ইতিহাসের মহানায়ক মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী

প্রকাশিত: ৬:৫৭ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১৮, ২০২১ | আপডেট: ৬:৫৭:অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১৮, ২০২১

১৯৪৯ সালের ২৩ জুন মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে গঠিত হয়েছিল পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’ । এটাও মুসলিম লীগই ছিল, কিন্তু ছিল আওয়ামের’ অর্থাৎ সাধারণ মানুষের মুসলিম লীগ। এজন্যই নাম দেয়া হয়েছিল আওয়ামী মুসলিমলীগ। নির্বাচিত তিনজন সহ-সভাপতি ছিলেন আতাউর রহমান খান, সাখাওয়াত হােসেন এবং আলী আহমদ খান; যুগ্ম সম্পাদক পদে নির্বাচিত হন খন্দকার মােশতাক আহমদ ও শেখ মুজিবুর রহমান। সহ-সম্পাদক ও কোষাধ্যক্ষ হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন যথাক্রমে এ কে এম রফিকুল হােসেন ও ইয়ার মােহাম্মদ খান। মওলানা ভাসানীর আহবানে অনুষ্ঠিত রাজনৈতিক কর্মী সম্মেলন’-এর মধ্য দিয়ে সেদিন আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠিত হয়েছিল। ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগের নির্যাতন নিশ্চিত জেনেও সম্মেলনের জন্য স্থান দিয়েছিলেন কে এম বশীর। তার কে এম দাস লেনের বাসভবন ‘রােজ গার্ডেন’-এর হল ঘরে প্রায় তিন শ’ প্রতিনিধির ঐতিহাসিক সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল। উল্লেখযােগ্যদের মধ্যে অবিভক্ত বাংলার প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী এবং লাহাের প্রস্তাব’-এর উত্থাপক শেরে বাংলা ফজলুল হক এই সম্মেলনে ভাষণ দিয়েছিলেন, কিন্তু প্রাদেশিক সরকারের অ্যাডভােকেট জেনারেলের পদ হারানাের ভয়ে তিনি আওয়ামী মুসলিম লীগে যােগদান করেননি।

“এক ধর্ম, এক দল এবং এক নেতার দেশ হিসেবে বর্ণিত পাকিস্তানের সরকার কিংবা মুসলিম লীগের যে কোনাে বিরােধিতাকেই সে সময় রাষ্ট্রদ্রোহিতারূপে বিবেচনা করা হতাে, বিরােধিতাকারীদের ‘হিন্দুস্থানের দালাল হিসেবে চিহ্নিত করা হতাে। এই অভিযােগে ‘শির’ কেটে ফেলার হুমকিও উচ্চারিত হতাে প্রকাশ্যে । অমন এক সর্বব্যাপী প্রতিকূল পরিস্থিতিতে আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠার মতাে দুর্দান্ত সাহসী পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে মওলানা ভাসানী একটি দলই কেবল গঠন করেননি, এতদিন ধরে বিচ্ছিন্নভাবে চলমান আন্দোলনের ধারাগুলােকেও সংহত ও সমন্বিত করেছিলেন। একযােগে তিনি অধিকার আদায়ের ভবিষ্যত সংগ্রামের জন্য নির্মাণ করেছিলেন সুদৃঢ় ভিত্তিও।

বস্তুত এই সময়কাল পর্যন্ত একমাত্র বিরােধী দল হিসেবে ন্যাশনাল কংগ্রেস তার দুর্বল ভূমিকা পালন করে আসছিল। পাকিস্তানের গণপরিষদে দলটির ১১ জন সদস্য থাকলেও চরম সাম্প্রদায়িক উত্তেজনাপূর্ণ সেই দিনগুলােতে মুসলমানদের জন্য গঠিত রাষ্ট্র পাকিস্তানে হিন্দু প্রধান কংগ্রেসের বিরােধিতাকে সহজেই ভারতের উসকানি এবং অনুচরবৃত্তি হিসেবে চিহ্নিত করা যেতাে। এর ফলে কংগ্রেসের পক্ষে ফলপ্রসূ কোনাে অবদান রাখা সম্ভব হয়নি। চাপের মুখে কংগ্রেস নেতারা সব সময় অবদমিত অবস্থায় থাকতেন, ভীত থাকতেন নিরাপত্তার অভাবে। অনেককে দেশত্যাগ করে ভারতেও চলে যেতে হতাে। এভাবে বিশেষ করে ১৯৫০-এর দাঙ্গার পর সকল নেতা ভারতে চলে যাওয়ায় দল হিসেবে ন্যাশনাল কংগ্রেস প্রায় অস্তিত্বহীন হয়ে পড়েছিল।

