করোনায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকলেও চলছে কোচিং, প্রাইভেট বানিজ্য, ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান অব্যাহত

মোঃ হায়দার আলী মোঃ হায়দার আলী

গোদাগাড়ী উপজেলা প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ৯:১৫ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ৫, ২০২০ | আপডেট: ৯:১৫:অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ৫, ২০২০

মো: হায়দার আলী: Education is the backbone of a nation. No nation can prosper in life without Education. Teacher is a nation builder. মহান ও নিবেদিত পেশা হিসেবে শিক্ষকতা সর্বজন স্বীকৃত।

এমন কোন পেশা নেই যা সম্মানের দিক থেকে শিক্ষকতার সমান হতে পারে। মানুষ গড়ার কারিগর হিসেবেই মনে করা হয় শিক্ষকদের। শিক্ষা মানুষের একটি মৌলিক অধিকার ও জাতীয় উন্নয়নের মাপকাঠি। কিন্তু কিছু কোচিংবাজ, প্রাইভেটবাজ শিক্ষকদের কারণে শিক্ষক সমাজ আজ প্রশ্নবৃদ্ধ। ৮০/৮৫ ভাগ শিক্ষক যদি সরকার প্রদত্ত বেতনভাতায় চলতে পারে তবে ১৫/২০ শিক্ষক কেন চলতে পারেন না, তাদের সরকারী নির্দেশ মানতে সমস্যা কোথায়?

গত বুধবার (২ ডিসেম্বর) রাজশাহী নগরীর নিউ মার্কেট এলাকার ‘জুয়েল ক্যামিস্ট্রি’ কোচিং সেন্টারে ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান চালায়। ওই কোচিংয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সামাজিক দূরত্ব ও অনেকের মুখে মাস্ক ছিলো না। এসময় ‘জুয়েল ক্যামিস্ট্রি’ কোচিং সেন্টারের মালিককে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করে ভ্রামম্যাণ আদালতের বিচারক সহকারী কমিশনার ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ কাউছার হামিদ। তিনি জানান, ‘সরকারি নির্দেশনা অমান্য করে কোচিং পরিচালনার দায়ে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এসময় কোচিং সেন্টার বন্ধের নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে।’

অন্যদিকে, নগরীর উপকন্ঠ কাটাখালী বাজারের বেলঘড়িয়া সড়কে দুইটি কোটিং সেন্টার চলে। এছাড়া কাটাখালী বালিকা বিদ্যালয়ের পাশে, পুরানো মাছপট্টিতে পাশের একটি বাড়িতে শিক্ষক প্রাইভেটের নামে অনেকগুলো শিক্ষার্থীদের নিয়ে কোচিং সেন্টার চালায়। উজ্জল, জুয়েল, ফাহাদ, নিকুঞ্জ, প্রকাশ, পরিচালনায় এসব কোচিং সেন্টারে এক ব্যাচে ১ শ থেকে ১২০ জন ছাত্রছাত্রীকে গাদাগাদি করে কোচিং করিয়ে থাকেন, এক বছর আগে থেকে জন প্রতি ১২ হাজার থেকে ১৩ হাজার টাকা আদায় করে থাকেন। কারো পড়ে ভাল না লাগলে পড়তে না চাইলে টাকাও ফেরত দেয়া হয় না। এছাড়া বিনোদপুর এলাকায় রহমান ডেকোরেটরারের পাশের দোতালায়. কাজলা মোড় এলাকায় কলেজ শিক্ষকের কোচিং সেন্টার চালাচ্ছেন। এছাড়া আলুপট্টি এলাকায়, নগর ভাবনের পাশে, নিউ মার্কেট এলাকায়, দড়িখড়বোনা এলাকায় বেশ কয়েকটি বাসা বাড়িতে চলে কোচিং।

