আন্তরাষ্ট্রীয় সম্পর্কের টানাপোড়নে ভারত

প্রকাশিত: ৪:৫৬ অপরাহ্ণ, জুন ২৬, ২০২০ | আপডেট: ৪:৫৬:অপরাহ্ণ, জুন ২৬, ২০২০
ছবি: টিবিটি

সম্প্রতি বিশ্ব রাজনীতির এক আলোচিত নাম দক্ষিণ এশীয় দেশ ভারত। সারাবিশ্বের সামরিক শক্তির র‌্যাঙ্কিংয়ে সেরা চারে তার অবস্থান এবং দ্বিতীয় সর্বাধিক জনবহুল রাষ্ট্র। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ক’টনৈতিক চালে এগিয়ে থেকে দেশটির বিপুল এ জনসংখ্যা ক্রমশ জনসম্পদে পরিণত হচ্ছে। তবে আন্তদেশীয় ক’টনৈতিক সম্পর্কে দিনকে দিন ভাটা পড়তে শুরু করেছে দেশটির।

সম্প্রতি লাদাখের গালওয়ান ভ্যালিতে ভারত ও চীনের সেনাবাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা থেকে এ সংকট কিছুটা হলেও আঁচ করা যায়। ১৯৬২ সালের পরে এই প্রথমবার চীন ভারত সীমান্তে এতবড় সংখ্যায় সেনাসদস্যর মৃত্য ও গত ৬ বছরে চীনের সঙ্গে ভারতের বারবার সীমান্ত সমস্যা মোদী সরকারের বিদেশনীতিকে স্বাভাবিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করবে।

এছাড়া কাশ্মীর ইস্যুতে পাকিস্তানের সাথে যুদ্ধাংদেহী অবস্থান, তিস্তা জলবন্ঠন চুক্তির জেরে বাংলাদেশের সাথে মনোমালিণ্য, ডোকলাম উপত্যকা নিয়ে চীন-ভ’টান-ভারতের মধ্যে বিরোধ, চিরকালের বন্ধু দেশ নেপালের সাথে সীমান্ত সমস্যা মাথা চাড়া দিয়ে উঠা ভারতের সাথে সীমান্তঘেষা বন্ধু দেশগুলোর সম্পর্কের অবনতির কথা-ই জানান দেয়।

এছাড়া বিশ্বমহলে ভারতকে নেতিবাচকভাবে দেখার একটি বড় কারন হলো দেশটির উগ্র হিন্দু জাতীয়তাবাদী মনোভাব। বিশ্বায়নের এ যুগে সেসব সহিংস আচরণ সহজে পৌছে যাচ্ছে পার্শ¦বর্তী ভিন্ন সংস্কৃতির জাতি গোষ্ঠীর মাঝে। এমন মনোভাবের জের ধরেই মুসলিম অধ্যুষিত দেশগুলোর সফট কর্ণার হারাতে বসেছে বিশ্বের সবচেয়ে বেশী সীমান্তবর্তী দেশঘেরা এবং বিশ্বরাজনীতিতে ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠা ভূবৈচিত্র্যর এ দেশটি। করোনা সংক্রমণের পূর্বে দিল্লির জাতিগত বিদ্বেষের কারনে ইরানসহ মুসলিম বন্ধু রাষ্ট্রগুলোর সেন্টিমেন্টে আঘাত করা, মায়ানমারের সেনা শাসনের উপর চীনা আধিপত্যের কারনে ভারতের ভারসাম্য রেখে চলা, শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা ও কলম্বো বন্দরে চীনের বিনিয়োগ, মালদ্বীপের উপর চীনা প্রভাব ভারতের আসন্ন চিন্তার কারনও হতে পারে।

সে হিসেবে বিশ্বমোড়ল আমেরিকা ও রাশিয়াকে পাশে না পেলেও পরবর্তী সম্মুখ সমরে চীন একরকম আটঘাঁট বেধেই নেমেছে বলা যায়। কারন প্রতিরক্ষা সহায়তা দিলেও বাণিজ্যচুক্তিতে আমেরিকা ভারতকে এতটুকু ছাড় দিয়ে কথা বলবেনা এটা সবারই জানা। যার প্রমাণ হাইড্রোক্সি ক্লোরোকুইনিন নিয়ে ট্্রাম্পের হুসিয়ারির মাধ্যমে কিছুটা হলেও আন্দাজ করা যায়।

