করোনায় মৃত্যুঝুঁকি কাদের বেশি?

প্রকাশিত: ৮:৪৫ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ২১, ২০২১ | আপডেট: ৮:৪৫:অপরাহ্ণ, এপ্রিল ২১, ২০২১

করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে যারা মারা যাচ্ছেন, তাদের বেশিরভাগই আগে থেকে স্থুলতা ও অসংক্রামক রোগে ভুগছিলেন। গত মঙ্গলবার (১৩ এপ্রিল) ব্রিটিশ জার্নাল অব স্পোর্টস মেডিসিনের প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রায় ৫০ হাজার মানুষের ওপর চালানো গবেষণায় দেখা গেছে, যারা শারীরিকভাবে নিষ্ক্রিয় থাকেন বেশি, কোভিডে তাদের মৃত্যুঝুঁকিও বেশি।

গবেষণায় বলা হয়, শরীরচর্চা একেবারেই করতেন না, এমন কোভিড রোগীদের হাসপাতাল ও নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে নিয়ে যেতে হয়েছে বেশি। তাদের মৃত্যুর আশঙ্কাও বেশি থাকে।

ধূমপান, স্থূলতা ও দুশ্চিন্তাও কোভিডের স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে পড়ে। তবে শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা এগুলোর তুলনায় বেশি গুরুতর বলে গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে। এর আগে করোনার স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে বেশি বয়স, ডায়াবেটিস, স্থূলতা ও হৃদরোগ আলোচিত ছিল। তবে তখনও শুয়ে-বসে থাকার অভ্যাসটি এর মধ্যে ছিল না।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও চীনের একটি যৌথ মিশন গত ২৮ ফেব্রুয়ারি একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তাতে বলা হয়, চীনে আক্রান্তদের মধ্যে ৮০ শতাংশের উপসর্গ ছিল মৃদু। তবে ষাটোর্ধ্ব যাদের উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, শ্বাসতন্ত্রের রোগ ও ক্যানসার ছিল তাদেরই মৃত্যুর ঝুঁকি বেশি দেখা গেছে। শুধু করোনায় আক্রান্ত এমন লোকজনের ক্ষেত্রে চীনে মৃত্যুর হার ছিল ১ দশমিক ৪ শতাংশ। করোনার পাশাপাশি অন্য রোগে আক্রান্তদের মৃত্যুর হার ছিল অনেক বেশি।

যৌথ মিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, হৃদরোগে আক্রান্তদের মৃত্যুর হার ছিল ১৩ দশমিক ২ শতাংশ, ডায়াবেটিসে আক্রান্তদের ক্ষেত্রে ৯ দশমিক ২ শতাংশ, উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্তদের ৮ দশমিক ৪ শতাংশ, দীর্ঘমেয়াদী শ্বাসতন্ত্রের রোগীদের ৮ শতাংশ এবং ক্যানসারে আক্রান্তদের ক্ষেত্রে মৃত্যুর হার ছিল ৭ দশমিক ৬ শতাংশ।

কী বলছে দেশের গবেষণা?

জাতীয় প্রতিষেধক ও সামাজিক চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান (নিপসম) ‘কোভিড-১৯ রোগীদের পরিণতির সঙ্গে সম্পর্কিত ঝুঁকিসমূহ নিরুপণ’ শিরোনামে একটি গবেষণা পরিচালনা করেছে। তাদের গবেষণা বলছে, যারা ১৪ দিনের মধ্যে মারা গেছেন তাদের মধ্যে করোনা ছাড়া তিন বা তিনের বেশি রোগে আক্রান্ত ছিল শতকরা ৩৩ দশমিক দুই শতাংশ, দুটি রোগ ছিল ২৭ দশমিক আট শতাংশ এবং একটি রোগ ছিল ৩৮ দশমিক ৯ শতাংশ রোগীর।

১৪ দিনের মধ্যে যারা মারা গেছেন তাদের ৩৯ দশমিক ১ শতাংশের শ্বাসতন্ত্রের জটিল রোগ বা সিওপিডি ছিল। ৩৯ দশমিক ১ শতাংশের ছিল ডায়াবেটিস এবং ৩৪ দশমিক ৮ শতাংশ ছিল উচ্চ রক্তচাপ। ১৭ দশমিক ৪ শতাংশের ছিল হৃৎপিণ্ডের রক্তনালীর রোগ। দীর্ঘমেয়াদী কিডনি রোগে ভুগছিলেন ৭ দশমিক ৪ শতাংশ রোগী।

আবার ২৮ দিনের মধ্যে যারা মারা গেছেন তাদের ৪০ শতাংশেরই ছিল শ্বাসতন্ত্রের জটিল সংক্রমণ। ৩৬ শতাংশের ডায়াবেটিস, ৩৬ শতাংশের উচ্চ রক্তচাপ, ১৬ শতাংশের হৃৎপিণ্ডের রক্তনালীর রোগ এবং দীর্ঘমেয়াদী কিডনি রোগ ছিল ১৬ শতাংশের।

