ইউরোপ যাত্রায় ‘নেতিবাচক’ রেকর্ড বাংলাদেশিদের

টিবিটি টিবিটি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ৯:১৩ অপরাহ্ণ, জুন ২১, ২০২১ | আপডেট: ৯:১৩:অপরাহ্ণ, জুন ২১, ২০২১

কাঠের ওপর বসে কিংবা ছোট্ট প্লাস্টিকের নৌকায় চড়ে উত্তাল সমুদ্র পাড়ি দিচ্ছেন বাংলাদেশিরা। জীবনের মায়া সম্পূর্ণরূপে তুচ্ছ করে তারা ইউরোপের মাটিতে পা রাখতে চান। পরিসংখ্যান বলছে, এমন ঝুঁকি নেয়ার ক্ষেত্রে সবার ওপরে অবস্থান করছে বাংলাদেশ। বিষয়টি সরকারের জন্য বিব্রতকর হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সম্প্রতি ইউরোপভিত্তিক সুপরিচিত জরিপ সংস্থা স্ট্যাটিস্টা এ ব্যাপারে একটি পরিসখ্যান প্রকাশ করেছে। সেখানে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত ইউরোপে অভিবাসন প্রত্যাশীদের নানা রকম তথ্য উঠে এসেছে। এই ৫ মাসে ১৫ হাজার তরুণ-যুবক ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি পৌঁছেছেন।

তবে ঠিক কত মানুষ এমন মারাত্মক ঝুঁকি নিয়ে মাতৃভূমি ছেড়েছেন, তার কোনো হিসেব উঠে আসেনি জরিপে। সেই হিসেব করা হয়তো সম্ভবও নয়। কারণ উত্তাল সমুদ্রে অভিবাসন প্রত্যাশী এসব হতভাগা মানুষের সলিল-সমাধি হওয়ার কথা গণমাধ্যমে উঠে আসে নিয়মিত বিরতিতেই। আবার অনেক খবর হয়তো গণমাধ্যমেও উঠে আসে না।

যারা তীরে পৌঁছাতে পারেন, তারাই কেবল উঠে এসেছেন পরিসংখ্যানে। গত ৫ মাসে ইতালি পৌঁছানো এমন ১৫ হাজার তরুণ-যুবকের মধ্যে ২ হাজার ৬০৮ জনই বাংলাদেশি। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অবস্থানে তিউনিশিয়া, গত ৫ মাসে দেশটির ২ হাজার ১১৩ জন ইতালি পৌঁছেছেন। তালিকার তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে আইভোরিকোস্ট।

রিপোর্ট বলছে, ইউরোপে অভিবাসন প্রত্যাশীদের পছন্দের গন্তব্য তালিকায় শীর্ষেই থাকছে ইতালি। গত ৭ বছরের চিত্র তাই। বেশির ভাগ সময় দ্বিতীয় অবস্থানে থাকলেও ২০২০ সালে ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি অভিবাসন প্রত্যাশী আশ্রয় নিয়েছিল গ্রীসে। তাদের বেশির ভাগই সমুদ্র পথে গ্রীস পৌঁছায়। তবে সেই বছরে স্থলপথেও ১৫০০ অভিবাসী গ্রীসে প্রবেশ করে। সে বছর ইতালি এসেছিল দ্বিতীয় স্থানে, এরপরেই ছিল স্পেন।

২০১৪ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি অভিবাসী ইউরোপ পৌঁছে ছিল ২০১৬ সালে। ওই বছর কেবল ইতালি উপকূলেই অবতরণ করেছিল ১ লাখ ৮১ হাজার অভিবাসন প্রত্যাশী।

সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণে প্রচারিত স্ট্যাটিস্টার রিপোর্টে বলা হয়, ইতালিতে অভিবাসন প্রত্যাশীদের বড় অংশ আসে সাব-সাহারান আফ্রিকা থেকে।

তবে উত্তর আফ্রিকায় শিকড় রয়েছে এমন লোকজনও ঢুকছে। কিন্তু বিস্ময়কর হচ্ছে সাগর পথে ইতালি যাত্রার ড্যাশবোর্ড ‘মোস্ট ফ্রিকুয়েন্ট ন্যাশনালিজিট ডিক্লিয়ার্ড আপন অ্যালাইভালস’-এ শীর্ষ স্থান দখলকারী ১০ রাষ্ট্রের তালিকায় ঘুরে ফিরে দক্ষিণ এশিয়ার ৩ দেশ-বাংলাদেশ, পাকিস্তান এবং আফগানিস্তান থাকছেই।

আশ্রয়ের আবেদনে পাকিস্তান এগিয়ে, দ্বিতীয় বাংলাদেশ
এদিকে অন্য একটি পরিসংখ্যানে দেখা গেছে- ইতালিতে আনুষ্ঠানিকভাবে আশ্রয় প্রার্থনার আবেদনকারীর তালিকায়ও বাংলাদেশের অবস্থান ঊর্ধ্বগামী। গত বছরের শেষ দু’মাসের তুলনামূলক পরিসংখ্যান প্রকাশ করেছে স্ট্যাটিস্টা, যেখানে বাংলাদেশ দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অবস্থানে রয়েছে।

