কলেজ জাতীয়করণে বাদ পড়লেন এক হাজার শিক্ষক

টিবিটি টিবিটি

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ৩:৫৩ অপরাহ্ণ, আগস্ট ২৭, ২০১৮ | আপডেট: ৩:৫৩:অপরাহ্ণ, আগস্ট ২৭, ২০১৮

দেশের উপজেলা পর্যায়ে ২৭১টি কলেজ গত ৮ আগস্ট থেকে জাতীয়করণ হয়েছে। এ খবরে অনেক এলাকার জাতীয়করণকৃত কলেজ শিক্ষকরা সরকারকে ধন্যবাদ দিয়ে আনন্দ শোভাযাত্রা, মিষ্টি বিতরণ করেছেন। তারা বলেছেন, সরকারিকরণ বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারের শিক্ষার উন্নয়নের ক্ষেত্রে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ।

অন্যদিকে সরকারিকরণের তারিখে অধিকাংশ কলেজের কিছু সিনিয়র শিক্ষকের বয়স ৫৯ (বর্তমানে সরকারি চাকরি থেকে অবসরের বয়স) পার হওয়ায় তাদের মধ্যে হতাশা নেমে আসে। তারা বলছেন, জীবনের উজ্জ্বল কর্মময় সময় উপজেলা পর্যায়ে কলেজে পাঠদান করে কাটালেন অথচ শেষ সময়ে সরকারিকরণ থেকে তারা বাদ পড়লেন। জাতীয়করণের সিদ্ধান্তের প্রায় দুই বছর পর তা বাস্তবায়ন হওয়ায় বা বিলম্বিত হওয়ায় বাদ প্রায় এক হাজার সিনিয়র শিক্ষক।

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর স্মারক নং-৭এ/০৯/সি-২/২০১৩/৫৬৩৯(ক)/৫, তারিখ-৩০/০৬/২০১৬ খ্রিস্টাব্দে জাতীয়করণের লক্ষ্যে প্রথম দফায় দেশের ১৯৯টি বেসরকারি কলেজে নতুন করে শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগ, স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি হস্তান্তরের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। যেসব প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করা হয়নি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান প্রধানকে পরিদর্শনের প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণের জন্য বলা হয়। ওই পত্রানুযায়ী কলেজ পরিদর্শন হয় এবং অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষ, সহকারী অধ্যাপক বা প্রভাষক পদের সব শিক্ষক এবং কর্মচারী, যারা মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতর কর্তৃক নির্বাচিত বেসরকারি কলেজের নিয়োগের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার তারিখের আগে চাকরিরত ছিলেন, তাদের কাগজপত্র পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরিদর্শন টিম যাচাই করে নিয়ে যান এবং সংশ্লিষ্ট দফতরে জমা দেন। এরপর মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের শাখা-৯ (বেসরকারি কলেজ-১) থেকে স্মারক নং ৩৭.০০.০০০০.০৭০.০২.০৪৪.২০১৬-১০৫, তারিখ-২৪/০৪/২০১৭ খ্রিস্টাব্দে কলেজসমূহের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি সরকার (সচিব, মাধ্যমিক উচ্চ শিক্ষা বিভাগ, শিক্ষা মন্ত্রণালয় গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার) এর কাছে হস্তান্তর করে রেজিস্ট্রিকৃত দানপত্র দলিল জরুরিভিত্তিতে প্রেরণের জন্য বলা হয়। সংশ্লিষ্ট কলেজ কর্তৃপক্ষ তা যথাসময়ে সম্পাদন করেন।

এ সময় থেকে কলেজ শিক্ষক-কর্মচারীরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে থাকেন, কবে কলেজ সরকারিকরণের সরকারি আদেশ জারি হবে। এর মধ্যে পূর্বে সরকারিকৃত কলেজে ক্যাডারভুক্ত শিক্ষকরা আন্দোলন শুরু করেন এবং হুঁশিয়ারি দেন নব্য সরকারিকৃত শিক্ষকদের ক্যাডারভুক্তি তারা মানবেন না। প্রয়োজনে বৃহত্তর আন্দোলনে যাবেন। এ নিয়ে পক্ষ-বিপক্ষ সৃষ্টি হওয়ায় কেটে যায় ২ বছরের বেশি সময়। আর এর মধ্যে নীরবে পার হয় সরকারি অবসরে যাওয়ার বয়স ৫৯। বাদ পড়েন অধিকাংশ কলেজের সিনিয়র শিক্ষকরা।

