কু-শিক্ষার বিষাক্ত কালো থাবার বলি নুসরাত!

প্রকাশিত: ৬:২২ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ১৩, ২০১৯ | আপডেট: ৬:২২:অপরাহ্ণ, এপ্রিল ১৩, ২০১৯

চেষ্টার সবটুকু দিয়েও অবশেষে বাঁচানো গেল না ফেনীর অগ্নিদগ্ধ মাদ্রাসা ছাত্রী নুসরাতকে। গায়ে কেরোসিন ঢেলে পুড়িয়ে দেয়ার ৫ দিন পর লাইফ সাপোর্টে থাকা নুসরাত, গত (১০ এপ্রিল) সাড়ে ৯টার দিকে দেশবাসীকে শোক সাগরে ভাসিয়ে চলে গেলেন অন্য লোকে। মিডিয়ার কল্যাণে দেশবাসী জানতে পারে গত ৬ই এপ্রিল সকাল ৯টার দিকে, আলিম পরীক্ষার্থী নুসরাত আরবি প্রথম পত্র পরীক্ষা দিতে সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসা কেন্দ্রে যান।

এরপর ‍অতি পরিকল্পিতভাবে তাকে পাশের ভবনের ছাদে ডেকে নেয়া হয়। ওই সময় বোরকা পরিহিত ৪-৫ জন হায়েনা; তার শরীরে অত্যন্ত নিষ্ঠুরতার সাথে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। এতে তার শরীরের ৮৫ শতাংশ পুড়ে যায়। এই বেদনা বিধুর ঘটনার মূল হোতা ঐ মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাওলানা সিরাজ উদ দৌলা। গত ২৭ মার্চ ঐ মাদরাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলা নুসরাতকে তার কক্ষে ডেকে নিয়ে শ্লীলতাহানির চেষ্টা করেন। এই ঘটনায় নুসরাতের মা শিরিনা আক্তার বাদী হয়ে অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে একটি মামলা করেন। মূলত শ্লীলতাহানির অভিযোগে দায়ের করা মামলা তুলে না নেয়ায় এ অমানবিক ঘটনা ঘটিয়েছে এই পশু প্রকৃতির মানব দল ।

কি দোষ নুসরাতের? নীতিহীন কাজের প্রতিবাদে সোচ্ছার হয়ে দাড়িয়ে বিচার চাওয়াটায় কি তার অপরাধ? কি অদ্ভুদ অসুস্থ সমাজের বাসিন্দা আমরা, ভাবলে বিস্ময়ে কেপে উঠে বুক। সর্বনাশা মিথ্যার কাছে অজানা কারণে আজ সত্যের নির্দয় পরাজয়, আর এ পরাজয় আমাদেরকে নিয়ে যাচ্ছে গহীন অতলে যেখান থেকে ফিরে আসার পথ হারিয়ে ফেলছি আমরা। দানব সিরাজ উদ দৌলাদের সৃষ্ট কালো মেঘে নুসরাতদের মত প্রতিবাদী কন্ঠ আর কত স্তব্দ হবে? অন্যায়ের প্রতিবাদে আর কত আত্তহুতি? এভাবে বিচারের দাবীতে প্রাণ হারাতে হলে কার কাছে বিচার চাইব আমরা? আর কত জীবন প্রদীপ নিভে গেলে আমরা ক্ষান্ত হবো? বিবেকের আদালতে জমে থাকা ‍হাজার প্রশ্নগুলি আমাদের কুরে কুরে খাচ্ছে প্রতিনিয়ত।

এ দেশে অন্যায়কারীরা দিনের আলোয় বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়ায় বীরদর্পে, আর ভূক্তভোগী স্বজনদের বয়ে বেড়াতে হয় আজীবনের দুঃসহ যন্ত্রণার বোঝা। নরপিচাশদের পৈশাচিক বিবেকে আজ এতটাই ঘুন ধরেছে যে অকালেই নুসরাতের প্রাণের আলো নিভিয়ে দিলো তারা। এভাবেই প্রাণ হারানোর খতিয়ান দিন দিন দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। ব্যাথা ভরা বিবেক আজ একটি প্রশ্ন খুজে বেড়াচ্ছে, কেন উষ্ন জীবন হার মানে শীতল মৃত্যুর কাছে।

