কোটি টাকার নিচে ঋণ নেবেন না

টিবিটি টিবিটি

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: 4:35 PM, December 2, 2019 | আপডেট: 4:35:PM, December 2, 2019

প্রভাষ আমিন: গত অক্টোবরে রাজধানীর মিরপুরে বায়েজীদ নামের এক ব্যবসায়ী আত্মহত্যা করেন। তিনি একা মরেননি, আত্মহত্যার আগে স্ত্রী কোহিনুর বেগম অঞ্জনা এবং একমাত্র ছেলে ফারহানকেও হত্যা করেন। সেই নিউজের সঙ্গে পত্রিকায় তাদের পারিবারিক একটি ছবি ছাপা হয়েছে। ফারহানের ক্যামেরায় সেলফি। ব্যাকগ্রাউন্ড দেখে বোঝা যায় ছবিটি সোনারগাঁ থেকে তোলা। হয়তো পরিবারটি সুখী ছিল। আর দশটা মধ্যবিত্ত পরিবারের মতো তারাও অবসরে ঘুরে বেড়াতো। সেই ছবিটি এখনও আমার ফেসবুকে শেয়ার করে রেখেছি। কারণ ফারহানের বয়স একদম আমার ছেলে প্রসূনের সমান। প্রসূনের মতো সেও একটি কলেজে পড়তো। প্রসূনকে ঘিরে আমাদের কত স্বপ্ন-আশা। নিশ্চয়ই ফারহানকে ঘিরেও বায়েজীদ-অঞ্জনা দম্পতির অনেক স্বপ্ন ছিল, আশা ছিল। কিন্তু বায়েজীদ নিজ হাতে সেই স্বপ্নকে গলা টিপে হত্যা করেন। কী এমন হলো, বায়েজীদ তার পুরো পরিবার নিশ্চিহ্ন করে দিলেন? না, বায়েজীদ জীবনানন্দের মতো কবি ছিলেন না। ‘বধূ শুয়েছিলো পাশে, শিশুটিও ছিলো; প্রেম ছিলো, আশা ছিলো; জ্যোৎস্নায়—তবু সে দেখিল কোন ভূত?’ কবিতার মতো বায়েজীদ জ্যোৎস্নায় কোনও ভূত দেখেননি। নিউজটা পড়ে আমি তার বেদনাটা অন্তর দিয়ে উপলব্ধি করতে পেরেছিলাম। বাংলাদেশে মধ্যবিত্তদের সবচেয়ে বড় অহঙ্কার তার আত্মসম্মান। বায়েজীদ গার্মেন্টস ব্যবসা করতেন। ব্যবসার জন্য ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছিলেন। কিন্তু ব্যবসায় লস করে ঋণ শোধ করতে পারেননি। তাই ব্যাংক তার বিরুদ্ধে কাফরুল থানায় মামলা করেছিল। সেই অপমানটাই নিতে পারেননি বায়েজীদ। ফারহান আমার ছেলের বয়সী বলে, তার অমন অকালে ঝরে যাওয়াটা আমাকে কাঁদিয়েছে; বায়েজীদ আমার মতো মধ্যবিত্ত বলে, তার বেদনাটা আমি বুঝেছি। কিন্তু ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ফেরত না দিলে তো ব্যাংক মামলা করতেই পারে, এ নিয়ে মায়াকান্না করে তো লাভ নেই। বরং আমি আশাবাদী হই, ব্যাংক বুঝি খেলাপি ঋণ আদায়ে সিরিয়াস হয়েছে। কিন্তু পত্রিকার খবর দেখে মন খারাপ হয়ে যায়, ব্যাংক যদি সিরিয়াসই হবে, তাহলে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বাড়তে বাড়তে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতো না। বিভিন্ন সময়ে অবলোপন, খেলাপি ঋণ ঢেকে রাখার নানান কৌশল না থাকলে এই পরিমাণ আরও অনেক বেশি হবে। বায়েজীদের মতো মধ্যবিত্ত ঋণখেলাপের মামলার অপমানে সপরিবারে আত্মহত্যা করেন। তাহলে যারা ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা নিয়ে ফেরত দিচ্ছেন না; তাদের বিরুদ্ধে কয়টা মামলা হয়েছে?