একটি বিরল ভাষণ শক্তিশালী বিরােধী দলের অনুপস্থিতির চমৎকার এ সুযােগ নিয়েছিল ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগ। রাষ্ট্রক্ষমতা কুক্ষিগত করার পাশাপাশি বাঙালী জনগােষ্ঠীর প্রতি শাসন, শােষণ এবং অত্যাচার-অবহেলার সুচিন্তিত পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথে অবাধে এগিয়েছিলেন পাকিস্তানের রাষ্ট্রনায়করা। তাদের নির্দেশে খাজা নাজিম উদ্দিন এবং মওলানা আকরাম খাসহ পূর্ব বাংলার নেতৃবৃন্দ মুসলিম লীগকে নিয়ে গিয়েছিলেন আহসান মঞ্জিলের অভ্যন্তরে। মুসলিম লীগের দ্বার বন্ধ হয়েছিল জনগণের জন্য । আগেই বলা হয়েছে, আসাম প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সভাপতি মওলানা ভাসানীকেও সাধারণ সদস্য হওয়ার সুযােগ দেয়া হয়নি।

পাকিস্তানের ক্ষমতাসীনদের এই স্বেচ্ছাচারী কার্যক্রমের মুখে স্বাভাবিকভাবেই অসহায় হয়ে পড়েছিল পূর্ব বাংলার জনগণ। প্রতিবাদবিহীন সে অবস্থার সুযােগ নিয়ে পাকিস্তানের ক্ষমতাসীনরা বাঙালীদের শােষণের সূচনা করেছিলেন। এই প্রক্রিয়ায় অন্যতম প্রাথমিক পদক্ষেপ ছিল প্রদেশের বিক্রয় করের ওপর কেন্দ্রের অংশিদারিত্ব প্রতিষ্ঠা। পাকিস্তানের ‘জাতির পিতা’ এবং গভর্নর জেনারেল মােহাম্মদ আলী জিন্নাহর সভাপতিত্বে ১৯৪৮ সালের মার্চে অনুষ্ঠিত মুখ্যমন্ত্রীও অর্থমন্ত্রীদের এক সভায় প্রাদেশিক রাজস্বের প্রধান উৎস বিক্রয় করের শতকরা ৫০ ভাগ কেন্দ্রকে দেয়া বাধ্যতামূলক করা হয়। সিদ্ধান্তটি প্রাথমিকভাবে দু’ বছরের জন্য নেয়া হলেও ১৯৫২ সালের রেইসম্যান রােয়েদাদ-এর সুপারিশক্রমে ব্যবস্থাটিকে স্থায়ী করা হয়েছিল। একই সঙ্গে আয়কর এবং পাট রফতানির শুস্ক থেকেও বঞ্চিত করা হতে থাকে পূর্ব বাংলা। এর ফলে পূর্ব বাংলার যে বিপুল ক্ষতি হয়েছিল, তার একটি উদাহরণ প্রসঙ্গত দেয়া যায়। ১৯৫০-৫১ ও ১৯৫১-৫২ সালে পাট শুল্ক খাতে প্রদেশের আয় ছিল যথাক্রমে ছয় কোটি ৭২ লাখ এবং ছয় কোটি টাকা; কিন্তু রেইসম্যান রােয়েদাদ’-এর পর ১৯৫২-৫৩ ও ১৯৫৩-৫৪ সালে এই পরিমাণ কমে দাঁড়ায় যথাক্রমে চার কোটি ৩২ লাখ এবং চার কোটি টাকায়। (দ্রষ্টব্যঃ হাসান হাফিজুর রহমানের সম্পাদনায় তথ্য মন্ত্রণালয় প্রকাশিত বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধঃ দলিলপত্র’-এর প্রথম খণ্ড, নভেম্বর, ১৯৮২; পৃ. ৬১৫-২২)