কোচিং সেন্টারগুলোর আশে-পাশের দোকান ও স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, করোনাভাইরাসের প্রথম সময়ে কোচিংগুলো বন্ধ ছিলো। পরে আস্তে আস্তে সব কোচিং সেন্টার খুলতে শুরু করেছেন শিক্ষকরা। তবে করোনার মধ্যে কোচিংগুলো খোলা থাকলেও প্রশাসন তেমন ব্যবস্থা নেয়নি। একইভাবে চলছে জেলার গোদাগাড়ী, তানোর, মোহনপুর, পুঠিয়া, বাঘাসহ অন্য উপজেলার কোচিং ও প্রাইভেট সেন্টার গুলি। শুধু রাজশাহীতেই নয় দেশের অন্য অন্য জেলার উপজেলার চিত্র প্রায় একই।

সহকারী কমিশনার ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ কাউছার হামিদ বলেন, ‘এমন অভিযান অব্যহত থাকবে।

সুযোগ্য প্রধান মন্ত্রী, বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনা বেসরকারী শিক্ষকদের ১ বৈশাখ ভাতা, ৫ ভাগ প্রবৃদ্ধি ঘোষনা করেছেন তা ২০১৯ ইং সনের জুলাই থেকে কার্যকর হচ্ছে। জাতীয় করণ ঘোষনাও এখন সময়ের ব্যপার। সত্যি প্রশংসার দাবীদার প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনা, উনাকে প্রশংসা ও ধন্যবাদ জানাই। আমাদের সুযোগ্য সাবেক শিক্ষা মন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ প্রায়ই বলতেন আমরা শিক্ষকদের উপযুক্ত বেতন দিতে পারি না তা হলে প্রশ্ন আশায় স্বাভাবিক যে কীভাবে শিক্ষার গুনগত মান তৈরী হবে । শিক্ষকদের আলাদা বেতন স্কেল প্রদান করা হবে বলেও বিভিন্ন সময় শিক্ষকদের আশ্বস্ত করতেন। এটা খুব ভাল দিক। শিক্ষার গুনগত উন্নয়ন ছাড়া জাতীয় উন্নয়ন সম্ভাব নয়। দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রধান মাপকাঠি হচ্ছে শিক্ষা। কিন্তু পাঠদানে আত্ম-নিয়োগ, শিক্ষার্থীদের মধ্যে নিহিত থাকা সুপ্ত মেধা জাগ্রত করা, দুঃস্থ ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের নিজের অর্থ ব্যয়ে দেশ সেরা হিসেবে গড়ে তোলা শিক্ষকও দেশে বিরল নয়। এ জন্যই সমাজে শিক্ষকরা সবচেয়ে বেশি সম্মানিত, শিক্ষার্থীরাও যুগে যুগে স্মরণ রাখেন তাদের। তবে কিছু শিক্ষকের অনৈতিকতা ও অর্থলিপ্সায় ভূলণ্ঠিত হতে চলেছে গোটা শিক্ষক সমাজের মর্যাদা। প্রশ্ন উঠেছে তাদের দায়িত্ববোধ, আন্তরিকতা ও নৈতিকতা নিয়ে। ক্লাসে পাঠদানের পরিবর্তে কোচিং বাণিজ্যে জড়িত থাকা, সরাকারী নির্দেশ মতে, প্রতিষ্ঠানগুলিতে প্রতিদিন ৬ ঘন্টা পাঠদান করার কথা থাকলেও প্রতিষ্ঠান প্রধান, শিক্ষকদের যোগসাজসে চলে ৩/৪ ঘন্টা আর তথাকথিত হাফডের অজুহাতে বৃহস্পতিবার চলে মাত্র ২/৩ ঘন্টা ফলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাই কোচিং প্রাইভেট করার জন্য সুযোগ করে দিচ্ছেন। আর করোনা ভাইরাসের কারণে গত ১৭ মার্চ থেকে সব ধরণের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে, তবে অনলাইন ক্লাস চালু রাখার নির্দেশনা থাকলেও অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সে নির্দেশনা পালন করেন না। ফলে সরকারের বিনামূল্যে পাঠ্য বই, উপবৃত্তি কার্যক্রম কোন কাজে আসে না।

