‘কতজনকে খুন করেছি, পঞ্চাশের পরে তা গোনা ছেড়ে দিয়েছিলাম’

টিবিটি টিবিটি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২:১৫ অপরাহ্ণ, জুলাই ৩১, ২০২০ | আপডেট: ২:১৫:অপরাহ্ণ, জুলাই ৩১, ২০২০

উপন্যাসের চরিত্রের মতো এই অপরাধীর নাম দেবেন্দ্র শর্মা। তাঁর বয়স ৬২ বছর। তিনি ন’য়ের দশক থেকে চলতি শতাব্দীর গোড়া পর্যন্ত অন্তত ৫০ জন ট্যাক্সি ও ট্রাকচালককে খুন করেছেন বলে অভিযোগ। তাঁর অপরাধের জাল দিল্লি, হরিয়ানা, উত্তরপ্রদেশ ও রাজস্থানে বিস্তৃত ছিল। তবে বেশিরভাগ অপরাধেরই বিচার হয়নি।

ঠিক কতজন মানুষকে খুন করেছে; ভারতের একজন সিরিয়াল কিলার নিজেও তা জানে না। কারণ সংখ্যাটা পঞ্চাশ পেরোনোর পরে সে গোনাই ছেড়ে দিয়েছিল! দেবেন্দ্র শর্মা নামের ওই ব্যক্তি পেশায় ডাক্তার। পুলিশের দাবি ৬২ বছরের দেবেন্দ্র অন্তত ১০০ মানুষকে খুন করেছে। অবশেষে দিল্লির বাপরোলা এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।

দিল্লি পুলিশের ডিসি (ক্রাইম) রাকেশ পাওয়েরিয়াকে উদ্ধৃত করে আনন্দবাজার পত্রিকার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঠিক নিজের হাতে খুন হয়তো নয়, তবে খুনি দলের পাণ্ডা ছিল দেবেন্দ্র। শিকার ছিল মূলত ট্যাক্সিচালক ও ট্রাকচালকেরা। ডিসি রাকেশ দাবি করেন, উত্তরপ্রদেশের কাসগঞ্জে দেবেন্দ্রর দলের লোকেরা যাত্রী সেজে ট্যাক্সিতে উঠত। নিরিবিলি কোনও জায়গায় ট্যাক্সি থামাত। তারপর চালককে খুন করে ট্যাক্সিটা নিয়ে পালাত। মৃতদেহটা ভাসিয়ে দেওয়া হত হাজারা খালে। ট্যাক্সিচালকের মৃতদেহ খেয়ে ফেলতো খালে থাকা কুমিরের দল। আর ট্যাক্সিগুলো বেচে দেওয়া হত ২০-২২ হাজার টাকায়। এলপিজি সিলিন্ডার বোঝাই আস্ত ট্রাকও লুট হতো একইভাবে। চালককে মারা হতো, ডাক্তারের ভুয়া গ্যাস এজেন্সিতে নামানো হত সিলিন্ডার। ট্রাকগুলোকে নিয়ে গিয়ে ভেঙে ফেলা হত।

আনন্দবাজার পত্রিকা জানিয়েছে, আয়ুর্বেদ ও সার্জারির ডিগ্রি রয়েছে দেবেন্দ্রর নামের পাশে। মাঝে মাঝে ক্লিনিকও চালিয়েছে। কিন্তু ডাক্তার হিসেবে সুনামের বদলে তার পরিচিতি ‘বদনামে’। দিল্লি, হরিয়ানা, উত্তরপ্রদেশ, রাজস্থানের মতো রাজ্যে তার নামে মোট কতগুলো মামলা ঝুলছে, পুলিশও ঠিক জানে না। খুন, অপহরণ, কিডনি পাচার চক্রের সদস্য, ভুয়ো এলপিজি এজেন্সির ব্যবসা— অভিযোগ অজস্র। তেমনই এক খুনের মামলায় গত ১৬ বছর ধরে সে যাবজ্জীবন জেল খাটছিল জয়পুরের সেন্ট্রাল জেলে। গত জানুয়ারিতে ২০ দিনের প্যারোলে বেরিয়ে পুলিশের নাগালের বাইরে চলে যায় দেবেন্দ্র। মঙ্গলবার দিল্লির বাপরৌলা এলাকা থেকে ‘ফেরার আসামি’ দেবেন্দ্রকে গ্রেফতারের পর তাকে জিজ্ঞাসাবাদের টেবিলে আনা হয়েছিল রাতে। সেই পর্ব শেষ হতে হতে ভোর। ঠান্ডা মাথায়, ‘তদন্তকারীদের সঙ্গে সম্পূর্ণ সহযোগিতা’ করেছে সে। নিজের অপরাধের কথা বলতে গিয় বলেছেন, ‘কত জনকে মেরেছি, পঞ্চাশের পরে তা গোনা ছেড়ে দিয়েছিলাম।’

