‘ওই যে হাসিনা!’ নির্মলেন্দু গুণ কনুই দিয়ে গুঁতো দিলেন আবুল হাসানকে!

টিবিটি টিবিটি

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ১২:৪৩ পূর্বাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ৭, ২০১৯ | আপডেট: ১২:৪৩:পূর্বাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ৭, ২০১৯
ফাইল ছবি

‘ওই যে হাসিনা!’ নির্মলেন্দু গুণ কনুই দিয়ে গুঁতো দিলেন আবুল হাসানকে!
আবুল হাসান মুখ তুললেন, চোখ সরু করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের দোতলার বারান্দার শেষ প্রান্তে মেয়েদের ভিড়ের দিকে তাকালেন।

বাইরের আকাশ থেকে আসা সুপ্রচুর আলোয় মেয়েদের দলটাকে এক ঝাঁক হাঁসের মতন উজ্জ্বল আর কলকাকলিময় বলে বোধ হচ্ছে। ওই ভিড়ের মধ্যে উজ্জ্বল কটা চোখের ছিপছিপে শাড়িপরা তরুণীটিই যে হাসিনা, আবুল হাসান তা সনাক্ত করতে পারলেন।

শাড়ি পরেছেন হাসিনা, কানে দুল, গলায় সোনার একটা চেন; রোদের আলো ছিটকে উঠছে কানের দুল থেকে! বোধ হয় বিয়ে হয়ে গেছে হাসিনার।

নির্মলেন্দু গুণের বয়স ২৩। ছিপছিপে কথাটার উৎপত্তি কি ছিপ থেকে! তিনি ছিপের মতনই হালকা-পাতলা আর ভীষণ লম্বা। মাথার চুল এলোমেলো, গ-ে আর থুৎনিতে অযত্নে বেড়ে ওঠা দাড়ি।

আবুল হাসান সে-তুলনায় খানিকটা বেঁটে, এবং পরিচ্ছন্ন। দুজনেই কবি। নির্মলেন্দু গুণ ঘোষণা করেছেন, কবিতা আমার নেশা পেশা এবং প্রতিশোধ গ্রহণের হীরন্ময় হাতিয়া। আবুল হাসান ঘোষণা করেছেন, আমরাই তো একমাত্র কবি। দুজনেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র।

এই পরিচয়টাই তারা কেবল গ্রহণ করেছেন, কিন্তু কোনোদিন পাস করে বেরোনোর কোনো ইচ্ছা তাদের নাই। তাদের ঘোষণা, তারা কবিতা লিখবেন, কবিতা লেখার ফাঁকে মাঝে-মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বেন, ইচ্ছা হলে ক্লাসও করতে পারেন, সুন্দরী মেয়েদের সঙ্গে প্রেম করবার চেষ্টা করবেন, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা মারবেন; কিন্তু ডিগ্রি লাভের চেষ্টা করবেন না।

তাদের দিন কাটে কবিতায়, শরীফের ক্যান্টিনে আড্ডায়; সন্ধ্যা কাটে ঠাঁটারিবাজারে হাক্কার দোকানে জুয়া খেলে; তারপর পেট ভরে চোলাই মদ্যপান করে টলতে টলতে সাইকেলে আরোহন, নির্মলেন্দু গুণ যান পলিটেকনিক হোস্টেলে।

এমনও হয়েছে, খিদে পেয়েছে দুজনের, কিন্তু পকেটে টাকা নেই, গুলিস্তানের হোটেলে পেটভরে খেয়ে হাত ধুয়ে মশলা চিবাতে চিবাতে কাউন্টারে এসে হঠাৎ দুইজনে দৌড়ে পালিয়ে এসেছেন।

এখন বাংলা বিভাগের বারান্দায় মুজিবকন্যা হাসিনাকে দেখে নির্মলেন্দু গুণ বললেন, চল, হাসিনার কাছে যাই, ওর কাছে আমাদের কবিতা-সংকলনটি বিক্রি করে আসি!

