আ’লীগের যেসব মন্ত্রী-এমপির কপাল পুড়তে পারে

টিবিটি টিবিটি

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ৪:০৭ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ১৭, ২০১৮ | আপডেট: ৪:০৭:অপরাহ্ণ, নভেম্বর ১৭, ২০১৮
সংগৃহীত

টাঙ্গাইল-৩ আসনের এমপি আমানুর রহমান খান রানা আলোচিত আওয়ামী লীগ নেতা ফারুক আহমেদ হত্যা মামলায় এখনো কারাগারে আছেন।

হত্যা মামলা ছাড়াও সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, জমিদখলসহ বিভিন্ন অভিযোগ তার বিরুদ্ধে। আসনটিতে তৎপর রয়েছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ডা: কামরুল হাসানসহ ডজনখানেক নেতা।

ঠাকুরগাঁও-২ আসনে বর্তমান সংসদ সদস্য জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মো: দবিরুল ইসলাম ও তার বিরুদ্ধে জেলার বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকায় সংখ্যালঘু পরিবারের জমিদখলের অভিযোগ রয়েছে।

আসনটিতে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেতে জোরেশোরে কাজ করছেন জেলা সাংগঠনিক সম্পাদক মোস্তাক আলম টুলু ও প্রবীর চন্দ্র রায়সহ অনেকে।

অনুষ্ঠানের ব্যানারে নিজের নাম না থাকায় নিজ মন্ত্রণালয়ের এক যুগ্মসচিবের কক্ষ ভাঙচুর ও আরেক সিনিয়র সহকারী সচিবের কক্ষে তালা দিয়ে দেশজুড়ে সমালোচনার ঝড় তোলেন নেত্রকোনা-২ আসনের এমপি এবং যুব ও ক্রীড়া উপমন্ত্রী আরিফ খান জয়।

তার বিরুদ্ধে দলীয় নেতাকর্মী এবং পুলিশ পেটানোর অভিযোগও আছে। খেলার মাঠে পিস্তল প্রদর্শন করে বেশ সমালোচিত তিনি। এবার তার মনোনয়ন অনিশ্চিত।

সে জন্য মাঠে তৎপর রয়েছেন জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি ও জেলা পরিষদের সাবেক প্রশাসক মতিয়ুর রহমান খান, জেলা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক এমপি মুক্তিযোদ্ধা আশরাফ আলী খান খসরুসহ অনেকে।

এভাবে টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, নিজ দলের নেতাকর্মী হত্যা ও নির্যাতন, সংখ্যালঘুদের নির্যাতন ও সম্পত্তি দখল, দুর্নীতি, ইয়াবা কারবার, আত্তীকরণসহ নানা অভিযোগ রয়েছে ক্ষমতাসীন দলের শতাধিক মন্ত্রী-এমপির বিরুদ্ধে।

আগামী নির্বাচনে বিতর্কিত এসব এমপির মনোনয়ন একেবারেই অনিশ্চিত। সে জন্য দলের সাবেক এমপিসহ শক্তিশালী বিকল্প প্রার্থীরা মাঠে রয়েছেন।

সরকারের বিভিন্ন সংস্থার জরিপ ও আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক নেতাদের পর্যবেক্ষণে এসব প্রার্থীর শক্তিশালী অবস্থান এবং জনপ্রিয়তার বিষয়টি উঠে এসেছে।

আওয়ামী লীগের নির্ভরযোগ্য একাধিক সূত্র জানায়, আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে মাঠজরিপে বর্তমান এমপিদের নানা অপকর্ম, এলাকায় অবস্থান এবং বিকল্প প্রার্থীদের নামও উঠে এসেছে।

আর নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হবে এবং বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেবে এ হিসাব কষেই আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজ দলের প্রার্থী বাছাই করছেন।

সে জন্য তিনি কয়েক দফায় এমপিদের সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, কারো মুখ দেখে তিনি আগামী নির্বাচনে মনোনয়ন দেবেন না। সর্বশেষ মনোনয়নপ্রত্যাশীদের সাক্ষাৎকার অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, দুইবার আমি এমপি বানিয়েছি এবার আর পারব না। এবার যোগ্যদেরই মূল্যায়ন করা হবে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দলের মনোনয়ন বোর্ডের তিন সদস্য জানান, নির্বাচনকে সামনে রেখে মূলত প্রার্থীদের দু’টি তালিকা করেছেন সভাপতি শেখ হাসিনা। একটি হচ্ছে বিএনপি নির্বাচনে না এলে এবং আরেকটি হচ্ছে বিএনপি নির্বাচনে এলে।

