে উদ্ধার করতে সক্ষম হয়।

পুরান ঢাকার চুড়িহাট্টা এলাকা জুড়ে গত বছর ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এ সময় বিমানবাহিনীর কর্মকর্তারা হেলিকপ্টার নিয়ে ছুটে গিয়েছিলেন সাহায্যের হাত বাড়াতে। রাতের বেলা বেল-২১২ হেলিকপ্টার নিয়ে যাওয়া এবং সুচারুভাবে কাজ করার পেছনে কাজ করেছিল নাইট ভিশন গগলস।

বর্তমানে বিমান বাহিনীর ৯টি হেলিকপ্টারে এ প্রযুক্তির ব্যবহার করা যাচ্ছে। বেল-২১২ ও এমআই সিরিজ হেলিকপ্টারের নাইট ভিশন গগলসের প্রশিক্ষণের জন্য বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর বৈমানিকরা কানাডা ও ইউক্রেনে প্রশিক্ষণ নেন। সদ্য কেনা সি-১৩০জে পরিবহন বিমানেও নাইট ভিশন গগলসের প্রযুক্তি অন্তর্ভুক্তির প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। অতি অল্প সময়ে একই সক্ষমতা বিমানবাহিনীর পরিবহন বিমান বহরেও সংযোজিত হবে।

বিমানবাহিনীর এয়ার কমোডোর মো. মাহামুদুর হাসান জানান, উড্ডয়ন ও অবতরণের নিরাপত্তার নিশ্চিতে নবদিগন্তের সূচনা করেছে নাইট ভিশন গগলস, যা হেলিকপ্টার উড্ডয়ন পরিচালনায় যোগ করেছে এক নতুন মাত্রা। হেলিকপ্টারের মাধ্যমে যে কোনো দুর্গম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে দিবা ও রাত্রীকালীন অপারেশন পরিচালনা করা সম্ভব। নাইট ভিশন গগলসের আবিষ্কার ও অন্তর্ভুক্তি বিমান চালনায় নতুন অধ্যায়ের সৃষ্টি করেছে।

কীভাবে গগলসের আবিষ্কার? এমন প্রশ্নের উত্তরে কর্মকর্তারা বলেন, বিড়াল গোত্রীয় প্রাণী রাতের অন্ধকারেও সীমিত পরিসরে দেখতে পায়। আর তা দেখেই গবেষণার সূত্রপাত হয়। অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ১৯৬৫ সালে স্টার লাইট স্কোপ যুক্ত প্রথম নাইট ভিশন গগলস তৈরি হয়। বর্তমানে বাংলাদেশেও আকাশচুম্বী স্থাপনা, মোবাইল নেটওয়ার্ক এন্টেনা দেশের আনাচেকানাচে গড়ে উঠেছে। রাতের বেলায় দৃষ্টিশক্তির সীমাবদ্ধতার কারণে এসব স্থাপনা স্বল্প উচ্চতায় হেলিকপ্টার উড্ডয়ন পরিচালনায় ঝুঁকির সৃষ্টি করে। এ অবস্থায় নাইট ভিশন গগলস প্রযুক্তির সহায়তায় ভূমি থেকে স্বল্প উচ্চতায় উড্ডয়নকালে বৈমানিকরা যে কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতা এড়িয়ে চলতে সক্ষম হন। এ ছাড়া এই গগলস ব্যবহারের কারণে বৈমানিকের মনোবল বৃদ্ধি পায়। অপারেশনাল সক্ষমতা বাড়ে। গভীর সমুদ্র ও দেশের যে কোনো প্রত্যন্ত অঞ্চলে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর হেলিকপ্টারসমূহ রাত্রীকালীন উড্ডয়ন পরিচালনা ও উদ্ধার কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করতে সক্ষম। জাতিসংঘ শান্তি রক্ষা মিশনে বিদ্রোহী জঙ্গি গোষ্ঠীগুলো মূলত রাতে শান্তি রক্ষী বাহিনীর ওপর অতর্কিত হামলা পরিচালনা করে থাকে। হেলিকপ্টার সাপোর্ট শান্তিরক্ষী এভিয়েশন কন্টিনজেন্টের একটি অপরিহার্য করণীয় বলে গণ্য হয়।

নাইট ভিশন গগলস হচ্ছে একপ্রকার আলোক যন্ত্র যা সম্পূর্ণ অন্ধকারেও দৃশ্যমান ছবি তৈরি করতে পারে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে প্রথম নাইট ভিশন ডিভাইস ব্যবহূত হয়। পরবর্তীকালে ভিয়েতনাম যুদ্ধসহ আরো অনেক যুদ্ধে এর ব্যবহার হয়। আবিষ্কারের সময় থেকেই এ ধরনের যন্ত্রের বিভিন্ন সংস্করণ বের হয়ে আসছে। সর্বশেষ এই প্রযুক্তির অংশ হিসেবে ১৯৬৫ সালে আসে নাইট ভিশন গগলস।

-ইত্তেফাক।