মৃত্যুর মিছিল

দেশে ২৪ ঘণ্টায় (১৫-১৬ এপ্রিল) সরকারি হিসাবে করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ১০১ জন। মহামারি শুরুর পর একদিনে এত মৃত্যু আর দেখেনি বাংলাদেশ। এর আগে দিন মারা যান ৯৪ জন। তার আগের দিন ৯৬ জন। গতকাল দেশে করোনা আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়ায়।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সরকারি হিসাবে গত ১৫ দিনে মারা গেছেন এক হাজার জন। গত এক সপ্তাহে বাংলাদেশে করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু তার আগের সপ্তাহের চেয়ে ৩০ শতাংশ বেড়েছে।

গতবছর প্রথম মৃত্যুর পর এক হাজার মৃত্যু ছাড়ায় গত ১০ জুন। ৫ জুলাইতে মৃত্যু ২ হাজার ছাড়ায়। এর মধ্যে সে বছরের সর্বোচ্চ মৃত্যু ৬৪ জনের কথা জানানো হয় ৩০ জুনে। ২৮ জুলাই মৃত্যু ছাড়িয়ে যায় তিন হাজার। চার হাজার ছাড়ায় ২৫ আগস্ট। পাঁচ হাজার ছাড়ায় ২২ সেপ্টেম্বর। ছয় হাজার মৃত্যু ছাড়ায় ৪ নভেম্বর। সাত হাজার ছাড়ায় ১২ ডিসেম্বর। ২৩ জানুয়ারি মৃত্যু ছাড়িয়ে যায় ৮ হাজার। গত ৩১ মার্চ মৃত্যুর সংখ্যা নয় হাজার ছাড়িয়ে যায়।

অর্ধেকেরও বেশি ষাটোর্ধ্ব

স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্যমতে, মারা যাওয়া ১০ হাজার ১৮২ জনের মধ্যে পুরুষ সাত হাজার ৫৬৬ ও নারী দুই হাজার ৬১৬ জন। এদের মধ্যে ষাটোর্ধ্ব আছেন অর্ধেকেরও বেশি- পাঁচ হাজার ৭৩৮ জন। ৫১ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে আছেন দুই হাজার ৫০৩ জন। ৪১ থেকে ৫০ বছরের মধ্যে আছেন এক হাজার ১৩৩ জন। ৩১ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে আছেন ৫০৫ জন। ২১ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে আছেন ১৯২ জন। ১১ থেকে ২০ বছরের মধ্যে ৭১ জন এবং ‍শূন্য থেকে ১০ বছরের শিশু আছে ৪০ জন।

যা বলছে মুগদা হাসপাতালের গবেষণা

করোনায় মৃত্যু নিয়ে কাজ করেছে রাজধানীর মুগদা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল। এ হাসপাতাল গতবছরের এপ্রিল থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ২০২ জনের মৃত্যু নিয়ে বিশ্লেষণ করেছে।

হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. রুবিনা ইয়াসমিন বলেন, কোমরবিডিটি অর্থাৎ অন্যান্য জটিল রোগে আক্রান্তদের ভেতরে সবচেয়ে বেশি ছিল উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস। ১৩১ জনের উচ্চ রক্তচাপ ছিল। ১২৫ জনের ছিল ডায়াবেটিস। এরপর ছিল হৃদরোগ ও অ্যাজমা। শ্বাসকষ্ট নিয়ে সবচেয়ে বেশি রোগী এসেছিলেন এই হাসপাতালে। তারপর জ্বর-কাশি, ডায়েরিয়া নিয়েও এসেছেন রোগীরা।

তিনি আরও জানান, হাসপাতালে আসা বেশিরভাগ রোগী মারা গেছেন ভর্তি হওয়ার ৪৮ ঘণ্টার ভেতর। তাদের মধ্যে একসঙ্গে উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসে আক্রান্তদের সংখ্যাই বেশি- প্রায় ৮৫ জন।

করোনায় মারা যাওয়া কতোজন অসংক্রামক রোগে আক্রান্ত ছিলেন তা নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদফতর কাজ করছে জানিয়ে অধিদফতরের মুখপাত্র এবং অসংক্রামক রোগ বিভাগের পরিচালক ও ঢামেক হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ডা. রোবেদ আমিন বলেন, কতোজন রোগী হাইপারটেনশন বা কতোজন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ছিলেন, এটা পেলে খুব ভালো হতো। কিন্তু এগুলো কেন্দ্রীয়ভাবে সংরক্ষিত থাকে না, হাসপাতালে থাকে। হাসপাতালে যদি কেউ এসব নিয়ে রিসার্চ করে, আমাদের জন্য ভালো হতো। এ ধরনের ক্লিনিক্যাল স্টাডি দেশে খুব বেশি হয়নি।’

ডা. রোবেদ আমিন আরও বলেন, ‘আমি ঢাকা মেডিক্যালে থাকতে প্রায় ৪৫০ স্যাম্পল নিয়ে গবেষণা করেছি। কারা হাইপারটেনশন বা কারা ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ছিলেন ওটা নিয়ে কাজ করেছি। প্রতিবেদন প্রকাশ হবে শিগগিরই। তবে প্রাথমিকভাবে দেখা গেছে, যাদের ডায়াবেটিস বা উচ্চরক্তচাপ বেশি, তাদের মৃত্যুঝুঁকিও বেশি। উন্নত দেশগুলোতেও দেখা গেছে, সেখানে কোমরবিডিটি থাকলে মৃত্যুহারও বেশি। বাংলাদেশে এ নিয়ে আরও ক্লিনিক্যাল ডাটা বা স্টাডি করা দরকার।

-বাংলা ট্রিবিউন।