আর শেষ পর্যন্ত বিএনপি নির্বাচনে আসায় দ্বিতীয় তালিকাটিই প্রাধান্য পাচ্ছে। কারণ, বিএনপি আসায় নির্বাচন অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে। সে জন্য বর্তমান বিতর্কিত অনেক এমপি-মন্ত্রীর কপাল পুড়তে পারে। এ ছাড়া এবার জোটের কলেবর বাড়ার কারণেও অনেকে বাদ পড়তে পারেন।

আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় ও তৃণমূল সূত্রে জানা গেছে, খুলনা-৬ (কয়রা-পাইকগাছা) আসনের এমপি অ্যাডভোকেট নূরুল হকের বিরুদ্ধে নিয়োগপ্রক্রিয়ায় জালিয়াতি ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগে মামলা হয়েছে।

স্থানীয় এক আওয়ামী লীগ নেতার পরিবারকে বাড়ি থেকে উৎখাতের চেষ্টার অভিযোগ তার ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে। উঁচু দেয়াল তুলে যাতায়াত বন্ধ করে দেয়া হয় সেই পরিবারের।
অমানবিক এ বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে আলোড়ন ওঠে দেশজুড়ে। আসনটিতে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেতে দৌড়ঝাঁপ করছেন সাবেক এমপি অ্যাডভোকেট সোহরাব আলী সানা, প্রধানমন্ত্রীর অর্থনীতিবিষয়ক উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমানসহ ডজনখানেক নেতা।

নেত্রকোনা-১ আসনে বর্তমান এমপি ছবি বিশ্বাসের বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, টিআর-কাবিখা লুট, নিয়োগবাণিজ্য এবং সর্বোপরি নিজ দলীয় নেতাকর্মীদের নির্যাতনেরও অভিযোগ রয়েছে।

তার বিরুদ্ধে একাট্টা স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা। এ আসনের সাবেক এমপি ও আনন্দমোহন কলেজের সাবেক ভিপি মোশতাক আহমেদ রুহীর পক্ষে অবস্থান নিয়েছে দলের তৃণমূল। তাকে আবারো এমপি হিসেবে চান তারা।

‘ইয়াবা সম্রাট’ হিসেবে পরিচিত কক্সবাজার-৪ (উখিয়া-টেকনাফ) আসনের এমপি আবদুর রহমান বদিকে নিয়ে শুরু থেকেই বিব্রত আওয়ামী লীগ। অবৈধ সম্পদ অর্জনকারী বদির বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছে দুর্নীতি দমন কমিশন।

এতে নি¤œ আদালত ৩ বছরের কারাদণ্ড দিলেও উচ্চ আদালত থেকে জামিনে আছেন তিনি। এ সুযোগে সাবেক সংসদ সদস্য ও টেকনাফ উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি অধ্যাপক মোহাম্মদ আলী নিজেকে গুছিয়ে নিচ্ছেন।

ফেনী-২ (সদর) আসনের এমপি ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নিজাম উদ্দিন হাজারীর বিরুদ্ধে দলীয় নেতাকর্মী হত্যা, নির্যাতনসহ নানা অভিযোগ রয়েছে স্থানীয় আওয়ামী লীগের।

এসব নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন জেলা আওয়ামী লীগের নেতারা। এ ছাড়া কারাগারে সাজার বিষয়টি নির্বাচনী হলফনামায় লুকিয়ে এমপি হওয়ায় তার বিরুদ্ধে রয়েছে ব্যাপক সমালোচনা।

এমনকি তার বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে দলের হাইকমান্ড বেশ ক্ষুব্ধ। এবার বিকল্প হিসেবে মাঠজরিপে উঠে আসছে দলের কেন্দ্রীয় উপকমিটির সদস্য ও সাবেক ছাত্রলীগ নেতা সাইফুদ্দিন আহমেদ ভূঁইয়া নাসির এবং সাবেক আলোচিত এমপি জয়নাল আবেদিন হাজারীর, ইকবাল সোবহান চৌধুরী ও আজহারুল হক আরজুর নাম।