২৯ এপ্রিল ১৯৬৮ সালে মারা গেছেন আমেরিকার কালো মানুষদের মুক্তির অগ্রসেনানি ডক্টর মার্টিন লুথার কিং। তিনি এক সাদা মানুষের গুলিতে নিহত হয়েছেন। তাকে স্মরণ করে একটা কবিতাসংকল বেরিয়েছে। ‘মার্টিন লুথার কিংকে নিবেদিত কবিতা।’

এটার প্রকাশক নির্মলেন্দু গুণের সহপাঠিনী বেবি মওদুদ। আবুল হাসান নির্মলেন্দু গুণের কবিতা আছে তাতে। কাজেই নির্মলেন্দুর ইচ্ছা, এই সংকলটা শেখ মুজিব-তনয়ার হাতে পড়ুক। আর তারা কবিতা-সংকলটা বিক্রি করে টাকা ওঠাচ্ছেন। দুই টাকা করে দাম। শেখ সাহেবের মেয়ে কি তাঁদের দশটাকা দেবেন না?

নির্মলেন্দু গুণ কয়েক মাস আগে শেখ মুজিবকে নিয়ে কবিতা লিখেছেন। কবিতার নাম ‘প্রচ্ছদের জন্য।’ বেশ বড় কবিতা। কবিতাটা তিনি দৈনিক সংবাদের সাহিত্যপাতায় প্রকাশের জন্য এর ভারপ্রাপ্ত সাহিত্যসম্পাদক শহীদুল্লাহ কায়সারের হাতে দিয়ে এসেছিলেন।

শেখ মুজিবকে উৎসর্গ করা দেখে সেটা ছাপালে আবার কোনো বিপদ-আপদ হবে কিনা, সেই ভাবনায় শহীদুল্লাহ কায়সার একটু দ্বিধা করছিলেন। এরই মধ্যে ইত্তেফাক নিষিদ্ধ। মাস খানেক সংবাদও বন্ধ ছিল। সংবাদের সাহিত্যসম্পাদক রণেশ দাশগুপ্তও কারাগারে। সেই কবিতা ছাপানো হচ্ছে না দেখে নির্মলেন্দু একটা চিরকুট লেখেন শহীদুল্লাহ কায়সারকে

‘শহীদ ভাই, আমি আমার কবিতাটির ব্যাপারে আপনার সিদ্ধান্ত জানতে এসেছিলাম। আর সময় দেয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আগামী সংখ্যায় যদি কবিতাটি না ছাপেন, তবে আমি গভর্নর মোনায়েম খানকে উৎসর্গ করে কবিতাটি ‘পয়গাম’ পত্রিকায় ছাপাব। আপনি কি তাই চান?
ইতি আপনার নির্মল।’

এরপরের সপ্তাহে ১২ নভেম্বর ১৯৬৭ নির্মলেন্দু গুণের কবিতা ছাপা হলো। প্রচ্ছদের জন্য: শেখ মুজিবকে। স্বপ্ন জড়ানো অবাক কণ্ঠে আঁধার পালাল।

নির্মলেন্দু গুণ ভাবছেন, শেখ মুজিব কি কবিতাটা পড়েননি!
ব্যাঙ্গমা আর ব্যাঙ্গমি বলাবলি করে, শেখ মুজিব এই কবিতাটা জেলখানায় বসে পড়েন। তিনি এর মানে বোঝার জন্য সংবাদের সাহিত্যসম্পাদক রণেশ দাশগুপ্তর কাছে যান। রণেশদা তাঁকে কবিতার অর্থ বুঝিয়েও দিয়েছিলেন। এ ছাড়া আরেক বন্দি লতিফ সিদ্দিকীও কবিতাটা নিয়ে শেখ মুজিবকে দেখিয়েছিলেন।

এখন বাংলা বিভাগের বারান্দায় দাঁড়িয়ে নির্মলেন্দু গুণের মনে হচ্ছে, শেখ হাসিনা কি তাঁর আব্বাকে নিয়ে লেখা কবিতাটা সংবাদে পড়েননি। তাঁর কি তাঁকে বলা উচিত নয়, আপনার কবিতা আমি পড়েছি। আমার ভালো লেগেছে!