বেসকারী কলেজ, মাদ্রাসাগুলির অবস্থা আরও করুন সেখানে পাঠদানের কোন নির্দেশনা মানা হয়না। চলে শিক্ষক কর্মচারীদের কথিত অফডে, ৬ দিনে শিক্ষকগণ আসেন ২/৩দিন। ২/১টি ক্লাস থাকে, ক্লাস করার ১০ মিনিট পূর্বে আসেন ক্লাস করে বাড়ী চলে যান কিন্তু বেতন নেন পুরো মাসের। এর জন্য ম্যানেজ করতে হয় কিছু কিছু ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের। শিক্ষাদানের চেয়ে অর্থ উপার্জনেই বেশি মনোযোগী হওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। শিক্ষকতার প্রতি চিরাচরিত অঙ্গীকার ভুলে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত ও পরিচালিত কোচিং সেন্টারে পড়তে বাধ্য করা হচ্ছে শিক্ষার্থীদের। নির্দেশ না মানলেই নম্বর কমিয়ে দেয়া, নানা ক্ষেত্রে নিগৃহীত করা এমনকি শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার ঘটনাও ঘটাচ্ছেন কোন কোন শিক্ষক। প্রবীণ শিক্ষাবিদরা বলছেন, শিক্ষকদের নিজেদের কারণেই তাদের সম্মান কমছে। একটি শিক্ষার্থী যদি শ্রেণী কক্ষে ৬ ঘন্টা থাকে, কোচিং প্রাইভেটে ৬ ঘন্টা, যাতায়াতের জন্য যায় ১/২ ঘন্টা, ৩ বার খাবার, গোসুল করতে যায় আরও ৩ ঘন্টা, ঘুম ৬/৮ ঘন্টা তবে সে বাড়ীতে পড়ার সময় কখনও পায়না, সে ভাল ফলাফল করবে কিভাবে। শিক্ষকগণ ক্লাসরুম ছেড়ে আর্থিক লোভে চেম্বার কেন্দ্রিক (কোচিং সেন্টার-প্রাইভেট) মনোযোগী হয়ে উঠেছেন। কোচিং বাণিজ্য বন্ধে ডা. ডীপু মনি ও সাবেক শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ ও শিক্ষা মন্ত্রণালয় বার বার নির্দেশনা দিলেও কোন কিছুই আমলে নিচ্ছেন না তারা। যাদের কথায় শিক্ষার্থীরা অনুগত হয়ে ওঠে সেই শিক্ষকদের বিরুদ্ধেই অভিযোগ উঠছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনাকে বৃদ্ধাঙ্গলী প্রদর্শনের।

