একটা খবর হাজারো রোগীর জন্য সুখবর

টিবিটি টিবিটি

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ৬:৩৩ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১০, ২০১৮ | আপডেট: ৬:৩৩:অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১০, ২০১৮

একটি দারুণ আনন্দের সংবাদ পাওয়া গেল। এটি এতো ভাল একটি সংবাদ যে প্রথমে পড়লে বিশ্বাসই হতে চায় না। কারণ ক্যান্সার নির্ণয় মাত্র ৫ মিনিটেই করা সম্ভব এবং সেটিও মাত্র ৫০০ টাকা খরচে, এটি প্রাথমিকভাবে একটি অবিশ্বাস্য সংবাদ।

কিন্তু সেই অবিশ্বাস্য ব্যাপারটিই এখন বাস্তবে পরিণত হতে চলেছে। শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণা টিম দুই বছর গবেষণার পর আবিষ্কার করেছেন যে ক্যান্সার নির্ণয়ের জন্য এখন আর এক সপ্তাহ অপেক্ষা করতে হবে না। এখন মাত্র ৫ মিনিটেই ক্যান্সার নির্ণয় করা সম্ভব হবে। আর এখনকার মতো এই রোগ নির্ণয়ের জন্য ৮ থেকে ১০ হাজার টাকার টেস্ট করতে হবে না। মাত্র ৫০০ টাকাতেই এই টেস্ট করা যাবে।

এই খুশির কিন্তু চাঞ্চল্যকর খবরটি সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞানের একটি গবেষণা টিম। ২৫ সদস্যের একটি টিম এই যুগান্তকারী আবিষ্কারটি করেছে বলে দাবি করেছে। যে সংবাদ সম্মেলনে এই তথ্যটি প্রকাশ করা হয়েছে সেখানে উপস্থিত ছিলেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ।

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়েছে যে এই রোগ নির্ণয়ের জন্য তাদের যা দরকার সেটি হলো রক্তের স্যাম্পল এবং একটি যন্ত্র যেটি ক্যান্সার নির্ণয়ের জন্য তারা ডিজাইন করেছেন। রক্তের স্যাম্পলে সুতীব্র লেজার বিম বা রঞ্জন রশ্মি প্রবেশ করিয়ে রোগটি নির্ণয় করা যাবে। সংবাদ সন্মেলনে ঐ টিমের একাধিক পদার্থ বিজ্ঞানী নতুন আবিষ্কারের বিভিন্ন কারিগরি দিক বিস্তারিতভাবে আলোচনা করেন।

গবেষকদের তরফ থেকে দাবি করা হয় যে সারা বিশ্বে এটিই হচ্ছে সর্বপ্রথম একটি ঘটনা যেখানে ক্যান্সার রোগ নির্ণয়ে নন লিনিয়ার অপটিকস ব্যবহার করা হচ্ছে। বিষয়টি হাইলি টেকনিক্যাল। তাই আমরা এর বিস্তারিত বর্ণনায় যাবো না। পদার্থের সাথে সুতীব্র আলোক রশ্মির বা রঞ্জন রশ্মির ইন্টার‌্যাকশন বা মিথস্ক্রিয়াই হলো নন লিনিয়ার অপটিকস।

সংবাদ সন্মেলনে জানানো হয় যে মেথড এবং সিস্টেম ভিত্তিক নন লিনিয়ার অপটিকাল বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন প্যাটেন্টের জন্য তারা ইতোমধ্যেই আমেরিকা এবং বাংলাদেশ সরকারের কাছে আবেদন করেছেন এবং সেই আবেদনটি গৃহীতও হয়েছে।

এই টিমের অন্যতম সদস্য মানস কান্তি বিশ্বাস বলেন, যখন রক্তের মধ্যে লেজার প্রবেশ করে তখন সেই ব্ল্যাড স্যাম্পল এবং সিরামের মধ্য দিয়ে একটি সুতীব্র রঞ্জন রশ্মি অনুপ্রবিষ্ট হয়। এরপর যদি দেখা যায় যে সেখানে কোনো পরিবর্তন ঘটছে তাহলে বোঝা যাবে যে ঐ ব্যক্তির ক্যান্সার রয়েছে। আর যদি পরিবর্তন না হয় তাহলে তার ক্যান্সার নাই।