এছাড়া সামরিকভাবেও এক ধাপ এগিয়ে রয়েছে চীন। ভারতের ১৪ লাখ ৪৪ হাজার সেনাসদস্যর বিপরীতে মোট ২১ লাখ ২৩ হাজার সেনা রয়েছে চীনের। তবে সংখ্যায় রিজার্ভ সৈন্যের দিক দিয়ে এগিয়ে রয়েছে ভারত। চীনের চেয়ে প্রায় ১৬ লাখের অধিক রিজার্ভ সৈন্যে রয়েছে ভারতের। তাই গেম থিওরির জিরোসাম গেমের স্বরুপে অগ্রসরমান এ সংকট পূর্বের হিন্দু-চীনি ভাই ভাই নীতিকে কতটুকু রক্ষা করতে পারবে সেটা সময়-ই বলে দেবে।

প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সাথে এ বৈরি সম্পর্কের আরো একটু বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ভারতের সাথে নেপালের সীমান্ত বিরোধ হটাত করে কাঠমান্ডুর বেইজিংয়ের ঘনিষ্ঠ হওয়ার কারনে নয়, এ সংকট দীর্ঘবছর ধরে চললেও তা অবসান হয়নি। ১৮১৬ সালে ব্রিটিশ ভারতের সাথে সুগাওলি চুক্তির অধীনে করা মানচিত্রের ভিত্তিতে লিপুলেখের ওপর দাবি তুলেছে নেপাল। গত বছর অধিকৃত জম্মু-কাশ্মিরকে দ্বিখন্ডিত করে ভারতীয় ইউনিয়নের অনÍর্ভূক্ত করার পর বিজেপি সরকারের করা রাজনৈতিক মানচিত্রের বিরুদ্ধে নেপালে বিক্ষোভ হয়েছিল। ইতিমধ্যে ভারতীয় ভূখন্ড নিয়ে নতুন মানচিত্রের অনুমোদন দিয়েছে নেপাল পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ।

সর্বসম্মতভাবে এ সংক্রান্ত বিলে অনুমোদন দেন দেশটির আইনপ্রণেতারা। তবে সংকট তৈরিতে অন্তরাল থেকে চীনের ভূমিকার বিষয়ে ভারতের অভিযোগকে উড়িয়ে দেয়া যায় না বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

আবার জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে ১৯৪৮ সালে কাশ্মীর বিষয়ে গণভোট এর প্রস্তাব গৃহিত হয়েছিলো। তবে সেনা প্রত্যাহারের বিষয়ে দুদেশের আপোসহীনতায় কাশ্মীরকে কেন্দ্র করে ভারত আর পাকিস্তানের মধ্যে দু’বার যুদ্ধ হয়েছে। এখন উভয়-ই পারমাণবিক শক্তিধর দেশে পরিণত হয়েছে এবং পুলওয়ামার ঘটনাকে কেন্দ্র্র করে আবারও যুদ্ধের মেঘ ঘণীভ’ত হয়েছে দুদেশের আকাশে।

এদিকে ভারতের সাথে আতাতও গত কয়েক বছরের ব্যবধানে খুব একটা সুখকর হয়নি বাংলাদেশের জন্য। সীমান্তে প্রতিনিয়ত বিএসএফের গুলি, বাংলাদেশকে কঠাক্ষ করে ভারতীয় মিডিয়ার সংবাদ পরিবেশন, শুস্ক মৌসুমে রংপুর অঞ্চলে তিস্তার পানি না পেয়ে হাহাকার ফসলের মাঠ এবং বর্ষার মেীসুমে অতিবৃষ্টির পাশাপাশি ফারাক্কা বাধ খুলে দেওয়ায় এদেশের জলমগ্ন বিস্তৃর্ণ জনপদের ভোগান্তি হয়তো ভেতরে ভেতরে ফুসিয়ে তুলছে বাংলাদেশীদের। আবার আমদানিতে নুন থেকে লাকরি পর্যন্ত ভরসা করা চীনও হয়ে উঠছে বন্ধু রাষ্ট্রে।

ইতিমধ্যেই রফতানিযোগ্য ৯৭ শতাংশ পণ্যে শুল্কমুক্ত ঘোষণা এবং বাংলাদেশকে বন্ধু আক্ষা দিয়ে করোনার ভ্যাকসিন তাদের দেশে উন্নয়ন হলে প্রায়োরিটি পাবে বাংলাদেশ বলে ঘোষণা করেছে চীন। আবার বাংলাদেশের সামরিক খাতের পালে জোয়ার এসেছে ওই চীন থেকে আমদানিকৃত অস্ত্র দিয়েই। তাই ভারত না চীন এমন প্রশ্নে চট করে ভারত বলে দেওয়ার দিনও এখন কিছুটা পালটিয়েছে বাংলাদেশের।

লেখক : শাহাদাত সুমন
শিক্ষার্থী ও গণমাধ্যমকর্মী
রসায়ন বিভাগ, ৩য় বর্ষ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।