দেবেন্দ্রের প্রথম স্ত্রী ও সন্তানেরা তার সঙ্গে সম্পর্ক চুকিয়ে দিয়েছিলেন প্রায় ১৬ বছর আগে। পুলিশ জানিয়েছে, উত্তরপ্রদেশ থেকে দিল্লিতে এসে প্রথমে মোহন গার্ডেনে এক পরিচিতের বাড়িতে উঠেছিল দেবেন্দ্র। তারপর আত্মীয়া এক বিধবা নারীকে বিয়ে করে থাকতে শুরু করে বাপরৌলায়। দেবেন্দ্রর দাবি, নতুন করে জীবন শুরুর চেষ্টা করছিল সে। শুরু করেছিল জমি-বাড়ির কারবার। পুলিশের দাবি, দেবেন্দ্রের অন্ধকার জগতের খবর তার দ্বিতীয়া স্ত্রী জানতেন।

আলিগড়ের পুরেনি গ্রামে দেবেন্দ্রের আদি বাড়ি। বিএএমএস ডিগ্রি বিহারের সিওয়ানের। ১৯৮৪ সালে জয়পুরে গিয়ে সে একটা ক্লিনিক খোলে। কয়েক বছর পর ১৯৯২-এ গ্যাসের ডিলারশিপ নিতে গিয়ে ১১ লক্ষ টাকা বিনিয়োগ করে ঠকে যায় দেবেন্দ্র। সেই বিপুল ক্ষতি সামলে নিতেই তিন বছর পরে আলিগড়ে ছারা-য় নিজেই ভুয়া এলপিজি সংস্থার ব্যবসা খুলে বসে সে। আনন্দবাজার পত্রিকা বলছে, সম্ভবত সেই প্রথমবার দেবেন্দ্র পা বাড়ায় অন্ধকার জগতে। ১৯৯৪ থেকে জড়িয়ে পড়ে কিডনি পাচার চক্রে। জয়পুর থেকে বল্লভগড় হয়ে গুরুগ্রাম পর্যন্ত বিছিয়ে থাকা সেই চক্রের হয়ে ২০০৪ সাল পর্যন্ত প্রায় ১২৫টি বেআইনি কিডনি প্রতিস্থাপন করে দেবেন্দ্র। প্রতি অস্ত্রোপচারের পারিশ্রমিক ৫ থেকে ৭ লাখ টাকা।

এ সবের মধ্যেই আলিগড়ে বেআইনি গ্যাসের ব্যবসা ধরা পড়ায় দেবেন্দ্র গ্রেফতার হয়। তা সত্ত্বেও সে ২০০১-এ উত্তরপ্রদেশের আমরোহায় একই ব্যবসা ফেঁদে বসে এবং আবার গ্রেফতার হয়। তবে দ্বিতীয় বার গ্যাসের ব্যবসা বন্ধ হওয়ার পরে জয়পুরের ক্লিনিকে বসতে শুরু করেছিল সে। ডাক্তারি চলেছিল টানা প্রায় দু’বছর। কিন্তু কাকপক্ষীতেও টের পায়নি, চেম্বারে বসা এই ডাক্তারই তখন আলিগড়ে ট্যাক্সি-ছিনতাইয়ের গ্যাং‌ চালাচ্ছে। তার কলকাঠিতেই খুন হচ্ছেন একের পর এক ট্যাক্সিচালক।

২০০৪-এ কিডনি পাচার চক্রের মামলায় জেলে যায় দেবেন্দ্র। ২০০২ থেকে ২০০৪ পর্যন্ত অনেকগুলো খুনের মামলায় গ্রেফতার হয়। তার মধ্যে দোষী সাব্যস্ত হয় ৬ থেকে ৭টি মামলায়।

ডাক্তার যদিও তখন গোনা ছেড়ে দিয়েছে!