আইসিইউ রোগীর নিকটাত্মীয়দের দুই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন প্রসঙ্গে ডা. আসিফ সৈকত

টিবিটি টিবিটি

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ২:২৪ অপরাহ্ণ, আগস্ট ২, ২০১৯ | আপডেট: ২:২৪:অপরাহ্ণ, আগস্ট ২, ২০১৯
ফাইল ছবি

আইসিইউ রোগীর নিকটাত্মীয়দের প্রায় সময়ই দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন থাকে। এ নিয়ে তাদের মধ্যে কিছু বিভ্রান্তিও থাকে। তবে চিকিৎসা বিজ্ঞানে রয়েছে এর চমৎকার ব্যাখ্যা।

এ বিষয়ে কথা বলেছেন রাজধানীর অ্যাপোলো হাসপাতালের ক্রিটিক্যাল কেয়ার বিভাগের রেজিস্ট্রার ডা. আসিফ সৈকত। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে বিষয়টি তুলে ধরেছেন তিনি।

ডা. আসিফ লিখেছেন, আইসিইউ রোগীর নিকটাত্মীয়দের দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন , কিছু বিভ্রান্তি এবং চিকিৎসা বিজ্ঞানের ব্যাখ্যা :

প্রশ্ন
স্যার, আমার রোগী লাইফ সাপোর্ট মেশিনে আছেন ….. কিন্তু রোগীতো নড়াচড়া করে না! আমার তো মনে হয় রোগী আর বেঁচে নেই!

উত্তর
খুব সতর্কতার সঙ্গে লক্ষ্য করুন, একজন রোগী যখন নিজে নিজে আর কোনো অবস্থাতেই শ্বাস নিতে পারেন না অথবা রোগীর ধমনীর রক্ত পরীক্ষা (arterial blood gas analysis) করে যখন দেখা যায়, রক্তে অক্সিজেনের ঘাটতির পরিমাণ এতটাই বেশি যে অক্সিজেনের এই ঘাটতিজনিত কারণে রোগীর মস্তিষ্ক, হৃদপিণ্ড, কিডনিসহ সংবেদনশীল অংগগুলো যে কোনো মুহূর্তেই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, তখন একজন আইসিইউ বিশেষজ্ঞ/চিকিৎসক রোগীর শ্বাসনালি দিয়ে একটি নল ঢুকিয়ে (Endotracheal tube) দেন এবং রোগীকে কৃত্রিম শ্বাসপ্রশ্বাস মেশিনের সঙ্গে সংযুক্ত করেন। রোগীর শরীরের অক্সিজেনের এই ঘাটতি, ventilator নামক মেশিনটি পূরণ করার চেষ্টা করে। এ ক্ষেত্রে চিকিৎসকরা রোগীর ফুসফুসসহ পুরো শরীরকে অবশ বা paralyzed করে দেন এবং রোগী যাতে ঘুমন্ত অবস্হায় থাকেন সেজন্য কিছু নির্দিষ্ট ওষুধ প্রয়োগ করেন। এসব ওষুধ রোগীকে মানসিক চাপমুক্ত রাখে, রোগীকে নিস্তেজ রেখে ফুসফুসের অক্সিজেন প্রবাহ নিশ্চিত করে এবং রোগীকে ব্যথামুক্ত রাখে।

এই সময় রোগী নড়াচড়া করতে পারে না। ডাকলেও সাড়া দেয় না। কতক্ষণ রোগী এভাবে নিস্তেজ থাকবে তা রোগীর ফুসফুসের উন্নতিসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ওপর নির্ভরশীল। এ সময় রোগীর আত্মীয়স্বজনদের অনেকেরই ভুল ধারণা জন্মায় যেহেতু রোগী আর নড়ছে না, ডাকলেও শুনছে না, রোগী মৃত।

আশা করি বিষয়টি নিয়ে কিছুটা ধারণা দিতে পেরেছি। বাস্তবিক অর্থে ভেন্টিলেটর মেশিন বা কৃত্রিম শ্বাসপ্রশ্বাস মেশিনের বিভিন্ন mode/প্রয়োগ কৌশল অনেক জটিল বিষয়।

প্রশ্ন
আমার রোগীর হাত-পা বরফের মতো ঠাণ্ডা হয়ে গেছে ,শরীর কালো হয়ে গেছে। আর আপনারা ওনার গলায় ছিদ্র করেছেন / বগলে ছিদ্র করেছেন / বুকের ওপর ছিদ্র করেছেন! আমি নিশ্চিত আমার রোগী মৃত!

উত্তর
একজন রোগী যখন blood pressure/শরীরের রক্তচাপ নিজে নিজে আর নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না, (due to shock of any cause) তখন রোগীর মস্তিষ্কের রক্তপ্রবাহও কমতে থাকে। রোগী আস্তে আস্তে নিস্তেজ হয়ে যায়, হৃৎপিণ্ডের রক্ত সঞ্চালন বা pumping ক্ষমতাও হ্রাস পেতে থাকে ,শরীরের শিরা উপশিরা সংকুচিত হয়ে আসে ( peripheral vesoconstriction)। এ অবস্থায় রোগীর হাত পায়ের শিরা-উপশিরায় যদি ছিদ্র করা হয় ইনজেকশন বা জরুরি ওষুধ দেওয়ার জন্য, অধিকাংশ সময়ই শিরায় রক্ত পাওয়া যায় না (শিরার সংকোচনজনিত কারণে)।

এ কারণেই রোগীকে বাঁচানোর জন্য চিকিৎসকরা রোগীর বগলে, গলার ডান বা বাঁ পাশে, বুকের উপরাংশে, উরুতে ছিদ্র করেন। কারণ রোগীর blood pressure অনেক কমে গেলেও এখানকার শিরাগুলো সহজে সংকুচিত হয় না। রোগীর প্রেসার বা রক্তচাপ কমে গেলে হাত-পায়ের শিরার দ্রুত সংকোচনজনিত (vesoconstriction) কারণে রোগীর শরীর মৃতের শরীরের মতো ঠাণ্ডা হয়ে যায়।

অন্যদিকে, রোগীর হৃৎপিণ্ড, মস্তিষ্ক, কিডনি, লিভারসহ গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের প্রবাহ স্বাভাবিক রাখার জন্য চিকিৎসকরা dopamine, adrenaline, noradrenaline, vesopressine জাতীয় ওষুধ প্রয়োগ করেন।

জীবনরক্ষাকারী এসব ওষুধ শরীরের হাত-পায়ের রক্ত প্রবাহ কমিয়ে হৃৎপিণ্ডসহ শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গকে বাঁচানোর চেষ্টা করা হয়। এ ক্ষেত্রে রোগীর গায়ে হাত দিলে খুবই শীতল মনে হয়, শরীর ফ্যাকাসে হয়ে যায়। রোগীর আত্মীয়-স্বজন শরীরের এই শীতলতা ও বর্ণহীনতাকে মৃতের শরীরের সঙ্গে তুলনা করে ভুল করেন।

পোস্টের শেষাংশে ডা. আসিফ লিখেছেন, আমি সহজভাবে বিষয়দুটি বোঝানোর চেষ্টা করেছি। প্রকৃতপক্ষে আইসিইউর চিকিৎসা প্রণালীর বিষয়গুলো অত্যন্ত জটিল।