অবশেষে প্রতিবন্ধী বৃদ্ধাকে জমি ফেরত দেবেন আ’লীগের সেই মেম্বার

টিবিটি টিবিটি

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ৮:৫০ অপরাহ্ণ, আগস্ট ৩১, ২০১৯ | আপডেট: ৮:৫০:অপরাহ্ণ, আগস্ট ৩১, ২০১৯

সংবাদ প্রকাশের পর অবশেষে প্রতিবন্ধী বৃদ্ধা হালিমা খাতুনের জমি ও দোকান ফেরত দেবেন বলে মুচলেকা দিয়েছেন ইউপি সদস্য (মেম্বার) আব্দুস সামাদ সান্টু।

বৃদ্ধা হালিমাকে বয়স্ক ভাতার কার্ড করে দেয়ার কথা বলে সমস্ত সম্পত্তি লিখে নেয়াসহ হালিমার পুত্রবধূ সালমার তিনিটি দোকান দখল করে নেন কুষ্টিয়ার খোকসা উপজেলার গোপগ্রাম ইউনিয়নের ২নং ওয়ার্ডের মেম্বার আব্দুস সামাদ সান্টু।

২৯ আগস্ট আ’লীগে যোগ দিয়েই বৃদ্ধার জমি লিখে নিলেন মেম্বার শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হলে স্থানীয় প্রশাসন নড়েচড়ে বসে। সংবাদের সত্যতা পাওয়ার পর শুক্রবার রাতে খোকসা থানা পুলিশের একটি দল অভিযুক্ত ইউপি সদস্য আব্দুস সামাদ সান্টু ও তার নিকট আত্মীয় আলতাফকে থানায় ধরে নিয়ে যায়।

কিন্তু স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের ছত্রছায়ায় থাকা প্রভাবশালী ইউপি সদস্য আব্দুস সামাদ সান্টু ও তার আত্মীয় ব্যবসায়ী আলতাফ হোসেনকে মুক্ত করতে মরিয়া হয়ে ওঠে ক্ষমতাশীন দলের একাংশের নেতারা। শুক্রবার রাতভর তাদের ছাড়াতে থানায় দেনদরবার চলতে থাকে। কিন্তু এ ব্যাপারে পুলিশ কঠোর অবস্থান গ্রহণ করায় আওয়ামী লীগ নেতাদের দেনদরবার শেষ পর্যন্ত ভেস্তে যায়।

আরো পড়ুন: আ’লীগে যোগ দিয়েই বৃদ্ধার জমি লিখে নিলেন মেম্বার

অবশেষে চলতি সপ্তাহের মধ্যে বৃদ্ধা হালিমার জমি ও হালিমার পুত্রবধূ সালমার তিনিটি দোকান ফেরত দেবেন বলে মুচলেকা দিয়ে থানা থেকে ছাড়া পান ইউপি সদস্য আব্দুস সামাদ সান্টু ও তার আত্মীয় আলতাফ হোসেন।

খোকসা থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এবিএম মেহেদী মাসুদ বলেন, বৃদ্ধার জমি দখলের বিষয়ে সংবাদ দেখার পরপরই সান্টু মেম্বারকে থানায় ধরে আনা হয়। বৃদ্ধা হালিমার জমি ও হালিমার পুত্রবধূ সালমার তিনিটি দোকান ফেরত দেবেন মর্মে মুচলেকা দিয়েছেন সান্টু মেম্বার। এই সপ্তাহের মধ্যে জমি ও দোকান ফেরত দেবেন মর্মে মুচলেকা নেয়া হয়েছে। যদি ওই বৃদ্ধার জমি ও দোকান ফেরত না দেন তাহলে সান্টু মেম্বারের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।

বৃদ্ধার পুত্রবধূ মৃত মন্টুর স্ত্রী সালমা বলেন, আগেও দোকান ভাড়ার বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান সালিশ করেছিলেন। কিন্তু কাজ হয়নি। এবার আবার থানায় মুচলেকা দিয়েছেন সান্টু মেম্বার। জমি ও দোকান ফেরত দেবেন বলেছেন। আসলে সান্টু মেম্বার ও ভাড়াটিয়া আলতাফ আওয়ামী লীগের রাজনীতি করে। তারা অনেক প্রভাবশালী। তবে থানায় যেহেতু মুচলেকা দিয়েছেন এজন্য জমি ও দোকান ফেরত পাওয়ার বিষয়ে আমি আশাবাদী।

এর আগে উপজেলার গোপগ্রামের মৃত আব্দুল মজিদ বিশ্বাসের স্ত্রী হালিমা খাতুনকে বয়স্ক ভাতার কার্ড করে দেয়ার কথা বলে তার জমি ও দোকান নিজের নামে লিখে নেন ইউপি সদস্য (মেম্বার) আব্দুস সামাদ সান্টু।

গোপগ্রাম ২নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আব্দুস সামাদ সান্টু খোকসা উপজেলার গোপগ্রামের মৃত আবুল হোসেনের ছেলে। ইউপি সদস্য সান্টু আগে বিএনপি নেতা ছিলেন। সম্প্রতি আওয়ামী লীগে যোগ দেন তিনি। তবে আওয়ামী লীগের কোনো পদে না থাকলেও আওয়ামী লীগের প্রভাব খাটিয়ে চলেন সান্টু।