হিসাবটি পরবর্তীকালের হলেও বঞ্চনার এই প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরপরই এবং মােহাম্মদ আলী জিন্নাহ স্বয়ং ছিলেন এর উদ্যোক্তা।বাঙালীর প্রতি পাকিস্তানী রাষ্ট্রনায়কদের শােষণমুলক নীতি-আচরণের বিরুদ্ধে সবল প্রতিবাদে প্রথমে সােচ্চার হয়েছিলেন মওলানা ভাসানী। ১৯৪৮ সালের ১৯ মার্চ পূর্ব বাংলার ব্যবস্থাপক সভায় বাজেটের ওপর বিতর্কে অংশ নিতে গিয়ে দেয়া

এক বিরল ভাষণে তিনি বলেছিলেন, প্রাদেশিক গভর্নমেন্ট এই যে সেলস ট্যাক্স সেন্ট্রাল গভর্নমেন্টের সঙ্গে চুক্তি করে দিয়ে আসলেন এবং তাদের কাছ হতে মাত্র এক কোটি টাকা নিবেন বলে স্বীকৃত হলেন, এটা মন্ত্ৰীমন্ডলী কোন স্বাধীনতার বলে করলেন? অ্যাসেম্বলীর মেম্বারদের সঙ্গে পরামর্শ না করে তারা নিজেরা মােড়লী করলেন কোন অধিকারে? আমরা কি সেন্ট্রাল গভর্নমেন্টের গােলাম? ব্রিটিশ গভর্নমেন্টের গােলামী করি নাই। ন্যায়সঙ্গত অধিকারের জন্য চিরকাল লড়াই করেছি, আজও করব। আমরা হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করে পাট উৎপাদন করব অথচ জুট ট্যাক্স এমনকি রেলওয়ে ট্যাক্স, ইনকাম ট্যাক্স, সেলস ট্যাক্স নিয়ে যাবে সেন্ট্রাল গভর্নমেন্ট। এই সব ট্যাক্সের শতকরা ৭৫ ভাগ প্রদেশের জন্য রেখে বাকি অংশ সেন্ট্রাল গভর্নমেন্টকে দেওয়া হােক বাঙালীর স্বার্থের দৃষ্টিকোণ থেকে কেবল নয়, সংসদীয় বিতর্ক এবং গণতান্ত্রিক আন্দোলনের দিক থেকেও মওলানা ভাসানীর এ ভাষণটি ঐতিহাসিক গুরুত্ব বহন করে। কারণ, পাকিস্তানী শােষণের বিরুদ্ধে মওলানা ভাসানী পূর্ব বাংলার তৎকালীন পার্লামেন্ট তথা ব্যবস্থাপক সভায় এ বক্তব্য রেখেছিলেন এবং এটাই ছিল তাঁর সর্বশেষ ভাষণ। এর ক’দিনের মধ্যেই তার সদস্য পদ কেড়ে নেয়া হয়েছিল।

এখানে প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ করা দরকার যে, মুসলিম লীগের সদস্য পদ পেতে ব্যর্থ হওয়ার পর থেকেই মওলানা ভাসানী ব্যক্তিগত উদ্যোগে সরকার বিরােধী ভুমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন। এই প্রক্রিয়ায় টাঙ্গাইলের শূন্য একটি আসনের উপনির্বাচনে তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে অংশ নেন। আগেই বলা হয়েছে, তিনি মুসলিম লীগ মনােনীত প্রার্থী জমিদার খুররম খান পন্নীকে হারিয়ে নির্বাচিত হয়েছিলেন।নির্বাচিত সদস্য হিসেবেই মওলানা ভাসানী ব্যবস্থাপক সভায় ভাষণটি দিয়েছিলেন।