শিক্ষা পরিবারের সর্বোচ্চ অভিভাবক খোদ শিক্ষা মন্ত্রী ক্ষোভ ও সতকর্তাও যেনো দাগ কাটছেনা তাদের মনে। বরং নিজ গতিতেই কোচিং বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছেন তাদের কোচিং ও প্রাইভেট বানিজ্য। তবে ব্যতিক্রম শিক্ষকের সংখ্যাও কম নয়। বিশেষ করে মাদরাসা শিক্ষায় এখনো শিক্ষকদের নিবেদিত প্রাণ ও অর্থেও মোহমুক্ত হয়ে শিক্ষাদান করার প্রমান পাওয়া গেছে। মাত্র ১ হাজার টাকা বেতনেও শিক্ষকতায় যুক্ত রয়েছেন এবতেদায়ী শিক্ষকরা। কোচিংয়ের এই কুফল সম্পর্কে প্রবীণ শিক্ষাবিদগন বলেছেন, পরীক্ষা এখন বাণিজ্য হয়ে গেছে। টাকার বিনিময়ে সবকিছু হচ্ছে। কোচিং ব্যবসায়ীরা সেটাই করছে। কোচিং সেন্টার যে কারণে চলছে সেগুলো তুলে দিতে হবে। ছাত্রছাত্রীদের ক্লাসনির্ভর হতে হবে। পরীক্ষা পদ্ধতির পরিবর্তন দরকার। শিক্ষাবিদরা বলছেন, কোচিং বন্ধে সরকারের যেমন কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। তেমনি শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মনোজগতে পরিবর্তন আনতে হবে। আর শিক্ষকদের হতে হবে দায়িত্বশীল। শিক্ষকরা যদি শ্রেণি কক্ষে নিজেদের উজাড় করে দিয়ে শিক্ষার্থীদের পড়ান তাহলে তাদের তো আর কোচিং-এর জন্য অপেক্ষায় থাকতে হয় না। সেই বিষয়টির দিকে শিক্ষকদের মনোনিবেশ করতে হবে। অভিভাবকরা অভিযোগ করে বলেন, শিক্ষকরা নিজেরাই (একাংশ) শিক্ষার্থীদের উত্তর বলে দেয়ার প্রতিযোগিতায় নামেন। আর পরীক্ষার্থীরা যখন শিক্ষকদের এসব কাজ- বাসায় গিয়ে বলেন, লজ্জায় লাল হয়ে যায় মুখ। হায়রে নৈতিকতা! কোথায় গেল সব? এখন বলাই যায়, শিক্ষকরা জাতি গড়ার কারিগর নন। তারা জাতির নৈতিক অবক্ষয়ের কারিগর। অনুসন্ধানে জানা গেছে, শহর ও উপজেলা এলাকার বিভিন্ন অলি-গলিতে ছোট ছোট বাসা ভাড়া নিয়ে গড়ে তোলা হচ্ছে কোচিং সেন্টার। শুধু শহরেই নয় উপজেলার গ্রাম অঞ্চলে বিষ বাষ্পের মত ছড়িয়ে পড়েছে এ সব অবৈধ কোচিং সেন্টার, প্রাইভেট হোম। এসব কোচিংয়ের বিজ্ঞাপন ও ব্যানার-পোস্টারগুলো থাকছে বেশ চটকদার এবং আকর্ষণীয়। পাশাপাশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন নামেও চলে কোচিং বাণিজ্য। শিক্ষকদের বাসা-বাড়ি, স্কুল-কলেজ এবং আশপাশের এলাকায় ফ্লাট-ঘর ভাড়া নিয়ে চলছে টাকার বিনিময়ে পাঠদান। শিক্ষার্থীদের অধিকাংশই জানান, ইচ্ছা না থাকা সত্ত্বেও তাদের কোচিংগুলোতে ভর্তি হতে হচ্ছে তাদের। অনেক অভিভাবকরা ভাল ফলাফলের আশায় জোর করে ভর্তি করছেন তাদের সন্তানদের। কোচিং সেন্টারগুলোতে সকাল ৬ টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত ক্লাস চলে বলে তারা জানায়। একদিকে কলেজ স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা বন্ধ থাকার করণে শিক্ষার্থীদের মানসিক, শারীরিক দুইভাবেই ভেঙ্গে পড়ায়, লেখাপড়া নষ্ট হওয়ায় অভিভাবকগণ বাধ্য হয়েই প্রাইভেট, কোচিং সেন্টারে পাঠাচ্ছেন।

