করোনায় পরীক্ষা এত কম কেন

হটলাইনে কল ৮ লাখের বেশি, পরীক্ষা মাত্র ১০৭৪ জনের

প্রকাশিত: ৯:১২ অপরাহ্ণ, মার্চ ২৯, ২০২০ | আপডেট: ৯:১৩:অপরাহ্ণ, মার্চ ২৯, ২০২০

রাজবংশী রায়: করোনাভাইরাসের লক্ষণ-উপসর্গ আছে, সারাদেশ থেকে গত ২৪ ঘণ্টায় এমন ৭৩ হাজার ১৩৪ জন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হটলাইনে ফোন করেছেন। তাদের মধ্যে জাতীয় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) মাত্র ৪৭ জনের করোনা শনাক্তকরণ পরীক্ষা করেছে। অর্থাৎ, করোনার লক্ষণ-উপসর্গ থাকাদের মধ্যে মাত্র শূন্য দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ ব্যক্তিকে পরীক্ষার আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে। তবে গত ২৪ ঘণ্টায় কেবল এই আইইডিসিআর হটলাইনে ফোনকল এসেছে তিন হাজার ৪০৫টি। তাদের মধ্যে পরীক্ষার আওতায় আনা হয়েছে ৪৭ জনকে। এ হিসাবে ১ দশমিক ৩৮ শতাংশ সন্দেহভাজন ব্যক্তি পরীক্ষার আওতায় এসেছে। গত ২১ জানুয়ারি থেকে হিসাব করলে গতকাল শনিবার পর্যন্ত হটলাইনে ফোনকলের সংখ্যা আট লাখ দুই হাজার ৫৮০টি। তার মধ্যে মাত্র এক হাজার ৭৬ জনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়েছে। এ হিসাবে আইইডিসিআর মাত্র শূন্য দশমিক ১৩ শতাংশ মানুষকে পরীক্ষার আওতায় আনতে পেরেছে।

অথচ করোনাভাইরাস প্রতিরোধে পরীক্ষার ওপর সবচেয়ে গুরুত্ব আরোপ করে আসছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। প্রতিষ্ঠানটির মহাপরিচালকসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সবসময়ই বলে আসছেন, করোনাভাইরাসের এই মহামারি প্রতিরোধে সবার আগে সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে পরীক্ষা করতে হবে। পরীক্ষায় পজিটিভ শনাক্ত হলে তাকে হাসপাতালে আইসোলেশনে রাখার পাশাপাশি ওই ব্যক্তির সংস্পর্শে থাকা ব্যক্তিদের কোয়ারেন্টাইন করতে হবে। যাতে তারা অন্যদের সংস্পর্শে না যেতে পারে। শুধু ঘরে আটকে রেখে এই ভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনাভাইরাসের পরীক্ষায় দেশ কতটা পিছিয়ে রয়েছে, এ চিত্রই তা বলে দেয়। স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা বারবার পরীক্ষা-নিরীক্ষার আওতা বাড়ানোর ঘোষণা দিলেও বাস্তবে তা কার্যকর হচ্ছে না।

গতকাল শনিবার পর্যন্ত আইইডিসিআরের বাইরে চট্টগ্রামের বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ট্রপিক্যাল মেডিসিন অ্যান্ড ইনফেকসাস ডিজিজেস হাসপাতালে পরীক্ষা চালু হয়েছে। এর বাইরে অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানে এই পরীক্ষা চালু হয়নি। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর্যাপ্ত সুযোগ না থাকায় দেশের কত সংখ্যক মানুষ অদৃশ্যভাবে এই ভাইরাস বহন করে বেড়াচ্ছেন, তা জানা যাচ্ছে না। এতে করে ঝুঁকি বাড়ছে বলে মনে করেন চিকিৎসা-বিশেষজ্ঞরা।

এ বিষয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও ভাইরোলজিস্ট অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, জরুরি ভিত্তিতে পরীক্ষার আওতা বাড়ানো প্রয়োজন। গত তিন মাসে এক হাজারের কিছু বেশি মানুষকে পরীক্ষার আওতায় আনা হয়েছে। এটি হতাশাজনক চিত্র। অথচ একই সময় বিশ্বের বিভিন্ন করোনা সংক্রমিত দেশ থেকে প্রায় পৌনে সাত লাখ মানুষ এসেছেন। তারা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়েছেন। তাদের অধিকাংশই হোম কোয়ারেন্টাইনের শর্ত মানেননি। এসব মানুষ ঠিক কতজনের সংস্পর্শে গেছেন তাও জানা যাচ্ছে না। আবার সন্দেহভাজনদের সবাইকে পরীক্ষার আওতায় আনা যাচ্ছে না। এতে করে ইতালি ও স্পেনের মতো ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তখন পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।

বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ডা. রশিদ-ই মাহবুব বলেন, দেশে করোনাভাইরাসের কমিউনিটি ট্রান্সমিশন শুরু হয়েছে- এটি এখন বলা যায়। আইইডিসিআর ঘুরিয়ে বললেও বিষয়টি স্বীকার করে নিয়েছে। সুতরাং সন্দেহভাজনদের পরীক্ষার আওতায় আনা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। এ ক্ষেত্রে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। কয়েকদিন ধরে কর্তৃপক্ষ পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরিধি বাড়ানোর ঘোষণা দিলেও বাস্তবে কিন্তু সেটি এখনও কার্যকর হয়নি। এটি দ্রুত কার্যকর করতে হবে। অন্যথায় ভয়াবহ পরিস্থিতির শিকার হতে হবে।

ডা. রশিদ-ই মাহবুব আরও বলেন, করোনা সংক্রমণের মাত্রা বাড়লে পর্যাপ্ত সংখ্যক আইসিইউ (নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র) প্রয়োজন হবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত যতটুকু খবর পাওয়া গেছে, মাত্র ২৯টি আইসিইউ চালু আছে। এটি নিয়ে সংশ্নিষ্টদের প্রস্তুতি নিতে হবে। দ্রুততম সময়ে কীভাবে আইসিইউ সাপোর্ট বাড়ানো যায়, সে বিষয়ে ভাবতে হবে।

হটলাইনে ফোন আট লাখ, পরীক্ষার আওতায় ১০৭৬ জন :চীনে করোনা সংক্রমণের পর চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি থেকে দেশের বিমানবন্দরসহ অন্যান্য প্রবেশপথে স্ট্ক্রিনিং মেশিন বসানো হয়। দেশে প্রবেশ করা সব যাত্রীকে স্ট্ক্রিনিংয়ের পাশাপাশি হটলাইনের নম্বর দিয়ে দেওয়া হয়। ওই সময় থেকে এ পর্যন্ত ছয় লাখ ৬৫ হাজার ১৩ জন দেশি-বিদেশি নাগরিক বাংলাদেশে প্রবেশ করেছেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও আইইডিসিআর সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের সেবার আওতায় আনতে পৃথক হটলাইন চালু করে। এর মধ্যে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ৩৩৩ হটলাইনে ৩১ হাজার ৫৬৩টি ফোনকল, স্বাস্থ্য বাতায়নের ১৬২৬৩ নম্বরে সাত লাখ ৫৭১টি ফোনকল এবং আইইডিসিআরের হটলাইনে ৭০ হাজার ৪৪৬টি ফোনকল আসে। অর্থাৎ, গতকাল শনিবার পর্যন্ত আট লাখ দুই হাজার ৫৮০টি কল এসেছে। এসব ফোনকলের মধ্য থেকে আইইডিসিআর মাত্র এক হাজার ৭৬ জনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে পেরেছে। তাদের মধ্যে ৪৮ জন করোনা আক্রান্ত এবং পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। এ হিসাবে আইইডিসিআর হটলাইনে ফোন করা ব্যক্তিদের মাত্র শূন্য দশমিক ১৩ শতাংশ মানুষকে পরীক্ষার আওতায় আনতে পেরেছে। অন্যদিকে, পরীক্ষার আওতায় আনা ব্যক্তিদের মধ্যে সংক্রমণের হার ৪ দশমিক ৪৬ শতাংশ। এ ছাড়া মৃতের হার ১০ দশমিক ৪১ শতাংশ।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে আইইডিসিআরের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. এএসএম আলমগীর বলেন, উপসর্গ-লক্ষণ নেই এবং বিদেশফেরত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসেননি এমন ব্যক্তিরাও পরীক্ষার জন্য ফোন করেন। এ ছাড়া সাধারণ সর্দি-কাশি হলেও অনেকে মনে করেন করোনা আক্রান্ত হয়েছেন। এমন সন্দেহ থেকে অনেকে ফোন করেন। এতে করে ফোনকলের সংখ্যা বেশি দেখাচ্ছে। আইইডিসিআরে ফোন করা ব্যক্তিদের মধ্যে যাদের সন্দেহভাজন মনে হয়েছে, তাদের পরীক্ষার আওতায় আনা হয়েছে।

তবে প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে- সন্দেহভাজন ব্যক্তিরা ফোন করলেও তারা সাড়া দেন না। মিরপুরের টোলারবাগ এলাকার যে ব্যক্তি করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন, তার ছেলে ফেসবুকে এক স্ট্যাটাসে এসব অভিযোগ করেছেন। ওই রোগীর সংস্পর্শে থাকা হাসপাতালের আইসিইউ বিভাগের প্রধানও করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। ওই চিকিৎসকের মেয়েও পরীক্ষা-নিরীক্ষা বিষয়ে আইইডিসিআরে ফোন করলে সাড়া না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন। একই অভিযোগ করেছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এক চিকিৎসক। এ ছাড়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও অনেকের এ ধরনের অভিযোগ ভাইরাল হয়েছে।

