আব্বাকে নিয়ে করোনা গুজব, শুনুন…

প্রকাশিত: ৮:৩২ অপরাহ্ণ, মে ১০, ২০২০ | আপডেট: ৮:৩২:অপরাহ্ণ, মে ১০, ২০২০
ফাইল ছবি

কামরুল হাসান শাকিম: সারাবিশ্ব আজ করোনা ভাইরাসের কাছে কপোকাত। এখনো কার্যকরী ওষুধ কোনো দেশ তৈরি করতে পারে নি। বাংলাদেশেও করোনা আক্রান্তের সংখ্যার সঙ্গে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েই চলছে। শহর বন্দর পেরিয়ে করোনা আজ হানা দিয়েছে গ্রামে গঞ্জেও। করোনা সত্যিকার অর্থেই ভয়ানক একটি ছোঁয়াচে রোগ। এর সঙ্গে গুজবও মানুষের তৈরি অন্যতম ভয়াবহ ব্যাধির নাম। আমরা করোনায় আক্রান্ত না হয়েও এই গুজব নামক ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে ছিলাম। বিশেষ করে আমার আব্বা। তাহলে কাহিনী শুনুন-

আমার গ্রামের বাড়ি হবিগঞ্জ জেলার চুনারুঘাট উপজেলায়। গত ২৪ শে এপ্রিল পবিত্র মাহে রমজান উপলক্ষে আমাদের পুকুরে মাছ ধরা হয়েছিল। এই পুকুরের অংশীদার আমাদের পাশাপাশি দুই বাড়ির। আমার পাশের বাড়ির (স¤পর্কে চাচা) জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে নাজির হিসেবে চাকরি করেন। সেদিন তিনি মাছ নেয়ার জন্য আসছিলেন। যেহেতু এখন খুবই ক্রান্তিকাল চলছে সেজন্য সঙ্গে করে কিছু মাস্ক এবং ত্রাণ নিয়ে আসেন। ওনার সময় খুব কম থাকায় এবং বিশ্বস্ততার কারনে আমার আব্বাকে ত্রাণ বণ্টনের লিস্ট দিয়ে সুষ্ঠুভাবে বণ্টনের জন্য অনুরোধ করে যান। দায়িত্বটি তিনি সঙ্গে নিয়ে আসা গাড়িতে বসে আব্বাকে বুঝিয়ে দিয়ে যান। এদিকে মাস্ক বিতরণকালে আশেপাশের কয়েকবাড়ির মানুষের সামাজিক দূরত্ব উপেক্ষা করে ভীড় জমিয়ে ফেলে। তখন একটা হযবরল অবস্থার সৃষ্টি হয়। এদিকে আব্বা ওনার লিস্ট মোতাবেক একদম সঠিকভাবে ত্রাণ বিতরণ করেন।

এইদিন স্বাভাবিক গেলেও পরেরদিন শনিবার সবকিছু উলটপালট হয়ে যায়। পরেরদিন আমরা সবাই জানতে পারি জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের চারজনের করোনা পজিটিভ। তখনই আমাদের সবার মনে উৎকণ্ঠার সৃষ্টি হয়। অধিকতর বিষয়টি নিশ্চিত হবার জন্য আব্বা ওনাকে ফোন করেন। ওনি ওনার করোনা ভাইরাসের পজিটিভের কথা জানান এবং কোনো উপসর্গ না থাকায় কোয়ারেন্টিনে আছেন বলে নিশ্চিত করেন। ওনি কোনো উপসর্গ না থাকলেও জেলা প্রশাসকের অফিসের সবার সঙ্গে বাড়িতে আসার তিনদিন আগে স্যাম্পল দিয়েছিলেন। কোনো উপসর্গ না থাকায় স্যাম্পল দিয়েও তিনি বাড়িতে আসেন। তখন আমরা সহ এলাকার সবাই একটা দুশ্চিন্তায় পড়ে যাই। আতঙ্ক, উৎকণ্ঠা এবং দুশ্চিন্তার হয়ে যায় আমাদের দুই-তিন বাড়ির মানুষের। বাড়ির মধ্যে সুনসান নীরবতা এবং এক ভীতিকর অবস্থার সৃষ্টি হয়। ঘটনাটি সবার জন্য দুশ্চিন্তার বিষয় হলেও আমাদের জন্য হয়ে যায় ডাবল দুশ্চিন্তার। কারন আমাদের দুশ্চিন্তার আগুনে আরেকটু ঘি ঢেলে দেয়ার মতোই গুজব ছড়িয়ে যায় আব্বা ওনার সংস্পর্শে গেছেন। গাড়িতে উঠেছেন। অথচ এখানে দুই-তিন বাড়ির সকল মানুষ ওনার সংস্পর্শে ছিল এবং অনেকে হ্যান্ডশেকও করেছে। করোনা হলে আশেপাশের সকল বাড়ির সবার হওয়ার কথা। কিন্তু আব্বা গাড়িতে উঠায় আর পরিচিত মুখ হওয়ায় গুজব রটে যায় আব্বা সংস্পর্শে গেছেন এবং ওনার করোনা হয়ে গেছে। এদিন রাতেই এক চাচাতো ভাই ফোন দিল আমাকে যে আব্বাকে আলাদা রাখতে এবং কোনো উপসর্গ আছে কিনা। কিন্তু আমি জানালাম কিছুই হয়নি।

