অর্ধাহারে-অনাহারে জীবন কাটাতে হয়েছে : সুমিত্রা বর্মণ

শরণার্থীর খোজে: পর্ব-১৭

শাহজাদা এমরান শাহজাদা এমরান

কুমিল্লা প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ৪:১২ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ২২, ২০২০ | আপডেট: ৪:১২:অপরাহ্ণ, নভেম্বর ২২, ২০২০

শাহাজাদা এমরান,লালমনিরহাট থেকে ফিরে। যুদ্ধের শুরুতে যারা ভারত গিয়েছিল তারা ক্যাম্পে আশ্রয় পাওয়ার পাশাপাশি বোনা ফাইড শরণার্থী হিসেবে অর্ন্তভুক্ত হয়েছিল। সব রকম সুযোগ সুবিধা তারা ভোগ করেছিল। কিন্তু আমরা যারা জুন জুলাইতে ভারত যাই, তারা না পেয়েছি আশ্রয়, না পেয়েছি বোনা ফাইড শরণার্থীর সুবিধা। ফলে মোডিফাইড শরণার্থী হিসেবে শুধু চাল আর ডাল নিয়েই আমাদের সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে। অর্ধাহারে আর অনাহারে জীবন কাটাতে হয়েছে। এক দিকে খোলা আকাশের নিচে বসবাস অপরদিকে অভুক্ত শরীর, সবমিলিয়ে মানবেতর জীবনযাপন আমাদের নিয়তিতে পরিণত হয়েছিল। কথাগুলো বললেন শরণার্থী সুমিত্রা বর্মণ। গত ৩ নভেম্বর লালমনিরহাট শহরের খোদসাপটানা এলাকায় তার সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন এই প্রতিবেদক।

সুমিত্রা বর্মণ । ১৯৫৪ সালে লালমনিরহাটের কাকেয়া টেপা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা শ্যাম চন্দ্র বর্মণ আর মাতা বিষাদী চন্দ্র বর্মণ। তিন ভাই ও এক বোনের মধ্যে তিনি সবার ছোট। বর্তমানে থাকেন লালমনিরহাট পৌরসভার ৩নং ওয়ার্ডের খোদসাপটানা এলাকায় স্বামীর বাড়ি। স্বামীর নাম প্রফুল্ল বর্মণ।

শরণার্থী জীবনের কথা জানতে চাইলে বয়সের ভারে ন্যূব্জ সুমিত্রা বর্মণ বলেন,বাবারে এত দিনের কথা তো আর বেশি মনে করতে পারছি না। তবে যতটুকু মনে আছে বলি। আমরা স্বামী, দেবর, ভাসুর সবাই একত্রে ছিলাম। যৌথ পরিবার বলতে যা বুঝায়। আমরা সাধারণ মানুষ। কোন রাজনীতিতে আমার স্বামী ও তার ভাইয়েরা ছিল না। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই লালমনিরহাট শহরটি চলে যায় পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর দখলে। এপ্রিল থেকে মে মাসের মধ্যে শহরের ৮০ ভাগ হিন্দু পরিবার ভারতে চলে যায়। কেউ গেছে অত্যাচারিত হয়ে, আবার কেউ গেছে অত্যাচারের ভয়ে। আমার ভাসুর বললেন, এখানে যারা মুসলিম পরিবার আছে তারা সবাই আমাদের জানে এবং চিনে। বিহারিদের সাথেও সম্পর্ক খারাপ না। সুতরাং ভারতে যাওয়ার দরকার নেই। আমাদের কোন কিছু হবে না। কিন্তু এরই মধ্যে শহরে ব্যাপক ধরপাকড় চলছে। লালমনিরহাট শহরের বিভিন্ন দোকানপাটে আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে। কারো যুবতী মেয়ে কিংবা নতুন পুত্রবধূকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে। এমন ঘটনা ছিল প্রায় প্রতিদিনের। জুন বা জুলাই মাস হবে। আমার মনে নেই। একদিন লালমনিরহাটের আর্মি ক্যাম্পে থেকে একটি গুলি এসে পড়ে আমাদের ঘরের সামনে খালি জায়গায়। ভাগ্যিস কেউ উঠানে ছিল না। এই ঘটনায় আমাদের কেউ হতাহত না হলেও সবাই ভীষণ ভয় পেয়ে যায় এবং ওইদিনই আমরা সবাই এক সাথে জীবন বাঁচাতে ভারত চলে যাই।