পরিবর্তন ঘটছে কিনা সেটি কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই বোঝা যাবে আর সমগ্র রেজাল্ট পেতে লাগবে মাত্র ৫ মিনিট। তারা ৪০ ব্যক্তির ওপর তাদের নতুন আবিষ্কৃত এই পদ্ধতি প্রয়োগ করেছেন। এদের মধ্যে ৩০ জনের ক্যান্সার আছে এবং ১০ জনের নাই। সেই পরীক্ষায় তাদের এই নতুন ফর্মূলা অব্যর্থ প্রমাণিত হয়েছে। পিএইচডি ফেলো অধ্যাপক মানস কান্তি বিশ্বাস এবং অন্যেরা বলেন যে, তাদের এই আবিষ্কার অন্যান্য রোগ নির্ণয়েও প্রয়োগ করা যেতে পারে।

॥দুই॥
যদি এই নতুন পদ্ধতি সফল বলে প্রমাণিত হয় তাহলে এটি স্বাস্থ্য সেবা তথা মানব সেবায় এক অসামান্য অবদান রাখবে। এখন বাংলাদেশের মানুষও জেনে গেছেন যে, ক্যান্সার যদিও দুরারোগ্য এবং ঘাতক ব্যাধি, তদসত্ত্বেও অত্যন্ত প্রাথমিক পর্যায়ে যদি ক্যান্সার নির্ণয় করা সম্ভব হয় এবং তাৎক্ষণিকভাবে চিকিৎসা শুরু করা যায় তাহলে অনেক রোগীই বেঁচে যান।

আমি এখানে কয়েকটি উদাহরণ দিচ্ছি, যাদের ক্যান্সার প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়েছিলো এবং তাৎক্ষণিক চিকিৎসার ফলে তারা এখন সুস্থ স্বাভাবিক জীবন যাপন করছেন। ভারতের ক্রিকেট টিমের নামকরা ব্যাটসম্যান যুবরাজ সিং ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে কিছু দিনের জন্য ক্রিকেট থেকে দূরে সরে গিয়েছিলেন। কিন্তু চিকিৎসার পর তিনি সুস্থ হয়েছেন এবং আবার ক্রিকেট খেলেছেন।

ভারতের অভিনয় শিল্পী মনিশা কৈরালা মরণ ব্যাধি ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছিলেন। তাঁকেও চিত্র জগত থেকে দূরে সরে যেতে হয়েছিলো। চিকিৎসা করে সুস্থ হওয়ার পর আবার তিনি ফিরে এসেছেন। বাংলাদেশের শীর্ষ সারির গায়িকা সাবিনা ইয়াসমিন ঘাতক ব্যাধি ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছিলেন। তিনি এখন সুস্থ এবং আগের মতই নিয়মিত গান গেয়ে যাচ্ছেন।

বাংলাদেশে একজন সাংবাদিক রয়েছেন যিনি একুশে পদকপ্রাপ্ত। আর একজন বিশ^বিদ্যালয়ের অত্যন্ত তরুণ অধ্যাপক। এরা দুজনই আমার ঘনিষ্ঠ। দুজনেরই স্ত্রীর ব্রেস্ট ক্যান্সার ধরা পড়ে। অত্যন্ত প্রাথমিক স্তর ছিলো বলে দূরে যেতে হয়নি। কলকাতাতেই তারা অপারেশন করেন। আজ ১৫ বছর হয়ে গেল। আমার বন্ধুদের দুই স্ত্রীই সুস্থ দেহে বহাল তবিয়তে আছেন।

এর বিপরীতে একটি অত্যন্ত দুঃখজনক এবং করুণ কাহিনী বর্ণনা করছি। এটি একেবারে আমাদের পরিবারের বিয়োগান্তক কাহিনী। আমার বিয়াইন, অর্থাৎ আমার ছোট মেয়ের শাশুড়ী কোমর ও পিঠের ব্যথার কমপ্লেইন করছিলেন বেশ কিছু দিন ধরে। ঢাকার অনেক নামকরা চিকিৎসক দেখানো হয়। এদের মধ্যে ছিলেন অর্থপেডিক্স সার্জন, মেডিসিন বিশেষজ্ঞসহ বিভিন্ন ব্রাঞ্চের সব নামকরা চিকিৎসক।

