আবর্জনায় নাস্তানাবুদ রাশিয়া

ডয়চে ভেলের প্রতিবেদন

টিবিটি টিবিটি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ৯:২৬ অপরাহ্ণ, জুন ২৩, ২০২১ | আপডেট: ৯:২৬:অপরাহ্ণ, জুন ২৩, ২০২১

আয়তনের বিচারে বিশ্বের সবচেয়ে বড় দেশ এবং এককালের পরাশক্তি হিসেবে রাশিয়া আবর্জনার চাপে নাজেহাল। এখনো সে দেশে জঞ্জাল ব্যবস্থাপনা অবহেলিত থাকায় মারাত্মক দূষণের সমস্যায় মানুষ জর্জরিত হচ্ছে।

শাপিনো গ্রামের কাছে আলেক্সিনস্কি ল্যান্ডফিল মস্কোর আশেপাশের প্রায় এক ডজন আবর্জনার স্তূপের একটি। ৩২ হেক্টর জমিতে প্রায় ৪৫টি ফুটবল মাঠ ধরে যেতে পারে। স্থানীয় মানুষের মতে, মাত্র কয়েক বছর আগে সেই গর্ত ৩০ মিটার গভীর ছিল। এখন সেখানে প্রায় ২০ মিটার উঁচু টিলা চোখে পড়ে। উচ্চতার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের স্বাস্থ্যের সমস্যাও বেড়ে চলেছে।

ইয়ুলিয়া ফেডোসেইয়েভার জন্মস্থান থেকে আবর্জনার স্তূপ প্রায় ৫০০ মিটার দূরে অবস্থিত। তিনি বলেন, অসহনীয় দুর্গন্ধের কারণে মাঝে মাঝে ফ্ল্যাটের জানালা খোলার উপায় ছিল না। তাঁর দুই সন্তান, আট বছর বয়সি ইলইয়া ও সাত বছরের ইয়ারোস্লাভা ঘনঘন অসুস্থ হয়ে পড়তো। একটা সময়ের পর ইয়ুলিয়া আর থাকতে না পেরে বাধ্য হয়ে ক্লিন শহরে চলে যান। নিজের অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়ে ইয়ুলিয়া বলেন, ‘‘বাচ্চাদের কোনো না কোনো রোগ লেগেই থাকতো। একদিন ডাক্তার বললেন, তাদের ফুসফুসে শব্দ হচ্ছে। আমি আর থাকতে না পেরে ক্লিন শহরে ফ্ল্যাটের খোঁজ শুরু করি। বাসা বদলানোর পর সেই ডাক্তারের কাছে আবার যেতে তিনি বললেন, অলৌকিক ঘটনা! বাচ্চাদের ফুসফুসে আর কোনো শব্দ নেই! কেন? উত্তরটা সহজ। কারণ আমরা সেই ভাগাড় থেকে দূরে চলে গেছি।’’

ইয়ুলিয়ার পরিবারের এমন অভিজ্ঞতা মোটেই বিচ্ছিন্ন নয়। জঞ্জাল ব্যবস্থাপনা রাশিয়ার অন্যতম বড় সমস্যা। গ্রিনপিস সংগঠনের সূত্র অনুযায়ী গোটা দেশে চার শতাংশেরও কম জঞ্জাল প্রক্রিয়াজাত করা হয় এবং মাত্র দুই শতাংশ ইনসিনারেশন প্লান্টে পৌঁছায়। বাকিটা ভাগাড়ে ফেলে দেওয়া হয়।

আয়তনের বিচারে বিশ্বের সবচেয়ে বড় দেশ বাৎসরিক প্রায় সাত কোটি টন জঞ্জাল ফেলার জায়গা পাচ্ছে না, এমনটা শুনলে বিস্ময় জাগতে পারে বৈকি! বিশেষ করে মস্কোর ল্যান্ডফিল বা ভাগাড়গুলিকে টাইম বোমা বলা হয়। বেশিরভাগ ল্যান্ডফিলই সরকারি মানদণ্ড না মেনে মাটি, ভূগর্ভস্থ পানি ও বাতাসে দূষণ ছড়ায়। স্থানীয় মানুষের লাগাতার প্রতিবাদ সত্ত্বেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কোনো সুফল পাওয়া যায় না।

ইয়ুলিয়া ফেডোসেইয়েভা তার নিজের অঞ্চলে দূষণহীন বাতাসের জন্য এক উদ্যোগে সামিল হয়েছেন। বাকি অ্যাক্টিভিস্টদের সঙ্গে মিলে নিজেদের অর্থ ব্যয় করে তারা একটি গ্যাস অ্যানালাইজার কিনেছেন। তেজস্ক্রিয় বিকিরণ, ক্লোরিন, হাইড্রোজেন সালফাইড, অ্যামোনিয়া ও অন্যান্য দূষণ পরিমাপ করে সেই যন্ত্র।

পরিবেশবাদী অ্যাক্টিভিস্ট আলেক্সি কোটভ বলেন, ‘‘এই তথ্য বিশ্লেষণ করে আমরা গোটা এলাকায় দুর্গন্ধের মানচিত্র সৃষ্টি করেছি। তার ভিত্তিতে স্থির করি, সন্তানদের নিয়ে বাইরে যেতে পারি কিনা।’’

পরিমাপের ফলাফল সত্যি উদ্বেগজনক। অ্যাক্টিভিস্টরা নিয়মিত সরকারি পরিবেশ দফতরে সেই তথ্য পাঠান। ২০১৭ সালে রাষ্ট্রীয় এমারজেন্সি সার্ভিস সাড়া দিতে বাধ্য হয়। তাদের পরিমাপে অনুমোদিত মাত্রার প্রায় ২৫ গুণ বেশি পরিমাণ হাইড্রোজেন সালফাইড ধরা পড়ে। তবে অ্যাক্টিভিস্টরা আদালতের দ্বারস্থ হয়েও কোনো সুফল পান নি।

ডিডাব্লিউ রিপোর্টাররা ল্যান্ডফিল ম্যানেজার ও ক্লিন পৌর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেও কোনো উত্তর পান নি। তাই ইউলিয়া বাধ্য হয়ে ডিটেক্টর যন্ত্রের ফলাফল দেখে সন্তানদের বাসার বাইরে নিয়ে যান। বাতাসের গতি পরিবর্তন এবং দুর্গন্ধের মাত্রা অসহনীয় হয়ে ওঠার আগেই আগেই ইয়ুলিয়া নিজের সন্তানদের একবার চট করে পুরানো বাসা দেখিয়ে এনেছেন।

ইয়ুলিয়া বলেন, ‘‘জানি না, আমরা আর কতদিন সিস্টেমের বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারবো। আমরা সংখ্যায় এত কম যে অসহায় ও মরিয়া বোধ করছি।’’

আবর্জনার পাহাড় বেড়েই চলেছে। সমস্যা সমাধানের বদলে উলটে আলেক্সিনস্কি ল্যান্ডফিল আরও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা চলছে।