‘আপনার জন্য লজ্জা, মিত্র ত্যাগ করছেন’

প্রকাশিত: ৫:৩০ অপরাহ্ণ, আগস্ট ২২, ২০১৮ | আপডেট: ৫:৩০:অপরাহ্ণ, আগস্ট ২২, ২০১৮
এরদোয়ানের ফাইল ছবি

তুরস্কের অর্থনীতির নিম্নগামীতার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দেশটির ওপর দ্বিগুণ হারে শুল্ক আরোপ এবং নিষেধাজ্ঞা দিয়ে দেশটির পুরোনো বন্ধু রাষ্ট্র এবং মধ্যপ্রাচ্যের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সামরিক মিত্রকে খুবই চাপের মধ্যে ফেলে দিয়েছে।

যার প্রভাবে উভয় রাষ্ট্রের রাজনৈতিক এবং আঞ্চলিক স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

গত সপ্তাহগুলোতে তুর্কি মুদ্রা লিরার মান নিম্নমুখী হওয়াতে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগান নিউ ইয়র্ক টাইমসকে দেয়া এক সাক্ষাতকারে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে বলেন, ট্রাম্প তাকে পেছন থেকে চুরি চালিয়েছে।

এরদোগান এসময় হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, ‘তুরস্ক নতুন বন্ধু এবং মিত্রের খোঁজে রয়েছে।’ এরদোগানের এই বিবৃতির ফলে রাশিয়া আগ্রহ দেখিয়ে তুরস্কের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলে, ডলারকে বিশ্বের অন্যতম প্রধান বিনিময়ের মাধ্যম হিসাবে ত্যাগ করতে হবে এবং এভাবেই ডলারের মান নিম্নমুখী হবে। এতে করে লিরার মান বৃদ্ধি পাবে।

যদিও তুরস্ক এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার মিত্রতা ন্যাটোর সৌজন্যে অতটা সহজে ভেঙ্গে পড়বে না বলেই মনে হচ্ছে। ১৯৪৬ সাল থেকেই তুরস্ক যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের অন্যতম মিত্র বলে বিবেচনা করে।

তুরস্কে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের ইনক্রিলিক বিমান ঘাঁটি যেখানে যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক মিসাইল ব্যবস্থা মোতায়েন করে রেখেছে এবং এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে আইএস সংশ্লিষ্ট পক্ষসমূহকে চাপের মুখে রেখেছে।

আটলান্টিক কাউন্সিলের একজন বিশেষজ্ঞ অ্যারন স্টেইন যুক্তি দেন যে, ‘এখনো এমন কোনো সূত্রের দেখা মিলছে না, যাতে করে তুরস্ক এরকম মিত্রতা ছেড়ে যাবে।’ তিনি চলমান ঘটনাকে এরদোগানের নিয়ন্ত্রণে বলে ব্যাখ্যা দেন।

স্টেইন আরো বলেন, তুরস্ক ১৯৫২ সাল থেকেই ন্যাটোর মিত্র এবং ইনক্রিলিক বিমান ঘাঁটি শুধুমাত্র ন্যাটোর প্রয়োজনেই ব্যবহার করা যাবে। ‘কিন্তু এটি একটি ফাঁকা হুমকি যে, ইনক্রিলিক বিমান ঘাঁটির মিশন বাতাসে উড়ে যাবে এবং এরদোগান নিজেকে আইএসের সাহায্যকারী রূপে দেখাতে পছন্দ করবেন না।’

ট্রাম্পের তুরস্কের ধাতুর উপর দ্বিগুণ শুল্ক আরোপ তেমন ফলপ্রসূ হবে না যেটা মূলত ডিজাইন করা হয়েছে তুরস্কের যন্ত্রণাকে সর্বোচ্চ দিকে নেয়ার জন্য এবং তুরস্ককে যাজক এন্ড্রু ব্রানসনকে মুক্তি দেয়ার চাপ প্রয়োগের কৌশল হিসাবে যাতে এরদোগানের হাতে মাত্র কয়েকটি পথ খোলা থাকে।