কিন্তু উনার রোগ নিরাময় হচ্ছিলো না। ব্যথা ক্রমান্বয়ে বেড়েই যাচ্ছিলো। উনার মেয়ে একটি মেডিকেল কলেজের লেকচারার। অর্থাৎ একজন ডাক্তার। ব্যথা যখন কমছিলো না, তখন সিদ্ধান্ত হয়, একজন যশস্বী মেডিসিন স্পেশালিস্টকে দেখানো হবে। অনেক চিন্তা ভাবনা করে সিদ্ধান্ত হয়, প্রফেসর কাহহারকে দেখানো হবে। কিন্তু দেখা গেলো, তার এ্যাপয়েন্টমেন্ট পেতে সময় লাগবে ১মাস। সাত পাঁচ ভেবে রুগিনীকে, অর্থাৎ আমার বিয়াইনকে কাহহার সাহেবের আন্ডারে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ড. কাহহার আনোয়ার খান মডার্ণ হাসপাতালে বসেন।

ড. কাহহার সেদিনই কয়েকটা টেস্ট দেন। টেস্ট রিপোর্ট পাওয়ার পর দেখা গেলো তাঁর ক্যান্সার হয়েছে। কিšুÍ ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। বলা হয় যে তার অসুখ থার্ড স্টেজে পৌঁছে গেছে। সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে তাকে অপারেশনের জন্য সিঙ্গাপুর পাঠানো হবে। সিঙ্গাপুর ন্যাশনাল হাসপাতালে পাঠানোর প্রাথমিক প্রস্তুতির সাথে সাথে ঢাকার ফাইন্ডিংস অর্থাৎ এখানকার পরীক্ষা নিরীক্ষার কাগজপত্র সিঙ্গাপুর পাঠানো হয়।

সিঙ্গাপুর থেকে বলা হয় যে আপনারা আসতে পারেন, আমরাও অপারেশন করবো। কিন্তু অপারেশনের সফলতা সম্পর্কে নিশ্চয়তা দিতে আমরা অক্ষম। কারণ সময় গড়িয়ে গেছে। প্রিয় পাঠক, সিঙ্গাপুরের টিকেট এবং সেখানে রেস্ট হাউজও ভাড়া করা হয়েছিলো। কিন্তু হাসপাতালের উত্তর পেয়ে সিঙ্গাপুর গমনের পরিকল্পনা পরিত্যাগ করতে হয়।

সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে ভারতের ভ্যালোর যাওয়ার ডিসিশন করা হয়। কাগজপত্র দেখে ভ্যালোর থেকে বলা হয় যে, ভ্রমণের ধকল পেসেন্ট সইতে পারবে কিনা সন্দেহ। সুতরাং ইন্ডিয়া যাওয়ার পরিকল্পনাও পরিত্যাগ করা হয়।

সেই রাতেই পেসেন্টকে নিয়ে যাওয়া হয় ঢাকার বিআরবি হাসপাতালে। ঐ হাসপাতাল পেসেন্টকে ১২ ঘন্টা অবজারভেশনে রাখে। তারপর তারা তাদের অপারগতা প্রকাশ করে। এই পেসেন্টের ভাগ্যে অর্থাৎ আমার বিয়াইনের ভাগ্যে কি ঘটতে যাচ্ছে সেটি আমাদের কাছে পরিষ্কার হয়ে যায়। এর ৪ দিন পর আমার বিয়াইন অর্থাৎ আমার ছোট মেয়ের শাশুড়ী জীবন থেকে জীবনান্তরে চলে যান।

বড় বড় ডাক্তাররা বলেছিলেন যে, আমাদের পেসেন্টের হয়েছিলো লিভার ক্যান্সার। সময় মতো অপারেশন করলে এই রোগে কেউ মারা যায় না। কিন্তু আমাদের এই পরমাত্মীয়ের কপালটাই ছিলো খারাপ। পৃথিবীর যে কোন জায়গায় চিকিৎসা করার মতো যার ছিলো আর্থিক সক্ষমতা, সময়মতো রোগ ধরতে না পারার কারণে তিনি বলতে গেলে অনেকটা অসহায়ের মতো আমাদেরকে ছেড়ে চলে গেলেন।