নড়াইল-১ আসনের বর্তমান এমপি কবিরুল হক মুক্তি। তার বিপক্ষে শক্ত অবস্থান নিয়েছেন তৃণমূলের নেতাকর্মীরা। টিআর, কাবিখার দুর্নীতি, স্কুল-কলেজে নিয়োগবাণিজ্যসহ নানা দুর্নীতির অভিযোগ তুলে ধরে এমপির বিরুদ্ধে তৃণমূল নেতাকর্মীরা একাধিক সংবাদ সম্মেলন করেছেন এবং দলীয় প্রধানের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন।

চট্টগ্রাম-১৫ (সাতকানিয়া-লোহাগাড়া) আসনের সংসদ সদস্য আবু রেজা মুহাম্মদ নেজামউদ্দিন নদভীকে নিয়ে একাধিকবার বিব্রত হয়েছে আওয়ামী লীগ। তার বিকল্প হিসেবে আসনটিতে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপ-প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক আমিনুল ইসলাম আমিন ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছেন।

চট্টগ্রাম-১১ (হালিশহর-পতেঙ্গা) আসনের এমপি এম এ লতিফ কম্পিউটারে ফটোশপের মাধ্যমে নিজের শরীরের অংশের সাথে বঙ্গবন্ধুর মুখমণ্ডল লাগিয়ে তুমুল বিতর্কের জন্ম দেন।
বিষয়টি নিয়ে ব্যাপকভাবে সমালোচিত হন এবং এতে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা তার ওপর নাখোশ। নরসিংদী-৫ (রায়পুরা) আসনের এমপি রাজিউদ্দিন আহমেদ রাজু নিজ এলাকায় বিতর্কিত।

এলাকার নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন না করে উল্টো তাদের ওপর হামলা-মামলার অভিযোগ আছে তার বিরুদ্ধে। আসনটিতে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির কার্যনির্বাহী সদস্য অ্যাডভোকেট রিয়াজুল কবীর কাওছার ব্যাপক গণসংযোগ করছেন।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ (সদর-বিজয়নগর) আসনের এমপি ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি র. আ. ম. উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরীর বিরুদ্ধে নাসিরনগরে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বসতবাড়িতে হামলা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের রয়েছে বিস্তর অভিযোগ।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মরহুম ছায়েদুল হকের সাথে বিরোধে জড়ানোয় তাকে ভালো চোখে দেখছে না কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ। আগামীতে আসনটিতে দলীয় মনোনয়ন হাতছাড়া হতে পারে মোকতাদির চৌধুরীর।

আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী মহল থেকে জানা যায়, এরকম বিতর্কিত প্রায় এক শ’র বেশি আসনে জনপ্রিয় ও ক্লিন ইমেজের প্রার্থী চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। বিতর্কিত এমপিদের আসনগুলোর মধ্যে রয়েছে কুষ্টিয়া-৪ (খোকসা-কুমারখালী) নীলফামারী-৩, নীলফামারী-৪, লালমনিরহাট-১, লালমনিরহাট-৩, রংপুর-১, রংপুর-২, রংপুর-৫, কুড়িগ্রাম-১, কুড়িগ্রাম-২, কুড়িগ্রাম-৩, গাইবান্ধা-১, গাইবান্ধা-২, গাইবান্ধা-৩, জয়পুরহাট-২, বগুড়া-৫, বগুড়া-৬, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-১, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২, নওগাঁ-৫, রাজশাহী-৩, রাজশাহী-৫, রাজশাহী-৬, নাটোর-২, সিরাজগঞ্জ-২, সিরাজগঞ্জ-৪, সিরাজগঞ্জ-৫, পাবনা-১, পাবনা-২, মেহেরপুর-২, ঝিনাইদহ-৩, যশোর-১, যশোর-২, যশোর-৫, যশোর-৬, মাগুরা-১, বাগেরহাট-৪, খুলনা-৩, খুলনা-৬, পটুয়াখালী-১, বরিশাল-২, বরিশাল-৫, টাঙ্গাইল-১, টাঙ্গাইল-২, টাঙ্গাইল-৬, টাঙ্গাইল-৮, জামালপুর-২, ময়মনসিংহ-৭, ময়মনসিংহ-৮, নেত্রকোনা-২, নেত্রকোনা-৩, নেত্রকোনা-৪, মুন্সীগঞ্জ-১, ঢাকা-২, ঢাকা-৮, ঢাকা-১৪, ঢাকা-১৫, ঢাকা-২০, গাজীপুর-৫, নারায়ণগঞ্জ-৩, মাদারীপুর-৩, শরীয়তপুর-২, শরীয়তপুর-৩ আসনসহ আরো কয়েকটি।