পাবনা জেলায় ৬টি নব্য সরকারি কলেজে ৪টিতে এ রকম অবস্থা হয়েছে। নাটোর জেলার তিনটি কলেজে এমন শিক্ষক-কর্মচারী আছেন ৭ জন, বগুড়ার ৬টি কলেজের ৯ জন, নওগাঁ জেলার ৫টি কলেজের ৮ জন।

সদ্য অবসরে যাওয়া এক কলেজ শিক্ষক বললেন, ২০১৬ সালের ৩০ জুন নিষেধাজ্ঞা (এমবার্গ) জারির সময় তার বয়স ৫৯ এর নিচে ছিল। ভাবলেন শেষ সময়ে অন্তত সরকারি পেনশনের আওতায় পড়বেন এবং মৃত্যুর আগে বলতে পারবেন সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে অবসরে গেছেন। কিন্তু বিসিএস ওয়ালাদের দ্বন্দ্বে ২ বছরের বেশি সময় চলে যাওয়ায় বয়স ৫৯ ইতোমধ্যে পার হয়ে গেছে। আরেকজন বললেন, চাকরির শুরু থেকেই তিনি বাড়ি থেকে প্রতিদিন ৩০ কিলোমিটার দূরে কলেজ করতেন। বুকভরা আশা ছিল উপজেলা পর্যায়ে কলেজ সরকারি একদিন না একদিন হবেই। সেই হওয়াই হলো, তার মতো অনেকের কপালে সরকারিকরণ জুটলো না! রাজশাহী থেকে আসতেন এক শিক্ষক তারও একই অবস্থা।

সদ্য অবসরে যাওয়া আটঘরিয়া সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ খলিলুর রহমান, উপাধ্যক্ষ পাঞ্জাব আলী, সাঁথিয়া সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ সুনীল কুমার সরকার দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, তাদের নেতৃত্বে পরিদর্শন টিমের কাছে শিক্ষক-কর্মচারীদের কাগজপত্র উপস্থাপন করা হলো, অথচ তারাই বাদ পড়ে গেলেন। কিন্তু মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী সে সময় বলেছিলেন, ‘কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হবেন না।’

সদ্য অবসরে যাওয়া চাটমোহর সরকারি ডিগ্রি কলেজের বাংলা বিভাগের শিক্ষক বললেন, যেসব উপজেলায় সরকারি কলেজ নেই, সেগুলোয় একটি করে কলেজ সরকারিকরণের জন্য ২০১৬ সাল থেকে সরকার তালিকাভুক্তির কাজ শুরু করে। চূড়ান্ত হয় সরকারিকরণের জন্য কলেজগুলো। ক্যাডার সার্ভিসধারীদের চাপে বিধিমালা না হওয়ায় দীর্ঘদিনেও এ কলেজগুলো জাতীয়করণ করা যাচ্ছিলো না। মূলত এসব কলেজ শিক্ষকদের বদলি, পদায়ন এবং মর্যাদা কী হবে, সেটা নিয়ে আন্দোলন হওয়ায় সরকারিকরণের কাজ আটকে ছিল। অবশেষে নীতিমালা জারি হলো ৩১ জুলাই, ২০১৮। এরই আলোকে ৮ আগস্ট ২৭১টি কলেজ জাতীয়করণের আদেশ জারি হলো।

তিনি বলেন, ২০১৬ সালের ৩০ জুন নিষেধাজ্ঞা জারির দিন থেকে জাতীয়করণের বয়স ধরলে অন্তত এসব সিনিয়র শিক্ষকের একটি গতি হতো। বিষয়টি এখন সামাজিক লজ্জার পর্যায়ে চলে গেছে। তারা চাকরি বৃদ্ধি চান না। তারা অন্তত সরকারি পেনশনের আওতাভুক্ত হতে চান। এ রকম অবস্থায় দেশে পুরনো কলেজগুলোতে দু’চারজন করে আছেন। তিনিসহ ভুক্তভোগীরা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এ ব্যাপারে সজাগ দৃষ্টি কামনা করেন। তাদের কথা, বেসরকারি শিক্ষক হিসেবে তারা অবসরে যাওয়ার ৪ বছর পর এককালীন টাকা পাবেন। এই টাকা সরকারি পেনশনে সমন্বয় করে সরকারি পেনশনের আওতায় অন্তত এসব শিক্ষককে আনা হোক।