করোনাকালে হাওরাঞ্চলের প্রকৃতি ফিরছে আপন রূপে

প্রকাশিত: ৮:১৩ অপরাহ্ণ, মে ১৪, ২০২১ | আপডেট: ৮:১৪:অপরাহ্ণ, মে ১৪, ২০২১

তাহিরপুর (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি: করোনা ভাইরাস হয়তো একসময় চলে যাবে, কিন্তু এ মহামারী যা কিছু দেখিয়ে শিখিয়ে দিয়ে যাচ্ছে সত্যি তা বিরল। এখন করোনার দ্বিতীয় ডেউয়ে আতঙ্ক বিরাজ করছে সর্বত্র। হাওরাঞ্চলসহ সারা দেশের মানুষ যখন করোনা পরিস্থিতির কারণে ঘরবন্দি। এ সুযোগে কমেছে দূষণের মাত্রা। তখন উন্মুক্ত হয়ে নিজেকে মেলে ধরার সুযোগ পেয়েছে প্রকৃতি। যেন প্রাণ ফিরে পেয়েছে সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলের এধরায়।

গত এক বছর পূর্বে হাজার হাজার পর্যটকসহ স্থানীয় নানান বয়সের মানুষের পদভারে সবুজ বন ও পানি ক্লান্ত, বিবর্ণ হলেও ছিল উৎসবমূখর পরিবেশ। সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার যাদুকাটা নদী, বারেকটিলা, টাংগুয়ার হাওর, শহীদ সিরাজলেক, শিমুল বাগানসহ হাওরবেষ্টিত সুনামগঞ্জ জেলার তাহিরপুর উপজেলার পর্যটন স্পটগুলো। ব্যস্ততম এলাকা মানুষের পদভারে থাকা এ স্থানের দৃশ্য এখন একেবারেই ভিন্নতা। সেখানে এখন বাসা বেঁধেছে নির্জনতা, নির্মল বাতাস ও সবুজ ঘাস।

সরজমিনে দেখা যায়, করোনায় যাদুকাটা এখন একেবারেই অচেনা। যে যাদুকাটায় হাজার হাজার মানুষের পদচারনায় কর্মমূখর ইঞ্জিনচালিত মেশিনের শব্দে মুখরিত থাকত পুরো যাদুকাটার চারপাশ, এখন সেখানে কেবলই নির্জনতা। নেই চিরচেনা ব্যস্থতা, জীবিকার তাগিদে হাজারো নারী-পুরুষের বালু, পাথর উত্তোলন, ইঞ্জিনচালিত নৌকার লোড-আনলোড করার চিত্র। প্রকৃতির ছোঁয়ায় পাল্টে গেছে চিরচেনা এ দৃশ্য।

নদীর ঘোলা পানি এখন স্বচ্ছ কাঁচের মত দেখা যায়। দেখা যায় নদীতে থাকা মাছসহ অন্যান্য প্রাণীও। আয়নার মত নিজের চেহারাও এখন দেখা যায়  নদীর পানিতে। নদীর পাড়ে নিস্তব্ধতা ছাড়া আর কোনও কোলাহল নেই। বারেকটিলা, টাংগুয়ার হাওর, শহীদ সিরাজলেক, শিমুল বাগানসহ পর্যটন স্পটগুলোর একেই চিত্র।

পর্যটন স্পটগুলোর বর্তমান পরিস্থিতিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো। পাশাপাশি এসব প্রাণ-প্রকৃতি, জীববৈচিত্র্য রক্ষায় প্রকৃতিবান্ধব হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া জরুরি বলে মনে করেছেন পরিবেশবাদী সংগঠন গুলো।

এ ব্যাপারে সচেতন মহলের বক্তব্য, টাংগুয়ার হাওর, বারেকটিলা, যাদুকাটা নদীসহ পযর্টন স্পটগুলোতে পরিবেশ পুনরুদ্ধারে পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো সংরক্ষণ করতে না পারলেও প্রকৃতি এখন আপন মনে গড়ে নিচ্ছে। করোনা নিষেধাজ্ঞার সুযোগকে পরিবেশগত পুনর্গঠনে কাজে লাগাতে পারলে তাহিরপুর উপজেলার এই অনিন্দ্য সুন্দর এলাকায় মন মাতানো সুগন্ধের সমারোহ ঘটবে।

যাদুকাটা নদী পাড়ে চা বিক্রেতা জসিম উদ্দিন বলেন, করোনাভাইরাসের কারণে প্রশাসনের কঠোর নিষেধাজ্ঞায় মানুষ যখন ঘরে ঘরে বন্দি। প্রকৃতি তখন মুক্ত। নদীর পানি একদম পরিস্কার হয়ে গেছে। কোনো ধরনের ময়লা নেই। নদীর পাড়ে এখন সবুজ ঘাস দেখা যাচ্ছে। এছাড়া শামুকের ছড়াছড়ি, কোন দুর্গন্ধ নেই যা আগেও দেখা যায়নি। যেহেতু এই সময়ে মানুষের চলাফেরা কম,তাই দূষণ ও এখন আগের মত নেই। পরিবেশ ফিরে পাচ্ছে তার হারানো সৌন্দর্য। কিন্তু নদীতে কাজ না থাকায় বেচা কেনা একবারেই ত নাই। করোনার কারনে বড় কষ্টে আছি।

যাদুকাটা নদীতে পাথর শ্রমিক হৃদয় হাসান জানায়, “কাজ করতে পারি না। নদীতে টাকাও নেই। বড় অসহায় অবস্থায় আছি। নদীতে সারাদিন উৎসবমূখর পরিবেশে বালু-পাথর উত্তোলন হত, ফলে নদীর পানি নষ্ট হত। এখন কাজ নেই।”

“গত এক বছরের বেশী সময় ধরে ফলে নদীর পানি একেবারেই স্বচ্ছ টিউবওয়েলের পানির মত। নদী এমন থাকলে ভাল দেখায়, কিন্তু আমরা তো নদীর উপর নির্ভশীল। কাজ করতে না পারায় না খেয়ে থাকতে হচ্ছে”, জানান হৃদয়।

এ ব্যাপারে তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পদ্মাসন সিংহ দি বাংলাদেশ টুডেকে বলেন, মানব সৃষ্ট নানান কারনে প্রকৃতি তার নিজস্ব রূপ হারিয়েছিল। আর করোনা সব কিছুই ঊলটপাল্ট করে দিয়ে শিখিয়েছে অনেক কিছুই। বর্তমান করোনা ভাইরাস সংক্রমণের আশংকা সবাই সবার ঘরে অবস্থান করায় প্রকৃতি তার নিজস্ব রূপ ফিরে এসেছে।