তথাপি স্টেইন যুক্তি দিয়ে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রকে ইনক্রিলিক ঘাঁটি থেকে বের করে দেয়ার হুমকি তেমন একটা কাজে দিবে না কারণ এই ঘাঁটিটি পরিচালিত হয় কিছু আন্তর্জাতিক চুক্তি দ্ধারা এবং এর জন্য তুরস্কের সংসদের সম্মতিরও প্রয়োজন রয়েছে।

ন্যাটোর অস্তিত্ব

যুক্তরাষ্ট্র এবং তুরস্কের মধ্যকার বিরোধের আড়ালে এরদোগান আসলে ন্যাটোতে তার গ্রহণযোগ্যতাকে আরো বাড়িয়ে তুলেছেন। তিনি ইস্তাম্বুলে তুর্কি সৈন্য বাহিনীর ঘাঁটির মাধ্যমে ন্যাটোর নতুন মিশনগুলো পরিচালিত করার জন্য প্রস্তাব দেন এবং তুরস্ক এর মাধ্যমে ইরাকে তাদের একজন ডেপুটি কমান্ডারকে ন্যাটোর উপদেষ্টা হিসাবে প্রেরণ করে।

এদিকে তুরস্ক ২০২১ সালের জন্য ন্যাটোর নেয়া খুবই উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন একটি নতুন মিশনের নেতৃত্ব দিবে। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ন্যাটোর সামিটে এরদোগান জানান, ন্যাটো মিত্র হিসাবে তুরস্ক প্রতিরক্ষা খাতে জাতীয় আয়ের ১.৮ শতাংশ ব্যয় করেছে।

অন্যদিকে সোমবার ট্রাম্প রাশিয়া থেকে তুরস্কের এফ-৩৫ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেনার বিরুদ্ধে একটি বিলে স্বাক্ষর করেন যার অধিকাংশই তুরস্ক ইতিমধ্যেই রাশিয়াকে পরিশোধ করেছে।

থেরেসে রাফায়েল নামের এক বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘২০১৬ সালে তাকে উৎখাত করার ব্যর্থ চেষ্টার পরে এরদোগানকে সেই রাগ থেকে কিছুতেই দমিয়ে রাখা যাবে না।

এরদোগান একটি পরিকল্পনা আঁটছেন, যেটা রাশিয়া সোমবার উন্মোচন করেছে। যাতে যুক্তরাষ্ট্রের ডলারের পরিবর্তে স্থানীয় মুদ্রা দ্বারা দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চালু করা যায় এবং এতে করে ডলারের মূল্য কমে যাবে।

ট্রাম্পের নিষেধাজ্ঞার প্রতিক্রিয়ায়, গত সপ্তাহে এরদোগান এক পথ সভায় ট্রাম্পের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘আপনার জন্য লজ্জা, আপনার জন্য লজ্জা’ এমন মন্তব্য করেন। ‘আপনি একজন যাজকের জন্য ন্যাটোর গুরুত্বপূর্ণ মিত্রকে ত্যাগ করার উদ্যোগ নিয়েছেন।’ এখন প্রশ্ন হচ্ছে তুরস্ক যাজক ব্রানসনকে আটক রাখার জন্য ন্যাটো থেকে ছিঁটকে পড়ে কিনা এবং তার অর্থনীতিকে আরো খারাপ দিকে নিয়ে যায় কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

এক ব্যক্তির জন্য আমেরিকা-তুরস্কের টানাপড়েন

সাম্প্রতিককালে যুক্তরাষ্ট্র আর তুরস্কের মধ্যে যে তিক্ত কূটনৈতিক টানাপড়েন শুরু হয়েছে, তার কেন্দ্রে রয়েছে তুরস্ক উপকূল ইজমিরের একটি চার্চ। এখানে কর্মরত আমেরিকান যাজক অ্যান্ড্রু ব্রনসনের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে সহযোগিতা করার অভিযোগ এনেছে আঙ্কারা।