করোনা পরীক্ষা নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনায় যা আছে :বিশ্বজুড়ে করোনা মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ার প্রেক্ষাপটে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা পরীক্ষা নিয়ে একটি গাইডলাইন তৈরি করে। ওই গাইডলাইন অনুযায়ী, করোনাভাইরাস শনাক্ত করার জন্য বায়োসেফটি লেভেল-২ কিংবা তার সমমানের ল্যাবরেটরি প্রয়োজন হয়। সংস্থাটি বারবার স্পষ্ট করে বলেছে, শুধু লকডাউনের মাধ্যমে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করে করোনার মহামারি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব নয়। প্রত্যেক সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে পরীক্ষার আওতায় আনতে হবে। পজিটিভ কেসগুলো পৃথক করতে হবে। সংস্পর্শে আসা অন্য ব্যক্তিদের শনাক্ত করে তাদের কোয়ারেন্টাইনে রাখতে হবে। মুমূর্ষু রোগীদের আইসিইউ সেবা নিশ্চিত করতে হবে। তাহলে করোনা মহামারি নিয়ন্ত্রণে আসবে।

অথচ আইইডিসিআর কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন সময়ে সংবাদ সম্মেলনে বলে আসছে, করোনাভাইরাস শনাক্ত করতে যে মানের ল্যাবরেটরি প্রয়োজন, সেটি একমাত্র তাদেরই আছে। অর্থাৎ, বায়োসেফটি লেভেল-৩ মানের ল্যাবরেটরি ছাড়া করোনাভাইরাস শনাক্তকরণের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা যাবে না বলে প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা একাধিকবার বলেছেন। যেহেতু এই মানের ল্যাবরেটরি দেশের অন্য কোথাও নেই, সুতরাং করোনা শনাক্তকরণের সব পরীক্ষা আইইডিসিআরেই করতে হবে। যদিও পরে ঢাকাসহ সারাদেশে একাধিক প্রতিষ্ঠানকে করোনা পরীক্ষার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের ভাইরোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. জাহিদুর রহমান জানান, করোনা সংক্রমণের পর থেকেই পরীক্ষা-নিরীক্ষার বিষয়ে আইইডিসিআর মিথ্যাচার করে আসছে। একমাত্র আইইডিসিআর ছাড়া দেশের অন্য কোথাও করোনা শনাক্তকরণ পরীক্ষা সম্ভব নয়- এটি পুরোপুরি মিথ্যাচার। সক্ষমতা না থাকলে এখন পরিধি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো কীভাবে। ঢাকার বাইরে চট্টগ্রামে পরীক্ষা শুরু হয়েছে। তাদের সিদ্ধান্তহীনতার কারণেই পরীক্ষা-নিরীক্ষা নিয়ে দুরবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। আগে থেকে পরীক্ষার আওতা বাড়ালে সন্দেহভাজনদের পরীক্ষার আওতায় আনা যেত। সেখান থেকে পজিটিভ কেস ও তাদের সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের পৃথক করা যেত। এতে করে সংক্রমণের মাত্রাও কমে যেত।

তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ বলেন, আইইডিসিআরের বাইরে জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট, ঢাকা শিশু হাসপাতাল, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ল্যাবরেটরি মেডিসিন, আইসিডিডিআর,বি এবং চাইল্ড হেলথ রিসার্চ ফাউন্ডেশন করোনা শনাক্তকরণ পিপিআর টেস্ট করার জন্য প্রস্তুত আছে। এ ছাড়া ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, আর্মড ফোর্সেস ইনস্টিটিউট অব প্যাথলজি ও কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল প্রস্তুত করা হচ্ছে। ঢাকার বাইরে প্রত্যেকটি বিভাগীয় শহরে করোনা টেস্ট করার জন্য প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে চট্টগ্রামের বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ট্রপিক্যাল মেডিসিন অ্যান্ড ইনফেকসাস ডিজিজেস হাসপাতালে পরীক্ষা শুরু হয়েছে। রংপুর ও রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পিসিআর মেশিন স্থাপনের কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পিসিআর মেশিন চালুর জন্য একটি কারিগরি দল সেখানে যাচ্ছে। আগামী সাত থেকে ১০ দিনের মধ্যে অন্য বিভাগগুলোতে করোনা শনাক্তকরণ পরীক্ষা চালু করা সম্ভব বলে বলে জানান তিনি।