হাসিনা নিজ থেকে কবি নির্মলেন্দু গুণের কাছে আসবেন, এই ছিল গুণের আশা। ক্লাসে তিনি হাসিনাকে দেখেছেন, তাঁর মুখাবয়বে শেখ মুজিবের অনেকটাই ছাপ আছে। তাঁকে দেখলে শেখ মুজিবকেই মনে পড়ে। শেখ মুজিবকে নির্মলেন্দু গুণ খুবই ভালোবাসেন। অথচ তাঁর মেয়ে কিনা বয়সে ছোট এবং সহপাঠিনী হওয়া সত্ত্বেও কবিকে পাত্তাই দিচ্ছেন না।

এইবার নির্মলেন্দু ও আবুল হাসান এগিয়ে গেলেন মেয়েদের ভিড়ের দিকে। নির্মলেন্দু তাঁদের হাতে থাকা সংকলগুচ্ছ থেকে একটা শেখ হাসিনার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, আমরা মার্টিন লুথার কিংকে নিয়ে একটা কবিতা-সংকলন বের করেছি। আপনাকে দশটাকা দিয়ে এটা কিনতে হবে!

পত্রিকার দাম দশটাকা নয়। দুই টাকা। মুজিবের কন্যার কাছে তো আর দুই টাকা চাওয়া যায় না।
শেখ হাসিনা মুখের কথার জবাব মুখে দিতে ছিলেন সদাপ্রস্তুত। ‘আপনাদেরকে দিব ১০ টাকা! এর চেয়ে একটা ভিখিরিকে ১০ টাকা দিলে তার উপকার করা হবে।’

তিনি কটাক্ষ হেনে তাঁর বন্ধু কাজী রোজী, সালমা প্রমুখ ছাত্রলীগ কর্মীদের সঙ্গে নিয়ে গটগট করে অকুস্থল ত্যাগ করলেন!
নির্মলেন্দু গুণ এই ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত ছিলেন না। তিনি হাসিনার গমন পথের দিকে আহতচিত্তে তাকিয়ে রইলেন।
হাসানকে বললেন, মনে হয় এর সম্পাদক বেবি মওদুদ ছাত্র ইউনিয়ন করে বইলা কিনল না!

হাসান বললেন, আমাদের সম্পর্কে যা সব রটনা ছড়ায় পড়েছে, তাতে এ-ই হওয়ার কথা।
নির্মলেন্দু গুণ বললেন, এই অপমানের শোধ নিব। বইয়ে যখন কবিতাটা দিব, তখন উৎসর্গ থাইকা মুজিবের নাম কাইটা দিব।

ব্যাঙ্গমা আর ব্যাঙ্গমি বলাবলি করে, নির্মলেন্দু গুণ তা-ই করেছিলেন। প্রেমাংশুর রক্ত চাই কবিতার বইয়ে এই কবিতায় আর শেখ মুজিবের নাম ছিল না। পরে আবারও তিনি নামটা যুক্ত করেন।

তবে হাসিনাও শোধ নিয়েছিলেন। বহু বছর পরে, হাসিনা যখন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী, তখন নির্মলেন্দু গুণ স্বাধীনতা পুরস্কার গ্রহণ করতে হাসিনার সামনে মঞ্চে এলে প্রধানমন্ত্রী কবির হাতে পুরস্কার ছাড়াও দুইটাকা খুচরা আলাদা করে দিয়ে দেন।

নির্মলেন্দু গুণ বলেন, যখন আমার হাতে পত্রিকা ছিল, তখন টাকা দিলেন না। এখন আমার হাতে পত্রিকা নাই, আর আপনি টাকা দিচ্ছেন। আমি তো ঋণী থেকে যাব। সেই ভালো। কবি ঋণী থাকুক…

আনিসুল হকের লেখা সদ্যপ্রকাশিত ‌’এই পথে আলো জ্বেলে’ থেকে…
প্রথমা প্রকাশন।

(সহায়ক গ্রন্থ: আমার কণ্ঠস্বর/ নির্মলেন্দু গুণ)
Add Image