আমি নিজেও একজন ঋণগ্রস্ত মানুষ। গত ২৫ বছর ধরে আমি টানা ঋণের বোঝা বয়ে চলেছি। ‘ঋণের বোঝা’ লিখলাম বটে, কিন্তু আসলে ঋণ আমার জন্য বোঝা নয়, আশীর্বাদ। আমি ঋণগ্রস্ত হয়েছি স্বেচ্ছায়। ঋণ আমার সংসারকে সচ্ছল করেছে, স্বাচ্ছন্দ্য এনে দিয়েছে। ব্যাংকের ঋণ দিয়েই আমি আমার সংসার সাজিয়েছি। প্রথমে ঋণ করে কিনেছি ফ্রিজ, তারপর টিভি, তারপর টিঅ্যান্ডটি ফোন, তারপর এয়ারকন্ডিশনার, এরপর গাড়ি, এরপর স্মার্টফোন। এভাবে একটা ঋণ শেষ হতে না হতেই আরেকটি ঋণের প্রস্তুতি নিয়েছি। ঋণ করে যে জিনিসগুলো কিনেছি, টাকা জমিয়ে কিনতে গেলে হয়তো ৩/৪ বছর বেশি সময় লাগতো। কিন্তু আমি সেই দেরিটা করতে চাইনি।

ঋণকে আমি মনে করি ব্যাংকের কাছে থাকা আমার টাকা। তাই আমার টাকা দিয়েই আমার সংসার সাজিয়েছি। ৪ বছর পরে না করে ৪ বছর আগে, এই যা। আমি নিয়মিত ঋণের কিস্তি শোধ করি। ফলে পরের ঋণ পেতে আমার কোনও সমস্যা হয়নি কখনও। আমার অভিজ্ঞতা হলো ব্যাংকগুলো ঋণ দেওয়া এবং আদায় করার ব্যাপারে খুবই দক্ষ। দেওয়ার আগে তারা চৌদ্দগোষ্ঠীর খোঁজখবর নেয়। অফিসে, এমনকি বাসায় হানা দেয়। শক্ত গ্যারান্টার চায়। আদায়ের ব্যাপারে তাদের দক্ষতা আরও বেশি। একদিন তারিখ পেরুলেই তারা ফোন করে তাগাদা দেয়। শুনেছি ঋণ আদায়ের জন্য ব্যাংক মাস্তান ভাড়া করে, হিজড়া ভাড়া করে। সেই মাস্তান বা হিজড়ারা বাড়ি পর্যন্ত হানা দেয়, সামাজিকভাবে হেয় করে। এছাড়া ঋণ আদায়ে মামলা তো আছেই। মান-সম্মানের ভয়ে লোকজন দ্রুত ঋণ শোধ করে দেয়। নিজের ঋণের কিস্তির জন্য না হলেও প্রায়ই ব্যাংকের ফোন রিসিভ করতে হয় আমাকে। অনেকের ঋণের গ্যারান্টার আমি। যাদের হয়ে গ্যারান্টি দেই, তারা কিস্তি শোধ না করলেও ব্যাংক আমাকে ফোন করে।

এ পর্যন্ত পড়ে আপনাদের মনে হতে পারে, বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত বুঝি খুবই সুরক্ষিত। আমিও তাই ভেবেছি। ঋণ দেওয়া এবং আদায় করার ক্ষেত্রে প্রচলিত যে পদ্ধতির কথা এতক্ষণ বললাম, এটা যদি সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতো, তাহলে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত হওয়ার কথা সবচেয়ে লাভজনক। কিন্তু তাহলে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ কারা নিলো? তাদের বাসায় কেন হিজড়ারা হানা দেয় না? আমি যদি ২৫ বছর ধরে একটার পর একটা ঋণ নিয়ে শোধ করতে পারি, তাহলে বাকিরা কেন করছেন না? এই ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা যারা মেরে দিলো, তাদের জন্য কি ব্যাংকের তাগাদা, বাংলাদেশ ব্যাংকের সিআইবি রিপোর্ট বা সামাজিক মান-মর্যাদার বিষয়গুলো প্রযোজ্য নয় কেন? নাকি এসব কঠোর নিয়ম কেবল আমাদের মতো আমজনতার জন্যই? খেলাপি ঋণের গল্প শুনে আমার খালি একটা কথাই মনে হচ্ছে, বজ্র আঁটুনি ফস্কা গেরো। আমার কেন জানি সন্দেহ হচ্ছে, বজ্র আঁটুনিটা আমাদের মতো আমজনতা বা বায়েজীদদের মতো ছোট ব্যবসায়ীদের জন্যই; বড় বড় ব্যবসায়ীদের জন্য গেরোটা সবসময় ফস্কাই থাকে।

