উৎসবমুখর পরিবেশে জাবিতে পাখিমেলা অনুষ্ঠিত

প্রকাশিত: ৪:৪৫ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ২৪, ২০২০ | আপডেট: ৪:৪৫:অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ২৪, ২০২০
ছবি: টিবিটি

শাহাদাত সুমন, জাবি প্রতিনিধি: প্রতিবছরের ন্যায় এবারও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) প্রাণিবিদ্যা বিভাগ পাখি সংরক্ষণে গণসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের জহির রায়হান মিলনায়তনের সামনে ব্যতিক্রমী পাখিমেলার আয়োজন করেছে। প্রানবন্ত এ মেলায় স্টলগুলো সাজানো ছিল মমি করা বিভিন্ন প্রজাতির দেশি ও অতিথি পাখি, পাখিবিষয়ক বই-পুস্তক, ক্যালেন্ডার এবং পাখি সংরক্ষণে সচেতনতা তৈরি করতে বিভিন্ন পোস্টার ও ছবি দিয়ে।

প্রাণ নেই। তবু যেন মননে কিচিরমিচির শব্দে মুগ্ধ করে প্রকৃতির অপরুপ শোভার জানান দিচ্ছে কাঠময়ূর, জলপিপি, জলময়ূরি, ময়না, শঙ্খচিল, পেঁচা, ফিঙে, তিতির, পাতি ক্যাস্ট্রো, কালেম, কবুতরের মমি করা পাখি। কেউবা পাথর চোখে তাকিয়ে আছে দেশের নানা প্রান্ত থেকে আগত দর্শনার্থীদের দিকে। মেলায় মোট আটটি স্টলে পাখি প্রদর্শিত হয়।

আজ শুক্রবার (২৪ জানুয়ারি) বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ফারজানা ইসলাম মেলার উদ্বোধন করেন। এসময় অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক শেখ মো. মনজুরুল হক, ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার রহিমা কানিজ, প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মোস্তফা ফিরোজ, অধ্যাপক ড. মো. মফিজুল কবির, বায়োটেকনোলজি এ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ সোহায়েল, বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা ও বিশিষ্ট পাখিবিশারদ ড. ইনাম আল হক, প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মুকিত মজুমদার বাবু, ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচারের (আইইউসিএন) কান্ট্রি ডিরেক্টর রাকিবুল আমিন, ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর আ স ম ফিরোজ-উল-হাসান প্রমুখ।

এসময় উপাচার্য বলেন,“পাখি জনজীবনের সাথে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ পাখির অভয়ারণ্য নিরাপদ রাখতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। এজন্য পাখিবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে অনেক জলাশয় লিজমুক্ত রাখা হয়েছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পাখির বসবাস উপযোগী পরিবেশ অক্ষুণœ আছে বলেই প্রতি বছর শীত মৌসুমে দূর-দূরান্ত থেকে পরিব্রাজক পাখি নিয়মিতভাবে ক্যাম্পাসে ছুটে আসে।”

তিনি আরও বলেন, “পাখি মেলায় এসে বাচ্চারা আনন্দ পায় এবং নানা প্রজাতির পাখির সঙ্গে পরিচিত হবার সুযোগ পায়। এই পরিচয়ের সূত্র ধরে দর্শকগণ পাখিপ্রেমী হয়ে উঠেন। অনেক প্রজাতির পাখি নানা কারণে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। তাই বিলুপ্তপ্রায় পাখির প্রজাতি রক্ষার্থে সকলের সহযোগিতা প্রয়োজন। আগে গ্রাম বা নগরে অনেক জলাশয় ও বন ছিল। সেখানে পাখি আসতো। সেই পাখির ডাকে ঘুম ভাঙত সকলের। বেপরোয়া ও অপরিকল্পিত নগরায়ন এবং বৃক্ষ নিধনের ফলে সবুজ প্রকৃতি ও পাখ-পাখালির বসবাসের পরিবেশ বিনষ্ট হচ্ছে। সেই বিষয়ে এখনই সকলকে সচেতন হতে হবে।”

ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচারের (আইইউসিএন) কান্ট্রি ডিরেক্টর রাকিবুল আমিন বলেন, “পাখি মেলার মূল উদ্দেশ্য পাখি সম্পর্কে গণসচেতনতা বাড়ানো। পাখিরা পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এদের নিয়ে প্রকৃতিপ্রেমীরা বেশি ভাবে। এই পাখিদের ধরে রাখতে হবে। বর্ণিল এই মেলায় যারা অংশ নিয়ে এবং নানাভাবে অবদান রাখেন তাদেরকে কৃতজ্ঞতা। পাখি সংরক্ষণে এ মেলা কার্যকরী ভ’মিকা রাখবে বলে আমার বিশ্বাস। এই সচেতনতা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে পর্যন্ত পৌঁছাতে হবে। যাতে পাখির কোনো প্রজাতি বিলুপ্তির দিকে না যায়।”