বৃদ্ধার প্রতিবেশীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রতিবন্ধী বৃদ্ধা হালিমা খাতুন চার সন্তানের জননী। তার স্বামী অনেক আগেই মারা যান। কিছুদিন আগে তার ছেলে মন্টু মারা যায়। ছেলের মৃত্যুর পর ছেলের নামে থাকা জমির ছয় ভাগের এক ভাগের মালিক হন হালিমা খাতুন। বৃদ্ধা হালিমা খাতুনের গোপগ্রাম বাজারে একটি দোকান রয়েছে। ওই দোকানের ভাড়া নিয়ে মৃত ছেলের তিন মেয়ে, দুই ছেলে ও স্ত্রীকে নিয়ে কষ্টে সংসার চালান। দোকান ভাড়ার টাকা দিয়ে কোনোমতে চলে তাদের সংসার। কিন্তু তাদের সেই দোকান ও জমি হাতিয়ে নিতে সুযোগ খুঁজতে থাকেন স্থানীয় ইউপি সদস্য আব্দুস সামাদ সান্টু। কয়েক দিন আগে বৃদ্ধা হালিমা খাতুনকে ভাতার কার্ড করে দেয়ার কথা বলে সেই দোকান ও জমি নিজের নামে লিখে নেন সান্টু মেম্বার।

জানতে চাইলে কাঁদতে কাঁদতে প্রতিবন্ধী হালিমা খাতুন বলেছেন, ‘ভাতার কার্ড করে দেয়ার কথা বলে আমার সব কিছু নিজের নামে লিখে নিয়েছেন সান্টু মেম্বার। আমি আমার জমি ও দোকান ফেরত চাই। সান্টু মেম্বারের বিচার চাই।’

কীভাবে বুঝলেন জমি লিখে নিয়েছেন সান্টু মেম্বার এমন প্রশ্নের জবাবে বৃদ্ধা হালিমা খাতুন বলেন, ‘আমি দোকানের ভাড়া তুলতে গেলে সান্টু মেম্বার বলে তোমার তো এখন আর দোকান নেই। এই দোকান এখন আমার। তুমি আমার কাছে দোকান ও জমি বিক্রি করে দিয়েছ।’

স্থানীয় সূত্র জানায়, বয়স্ক ভাতার কার্ডের টাকা তোলার কথা বলে গত ১০ জুলাই খোকসা উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে বৃদ্ধাকে নিয়ে জমির দলিলে স্বাক্ষর করিয়ে নেন সান্টু মেম্বার।

মৃত মন্টুর স্ত্রী সালমা খাতুন বলেন, আমার চার সন্তান। সন্তান ও শাশুড়ি হালিমা খাতুনকে নিয়ে দোকান ভাড়ার টাকায় সংসার চালাতাম। কিছুদিন ধরে ভাড়াটিয়া আলতাব হোসেন দোকানের ভাড়া দেয় না। আমরা ভাড়া চাইতে গেলে বলে দোকান এবং জমি এখন আর তোমাদের নেই। ইউপি সদস্য সান্টু দোকান ভাড়া দাবি করেছেন, দোকান এবং জমি এখন তার। তোমার শাশুড়ি সবকিছু মেম্বারের নামে লিখে দিয়েছেন।

মৃত মন্টুর চাচা আব্দুল হাই বলেন, সান্টু মেম্বার আমার ভাবি হালিমার কাছ থেকে প্রতারণার মাধ্যমে ১১ দাগে প্রায় ২ শতাংশ জমি লিখে নিয়েছেন। এখন আলতাব ও সল্টু মেম্বার ১১ দাগের জমি একই দাগে দেখিয়ে তিনটি দোকান দখল করেছেন। যার আনুমানিক মূল্য ৩০ লাখ টাকা। বয়স্ক ভাতার টাকা তোলার কথা বলে সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে নিয়ে আমার ভাবির জমি ও দোকান দখল করে নিয়েছেন সান্টু মেম্বার।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে গোপগ্রাম ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আলমগীর বলেন, ইউপি সদস্য আব্দুস সামাদ সান্টু ও ভাড়াটিয়া দোকানদার আলতাব হোসেন প্রতারণার মাধ্যমে বয়স্ক ভাতার টাকা তোলার নাম করে প্রতিবন্ধী বৃদ্ধা হালিমা খাতুনের ৩০ লাখ টাকার জমি ও দোকান নিজের নামে লিখে নিয়েছে। এমন ন্যক্কারজনক কাজের জন্য প্রতারক সল্টু মেম্বারের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাই।

এর আগে ইউপি সদস্য আব্দুস সামাদ সান্টু বলেছিলেন, এক লাখ ৪০ হাজার টাকার বিনিময়ে ওই জমি ও দোকান স্বেচ্ছায় আমার নামে লিখে দিয়েছেন বৃদ্ধা হালিমা খাতুন।

তবে শুক্রবার থানায় পুলিশের কাছে জমি ও দোকান ফেরত দেয়ার মর্মে মুচলেকা দেয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে কোনো কথা বলেননি সান্টু মেম্বার।