‘নাম্বার অব এসাইলাম এপ্লিকেশনস সাবমিটেড ইন ইতালি ইন নভেম্বর অ্যান্ড ডিসেম্বর-২০২০ বাই ন্যাশনালিটি অব অ্যাপলিকেন্ট’ শিরোনামে প্রচারিত পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, নভেম্বর-২০২০ এ ৮শ’ ৪ জন পাকিস্তানের নাগরিক ইতালি কর্তৃপক্ষের কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করেছেন। আর ডিসেম্বরে করেছেন দেশটির ৬শ’ ৪৬ জন নাগরিক। নভেম্বরে ৩শ’ ৬২ জন আর ডিসেম্বরে ৪শ’ ৬৭ জন বাংলাদেশি আশ্রয় প্রার্থনার আবেদন দাখিল করেছেন।

তুলনামূলক ওই পরিসংখ্যানের সঙ্গে যে গ্রাফ বা লেখচিত্র সংযুক্ত করা হয়েছে, তাতে আশ্রয় প্রার্থনার আবেদনকারী রাষ্ট্রের মধ্যে নাইজেরিয়াকে তৃতীয় স্থানে রাখা হলেও পরিসংখ্যানে দেখা গেছে গড়ে দু’মাসে বাংলাদেশের চেয়ে বেশি সংখ্যক নাইজেরিয়ান ইতালিতে আশ্রয়ের আবেদন করেছে।

নভেম্বরে নাইজেরিয়ানদের আবেদন সংখ্যা ছিল ৪শ’ ১৩ আর ডিসেম্বরে ৪শ’ ৩৬টি। ডিসেম্বরের হিসাব বিবেচনায় ওই গ্রাফ তৈরি করা হয়েছে জানিয়ে বলা হয়, ওই মাসে মোট ৩ হাজার ২শ’ ৫৪টি আশ্রয়ের আবেদন জমা পড়েছে।

মৃত্যুর ঘটনা নিবন্ধন হলেও নিখোঁজের তথ্য নেই
ভূমধ্যসাগর হয়ে ইউরোপ যাত্রা বিষয়ক একটি রিপোর্টে বলা হয়, লাশ উদ্ধার হলেই কেবল মৃত্যুর ঘটনা নিবন্ধিত হয়। নিখোঁজ ব্যক্তিদের কোনো হিসাব হয় না। রেকর্ড সংখ্যক অভিবাসীর মৃত্যু এবং নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা ঘটে ভূমধ্যসাগরে। যেই রুটটি ধরে ইতালি যাওয়া যায় তা মধ্যবর্তী ভূমধ্যসাগরীয় রুট নামে পরিচিত। এই রুটেই সবচেয়ে বেশি অভিবাসীর মৃত্যু হয়। রুটটি উত্তর আফ্রিকা থেকে ইতালি হয়ে মাল্টা পর্যন্ত বিস্তৃত। মূলত লিবিয়া থেকে এ পথে যাত্রা করে অভিবাসীরা। তবে তিউনিশিয়া, মিশর ও আলজেরিয়া থেকেও কিছু কিছু যাত্রার খবর পাওয়া যায়। এর পরে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মৃত্যু এবং নিখোঁজের ঘটনা ঘটে পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় রুটে। তুরস্ক থেকে ইউরোপের দেশ গ্রীস ও সাইপ্রাসে যাত্রার রুট এটি।

রিপোর্ট বলছে, গত ক’বছর ধরে অভিবাসনের উদ্দেশ্যে ইতালি যাত্রা পথে নিখোঁজ এবং মৃতের ঘটনা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। ২০২০ সালে মধ্যবর্তী রুট অর্থাৎ ইতালি রুটে ৯৮৩ অভিবাসন প্রত্যাশীর মৃত্যু হয়। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত ওই রুটে ১৯৪ জনের মৃত্যু রেকর্ড করা হয়েছে। সব থেকে বেশি মৃত্যুর রেকর্ড হয়েছিল ২০১৬ সালে। ওই বছর ৪ হাজার ৬শ’ মানুষের মৃত্যুর ঘটনা নিবন্ধিত হয়।

২০১৮ সালের হিসাব অনুযায়ী ভূমধ্যসাগরে ২৩ শতাধিক অভিবাসন প্রত্যাশীর মৃত্যুর ঘটনা রিপোর্ট হয়। ‘মিসিং মাইগ্রেটস’-গবেষণাপত্র অনুযায়ী ওই বছর ভূমধ্যসাগরে এর দ্বিগুণ সংখ্যক অভিবাসী নিখোঁজ হয়েছেন।