জাতির সবচেয়ে মজবুত ভিত হচ্ছে শিক্ষা নামক মেরুদণ্ড, সেই মেরুদণ্ড বিনির্মাণকারী হচ্ছে একজন শিক্ষক। একজন শিক্ষককে হতে হয় আপাদমস্তক আদর্শবান। আস্থা, বিশ্বাস ও নিরাপদে ভরা নির্যাস দিয়ে যে বিল্ডিং রচিত হয় তার নাম শিক্ষক। শিক্ষকতা কেবল একটি মহৎ পেশাই নয়, শিক্ষার্থীদের বিশ্বাসে ভরা নিরাপদ আশ্রয় স্থল। সেই নিরাপদের স্থান যদি হয় ভয়ানক অনিরাপদ তাহলে জাতির জন্য এটা নিষ্ফলতা। একজন কালপ্রিট সিরাজ উদ দৌলা পুরো শিক্ষক সমাজের মুখে কলঙ্কের দাগ একে দিয়েছে। এরা সু-শিক্ষা গ্রহণে ব্যর্থ হয়ে কু-শিক্ষার বিষ নিজের গায়ে জড়িয়েছে। সেই বিষে অাক্রান্ত অাজ এ সমাজের নুসরাতরা। একজন শিক্ষক যখন বিকৃতরূপের হয় সেই সমাজ তখন ভঙ্গুরে পর্যবসিত হয়। বিকৃত মস্তিষ্কের সিরাজ উদ দৌলাদের কাছে অনিরাপদ বেষ্টিত ছাউনীর নীচে হতাশার চাদরে বন্দি আমাদের আগামী প্রজন্মের স্বপ্ন। একজন অধ্যক্ষের কু-শিক্ষার ভয়ংকার ছোবলে ফুলের মত জীবনকে আমাদের হারাতে হলো। এ শিক্ষার প্রতি ঘৃনা ভরে থুথু নিক্ষেপ আর ধৃক্কার জানাই। নুসরাতদেরকে বাঁচাতে হলে অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলাদের কু-শিক্ষার বিষদাঁত উপড়ে ফেলতে হবে চিরতরে আর তা না হলে বার বিষ দাত বসাবে তারা নুসরাতদের বুকে।

একজন সত্যিকারের প্রতিবাদী যোদ্ধা নূসরাত বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষকে অশ্রুসিক্ত করে চলে গেলেন। বীরের কখনো মৃত্যু হয় না। নুসরাত প্রতিবাদ করে নিজেকে রক্ষা করতে পারেনি এটা ঠিক, কিন্তু জীবন দিয়ে নুসরাত প্রতিবাদের যে সত্যতার দ্বীপ শিখা জ্বেলে গেলেন তা এই সময়ে বর্বর নির্যাতন নিপীড়নের প্রতিবাদের দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে আমাদরে হৃদয় পটে। নুসরাতরা চলে গিয়ে বেঁচে যায়, আর আমরা বার বার হেরে যাওয়ার যে কলঙ্কের কালিমা বাংলাদেশের বুকে লেপন করছি তার খেসারত আমাদের অক্ষরে অক্ষরে দিতে হবে। এখনি সময় নুসরাতের প্রতিবাদের পথ ধরে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে, জিম্মির সকল দেয়াল ভেঙ্গে রুখে দাড়াতে হবে ষোল কোটি মানুষের।

দেশের বিদ্যমান পরিস্থিতি আমাদের ভাবিয়ে তুলছে, বিবেক কেপে উঠছে বার বার জাতি হিসেবে কোথায় নেমে যাচ্ছি আমরা। আমাদের সমাজের মাথায় ভয়ংকর পচন ধরেছে, অচিরেই নিয়ন্ত্রণে না আনলে এ পচন গোটা জাতিকে গ্রাস করবে। সমাজের প্রত্যেকটি খুটি শক্তি হারিয়ে যেন নড়বড়ে না হয় দিন দিন, কোন ধাক্কায় যেন ধস নেমে না আসে সে দিকে গুরুত্বের সাথে নজর দিতে হবে। এই মামলার কোন গতিপথ যেন মুখ থুবড়ে না পড়ে, আরেকটি ঘটনার দেয়ালে চাপা পড়ে পিষ্ট না হয় । সব কিছুর উদ্ধে থেকে এই ধরনের নারকীয় ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে না পারলে একটি নিরাপদ বাংলাদেশ পাবো না আমরা।

লেখক:
চেয়ারম্যান
অক্সফোর্ড স্কুল এন্ড কলেজ ও
নিসু ফাউন্ডেশন, গাজীপুর।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। বাংলাদেশ টুডে এবং বাংলাদেশ টুডে-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)