ইতিহাসের সর্বোচ্চ বাণিজ্য ঘাটতি

এক বছরে ঘাটতি বেড়েছে ৯৩ শতাংশ

টিবিটি টিবিটি

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ১:৩২ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২, ২০১৮ | আপডেট: ১:৩২:অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২, ২০১৮

আমদানি ব্যয় রেকর্ড পরিমাণ বাড়লেও বাড়ছে না রপ্তানি আয়। অার এতে বেড়েই চলছে বাণিজ্য ঘাটতি। গত ২০১৭-১৮ অর্থবছর (জুলাই-জুন) শেষে সামগ্রিক বাণিজ্য ঘাটতি ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।

এ সময় বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ হাজার ৮২৬ কোটি ডলার। যা ২০১৬-১৭ অর্থবছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৭-১৮ অর্থবছর শেষে দেশের বাণিজ্য ঘাটতি তার আগের ২০১৬-১৭ অর্থবছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। এ সময় পণ্য ও সেবা উভয় বাণিজ্যেই ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৮২৫ কোটি ৮০ লাখ ডলার যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১ লাখ ৫৩ হাজার কোটি টাকা।

২০১৬-১৭ অর্থবছর শেষে যার পরিমাণ ছিল ৯৪৭ কোটি ২০ লাখ ডলার। অর্থাৎ বছরের ব্যবধানে বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ বেড়েছে ৯২ দশমিক ৭৬ শতাংশ।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অবকাঠামো উন্নয়নে বড় বড় প্রকল্পগুলোর জন্য মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি করা হচ্ছে। ফলে ব্যাপক হারে বাড়ছে আমদানি ব্যয়। কিন্তু সে তুলনায় রপ্তানি আয় বাড়ছে না। তাই বড় ধরনের বাণিজ্য ঘাটতি দেখা দিয়েছে।

তাদের মতে, উৎপাদনশীল খাতে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি করা হয়। যা অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক। কিন্তু দেখতে হবে আমদানির আড়ালে অর্থ পাচার হচ্ছে কিনা। কারণ ভবিষ্যতে অর্থপাচরের ফলাফল হবে অত্যন্ত ভয়াবহ।

তাদের আশঙ্কা, বর্তমান অবস্থা অব্যাহত থাকলে চাপের মুখে পড়বে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। কারণ আমদানি বাড়লে ডলারের দাম বাড়ে। যার প্রভাব পড়ে আমদানি ও শিল্পপণ্যের দামে।

এ বিষয়ে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, দেশে অবকাঠামোর উন্নয়ন হচ্ছে। মেগা প্রকল্পগুলোর জন্য মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি করা হচ্ছে। এ কারণে আমদানি ব্যয় বাড়ছে। কিন্তু সে তুলনায় রপ্তানি আয় বাড়ছে না। তাই ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। তাই এখন রপ্তানি আয় বাড়াতেই হবে। এর বিকল্প নেই।

তবে আমদানির আড়ালে অর্থ পাচার হচ্ছে কি না তা খতিয়ে দেখার পরামর্শ দিয়ে এই অর্থনীতিবিদ বলেন, যদি মূলধনী যন্ত্রপাতি বা পণ্য উৎপাদনের কাঁচামাল আমদানি হয়ে থাকে তাহলে ভালো। কিন্তু আমদানির এই প্রভাব বিনিয়োগ খাতে দেখা যাচ্ছে না। তাই আমদানির নামে অর্থপাচার হচ্ছে কি না তা সংশ্লিষ্টদের খতিয়ে দেখতে হবে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৭-১৮ অর্থবছর শেষে ইপিজেডসহ রপ্তানি খাতে বাংলাদেশ আয় করেছে ৩ হাজার ৬২০ কোটি ৫০ লাখ ডলার। এর বিপরীতে আমদানি বাবদ ব্যয় করেছে ৫ হাজার ৪৪৬ কোটি ৩০ লাখ ডলার। এ হিসাবে বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৮২৫ কোটি ৮০ লাখ ডলার বা এক লাখ ৫৩ হাজার ৩৬৭ কোটি টাকার বেশি।

এই সময়ে, আমদানি বেড়েছে ২৫ দশমিক ২৩ শতাংশ। এর বিপরীতে রপ্তানি বেড়েছে মাত্র ৬ দশমিক ৪৩ শতাংশ। অন্যদিকে রেমিট্যান্স বেড়েছে ১৭ দশমিক ৩৩ শতাংশ। ফলে চলতি হিসাবে ঘাটতি বেড়েছে।

নাম না প্রকাশ করার শর্তে বাংলাদেশে ব্যাংকের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, চলতি হিসাবে উদ্বৃত্ত থাকার অর্থ হলো নিয়মিত লেনদেনে দেশকে কোনো ঋণ করতে হচ্ছে না। আর ঘাটতি থাকলে সরকারকে ঋণ নিয়ে তা পূরণ করতে হয়। সেই হিসাবে উন্নয়নশীল দেশের চলতি হিসাবে উদ্বৃত্ত থাকা ভালো।

‘কিন্তু গত কয়েক বছর উদ্বৃত্তের ধারা অব্যাহত থাকলেও গত অর্থবছরে ঋণাত্মক ধারায় চলে গেছে। যা এখনো অব্যাহত আছে। সর্বশেষ ২০১৭-১৮ অর্থবছর শেষে ৯৭৮ কোটি ডলার ঋণাত্মক হয়েছে। কিন্তু এর আগের ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ঋণাত্মক ছিল ১৩৩ কোটি ১০ লাখ ডলার।’

তিনি বলেন, আমদানির উচ্চ প্রবৃদ্ধি নিট বৈদেশিক সম্পদের প্রবৃদ্ধিকে ঋণাত্মক ধারায় এনেছে। এর প্রভাবে বৈদেশিক লেনদেনের চলতি হিসাবে এবং সামগ্রিক ভারসাম্যে ঘাটতি সৃষ্টি হয়েছে। এতে ডলারের বিপরীতে টাকার মান কিছুটা কমেছে।

প্রতিবেদন মতে, আলোচিত সময়ে সেবা খাতে বেতনভাতা বাবদ বিদেশিদের পরিশোধ করা হয়েছে ৯১১ কোটি ডলার। বিপরীতে বাংলাদেশ এ খাতে আয় করেছে মাত্র ৪৫৩ কোটি ৯০ লাখ ডলার। ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৪৫৭ কোটি ডলার। যা গত ২০১৬-১৭ অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৩২৮ কোটি ডলার।

বিদেশ থেকে ধারের পরিমাণও বেড়েছে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, অর্থবছরের মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদে বিদেশি ঋণ গ্রহণ বেড়েছে। আলোচ্য সময়ে আর্থিক হিসাবে দেখা যাচ্ছে, এ ধরনের ঋণ এসেছে ৫৭৮ কোটি ৫০ লাখ ডলার, যা আগের একই সময়ের তুলনায় ৭৯ দশমিক ৭৭ শতাংশ বেশি। বিদেশি ঋণ বাড়লেও বিদেশি বিনিয়োগ কমে এসেছে।

এ সময় সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) এসেছে ২৭৯ কোটি ৮০ লাখ ডলার, যা গত অর্থবছরের চেয়ে ৭ দশমিক ৯০ শতাংশ কম। অন্যদিকে শেয়ারবাজারে বিদেশি বিনিয়োগও কমেছে। অর্থবছর শেষে শেয়ারবাজারে ৩৬ কোটি ৫০ লাখ ডলারের বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে। যা তার আগের অর্থবছরে ছিল ৪৫ কোটি ৭০ লাখ ডলার।