এই পটভূমিতে শাহজালাল বিশ^বিদ্যালয়ের আলোচ্য আবিষ্কার যে কত গুরুত্বপূর্ণ এবং মানুষের জীবন বাঁচানোতে যে কত সহায়ক ভূমিকা গ্রহণ করতে পারে সেটি সহজেই অনুমেয়। সে কারণেই বলছি, যদি সত্যিই এই আবিষ্কার বাস্তবে কাজে লাগে তবে এটি হবে যুগান্তকারী, ঐতিহাসিক এবং চিকিৎসা বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে একটি মাইল ফলক। কবে এটি বাংলাদেশের স্বাস্থ্য সেবায় প্রয়োগ করা হবে, সেই দিনটি দেখার জন্য আমরা ব্যাকুল আগ্রহে প্রতীক্ষা করছি।

॥তিন॥
লেখাটি শুরু করেছিলাম তিন দিন আগে। লেখাটি যখন এই পর্যায়ে আসে তখন বিভিন্ন মিডিয়ায় দেখা যায় যে জিয়া চ্যারিট্যাবল ট্রাস্ট মামলায় বেগম খালেদা জিয়ার বিচার হবে নাজিমুদ্দিন রোডস্থ কেন্দ্রীয় কারাগারে। খবরটি শুনে ক্যান্সারের ওপর লেখাটি ঐ অবস্থাতেই শেষ করলাম। শুরু করলাম ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বেগম জিয়ার বিচার নিয়ে লিখতে।

উল্লেখ করা যেতে পারে যে, ঢাকার আলিয়া মাদরাসায় স্থাপিত বেগম জিয়ার মামলার বিশেষ ট্রাইব্যুনাল জিয়া অর্ফানেজ ট্রাস্ট মামলায় তাকে ৫ বছরের কারাদন্ড দিয়েছে। এখন সেই একই আদালতে জিয়া চ্যারিট্যাবল ট্রাস্ট মামলার বিচারের কাজ চলছে। সেই ট্রাইব্যুনাল এখন আবার আলিয়া মাদরাসা থেকে নাজিমুদ্দিন রোডের কেন্দ্রীয় কারাগারে স্থানান্তর করা হয়েছে। বেগম জিয়ার আইনজীবীরা বলেছেন বেগম জিয়ার মামলা একটি সিভিল মামলা। সংবিধানের ৩৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রকাশ্য আদালতে তার বিচার হবে।

একমাত্র মিলিটারি কোর্টে ক্যামেরা ট্রায়াল হয়। বেগম জিয়ার মামলাটি সামরিক বিষয়ে নয় এবং সামরিক বিষয় এখানে জড়িতও নয়। তবুও কারাগারের অভ্যন্তরে তার ক্যামেরা ট্রায়ালের ব্যবস্থা করা হয়েছে। বেগম জিয়ার আইনজীবীরা বলেছেন এটি সংবিধানের ৩৫ অনুচ্ছেদের লঙ্ঘন। তাই তারা কেউ সেই দিন জেলখানায় স্থাপিত আদালতে যাননি।

অন্যদিকে গুরুতর অসুস্থ বেগম জিয়াকে হুইল চেয়ারে করে জোর করে আদালতে আনা হয়। বেগম জিয়া তখন কাঁপছিলেন। তিনি আদালতকে সাফ জানিয়ে দেন যে তিনি অসুস্থ এবং এই শরীরে বারবার আদালতে আসতে পারবেন না। তিনি আরো বলেন যে, তিনি যানেন যে এই আদালতে ন্যায়বিচার পাবেন না। তাই তিনি আসবেন না।

এজন্য আদালত তাকে যত ইচ্ছা শাস্তি দিক, যত বছর খুশি শাস্তি দিক। সেই দিন মামলা আর এগোয় নি। আদালত পরবর্তী শুনানির জন্য ১১ সেপ্টেম্বর ধার্য্য করেছে। এদিকে বিএনপি বেগম জিয়ার চিকিৎসার জন্য তাকে এ্যাপোলো হাসপাতাল বা ইউনাইটেড হাসপাতাল বা যে কোনো বিশেষায়িত প্রাইভেট হাসপাতালে চিকিৎসা প্রদানের আবেদন জানিয়েছে। তাকে উপযুক্ত চিকিৎসা না দিলে তারা আদালতে যাবেন না বলেছেন।
এই পরিস্থিতিতে পরবর্তী শুনানির দিনে বেগম জিয়া এবং তার আইনজীবীরা আদালতে হাজির হন কি না সেটি দেখার জন্য জনগণ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন।
Email: asifarsalan15@gmail.com

দৈনিক সংগ্রাম