ক্যাম্পে আসার ১৫ দিনের মধ্যে ভাই-বোন মারা যায় : শ্রী গনেশ চন্দ্র বর্মন

শরণার্থীর খোঁজে : পর্ব ১৪

শাহজাদা এমরান শাহজাদা এমরান

কুমিল্লা প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ৪:৪৪ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ১৭, ২০২০ | আপডেট: ৪:৪৪:অপরাহ্ণ, নভেম্বর ১৭, ২০২০

শাহাজাদা এমরান,কুড়িগ্রাম থেকে ফিরে, আমাদের এলাকাটি রাজাকার অধ্যুসিত ছিল।যুদ্ধের শুরুতেই তারা নানা অপকর্মে জড়িয়ে পড়ে।কি হিন্দু কি মুসলমান তা তাদের কাছে কোন বিষয় ছিল না। তাদের কাছে একটাই বিষয় সেটা হলো মানুষের সম্পদ ছিনিয়ে নেওয়া। এর বিনিময়ে পাকিস্তান সেনাদের কাছে যুবতী মেয়ে পাচার আর মানুষের গরু ছাগল ও মুরগী ধরে নিয়ে তাদের উপহার হিসেবে দেওয়া। রাজাকারদের অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে ভারতে চলে যাই। সেখানে শরণার্থী ক্যাম্পে যোগ দেওয়ার ১৫ দিনের মধ্যে আমার এক ভাই এক বোন ডায়রিয়ায় মারা যায়। এ কথা বলেই চোখ মুছতে থাকে শ্রী গনেশ চন্দ্র মন্ডল। গত ২ নভেম্বর সোমবার এই প্রতিবেদকের সাথে কুড়িগ্রাম জেলার নাগেস্বর উপজেলার এইড কুমিল্লা অফিসে একান্ত সাক্ষাতকারে তিনি এ কথা বলেন।

এ সময় সাথে ছিলেন এইড কুমিল্লার কুড়িগ্রাম জেলার প্রজেক্ট ম্যানাজার মো.দেলোয়ার হোসেন। শুকু শ্রী গনেশ চন্দ্র বর্মন। বাবা দূর্গা প্রসাদ বর্মন এবং মা শুকু বালা।চার ভাই ও দুই বোনের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়। ১৯৬২ সালে তিনি কুড়িগ্রাম জেলার ফুলবাড়ি উপজেলার বাদ্দামোড় ইউনিয়নের বোয়ালভীর গ্রামে জন্ম গ্রহন করেন।

শরণার্থী জীবন সম্পর্কে জানতে চাইলে শ্রী গনেশ চন্দ্র বর্মন বলেন,দেশে যখন যুদ্ধ শুরু হয় তখন আমি সপ্তম শ্রেণীতে পড়ি। আমাদের এলাকার হাবিব মাস্টার,জব্বার মোল্লা,হাফেজ মোল্লা,খলিল মোল্লা ও জুলু মোল্লা ছিল ডাকাত। তারা এলাকায় বড় বড় ডাকাতি করত। এই ডাকাতি করায় ছিল তাদের পেশা। কিন্তু দেশে যখন পাকিস্তানীদের সাথে যুদ্ধ শুরু হল তখন তারা হয়ে গেল সাচ্চা রাজাকার। তাদের ভারতের হাত থেকে দেশকে বাঁচানোর জন্য হঠাৎ করে পাকিস্তান প্রেমিক হয়ে গেল। অথচ এর আগে কখনো দেখিনি তারা মুসলিমলীগ করত। দিনের পর দিন তাদের অত্যাচার নির্যাতন বেড়ে গেল। পড়ে জানতে পারি আমাদের এলাকার শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান এস কে দেওয়ানের অনুসারি হিসেবে তারা রাজাকারী খাতায় নাম লিখিয়েছে। এপ্রিলের দ্বিতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত আমাদের গ্রামে যুদ্ধের খুব একটা প্রভাব পড়েনি। এলাকায় আতংক থাকলেও সব কিছুই স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু ২০ এপ্রিলের পর গ্রামে গ্রামে অশান্তি শুরু হয়। পাশের গ্রামের এক বাড়িতে এক রাতে কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দেবার অপরাধে ঐ বাড়ির দুটি ঘর কেরোসিন তেল দিয়ে সম্পূর্ন ভস্মিভূত করে ফেলে। এই অপরেশন দিয়েই আমাদের অত্যাচার শুরু হয়। মে মাসের ৩ বা ৪ তারিখ হবে। তবে সেদিন বুধবার ছিল। সকালেই গ্রামে রটে গেল পাকিস্তান বাহিনী ধরলা নদী পাড় হয়ে গ্রামের দিকে আসতেছে। আর একই সাথে রাজাকাররা শুরু করল লুটপাট আর অগ্নিসংযোগ।

