করোনার প্রকোপে ঘুড়ির প্রত্যাবর্তন

প্রকাশিত: ১১:২৫ অপরাহ্ণ, জুন ২০, ২০২০ | আপডেট: ১১:২৫:অপরাহ্ণ, জুন ২০, ২০২০
আজিমুর রশিদ কনক – ছবি : টিবিটি

করোনার প্রকোপে গত প্রায় দুই মাস ধরে বাসায় বন্দি। প্রতিদিনই নতুন নতুন আক্রান্তের খবর আর লাশের সংখ্যার লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়ে চলা; করোনায় আক্রান্ত হবার ভয়ের চেয়ে মানসিক স্বাস্থ্য খারাপ হবার ভয়টাই বেশি কাজ করছে মাথার ভেতরে। অনেককেই দেখছি এই মহামারির মাঝেও ভালো কিছু খুঁজে নিচ্ছেন। কেউবা কক্সবাজারে ডলফিনের ঝাঁকের ভিডিও দিয়ে মাতাচ্ছে ফেসবুক। কেউবা আবার জিলাপি বানাতে গিয়ে অদ্ভুত সব খাবার তৈরি করে ফেলছে। কারও কাছে সময়টা পরিবারের সাথে কাটছে- মধুর। আবার কেউ কেউ পরিবার থেকে দূরে অন্য কোথাও বসে করোনার মুন্ডুপাত করছেন। আমার জন্য করোনা চমৎকার কিছু সময় বয়ে এনেছে। সেগুলো নিয়েই এই লেখা।

আমি পুরান ঢাকার মানুষ। আমার অনেক বন্ধুই বলে, পুরান ঢাকার মানুষদের সাথে পাঞ্জাবের মানুষদের একটি মিল রয়েছে- উভয়েই আমুদে প্রকৃতির। উৎসব করতে ভালোবাসে। আবার অন্য আরেকদিক দিয়ে আমার মনে হয় আমাদের সাথে আফগানদের বেশ মিল রয়েছে, সেটি হলো ঘুড়ি ওড়ানো। আফগানিস্তানে ঘুড়ি ওড়ানো হয় উৎসবের মতো করে। অনেকটা আমাদের সাকরাইনের মতো। এখনকার ডিজে পার্টিওয়ালা সাকরাইন না। আসল সাকরাইন-যেখানে ঘুড়ি ওড়ানোর প্রতিযোগিতা হতো। ঘুড়ি কাটার সাথে জড়িত থাকতো আবেগ। ঘুড়ি ওড়ানোর এমন উৎসবের উল্লেখ আছে খালেদ হুসেইনির কাইট রানার উপন্যাসে।

ছোটবেলায় এই গরমকালে আকাশের নীল ক্যানভাসে শত শত ঘুড়ির ওড়াওড়ি চোখে পড়তো। মামার বাড়ির ছাদে কয়েকটা নাটাইয়ে সুতা মাঞ্জা দেওয়া হতো। কত প্রস্তুতি! মাঞ্জা হতে হবে সবার চেয়ে আলাদা; সবার চেয়ে ধারালো। এলাকার সোনামিয়ার দোকান থেকে কিনে আনা হতো ঘুড়ি। তখন সবচেয়ে বড় ঘুড়ির দাম ছিল পাঁচ টাকা। ‘চোখদার’ ঘুড়ি যখন আকাশের বুকে ভেসে বেড়াতো আর মাঝে মাঝে গোত্তা মারতো, কি যে আনন্দ হতো তা বলে বোঝানো যাবে না। দুপুরের পর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলতো ঘুড়ি ওড়ানো। আর বন্ধের দিনে সারাদিন চলতো ঘুড়ি নিয়ে মাতামাতি। এমন কোন ছাদ ছিল না- যেখানে ঘুড়ি ওড়ে না। বিকেল মানেই নীল আকাশে সাদা মেঘের ভাঁজে ভাঁজে যেন ঘুড়ির মেলা।

