এরদোয়ানের দৌড় আসলে কতদূর?

প্রকাশিত: ৩:১১ অপরাহ্ণ, আগস্ট ৩১, ২০১৮ | আপডেট: ৩:১১:অপরাহ্ণ, আগস্ট ৩১, ২০১৮

দু’জনেই চলনে বলনে আগ্রাসী। ক্ষ্যাপাটে এরদোগান আর পাগলাটে ট্রাম্প। ট্রাম্প অগোছালো, আবোল তাবোল বকেন। যা মন চায় তাই বলে যান আপন মনে। তবে এরদোয়ান বক্তা হিসেবে দারুণ। কখনো কবিতায়, কখনো ঝাঁঝালো বক্তৃতায় মানুষের মনোরঞ্জনের খোরাক জোগাতে তার জুড়ি মেলা ভার।

কী শিক্ষিত কী অশিক্ষিত সব মানুষদের মন জয় করতে একজন রাজনীতিবিদের যেসব গুণ থাকা দরকার তার সবই আছে রিসেপ তাইয়্যিপ এরদোগানের। যেন মঞ্চের দক্ষ অভিনেতা। কখনও হাসেন। মানুষকে উৎফুল্ল করেন। কখনও কাঁদেন, কাঁদানও সবাইকে।

মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিকে উস্কে দিতে পারেন নিপুণ শব্দের সমাহারে। ফলে তিনি ক্ষমতার মসনদে বসার ১৫ বছর পরও নির্বাচনে লড়ার সাহস পান। সে নির্বাচনে আবার জেতেনও।

এদিকে তুলনায় ডোনাল্ড ট্রাম্প রাজনীতিবিদ হিসেবে নতুন ও অদক্ষ। সরকার পরিচালনার অভিজ্ঞতাও এবারই প্রথমবারের মতো পাচ্ছেন তিনি। আপাদমস্তক পাগলা।

প্রথম অর্থনীতির দেশ বলে যাকে যা মুখে আসে তাই বলে বসেন। তার কথা যতটা না অসহ্যকর তার মুখভঙ্গি তার চেয়েও বেশি বিচ্ছিরী, হাস্যকর। ট্রাম্পের রাজনৈতিক অভিলাষ বোঝা যায় না। তার বয়সও হয়েছে যথেষ্ট।

আর এরদোয়ান উচ্চাভিলাসী, পররাষ্ট্রনীতিতে আগ্রাসী। ফলে নানা সময়ে নানা ইস্যুতে তার লেগে যায় অন্যদেশের নেতাদের সঙ্গে। আজ দানব রাষ্ট্র ইসরায়েলের রক্তলোলুপ নেতা নেতানিয়াহুকে ঝারেন তো কাল জার্মানির অ্যাঞ্জেলা মার্কেলকে।

সবাই ভয়ে তটস্থ থাকে কখন অটোমান সুলতান কার দিকে তার কথার পাগলা ঘোড়া ছোটান।

ক’দিন আগে আমরা ট্রাম্প-কিম সার্কাস দেখেছি। এখন শুরু হয়েছে ট্রাম্প-এরদোগান যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা। তবে এ খেলায় নিজের ইচ্ছায় অংশ নেননি এরদোগান। তার ওপর নানা কারণে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। এতে তার দায়ভারও অবশ্য কম না। যেভাবে গায়ে পড়ে গিয়ে পশ্চিমা শক্তির সাথে ঝগড়া করেছেন, তাতে কখনো কখনো মনে হয়েছে তিনি আসলে দেশীয় রাজনীতিতে নিজের আসন শক্ত করতে ইচ্ছে করেই এসব ঝগড়া লাগাচ্ছেন।

তার একঘেয়েমি কথাবার্তার জন্য বহু মিত্র দেশ অতীতে ক্ষুণ্ন হয়েছে। আমরা এরদোয়ানের আগ্রাসী নীতি বুঝতে পারি দেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে তার দেশের অনৈতিক নাক গলানো দেখে।

পরে অবশ্য দেশটি তাদের ভুল বুঝতে পেরে নিজেদের শুধরে নেয়। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে গত কয়েক বছর ধরেই তুরস্কের মনোমালিন্য চলছিল।

২০১৬ সালের জুলাইয়ে তুরস্কে ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থানের পর থেকে তিক্ততা প্রকাশ্যে আসতে থাকে। মার্কিন যাজক এন্ড্রু ব্রানসন প্রশ্নে এখন রীতিমতো যুদ্ধাবস্থা।

যাইহোক, তুরস্কের অর্থনীতি যখন প্রচণ্ড চাপের মধ্যে রয়েছে তখন দীর্ঘদিনের বন্ধু যুক্তরাষ্ট্রের এমন আচরণ আসলে কাটা ঘায়ে নুনের ছিটার মতো।

যুক্তরাষ্ট্র তুরস্ককে অর্থনৈতিকভাবে ঘায়েল করার চেষ্টা করছে। তুরস্ক যুক্তরাষ্ট্রকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, এ জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে কড়া মূল্য দিতে হবে।

সিরিয়াসহ বিভিন্ন ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র-তুরস্কের যে মতবিরোধ তার একটা চূড়ান্ত রূপ বোধহয় আমরা দেখতে শুরু করেছি।

যুক্তরাষ্ট্র প্রথমে তুরস্কের দুই মন্ত্রীর ওপর অবরোধ দিয়েছে। এরপর তাদের রফতানি করা দুটি পণ্যের ওপর কর বাড়িয়েছে দ্বিগুণেরও বেশি। এতে টার্কিশ লিরার দরপতন হয়েছে ব্যাপকহারে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রকে পাল্টা জবাব দেওয়ার মতো কিছু কি আছে তুরস্কের হাতে?