মেলার আহবায়ক ও প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক কামরুল হাসান বলেন, “দর্শনার্থীর উৎপাত কম থাকায় বিগত বছরগুলোর তুলনায় এবার পাখির সংখ্যা বেড়েছে। প্রথম দিকে কোলাহল কম থাকায় প্রশাসনিক ভবনের পাশের লেকে এবার সবচেয়ে বেশি পাখি এসেছিল। পরে কোলাহলের কারণে পাখিরা আবার অন্য লেকগুলোতে সরে যায়। সুতরাং কোলাহলমুক্ত থাকলে পাখি বেশি দেখা যাবে।”

দিনব্যাপী এ মেলায় বিভিন্ন ইভেন্টের মধ্যে ছিলো আন্তবিশ্ববিদ্যালয় পাখিদেখা প্রতিযোগিতা, পাখি বিষয়ক আলোকচিত্র প্রদর্শনী, স্কুল পর্যায়ের শিশু কিশোরদের জন্য পাখির ছবি আঁকা প্রতিযোগিতা, টেলিস্কোপ ও বাইনোকুলার দিয়ে শিশু-কিশোরদের পাখি পর্যবেক্ষণ, পাখির আলোকচিত্র ও পত্র পত্রিকা দিয়ে স্টল সাজানো প্রতিযোগিতা, পুরস্কার বিতরণী, পাখি চেনা প্রতিযোগিতা ও পাখি বিষয়ক কুইজ প্রতিযোগিতা।

আন্তবিশ্ববিদ্যালয় পাখিদেখা প্রতিযোগিতায় দেশের ৩টি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দুটি করে দল অংশগ্রহন করে। প্রতিটি দলে চারজন করে ছাত্র-ছাত্রী এবং দলের সাথে একজন করে বিচারক দেওয়া হয়।যেখানে প্রতিযোগীদেরকে জাবি ক্যাম্পাসে নির্ধারিত একঘন্টা হেটে পাখি দেখে বা পাখির ডাক শুনে নাম লিখতে হয়েছে।
পাখি দেখা প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অধিকার করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দেবপ্রিয় বিশ্বাস, সুলতান আহমেদ, আশিকুর রহমান, তাহসিনা সানিয়াত এবং দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিমূল নাথ, দুর্জয় রাহা অন্তু, আনিতা শাহরিয়ার ও সজীব বিশ্বাস।

এছাড়া সংবাদমাধ্যমে বিগত এক বছরে প্রতিবেদন প্রকাশের মাধ্যমে পাখি ও জীববৈচিত্র রক্ষায় অবদান রাখায় প্রিন্ট, অনলাইন ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার তিনজন সংবাদকর্মী প্রতিদিনের সংবাদের মো. তহিদুল ইসলাম, বাংলানিউজের বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্য বপন ও মাই টিভির মো. আব্দুল্লাহ আল ওয়াহিদকে ‘কনজারভেশন মিডিয়া অ্যাওয়ার্ড’ এবং বিগত এক বছরে বাংলাদেশের পাখির উপর সায়েন্টিফিক জার্নাল, প্রকাশিত প্রবন্ধ পর্যালোচনা করে একজনকে ‘সায়েন্টিফিক পাবলিকেশন অ্যাওয়ার্ড’ প্রদান করা হয়েছে।

ঢাকার হেমায়েতপুর থেকে পরিবারসহ মেলায় ঘুরতে আসা আজিজ স্বপন বলেন, ‘ দেশ যত বেশি উন্নত হচ্ছে, এখানে রাস্তাঘাট হচ্ছে, দালানকোঠা হচ্ছে, ফলে পাখির বসবাসের জায়গা ও প্রজনন স্থল কমে যাচ্ছে। ছোটবেলায় যেসব পাখি দেখতাম, সেগুলোর অনেক পাখিকেই এখন দেখিনা। মেলায় এসে খুব ভালো লাগছে। এটা অন্য রকম একটা আয়োজন। জাবি প্রসাশনকে পাখি সংরক্ষণে গণসচেতনতা বৃদ্ধির এ প্রচেষ্টাকে সাধুবাদ জানাই।”

প্রসঙ্গত, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০-২২টি লেকসহ পুরো ক্যাম্পাসে প্রায় ১৮৯ প্রজাতির পাখি দেখা যায়। এর মধ্যে পায় ৬০ প্রজাতির অতিথি পাখি এবং ৯০ প্রজাতির বাংলাদেশের পাখি রয়েছে। পাখিমেলার মাধ্যমে পাখি সংরক্ষণে সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে জাবির প্রাণিবিদ্যা বিভাগ ২০০১ সাল থেকে পাখি মেলার আয়োজন করে আসছে। এবারের পাখি মেলার সহ আয়োজক হিসেবে রয়েছে ওয়াইল্ডলাইফ রেসকিউ সেন্টার, বাংলাদেশ বার্ড ক্লাব, আরণ্যক ফাউন্ডেশন, প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশন, আন্তর্জাতিক প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ সংঘ (আইইউসিএন) এবং বাংলাদেশ বন বিভাগ।