যদিও শিক্ষা মন্ত্রণালয় ২০১২ সালের ২০ জুন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের কোচিং বন্ধে একটি নীতিমালা জারি করে। ওই নীতিমালায় বলা হয়েছে- শিক্ষকরা নিজ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের কোচিং করাতে পারবেন না। তবে অন্য প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ ১০ জনকে কোচিং করাতে পারবেন। কিন্তু মন্ত্রণালয়ের ওই নির্দেশনাকে অমান্য করে দেদারসে চালাচ্ছেন প্রাইভেট, কোচিং বানিজ্য। সংশ্লিষ্টরা দেখার যেন কেউ নেই। বরং পুরো শিক্ষা ব্যবস্থা এখন কোচিং নির্ভর হয়ে গেছে। শিক্ষার্থীরা কোন মতে, রাতে বাড়ীতে অবস্থান করে সারাদিন ছুটে চলেছে প্রাইভেট ও কোচিং হোমে। শিক্ষকদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে উপস্থিতি না থাকার কারণে তারা সারা দিন ব্যস্ত থাকছেন কোচিং প্রাইভেট কোচিং সেন্টারগুলিতে। গ্রাম থেকে শহরাঞ্চলে কোচিং প্রাথমিক শিক্ষাস্তর হতে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত আষ্টেপৃষ্ঠে গেঁথে ফেলেছে। এছাড়া যেন লেখাপড়ায় হয় না। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে একবার কোচিং বাণিজ্যের সাথে জড়িত শিক্ষকদের নামের তালিকা তৈরির উদ্যোগ নেয়া হয় এবং যারা এর সাথে জড়িত এমন শিক্ষকদের বদলি এবং প্রথম দফায় তাদের সতর্ক করে দেয়ার উদ্যোগও নেয়া হয়। কিন্তু সেসব উদ্যোগ যেখানে ছিল এখনো সেখানেই রয়েছে। অন্যদিকে নিশ্চিত জিপিএ-৫ (এ প্লাস), শতভাগ পাসের নিশ্চয়তার মতো নজরকাড়া বিজ্ঞাপন দিয়ে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের আকৃষ্ট করছে কোচিং সেন্টার প্রাইভেট হোমগুলো, স্কুল, কলেজ, মাদ্রসার গেটে অবৈধ কোচিং সেন্টারের নিয়োগকৃত লোকজন বিভিন্ন লোভনীয় বিজ্ঞান নিয়ে শিক্ষার্থী, অভিভাবকদের হাতে প্রকাশ্যে ধরিয়ে দিচ্ছেন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সামনে দিয়ে বীর দাপটে কোচিং প্রাইভেট এর মাইকিং করা হচ্ছে, দেখার যেন কেউ নেই কোন কোন স্থানে তাদের ম্যানেজ করা হচ্ছে অভিযোগ রয়েছে। লাভজনক এই ব্যবসার কারণে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ব্যাঙের ছাতার মতোই গজিয়ে ওঠেছে বিভিন্ন নামে বেনামে হাজার হাজার কোচিং সেন্টার, প্রাইভেট হোম।

অনেক ক্ষেত্রে মার্কসের ভয়-ভীতি দেখিয়েও ভর্তি হতে বলা হয় কোচিং সেন্টারে প্রসপেক্টাস আর নজরকাড়া বিজ্ঞাপন নির্ভর কোচিং সেন্টারের আড়ালে প্রশ্নফাঁসের ব্যবসা হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। ফ্রি স্টাইলে এবং কর্তৃপক্ষের নাকের ডগার উপর এই বাণিজ্য চললেও নিরব থাকছে মন্ত্রণালয় ও কর্তৃপক্ষ। তবে অভিভাবকরা বলছেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় ছেলে মেয়েদের ভালো ফলাফলের জন্য তাদের সন্তানদের নিয়ে প্রাইভেট, কোচিং সেন্টারের দ্বারস্থ হচ্ছেন। শুধু কোচিং সেন্টার খুলে বসা এবং এতে শিক্ষার্থীদের পড়তে বাধ্যই করা হচ্ছে না। শিক্ষকরা তাদের কোচিংয়ের নাম কুড়ানোর জন্য বেছে নিচ্ছেন অনৈতিক পন্থাও। নিজের কাছে কোচিং বা প্রাইভেট পড়া শিক্ষার্থীদের ফল যাতে ভালো হয় সেজন্য পরীক্ষার হলে শিক্ষার্থীদের কাছে নকল পৌঁছে দিচ্ছেন সংশ্লিষ্ট শিক্ষকেরা। বলে দিচ্ছেন নৈর্ব্যক্তিকের উত্তর। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এবং শিক্ষকদের এই অনৈতিক কাজের কারণে ফলাফলে সেরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্বাচনের পদ্ধতিই বাতিলের ঘোষণা দিতে বাধ্য হন শিক্ষা মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের তদন্তে জানা যায়, আগে যেখানে শিক্ষকরা পরীক্ষার হলে ছাত্রদের নকল ধরতেন।