একটা বিষয় পরিষ্কার, বড় বড় ঋণখেলাপি বড় বড় ব্যবসা করে, দামি গাড়ি হাঁকায়, বিলাসবহুল বাড়িতে থাকে; সব আমার-আপনার পয়সায়। ব্যাংকের মূল পুঁজির মাত্র ১০ ভাগ থাকে উদ্যোক্তাদের। বাকি ৯০ ভাগই সংগ্রহ করা হয় সাধারণ আমানতকারীদের কাছ থেকে। আর সাধারণ আমানতকারীদের কাছ থেকে নেওয়া অর্থ ব্যাংকাররা তুলে দেয় লুটেরাদের হাতে এবং সেই টাকা আর ফিরে আসে না। পরে রাষ্ট্র জনগণের করের টাকা থেকে ব্যাংকগুলোর সেই ঘাটতি পুষিয়ে দেয়। বলা যায়, কোনও কোনও ব্যাংক চলছে বেলুনের মতো ফাঁপা প্রবৃদ্ধি দিয়ে। কেউ একজন একটা ছোট্ট হুল ফোটালেই ধসে পড়তে পারে অনেক ব্যাংক। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, অনেক ব্যাংক করাই হয়েছে লুটপাটের জন্য। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো দেখে মনে হয়, সরকার কা মাল দরিয়ামে ঢাল। এক হলমার্ক গ্রুপ খালি করে দিয়েছে সবচেয়ে বড় রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক সোনালী। বেসিক ব্যাংকের সাগরচুরি নিয়ে অনেক কথা হয়েছে। কিন্তু ব্যাংকটির সাবেক চেয়ারম্যান বাচ্চুকে ধরা হয়নি। চালু হতে না হতেই খালি হয়ে গেছে ফার্মার্স ব্যাংক। নাম বদলে যেটা এখন পদ্মা ব্যাংক। কিন্তু যারা খালি করলো, তাদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে? নিচের লিক বন্ধ না করে ওপরে যতই পানি ঢালেন, ট্যাংক কিন্তু ভরবে না। বারবার খালি হয়ে যাবে। বাংলাদেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা যেন অনেকটা তাই।

খেলাপি ঋণের টাকার অঙ্কটা আরেকবার খেয়াল করে দেখুন—১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা! এই টাকা নিশ্চয়ই হঠাৎ করে রাতারাতি খেলাপি হয়নি। তাহলে তারা যখন দিনের পর দিন ব্যাংকের টাকা দিচ্ছিল না, তখন কোথায় ছিল বাংলাদেশ ব্যাংকের সিআইবি, কোথায় ছিল ব্যাংকের রিকভারি গ্রুপ, কোথায় ছিল আইন; তাদের এতদিন ধরা হয়নি কেন? ব্যাংকের টাকা মানে জনগণের টাকা মেরে দিয়ে সবার চোখের সামনে তারা দামি গাড়িতে ঘুরে বেড়াচ্ছে কীভাবে? ব্যবস্থা নেওয়া তো দূরের কথা, বরং ঋণখেলাপিদের সরকার নানা সুবিধা দেয়। ভালো ঋণগ্রহীতাদের নিয়মিত সুদ দিতে হয়। আর খেলাপিদের সুদ মওকুফ হয়। তারা মাত্র ২ শতাংশ টাকা দিয়ে ঋণ পুনঃতফসিল করতে পারেন। আছে একটা নির্দিষ্ট সময় পর একেবারে অবলোপন করে দেওয়ার নজিরও। অবলোপন করে দেওয়া মানে ব্যাংকও বাঁচলো, সেই চোরও বাঁচলো। দুয়ে মিলে মেরে দিলো জনগণের টাকা। কিন্তু এই চোরগুলো তো পালিয়ে থাকছে না, গোপনও নয়। কিছু পারুক আর না পারুক, ব্যাংকগুলো তো ঋণখেলাপিদের নামের তালিকা ছবিসহ পত্রিকায় ছাপিয়ে দিতে পারে। কিন্তু দেবে না। কারণ চোরে চোরে মাসতু তো ভাই। তাছাড়া ঋণ দেওয়ার সময় তো, ঋণের সমান দামের সম্পত্তি মর্টগেজ রাখার কথা। ঋণ ফেরত না দিলে সেই সম্পত্তি বিক্রি করে আদায় করা হচ্ছে না কেন? তার মানে ঘাপলাটা হয় ঋণ দেওয়ার সময়ই।

