এটা ‘হাত খাওয়া রোগ, ওষুধেও কাজ হয়না’

প্রকাশিত: ৯:৪৫ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১১, ২০১৮ | আপডেট: ৯:৪৫:অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১১, ২০১৮

অজানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে শামুক শ্রমিকরা। আক্রান্তরা বলছেন এটা ‘হাত খাওয়া রোগ, ওষুধ খেলেও রোগ সারে না’! চিকিৎসকরাও রোগের নাম নির্দিষ্ট করে নির্ণয় করতে পারছেন না। তাঁদের আশঙ্কা, শামুক ভাঙার পেশা বন্ধ না করলে রোগীদের হাতে পচন ধরে ভবিষ্যতে গ্যাঙরিনের মতো ভয়ংকর রোগ ছড়াতে পারে।

শামুক নিধন উৎসবে (!) প্রতিদিন মারা হচ্ছে লাখ লাখ শামুক। শিশুরাও যুক্ত হচ্ছে এ কাজে, তারা স্কুলবিমুখ হয়ে পড়ছে। শামুক মেরে জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের পাশাপাশি তা পুড়িয়ে পানে খাওয়ার চুন তৈরি হচ্ছে। এতে মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে বাতাস, মাটি ও পানি।

বায়ু দূষণের শিকার ভুক্তভোগীরা জানান, তাদের নালিশ করার কোনো জায়গা নেই। বাগেরহাট জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরসহ আইন সংশ্লিষ্টরা এ বিষয়ে উদাসীন। শামুকের প্রাণ-হরণের যজ্ঞক্ষেত্র মিষ্টিপানির ঘেরপ্রধান বাগেরহাটের চিতলমারীসহ পার্শ্ববর্তী ফকিরহাট ও মোল্লাহাট উপজেলা। এই এলাকায় শামুক আসে গোপালগঞ্জসহ উত্তরের বিভিন্ন বিল-মাঠের জলাশয় থেকে।

শামুকের ওপর নির্ভরশীল জীবিকা বিচিত্র ধরনের। বিলাঞ্চল থেকে শামুক সংগ্রহ, ঘের মালিকদের কাছে পৌঁছানো, শামুক ভাঙা, শামুকের খোসা সংগ্রহ, খোসা পুড়িয়ে পানে খাওয়ার চুন তৈরি ও বাজারজাতের কাজে নিয়োজিত রয়েছে হাজার হাজার মানুষ। শামুকের শক্ত খোলস ভেঙে ভেতরের মাংস চিংড়ি ও সাদা মাছের খাবার হিসেবে মৎস্য ঘেরে দেওয়া হচ্ছে। এতে মাছের ওজন ও শরীর দ্রুত বৃদ্ধি হয় বলে জানান মৎস্য চাষিরা।

সরেজমিনে ভোরবেলায় চিতলমারী বিভিন্ন গ্রামের রাস্তা বিচরণকালে শোনা যায়- শক্ত কিছুর পিঠে ছোট লোহা পেটানোর ঠুকঠাক শব্দ। প্রায় আট ইঞ্চি লম্বা কাঠের চটার মাথায় দেড়-দুই ইঞ্চি লোহার পাত। প্রতিটি জীবন্ত শামুকের পেছনের পেঁচানো অংশে লোহা দিয়ে পেটানোয় ব্যস্ত অসংখ্য মানুষের হাত।

পেছনের অংশ ভাঙার পর কাঠের বাটওয়ালা ছোট ছুরি দিয়ে শামুকের মুখসহ নরম শরীর ‘ঘ্যাঁত’ বের করে আনা হচ্ছে সহজে। রাস্তার ওপর কিংবা ঘেরপাড়ে বস্তায়, স্তূপাকারে রাখা শামুক ভাঙছেন শিশু, নারী-পুরুষ। পাশের রাস্তা দিয়ে দ্রুতবেগে ছুটে যাচ্ছে ইঞ্জিনভ্যান কিংবা পাওয়ার টিলারের ভটভটি গাড়ি।

একটি দল ব্যস্ত আছে বস্তাভর্তি ‘কাঁচা শামুক’ বিভিন্ন স্থানে সরবরাহের কাজে। আরেকদল ব্যস্ত আগের দিনের ভাঙা শামুকের দুর্গন্ধময় খোসা বস্তাভর্তি করে চুন তৈরির কারখানায় পৌঁছে দিতে। দুর্গন্ধময় গাড়ি দেখে পথযাত্রীরা নাক ঢাকছেন। সব দুর্গন্ধ সয়ে গেছে প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে শামুক ভাঙায় ব্যস্ত শ্রমিকদের।

শামুক ভাঙা শ্রমিকরা যা বলেন

প্রায় ১৮ বছর ধরে শামুক ভাঙেন চিন্তা হালদার (৪০)। তার হাতের তালুতে অসংখ্য ছিদ্র, সেখান থেকে ঝরে রস। ব্যথা করে। যন্ত্রণা বাড়ে রাতের অবসরে। ব্যথা বুঝতে দেন না স্বামী, সন্তানদের। সরষের তেল গরম করে হাতে লাগিয়ে ঘুমিয়ে পড়েন। উপজেলা সদরের হাসপাতাল প্রায় ১২ কিলোমিটার দূরে। সকাল হলে কাজের তাড়নায় সব ব্যথা হয়ে যায় একাকার।