সময়ের সাথে সাথে বড় হয়েছি। আর এই মৌসুমটাতে আকাশে ঘুড়ির সংখ্যা কমতে দেখেছি। বিকেল বেলার অনেক বড় একটা অংশ দখল করে নিলো কম্পিউটার গেইমস, কোচিং ক্লাস আর স্মার্টফোনের পাব্জি, লুডু এবং এমন আরো অনেক গেইমস। আমিও ব্যস্ত হয়ে গেলাম পেশাগত কাজে। বিকালের আকাশ আর সেভাবে দেখাই হয়ে উঠতো না। যদিও বা দেখা হতো, সেখানে আর সেই আগের মতো ঘুড়ি উড়তো না।

তবে করোনার এই সময়টা আমাকে এবং আমার মতো আরো অনেককে যেন ফিরিয়ে দিয়েছে সেই ছোটবেলার সময়টা। সরকারি ছুটির (পড়ুন অঘোষিত লক ডাউন) শুরু থেকেই পুরানো ঢাকার কিশোর তরুণেরা বিপদে পড়ে গেল। বিকালে মাঠের খেলা, পাড়ার চায়ের দোকানে আড্ডা সব বন্ধ। তাহলে উপায়! সেই ছোটবেলায় ফিরে যাওয়া। ছাদে ছাদে আবার ফিরতে শুরু করলো কিশোর তরুণদের দল- ঠিক যেমন বছর ঘুরে ফিরে আসে অতিথি পাখির ঝাঁক। এক ছাদ থেকে আরেক ছাদে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেওয়া। হৈ চৈ করে ঘুড়ি ওড়ানো। আর কারো ঘুড়ি কাটতে পাড়লেই, ‘ভুয়া’ কিংবা ‘ঢিলি’ বলে চিৎকার করে যার ঘুড়ি কাটা গেছে তাকে খোঁচা দেওয়া। এরপর শুরু আরেক খেলার। ঘুড়ি কেটে যাবার পর উড়ে চলে নিজের মতো, আর সেই ঘুড়ি অনুসরণ করে রাস্তা দিয়ে দৌড়ে চলে কচিকাঁচার দল। ঘুড়ির নাগাল সবার আগে পাবার জন্য কারও হাতে লম্বা লাঠি; কেউ আবার খালি হাতে। সামনে ছোট কোন টিন-শেড পড়লে, ঘুড়ি ধরার জন্য তাঁর ছাদে উঠে পড়তেও দ্বিধা নেই ওদের। এত কিছুর পর যার হাতে ঘুড়িটা ধরা দিতো, তাঁর চোখেমুখে রাজ্য জয়ের হাসি। সেই হাসি দূর থেকে দেখলেও মনে কেমন যেন অন্যরকম ভালোলাগা ছুঁয়ে যেত।

করোনার এই ভয়াবহ সময়টাতে এমন চমৎকার কিছু মুহূর্ত উপহার পেয়ে, কিছু সময়ের জন্য হলেও মনে কিছুটা শান্তির পরশ পাওয়া গেছে। হয়তো মনে হতে পারে এ আর এমন কি! কিন্তু বিশ্বজুড়ে বিশেষজ্ঞরা যখন এই পরিস্থিতিতে মানসিক স্বাস্থ্য স্বাভাবিক রাখার তাগিদ দিচ্ছেন, ঠিক সেই সময়টাতে এই ছোট একটা জিনিস মানুষের মাঝে আনন্দের বার্তা ছড়িয়ে দিয়ে মানুষকে চাঙ্গা করছে; এটা কি কম কিছু? এই আকালের দিনে মনের আনন্দের খোরাক হচ্ছে এই ঘুড়ি, এটাইতো অনেক। আর তাই, অনেক বড় বড় কিছুর দিকে না তাকিয়ে, আমাদের পুরানো ঢাকার ঐতিহ্য এই ঘুড়ির প্রত্যাবর্তনের দিকে তাকিয়েই আমরা কিছুটা হলেও মানসিক শান্তি খুঁজে পাচ্ছি।

 

লেখক: আজিমুর রশিদ কনক
শিক্ষক, সাংবাদিক ও গবেষক।