কুমিল্লায় প্রতিবন্ধী স্কুল দখলের চেষ্টা

শাহজাদা এমরান শাহজাদা এমরান

কুমিল্লা প্রতিনিধি

প্রকাশিত: 4:30 PM, October 21, 2019 | আপডেট: 4:30:PM, October 21, 2019
ছবি: টিবিটি

কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলার উত্তর দূর্গাপুর ইউনিয়নের আড়াইওরা এলাকায় ‘পরশ প্রতিবন্ধি স্কুল’ নামে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জবরদখলের চেষ্টা করছেন প্রভাবশালীরা বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

দখলের অংশ হিসেবে ইতিমধ্যে স্কুলটির নাম পরিবর্তন করে বীর মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ্ব ফারুক হোসেন প্রতিবন্ধী স্কুল নামে একটি লিফলেট করে এবং একজন কে দায়িত্ব দিয়ে কথিত দাবীবার আলহাজ্ব ফারুক হোসেন বিদেশ চলে যান। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় অসন্তোষ বিরাজ করছে এবং প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, পরশ সমাজকল্যান সংস্থা কর্তৃক মীর্জা ফাতেমা আহমেদ পরশ প্রতিবন্ধী স্কুলটি আড়াইওরা এলাকায় নিজস্ব ভূমিতে ২০০৮সালে প্রতিষ্ঠা করেন। সমাজকল্যাণ অধিদপ্তর কর্তৃক যার রেজিঃ নম্বর-(১৮০৭/০৮)। গত ১১বছর যাবৎ অত্যন্ত সুনাম ও সুষ্ঠুভাবে প্রতিবন্ধী ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি পরিচালিত হয়ে আসছে। স্কুলটির প্রসার ও ছাত্র-ছাত্রীদের শিক্ষার অগ্রগতিতে সস্তÍষ্ট হয়ে কুমিল্লা জেলা পরিষদ অনুদানের মাধ্যমে একটি দ্বিতল ভবন নির্মাণ করে দেন।

নির্মিত ভবনটিতে স্কুলটির কার্যক্রম সাবলীলভাবে চলছে। এরই মধ্যে স্কুলটির সুষ্ঠু এবং নিষ্ঠার সাথে পরিচালিত হওয়ার কারনে মোট তিনবার জাতীয় এবং সমাজকল্যাণ অধিদপ্তর থেকে সফল সমাজকর্মী হিসাবে সভাপতি ব্যক্তিগত এবং প্রতিষ্ঠানগতভাবে পুরস্কার লাভ করেছেন।

বর্তমানে স্কুলটিতে মোট ৯৫জন ছাত্র-ছাত্রী ও চারজন শ্রেণি শিক্ষক, একজন স্বাস্থ্যগত শিক্ষক এবং সেবাকর্মী রয়েছেন। সমাজের স্বনামধন্য ব্যক্তি ও বেসরকারি সংস্থার আর্থিক সহযোগিতায় স্কুলটি কাজ গতিশীল আছে। স্কুলটি সামনে রয়েছে ওই এলাকার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন দানশীল ব্যক্তির মৌলিকদান করা একচিলতে মাঠ। যা স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীরা শারিরিক প্রশিক্ষণ ও খেলাধূলার জন্য ব্যবহার করে থাকে।

কিন্তু হঠাৎ করে স্কুলটির প্রতিষ্ঠাতা মরহুম মির্জা ফাতেমা আহমেদের দেবর আলহাজ্ব মো. ফারুক হোসেন নিজকে স্কুলটির প্রতিষ্ঠাতা দাবী করে স্কুলটির প্রতিষ্ঠাকাল ১৯১৪ সাল বলে উল্লেখ করে এবং ‘পরশ প্রতিবন্ধি স্কুল’টির প্রতিষ্ঠাতা মরহুম মির্জা ফাতেমা আহমেদকে স্কুলটির উদ্যোগক্তা উল্লেখ করে একটি প্যাড করেন।

এবং সেই প্যাডে স্থানীয় মরহুম আলী হোসেনের ছেলে মো. জামাল হোসেনকে স্কুল পরিচালনার সক্ষমতা প্রদান করে একটি চিঠি চলতি বছরের ৭ সেপ্টেম্বর ইস্যূ করে তিনি বিদেশ চলে যান। একই সাথে আগামী ৩০ নভেম্বর তিনি বিদেশ থেকে দেশে আসবেন বলে চিঠিতে উল্লেখ করেন। এই লিখিত চিঠিটি কপি করে এলাকায় বিতরণ করে দখলের চেষ্টা করেন জামাল হোসেন গং।

বিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতার স্বামী ও বর্তমান সভাপতি মো. জহির হোসেন আরো অভিযোগ করেন, গত ৭ সেপ্টেম্বর একটি কুচক্রী মহল স্কুলের সামনের খোলা মাঠটি দখল করার নির্মিত্তে স্থানীয় জামাল হোসেন নামে এক ব্যক্তি তার দলবল নিয়ে ছবি ও স্ব্ক্ষার সম্বলিত ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ ফারুক হোসেন প্রতিবন্ধী স্কুল’ নাম করে একটি মনগড়া চিঠির ফটোকপি এলাকাবাসীর মধ্যে বিতরণপূর্বক খোলা মাঠটি তথা স্কুলটি জবরদখল করার শুরু করেন।

তারা স্কুলের সাইনবোর্ডটিও খুলে ফেলেন। ওই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, ওই কথিত বীর মুক্তিযোদ্ধা ১৯১৪ সালে প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠা করেছেন। কিন্তু ১৯১৪ ছিলো বৃটিশশাসনামল। সেই সময় অত্র এলাকা ছিলো জলাভূমি ও ফসলী জমি।

এমনকি কুমিল্লা-বুড়িচং সড়কের কোনো অস্থিস্ত¡ও তখন ছিলো না। বর্তমানে ফারুক হোসেন প্রতিবন্ধী স্কুলের খোলা মাঠটি স্থানীয় জামাল হোসেনকে দিয়ে জবরদখলের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। এই অবস্থায় স্কুলটি রক্ষায় প্রশাসনসহ সকলের সহযোগীতা কামনা করেছেন মো.জহির হোসেন।

স্কুলটির জায়গায় মালিক মো. রুবায়েত হোসেন প্রশ্ন করে বলেন,আলহাজ্ব মো. ফারুক হোসেন নিজকে মুক্তিযোদ্ধা বলে দাবী করলেও তিনি আসলে মুক্তিযোদ্ধা না। তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, ১৯৪৬ সালের ৩০ জুন জন্ম দেওয়া ফারুক হোসেন কিভাবে ১৯১৪ সালে স্কুলটি প্রতিষ্ঠা করেন। আর এ সময়ে স্কুলটির উদ্যোক্তা হিসেবে দেখিয়েছে আমার মা কে।

যার জন্ম ১৯৬০ সালের পরে। স্কুলটি দখল করার চেষ্টা করার কারণে স্কুল প্রতিষ্ঠাতা ছেলে রুবায়েত হোসেন বাদী হয়ে গত ২ অক্টোবর কুমিল্লার অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট আদালতে স্কুল দখল করতে আসা জামাল হোসেনসহ অজ্ঞাত আরো ৭/৮জনের বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করেন মামলা নং-পি আর ১৩৪২/১৯। একই সাথে তিনি মো. ফারুক হোসেনকে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে অভিহিত করে গত ৩ অক্টোবর ২০১৯ মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রীকে একটি চিঠি লেখেন তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য।

এদিকে, এসব অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে অভিযুক্ত ফারুক হোসেনের মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন করা হলেও তার মুঠোফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়। পরে জানা যায় তিনি বর্তমানে বিদেশ রয়েছেন। আগামী ৩০ নভেম্বর দেশে ফিরবেন।

তবে এ ঘটনায় অপর অভিযুক্ত মো.জামাল হোসেন তার বিরুদ্ধে আসা এসব অভিযোগ অস্বীকার করে নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছেন। তিনি বলেন, আমি ওই স্কুলের সম্পত্তি দখল করতে যাইনি। আমার বিরুদ্ধে তাদের এসব অভিযোগ সম্পূর্ন মনগড়া ও মিথ্যা।

এ দিকে, সোমবার সকালে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা মো. ফারুক হোসেন ও তার সহযোগী জামাল হোসেনের বিরুদ্ধে স্কুল দখল করার চেষ্টার অভিযোগ এনে এক সংবাদ সম্মেলন করেছেন, ‘পরশ প্রতিবন্ধি স্কুল’ কমিটির সভাপতি মো.জহির হোসেন। এ সময় স্কুলের জমিদাতা রুবায়েত হোসেন ও স্কুলের শিক্ষক মাকসুদা ফেরদৌসীসহ অন্যান্যরা উপস্থিত ছিলেন।