এখন নিজ প্রতিষ্ঠানের এবং কোচিংয়ের ছাত্রদের পাস ও নম্বর বাড়ানোর জন্য নিজেই নকল নিয়ে হাজির হন শিক্ষার্থীদের কাছে অত্যন্ত দু:খজনক হলেও বাস্তব সত্য কোন কোন কেন্দ্র সচিব ও হল সুপারদেরও পাবলিক পরীক্ষায় নৈব্যাক্তিক এ নকল সরবরাহ দেওয়ারও অভিযোগ রয়েছে । লক্ষ্য একটাই এবছর ওই শিক্ষকের নিজস্ব কোচিং কিংবা প্রতিষ্ঠান থেকে বেশি সংখ্যক শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেলে পরের বছর বিজ্ঞাপন হবে। এমনকি অন্য স্কুলে কেন্দ্র পড়লে সেখানে টাকা পয়সা দিয়ে পরীক্ষকদের কিনে ফেলেন। আগে ভালো স্কুলের শিক্ষকরা বাড়তি রোজগারের জন্য বিভিন্ন কোচিং সেন্টারের সাথে সম্পৃক্ত হতেন। এখন তারা নিজেরাই কোচিং প্রাইভেট ব্যবসা করছেন। রীতিমতো নিজের নাম দিয়েই কোচিং সেন্টার খুলে বসেছেন তারা। কম-বেশি রাজধানী, জেলা উপজেলা সদরে প্রায় সব কোচিং সেন্টারই জমজমাট। সেভ দ্য চিলড্রেন অস্ট্রেলিয়ার সহায়তায় পরিচালিত শিশু সংগঠন চাইল্ড পার্লামেন্টের এক জরিপে দেখা যায়, ৮২ শতাংশ ছাত্রছাত্রীই গৃহশিক্ষকের কাছে পড়ে বা কোচিংয়ে যায়। শতাংশটির অংকে তারতম্য হতে পারে। কিন্তু তথ্যগতভাবে শতভাগ সঠিক। অর্থ ব্যয়ে ভাল ফল: পরীক্ষায় ভালো ফলের পেছনে আগে শিক্ষকদের অবদানকে মেনে নেয়া হলেও এখন তা মানতে নারাজ অভিভাবকরা। তারা বলছেন, শিক্ষকরা নয়, বরং টাকায় তাদের ফল কিনে নিতে হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের ভালো ফলাফল যে স্কুলের পাঠদানের কারণে হচ্ছে না তা স্বীকারও করেছেন অভিভাবকরা। গোদাগাড়ী সরকারী স্কুল এন্ড কলেজের কয়েকজন অভিভাবক বলেন, পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর অধ্যক্ষ বলেন, তাদের অক্লান্ত পরিশ্রম, আন্তরিক প্রচেষ্টা আর নিয়মিত পাঠদানের কারণে হয়েছে। আসলে কি তাই? অভিভাবকরা অভিযোগ করে বলেন, আমাদের সন্তানদের ভালো ফলাফলে স্কুলের বা শিক্ষকদের কোনই অবদান নেই। আমরা টাকা খরচা করে এই ফলাফল কিনেছি। কেমন কিনেছি! তার জবাবে একজন অভিভাবক বললেন, দেখুন আমার সস্তানের পেছনে মাসে দশ থেকে পনরো হাহাজার টাকা খরচ করছি। তাকে ভাল শিক্ষকের কাছে পড়ানোর নামে দুহাতে পয়সা খরচ করেছি।