বাড়ির রান্না-বান্না সেরে দ্রুত গিয়ে বসেন ওয়াপদা বাঁধে শামুক ভাঙার চাতালে। সকাল ৮টা থেকে দুপুর ১২টা-১টা পর্যন্ত উপুড় হয়ে বসে শামুক ভাঙেন। স্বামী ভ্যান চালান। সুযোগ পেলেই স্ত্রীকে শামুক ভাঙতে সাহায্য করেন। চিন্তা হালদার বলেন, ‘যারা শামুক ভাঙে সগলেরই হাত খাওয়া রোগ আছে। লজ্জ্বায় হাত দেহায় না। একদিন কাজ বাদ দিয়ে হাসপাতালে গেলি মাইনে নাই। কাজ না অরলি খাবো কি? যত কষ্ট হয় হোক, মাইয়ে দুটোরে লেহাপড়া ঠিকমতো করাতি চাই।’

রেক্সোনারা যখন শামুক ভাঙার কাজে ব্যস্ত, তখন প্রায় পাঁচ বছরের ছেলেটি খেলাচ্ছলে চিতলমারী-বাগেরহাট ব্যস্ত সড়কের ওপর চলে যায়। পেছন হতে হাঁক দেয় মা বলে, রাস্তার ওপর নাচতে থাকে ছেলে। গাড়ি আসার শব্দ শুনে হাতের কাজ ফেলে রাস্তা থেকে ঝট্কা টানে ছেলেকে সরিয়ে নেন। বাঁশভর্তি ট্রাক ছুটে যায় ধুলো উড়িয়ে। ছেলের খালিপিঠে কষে চড় মারে মা। টেনে নিয়ে ফেলে দুর্গন্ধময় শামুকের গাদার পাশে। চিৎকার করে কাঁদতে থাকে ছেলে।

চিতলমারীর চরবানিয়ারী ইউনিয়নের শ্যামপাড়া গ্রামের গাউস ফকিরের স্ত্রী রেক্সোনা জানান, স্বামী ভ্যান চালান, দুই সন্তানসহ পরিবারে চারজন। সংসার চলে না। তাই ছেলেমেয়েকে নিয়ে শামুক ভাঙতে শুরু করেন। সকাল ৭টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত শামুক ভাঙেন। মেয়ে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে, ছেলের বয়স পাঁচ। যেদিন ১২টার আগে দুই বস্তা শামুক ভাঙা হয়ে যায়, সেদিন মেয়ে স্কুলে যায়। ৫০ কেজির প্রতিবস্তা শামুক ভেঙে মজুরি পাবেন ৬০ টাকা। মা-মেয়ে দিনে দুই বস্তা শামুক ভাঙতে পারেন।

এই ধরনের অসংখ্য ঘটনা রয়েছে।

বায়ু দূষণের কারখানা: শামুকের খোলস পুড়িয়ে তৈরি হয় পানে খাওয়ার চুন

চিতলমারীর বিভিন্ন গ্রাম থেকে শামুকের খোলস সংগ্রহ করে এনে পুড়িয়ে অস্বাস্থ্যকরভাবে তৈরি হচ্ছে পানে খাওয়ার চুন। চরবানিয়ারী ইউনিয়নের দুর্গাপুর গ্রামে শম্ভু সূত্রধরের রয়েছে শামুকের খোলস পোড়ানো কারখানা। অপরিচ্ছন্ন দুর্গন্ধযুক্ত শামুকের খোলস মাসের পর মাস স্তূপাকারে রেখে সারা বছর পোড়ানো হয়। দুর্গন্ধযুক্ত ধোঁয়ায় দূষিত হয় এলাকা। ২০০৯ সাল থেকে চলছে এ কাজ।

কারখানার আশপাশের বসতবাড়ির লোকজন জানান, দুর্গন্ধে প্রায়ই বাড়ির লোকজন অসুস্থ থাকে। বরিশাল থেকে আগত শম্ভু সূত্রধর বংশ পরম্পরায় চুন ব্যবসায়ী। শম্ভু জানান, তার ট্রেড লাইসেন্স রয়েছে। প্রতিকেজি চুন ৫০-৬০ টাকায় বিক্রি হয়। চুন যায় বরিশাল, ঝালকাঠিসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায়।

প্রতক্ষ্যদর্শীরা জানায়, শামুক পোড়াতে প্রচুর কাঠ লাগে। এ জন্য কাটা হয় গাছ।

চিকিৎসকদের বক্তব্য

বাগেরহাটের ডেপুটি সিভিল সার্জন পুলক দেবনাথ শামুক ভাঙায় নিয়োজিত এক নারীর হাতের তালু খাওয়ার দৃশ্য দেখে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ধারণা করা যায় ফাঙ্গাল ইনফেকশনের কারণে এই অবস্থা হচ্ছে। পরীক্ষা-নিরীক্ষা হলে রোগের সঠিক নাম নির্ণয় করা যাবে।’

চিতলমারী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আলমগীর হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এটাকে অনেকে পেশাগত কারণে চর্মরোগ (কন্টাক ডারমাটাইটিস) বলেন। সমাধান একটাই- শামুক ভাঙার পেশা ছেড়ে দিতে হবে। নইলে ভবিষ্যতে হাতে পচন ধরে গ্যাঙরিনের মতো ভয়ংকর অবস্থা হতে পারে।’

পরিবেশ দূষণে আইন

বাগেরহাট সামাজিক বনবিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তা চিন্ময় মধু কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘২০১২ সালের ১০ জুলাই সরকারি প্রজ্ঞাপনে শামুককে বন্যপ্রাণি হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। বন্যপ্রাণি বিনষ্ট ও ধ্বংসের অপরাধে আইন অনুযায়ী এক বছরের কারাদণ্ড ও সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। তাই শামুক ধরা ও বাজারজাত করা সম্পূর্ণ অবৈধ।’

পরিবেশ অধিদপ্তর

বাগেরহাট জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. এমদাদুল হক বলেন, ‘কেউ অভিযোগ করলে আমরা ব্যবস্থা নেব।’