আমাদের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র আগেই কিছুটা গোছানো ছিল। কারণ যেহেতু দেশের পরিস্থিতি ভাল না তাই প্রস্তুতিটা মোটামোটি ছিল। তাই এই খবর পেয়েই আমরা দ্রæত রেডি হয়ে ঘরের দড়জাও মা আটকায়নি। এভাবেই ভারতের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেই। আমাদের বাড়ি থেকে ভারত সীমান্ত খুবই কাছে। আমরা গাদার হাট হয়ে সীমান্ত পাড় হয়ে পশ্চিম বঙ্গের বামন হাট যাই। বামন হাট পৌঁছতে পৌঁছতে রাত ১০ টা বেজে যায়। ঐখানে যাওয়ার পর আমাদের অবস্থা দেখে এক মুসলমান মুরুব্বী তার বাড়িতে আশ্রয় দিলেন। রাতে আমাদের খাবারের ব্যবস্থাও করলেন। সকালে ঐ মুসলিম চাচা রেল লাইনের জায়গায়টি দেখিয়ে দিলেন। তোমরা ঐখানে থাকতে পার। রেললাইনের দুই পাশে অসংখ্য মানুষের বসবাস। কারণ, বামনহাট শরণার্থী শিবিরে তীল ধরনের কোন জায়গা নেই।তাই আমরা যারা রেললাইনে তাবু খাটিয়ে আশ্রয় নিলাম আমাদের সবাইকেই রেশমকার্ড দেওয়া হল। রেললাইনের পাশে কি থাকা যায়। চতুর্দিকে অপরিস্কার,নোংরা স্যাত স্যাত অবস্থা। নেই বাথরুম ও গোসলের ব্যবস্থা। স্থানীয়রা অস্থায়ী ভাবে কিছু টয়লেট করে দিয়েঠে রাস্তার উভয় পাশে। কি যে ভয়াভহ অবস্থায় ছিলাম আমরা তা কিভাবে বুঝাই। বাবা ভাল গান গাইতেন। রিলিফ যা দিত তা দিয়ে আমাদের তিন বেলা হতো না। তাই বাবা রেলের মধ্যে গান গাইয়ে গাইয়ে টাকা রোজগার করতেন। এই রেললাইনের বস্তিতে আসার ১৫ দিনের মাথায় কলেরা হয়ে মারা যায় আমার সাত বছরের ছোট ভাই নরশেন আর ১১ বছরের বোন স্বরসতী। মাত্র অল্প দিনের ব্যবধানে ছোট দুই ছেলে মেয়েকে হারিয়ে বাবা মা একেবারে বাকরুদ্ধ হয়ে যান। এতে তারা নিজেরাও অসুস্থ্য হয়ে যান। সেই সময়ে আমাদের উপর চলে আরো অন্য রকম মানুসিক চাপ।বাবা গান গাইতে যেত না বলে খাবার সংকটও দেখা দিল। অর্ধহারে অনাহারে দিন যেতে লাগল। বাবার সবচেয়ে কষ্ট হলো, ভগবান আমার ছেলে মেয়ে দুটিকে কি মৃত দিল। না পারলাম দাহ করতে না পারলাম মাটিতে পুতে ফেলতে। কারণ, আশে পাশে মাটিতে পুতে ফেলার জায়গা না থাকাতে বাশঝাড়ের ভিতর পুরানো কাপড় দিয়ে পেচিয়ে আমার দুই ভাই বোনের মৃত দেহ আমরা ফেলে আসি। অবশ্য এই কাজটি আরো অনেকেই করেছে।

বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে এই কথাটি আপনি কিভাবে কখন জানলেন জানতে চাইলে শরণার্থী শ্রী গনেশ চন্দ্র বর্মন বলেন, রেলষ্টেশন সংলগ্ন থাকার কারণে সব খবরই আমরা সাথে সাথে পেয়ে যেতাম। ১৬ ডিসেম্বর দুপুরে। তষনও পাকিস্তান আত্মসমর্পন করেনি। কিন্তু সারা রেলষ্টেশন ছড়িয়ে পড়ল বাংলাদেশ স্বাধীন হয়ে গেছে। পাকিস্তানীরা পরাজয় মেনে নিয়েছে। এই খবর শোনার সাাথে সাথে আমরা পায়ে হেটেই বাড়িতে রওয়ানা দেই। বামন হাটের রেল লাইন থেকে আমাদের বাংলাদেশের বাড়ির দূরুত্ব প্রায় ১২ থেকে ১৩ কিলোমিটার হবে। যেহেতু আমরা শরণার্থী শিবিরে ছিলাম না তাই আমাদের কোন বাধ্যবাধকতাও ছিল না। আমরা চলে আসি।

বাড়িতে এসে কি দেখলেন জানতে চাইলে শ্রী গনেশ চন্দ্র বর্মন বলেন, অনেকের বাড়ি ঘর পুড়িয়ে ফেলেছে , লুট করেছে কিন্তু আমাদের ঘর যেভাবে ছিল সেভাই আছে তবে মালামাল গুলো নিয়ে গেছে। আর ঘরের ভিতর আগাছা হয়ে ভরে রয়েছে। তাই ঘর পরিস্কার করে সেই দিন রাতেই আমরা নিজের ঘরে উঠি।

শ্রী গনেশ চন্দ্র বর্মনের দাবী, মুক্তিযুদ্ধের কারণেই ভারতের রেললাইনের পাশে বিনা চিকিৎসায় আমার দুই ভাইবোন মারা গেছে। সুতরাং আমাদের শহীদ পরিবার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে সরকার যেন প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করে।