তবে এটা ঠিক, যে কেউ যেকোনও সময় কিন্তু ঋণখেলাপি হতেই পারেন। যেকোনও উদ্যোক্তা ব্যাংক থেকে টাকা নিয়েই ব্যবসা করবে। ব্যবসায় লাভ হলে সেই টাকা কিস্তিতে ব্যাংককে ফেরত দেবে। কিন্তু কখনও কখনও ব্যবসায় লসও হতে পারে। লস হলেই যদি ব্যাংক সেই ব্যবসায়ীর পেছনে লাগে, তাহলে তিনি আর উঠে দাঁড়াতে পারবেন না। তার ব্যবসাও আর কখনও লাভ হবে না। তাতে ব্যাংক মামলা করতে পারবে, কিন্তু কখনও টাকা পাবে না। ভালো ব্যাংক একজন ভালো গ্রাহকের বিপদে পাশে দাঁড়াবে। তাকে আবার ঘুরে দাঁড়াতে সাহায্য করবে। যাতে সেই ব্যবসায়ীও টিকে যাবে, ব্যাংকও টাকা ফিরে পাবে।

কিন্তু বাংলাদেশের ঋণখেলাপের সংস্কৃতিটা টাকা মেরে দেওয়ার ধান্দা থেকে আসা। ঋণখেলাপি আসলে একটি চক্র। যাতে শুধু যে ঋণগ্রহীতা আছেন তাই নয়, ঋণদাতা ব্যাংকাররাও আছেন। ব্যাংকাররা দেওয়ার সময়ই জানেন কোন ঋণটা আদায় হবে, কোনটা হবে না। এখন বাংলাদেশে বড়লোক হওয়ার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো ব্যাংকের টাকা মেরে দেওয়া। কোনও ব্যাংকের চেয়ারম্যান বা পরিচালক বা ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সঙ্গে খাতির করুন। একটা বায়বীয় প্রজেক্ট বানান। তারপর একটা বড়সড় লোন নেন। ব্যস সেই টাকায় বাড়ি-গাড়ি কিনে আয়েশ করে চলুন। কেউ আপনার চুলের মাথাও ছুঁতে পারবে না। সমাজে আপনি সম্মান পাবেন, নইলে সম্মান কিনে নিতে পারবেন। আর বেশি ঝামেলা হলে মালয়েশিয়াকে সেকেন্ড হোম বানিয়ে নিন বা ২ শতাংশ টাকা দিয়ে ঋণ রেগুলার করে নিন। তারপর কোনও এক ফাঁকে মওকুফ বা অবলোপন করিয়ে নেবেন। ব্যস। কেউ আপনার নাগাল পাবে না।

তবে শর্ত হলো আমাদের মতো ১০-১৫ লাখ টাকার পারসোনাল লোন বা বায়েজীদদের মতো অল্প টাকা ঋণ নেবেন না। মোটা অঙ্কের ঋণ নেবেন, যাতে সেই ঋণের টাকাই আপনাকে ওপরতলায় নিয়ে যায়, যাতে ব্যাংকাররা আর আপনার নাগাল না পায়। ব্যাংকের টাকায় আপনি ক্ষমতা কিনে নিন, যাতে ব্যাংক আপনাকে ভয় পায়। এতটা ভয়, যাতে আপনার বাসায় হিজড়া বা মাস্তান পাঠানোর কথা কল্পনাও করতে না পারে, ফোন করতে না পারে, মামলা করার কথা চিন্তাও না করে।

অর্থমন্ত্রী যতই বলুন, এভাবে চলতে থাকলে খেলাপি ঋণ আরও বাড়বে, বাড়তেই থাকবে। ঋণখেলাপিদের রমরমা দেখে ভালো ঋণগ্রহীতারাও ঋণ শোধ না করতে উৎসাহী হবেন। কোনও ব্যবসায়ী যদি সত্যি বিপদে পড়েন, তাহলে তার পাশে দাঁড়াতে হবে। তবে যারা ইচ্ছাকৃত খেলাপি, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। কোনও ছাড় দেওয়া যাবে না। তাহলেই শুধু সবার চোখের সামনে জনগণের টাকা মেরে দেওয়ার এই প্রবণতা বন্ধ হবে।

লেখক: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