সুমিত্রা বর্মণ বলেন, শ^শুরের শ্রাদ্ধ করা হয়নি বলে আমার স্বামী সেদিন আমাদের সাথে জাননি। তিনি বলেছেন, বাবার শ্রাদ্ধ না করে আমি এ বাড়ি ছাড়ব না। সকাল ১০টায় আমরা পরিবারের ৮ জন সদস্য নিয়ে বাসা থেকে বের হলাম। মোগলহাট হয়ে ধরলা নদী পাড়ি দিয়ে ভারতের শিয়ালদহ গিয়ে এক আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিই। এই আত্মীয়ের বাড়িতে রাত্রিযাপনের পর সকালেই তারা বলল, তোমরা এবার ক্যাম্পে যাও। এরপর আমার ভাসুর গিয়ে কইন্যা ক্যাম্পে যায়। ওই ক্যাম্পে তিল ধারণের কোন জায়গা নেই। ক্যাম্প কমান্ডার বললেন, মুডিফাইড শরণার্থী হিসেবে ক্যাম্পে আপনাদের আমরা অন্তর্ভুক্ত করতে পারি। আমার ভাসুর জানতে চাইল দাদা, বোনা ফাইড আর মোডিফাইড শরণার্থীর মধ্যে পার্থক্য কি ?তখন তিনি বললেন, যারা ক্যাম্পে থাকবে তারা বোনা ফাইড । তারা চাল ডালসহ রান্না করার জন্য প্রয়োজনীয় সব কিছু পাবে আর যারা মোডিফাইড শরণার্থী তারা ক্যাম্পের বাইরে নিজের পছন্দসই জায়গায় থাকবে ক্যাম্প থেকে শুধু চাল আর ডাল পাবে। কোন উপায় না পেয়ে ভাসুর রাজি হলেন। পড়ে আমরা ক্যাম্প সংলগ্ন একটি খালি জায়গায় কোনমতে গাছপালা দিয়ে বাঁশ দিয়ে ছোট দুটি রুম করে থাকা শুরু করি। পরে আমাদের আ-েপাশের সকল খালি জায়গায় আরো অনেক পরিবার এসে নিজ উদ্যোগে বসতি স্থাপন করে। এখানে আমরা হিন্দু মুসলমান সবাই এক সাথে ছিলাম। কেউ কারো জন্য সমস্যার কারণ হয়নি। তবে এখানে আমাদের খাবার সংকট, পানির সংকট,থাকার সংকটের পাশাপাশি চিকিৎসার সংকটও ছিল তীব্র।

আমরা আসার ১৫ দিন পর আমার স্বামী বাবার শ্রাদ্ধ করে ভারতে আসে। এসে তো সে অবাক। একটি রাস্তার পাশে ঝুপটি ঘরে আমরা বসবাস করছি। আমাদের এই কইন্যা শরণার্থী শিবিরে অসংখ্য মানুষ মারা গেছে শুধু মাত্র বিনা চিকিৎসায়। সেই হৃদয়বিধারক দৃশ্যগুলোর কথা মনে হলে এখনো চোখে জল আসে।

কবে দেশে ফিরলেন জানতে চাইলে সুমিত্রা বর্মণ বলেন, দেশ স্বাধীন হয়েছে এই সংবাদ আমরা পাই ১৭ ডিসেম্বর সকালে। আমরা ২১ ডিসেম্বর দেশের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা হই। আসার সময় আমাদের সবাইকে কিছু চাল,ডাল,একটি করে কম্বল দিয়ে দেয়। এসে তো বাড়ি ঘর চিনতে পারি না। বড় বড় গাছ জন্মে জঙ্গল বাড়ি হয়ে আছে। ওই দিন রাতে আমরা একটি স্কুল ঘরে থাকি। পরদিন বাড়িঘর পরিষ্কার করে ,ঠিকঠাক করে পরে ঘরে উঠি।

সুমিত্রা বর্মণের জোর দাবি, সরকার যেন আমাদের শরণার্থী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে সম্মানের সাথে বাঁচার সুযোগ করে দেন।