এদিকে পরেরদিন মুখে মুখে রটে গেছে আব্বা করোনা আক্রান্ত হয়ে গেছেন। সবাই ফোন দিচ্ছে অনেকে সরাসরি জিজ্ঞেস করছে আবার অনেকে ইনিয়েবিনিয়ে জিজ্ঞেস করার চেষ্টা করছে। অনেকেই বলছে বাড়ি লকডাউন দিতে, অনেকেই বলতেছে করোনার জন্য স্যা¤পল দিতে। মাথা কিছুতেও কাজ করছিলনা। পাশের বাড়ির এক লোক আরেকজনকে ফোন দিয়ে বলেছে নাকি আব্বা বিছানায় পড়ে গেছেন এবং করোনা আক্রান্ত হয়ে গেছেন।

ঝড়ের বেগে আব্বার করোনা হবার গুজব চারদিকে ছড়িয়ে পড়লো। তবে আমরা সাবধানতার জন্য তখন থেকেই গরম পানি খাওয়া, গারগিল করা শুরু করেছিলাম। গ্রামেই ছোট বোনের শ্বশুর বাড়ি গুজব পৌঁছে যাওয়ায় তারাও আতঙ্কিত হয়ে পড়ে।

অনেকেই প্রথম দিন আব্বাকে দেখতে না পেয়ে বলা শুরু করলো ওনাকে ঢাকায় হাসপাতালে নিয়ে গেছে। কথিত এক স্থানীয় সাংবাদিক নিউজের জন্য পাশের বাড়ির একজনকে ফোন দিয়ে তথ্য জানতে চাইল। কিন্তু তারা নিষেধ করায় আর এগোয়নি। একদল গুজব ছড়ালো নাজির সাহেবের (যিনি আক্রান্ত ছিলেন) ওনার রিপোর্ট ভুল আসছে কিন্তু আব্বার করোনা পজিটিভ আসছে। দুই একদিন পরে যখন আব্বাকে কিছুটা বাহিরে দেখা গেল তখন সবাই আবার গুজব রটানো শুরু করলো যে আব্বার করোনা টেস্ট নেগেটিভ আসায় ওনি বের হচ্ছেন।

এই গুজব দেশ পেরিয়ে বিদেশেও আমার চাচাতো ভাইয়ের কাছে পৌঁছে গেল। অথচ আমাদের কারও কোনো উপসর্গই ছিলনা। এই পরিস্থিতিতে বুঝতে পেরেছি গুজব কতটা ভয়ংকর রূপ নিতে পারে। আমার কাছে করোনা থেকেও গুজবকে শক্তিশালী মনে হয়েছিল। আশেপাশের দুই-তিন বাড়ির মানুষ জটলা বেধে ওনার সংস্পর্শে আসলেও গুজব রটে যায় আমার আব্বার নামে। পরবর্তীতে ওনার (যিনি আক্রান্ত) পরিবারের সবার স্যাম্পল পাঠানো এবং ২রা মে সবার রিপোর্ট নেগেটিভ আসে। গত ৬ মার্চ ওনারও কোনো উপসর্গ ছাড়াই পরবর্তী পরীক্ষায় নেগেটিভ রেজাল্ট আসে। এই খবর শুনে দুই-তিন বাড়ির মানুষ এখন স্বস্তিতে আছি।

লেখক:
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। বাংলাদেশ টুডে এবং বাংলাদেশ টুডে-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)