শহরের একটি সরু রাস্তার পাশে হলুদ ফটকের একটি চার্চ। পিয়ের ফেরিঘাট থেকে অল্প হাঁটলেই সেখানে যাওয়া যায়। একটি বিবর্ণ সাইনবোর্ডে এই চার্চের পরিচয় বলা হয়েছে। শুধু কয়েকজন মানুষ এই চার্চের নিয়মিত ধর্মসভায় যাতায়াত করতেন।

কিন্তু এখন সেই পরিস্থিতি পাল্টে গেছে। রবিবারের প্রার্থনা সভায় এখন অসংখ্য আন্তর্জাতিক প্রতিবেদকের ভিড় লেগে যায়।

দুই বছর আগে পর্যন্ত অ্যান্ড্রু ব্রনসন চার্চে কাজ করতেন। তার একজন বন্ধু জানিয়েছেন, ২০১০ সাল থেকে ধর্মসভা পরিচালনা করতেন ব্রনসন। উত্তর ক্যারোলিনা থেকে আসা ব্রনসন স্ত্রী নোরিনকে নিয়ে তুরস্কে আসেন ১৯৯৩ সালে। তাদের তিন সন্তান এখানেই বড় হয়েছেন।

২০১৬ সালের ৭ অক্টোবর এই দম্পতিকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ২০১৬ সালে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ানের বিরুদ্ধে ব্যর্থ অভ্যুত্থান চেষ্টার পর যে ৫০ হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তাদের অংশ হলেন ব্রনসন দম্পতি।

কয়েকদিন পরে নোরিন ব্রনসনকে মুক্তি দেয়া হয়। তবে ডিসেম্বর মাসে যাজক ব্রনসনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ গঠন করে তুরস্ক। সেখানে অভিযোগ আনা হয়, ‘তিনি সশস্ত্র সন্ত্রাসী বাহিনীর সদস্য’ এবং তাকে কারাগারে পাঠিয়ে দেয়া হয়।

কৌঁসুলিরা বলেন, ব্রনসনের সঙ্গে দুইটি গ্রুপের যোগাযোগ রয়েছে, যাদের সন্ত্রাসী বলে মনে করে তুরস্ক। অপরাধ প্রমাণিত হলে তার ৩৫ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে যে, তিনি কুর্দিস্তান ওয়ার্কার্স পার্টিকে (পিকেকে) সাহায্য করছেন। এই দলের নেতা ফেতুল্লাহ গুলেন- ব্যর্থ ওই অভ্যুত্থান চেষ্টার জন্য যাকে দায়ী করছে তুরস্ক।

গুলেন যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়ায় বসবাস করেন এবং অভ্যুত্থান চেষ্টার সঙ্গে কোনোরকম জড়িত থাকার অভিযোগ নাকচ করে দিয়েছেন। বিচারের মুখোমুখি করতে তাকে তুরস্কে ফেরত পাঠানোর দাবি করছে আঙ্কারা।

তবে ব্রনসনের স্বজন এবং বন্ধুরা অভিযোগ করছেন, কূটনৈতিক দর কষাকষির হাতিয়ার হিসেবে এই ধর্মযাজককে ব্যবহার করার চেষ্টা করছে তুরস্ক। তুরস্ক জানিয়েছে, আইন অনুযায়ী’ তার বিরুদ্ধে আদালতের কার্যক্রম চলছে।

বর্তমান সংকটের শুরু হয় গত ১৮ জুলাই থেকে, যখন শুনানির পর তুরস্কের একটি আদালত ব্রনসনকে কারাগারে রাখার আদেশ দেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই সিদ্ধান্তকে ‘অসম্মান’ বলে বর্ণনা করেন এবং তাকে অবিলম্বে মুক্তি দেয়ার জন্য তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের প্রতি আহ্বান জানান।

একটি টুইট বার্তায় ট্রাম্প বলেন, ‘তাকে দীর্ঘদিন ধরে জিম্মি করে রাখা হয়েছে। এরদোয়ানের উচিত এই চমৎকার খৃষ্টান স্বামী ও পিতার মুক্তির জন্য কিছু করা। তিনি অন্যায় কিছু করেননি, তার পরিবার তাকে পেতে চায়।’