রাজশাহী সরকারী পিএন গার্লস স্কুলের দশম শ্রেণির একজন শিক্ষার্থীর অভিভাবক কারিমা খাতুন অভিযোগ করে বলেন, ‘ক্লাস নাইন থেকে দুটি বছর মেয়েকে টানা কোচিং করাচ্ছি। প্রতি মাসে শুধু এ জন্যই খরচ হচ্ছে ১৫ হাজার টাকা। রাজধানীর উদয়ন স্কুলের দশম শ্রেণির ছাত্রী আরিফা খাতুন তার স্কুলের শিক্ষককের কাছেই গণিত এবং ইংরেজি কোচিং করেন। ‘ক্লাস বন্ধ থাকায় কোচিং করতেই হয় বলে জানান তিনি। নাসিমার অভিভাবকও জানান, ভাল রেজাল্ট করতে হলে কোচিং করাতেই হবে। ক্লাসে যে পড়া হয় তাতে ভাল রেজাল্ট করা যায় না। এদিকে প্রাইভেট পড়তে অস্বীকৃতি জানালে শিক্ষকের রোষানলের শিকার হয়েছেন এমন ছাত্রের সংখ্যাও কম নয়। পরীক্ষায় নম্বর কম দেয়া এমনকি শারীরিক নির্যাতনের শিকারও হয়েছেন কেউ কেউ। কিন্তু সে তাতে রাজি না হওয়ার পর থেকেই তার প্রতি ওই শিক্ষক বিরূপ আচরণ শুরু করেন। সম্প্রতি দেশে প্রথমবারের মতো একটি জরিপ করে সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)। অভিভাবকরা প্রতিমাসেই একজন শিক্ষার্থীর স্কুল-কলেজের বেতন, ফি ও অন্যান্য খরচ ছাড়াও কেবল কোচিং ও প্রাইভেটেরপেছনেই তিন থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত ব্যয় করছেন। একজন শিক্ষার্থীর মোট খরচের ৩৯ শতাংশ ব্যয় হচ্ছে কোচিং করতে গিয়ে।

২০১২ সালের জুনে চট্টগ্রাম অঞ্চল নিয়ে চিটাগাং রিসার্চ ইনিশিয়েটিভ (সিআরআই) এর গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, একজন শিক্ষার্থীর মোট খরচের ৩৯ শতাংশ ব্যয় হচ্ছে কোচিং করতে গিয়ে। স্কুল শিক্ষাকে বিনামূল্যে ভাবা হলেও প্রতিটি পরিবার এখাতে প্রতি মাসে মোট ব্যয় করছে ছয় হাজার ৮৪ টাকা। শিক্ষকদের কোচিংয়ে জড়িত থাকার বিষয়টি স্বীকার করে শিক্ষামন্ত্রী নিজেই বলেছেন, দেশের বেশিরভাগ কলেজে বেলা ১১টার পর শিক্ষক-শিক্ষার্থী খুঁজে পাওয়া যায় না। কারণ শিক্ষকরা মনে করেন ক্লাসে পড়ালে কোচিং-প্রাইভেটে শিক্ষার্থীরা আসবে না। মন্ত্রী বলেন, শিক্ষার্থীরা সকাল সাতটায় বাড়ি থেকে আসে। তারা আসে কোচিং করতে। সকালে যে শিক্ষার্থী আসে, সে কোচিং করে ক্ষুধার্ত হয়ে বাড়ি চলে যায়। শিক্ষামন্ত্রী বলেন, কোন কোন শিক্ষক ক্লাসে শিক্ষার্থীদের যথাযথভাবে না পড়িয়ে কোচিংয়ে বাধ্য করছেন বলে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে।

শিক্ষার্থীদের নোট বই পড়তে উদ্বুদ্ধ করা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অনিয়মিত উপস্থিতি প্রভূতি অভিযোগও কোন কোন শিক্ষকের বিরুদ্ধে পাওয়া যায়। নিয়মিত পরিদর্শন ও মনিটরিংয়ের মাধ্যমে এ সব শিক্ষক নামধারী দুর্জন ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহনের নির্দেশ দেয়া হয়েছে বলে তিনি জানান। মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে কোচিং বাণিজ্য বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহনের কথাও জানানো হয়। পাবলিক পরীক্ষার সময় কোচিং প্রাইভেট বন্ধ থাকার সরকারী নির্দেশ থাকলেও সেটা মানা হয় না। কাজের কাজ কিছুই হয় না।

লেখক: মো: হায়দার আলী
প্রধান শিক্ষক ও কলামিষ্ট।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। বাংলাদেশ টুডে এবং বাংলাদেশ টুডে-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)