যুক্তরাষ্ট্র অর্থনীতিতে পৃথিবীর এক নাম্বার শক্তি, যেখানে তুরস্কের অবস্থান ১৭। ফলে অর্থনৈতিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে শায়েস্তা করার সুযোগ খুব একটা নেই তুরস্কের হাতে।

যদিও তুরস্ক পাল্টা বিভিন্ন মার্কিন পণ্যের ওপর কর বাড়িয়ে দিয়েছে। পৃথিবীব্যাপী বিশাল বাজার নিজেদের দখলে থাকায় এতে মার্কিন অর্থনীতিতে খুব একটা প্রভাব পড়বে না।

মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক রাজনীতিতে তুরস্ক গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়ার সন্দেহ নেই। সিরিয়া যুদ্ধের শুরুতে তুর্কি-মার্কিন এক বলয়ে থাকলেও এখন তুরস্ক ভিড়েছে রাশিয়া শিবিরে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে নিয়ে রাজনীতি রাজনীতি খেলার হিসেব-নিকেষ পাল্টে গেছে।

এ নিয়ে তুরস্কের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের প্রচণ্ড ক্ষোভ। সিরিয়ার সশস্ত্র কুর্দিদের টনে টনে অস্ত্র দিয়ে দেশটিকে সেটা বুঝিয়েও দিচ্ছে ট্রাম্প প্রশাসন। তুরস্কও এর জবাব দিচ্ছে, সিরিয়ায় একক সামরিক অভিযান পরিচালনা করে।

তুরস্ককে ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে বেকায়দায় পড়বে ঠিকই কিন্তু তুরস্ক নিজেও কিন্তু খুব একটা স্বাচ্ছন্দ্যে চলতে পারবে না। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে সৌদি আরব, মিশর, ইসরায়েলের মতো আঞ্চলিক ঘনিষ্ট মিত্র। যাদের কাজ হচ্ছে শুধু জ্বী হুজুর, জ্বী হুজুর করে যাওয়া।

তুরস্ক মার্কিন সরকারকে হুমকি দিয়ে বলেছে, প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সব ধরনের যোগাযোগ (সামরিক ও বেসামরিক) বন্ধ করে দেওয়ার। এটা অবশ্য সহজ কোন কাজ না।

নানা কারণে তুরস্ককে এখনো মার্কিনিদের সমঝে চলেতে হয়। এরদোগান অবশ্য এখানেও সংখ্যাগরিষ্ঠ তুর্কিদের মনোরঞ্জনের খোরাক জুগিয়েছেন, সমর্থকদের উদ্দেশে এক ভাষণে তিনি বলেছেন, ‘তাদের আছে ডলার আর আমাদের আছে আল্লাহ।’

দেশনেতার এমন কথায় বহু তুর্কিই হয়তো আবেগী হয়েছে। কিন্তু সংকটের সমাধান না হলে এ আবেগ খুব বেশিদিন ধরে রাখা যাবে না। তুর্কিদের অর্থনৈতিক মুক্তি নিশ্চিত করা না গেলে যারা আজ এরদোগানের নামে জয়োধ্বনি দেন তারাই তাকে দুয়োধ্বনি দেবেন।

কার ক্ষমতা কতদূর, তার চেয়েও বড় কথা হচ্ছে এই দুটি দেশের মধ্যে ঝগড়া থামার কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। তাহলে কি যুদ্ধ বেজে যেতে পারে দুই ন্যাটো সদস্যের মধ্যে? উত্তর হচ্ছে, না, এ বেলা আমরা ২০১৫ সালে ফিরে যেতে পারি।

২০১৫ সালে তুরস্কের সীমান্তে রাশিয়ান বিমান ভূপাতিত করাকে কেন্দ্র করে রাশিয়া-তুরস্ক যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু এরপর আমরা দুই দেশের সম্পর্ক জোড়ালো হতে দেখি। কে বলবে, যুক্তরাষ্ট্র-তুরস্কের বেলাতেও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটবে না।

যুক্তরাষ্ট্র যত শক্তিশালিই হোক, তুরস্কের সম্মতি ও সমর্থন ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে তার শক্তির পূর্ণ ব্যবহার অসম্ভব। মধ্যপ্রাচ্যে রাশিয়া ও চীনকে অগ্রাহ্য করে ছুড়ি ঘুড়ানোর জন্য তুরস্কের মতো একজন মিত্র তাদের খুব বেশি প্রয়োজন। আর এরদোগান ও তার নেতারা যতই বাগাড়ম্বর করুক না কেন, তারা খুব ভাল করেই যানে যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়া আঞ্চলিক রাজনীতিতে তাদের দৌড় কতদূর।

লেখক: তুর্কি স্কলারশিপ ফেলো। শিক্ষক, ভাষা-যোগাযোগ ও সংস্কৃতি বিভাগ, গণ বিশ্ববিদ্যালয়।