স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটার কারণে গত ২৫ জুলাই ব্রনসনকে কারাবন্দীর বদলে গৃহবন্দী করে রাখা হয়। এই সিদ্ধান্ততে ওয়াশিংটন স্বাগত জানালেও পর্যাপ্ত নয় বলে মনে করছে। ব্রনসনকে মুক্তি না দেয়ায় সর্বশেষ গত ১লা আগস্ট তুরস্কের বিচার এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ওপর নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করে হোয়াইট হাউজ।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেওর সর্বশেষ একটি চেষ্টার পর, শুক্রবার ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দেন, তুরস্ক থেকে আমদানি করা স্টিল আর অ্যালুমিনিয়ামের ওপর শুল্ক দ্বিগুণ করা হবে। ট্রাম্প টুইট বার্তায় জানান, ‘তুরস্কের সঙ্গে এই মুহূর্তে আমাদের সম্পর্ক ততটা ভালো নেই।’

গত সোমবারই মার্কিন নেতারা একটি প্রতিরক্ষা বিলে স্বাক্ষর করেছেন, যার ফলে একশোটি এফ-৩৫ ফাইটার জেট বিমান তুরস্কের কাছে হস্তান্তরে বিলম্ব হবে।

এই বিতণ্ডা এখন পুরোমাত্রার একটি কূটনৈতিক সংকটে পরিণত হয়েছে। এর আগে ১৯৭৪ এবং ১৯৭৮ সালে তুরস্কের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল যুক্তরাষ্ট্র, যখন ১৯৭৪ সালে তুরস্ক সাইপ্রাসে অভিযান চালায়।

সাম্প্রতিক এই নিষেধাজ্ঞার পর তুরস্কের লিরার মূল্যমান ২০ শতাংশ পড়ে গেছে। বিনিয়োগকারীরা বিক্রি বাড়িয়ে দেয়ায় আরো কয়েকটি উদীয়মান অর্থনীতির মুদ্রার মানও কমেছে।

পাল্টা জবাব হিসাবে এরদোয়ান বলেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের ইলেকট্রনিক পণ্য বর্জন করবে তুরস্ক। আমেরিকান সরবরাহকারীদের সাথে ব্যবসাকারী কোম্পানিগুলোকে বিকল্প খোঁজার জন্যও তিনি আহবান জানিয়েছেন।

এরদোয়ান বলেন, ‘আমি আমার জাতিকে আহবান জানাচ্ছি, বিশেষ করে আমাদের ব্যবসায়ী সম্প্রদায়কে; এখন আমাদের সবচেয়ে ভালো জবাব হবে চালকের আসনে শক্তভাবে বসা। আমরা আরো বেশি উৎপাদন করবো, আরো বেশি রপ্তানি করবো।’

তুর্কি এয়ারলাইন্স এবং তুর্কি টেলিকমের মতো বড় ব্যবসায়িক কোম্পানিগুলো ঘোষণা দিয়েছে, তারা যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক কোন মিডিয়ায় আর বিজ্ঞাপন দেবে না।

যখন দুই ন্যাটো সহযোগী দেশের মধ্যে সম্পর্ক খারাপের দিকে যাচ্ছে, তখন রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় বৈঠকের জন্য এসেছেন। যুক্তরাষ্ট্রকে এক হাত দেখে নেয়ার সুযোগের ব্যবহার করছেন ল্যাভরভ। রাশিয়া এবং তুরস্কের ওপর নিষেধাজ্ঞা ‘অবৈধ’ এবং ‘বিশ্ব বাণিজ্যে অন্যায় সুবিধা নিতে’ ওয়াশিংটন এসব করছে বলে তাদের দাবি।

তুরস্ক আর যুক্তরাষ্ট্রের এই তিক্ত কূটনৈতিক বৈরিতার কোন সমাধানের আলো দেখা যাচ্ছে না- পাশাপাশি তুরস্কে ব্রনসনের ভাগ্যও অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে।

সূত্র: বিবিসি