গর্ভকালীন সময়ে স্বাস্থ্য পরীক্ষায় এগিয়ে আসছে গ্রামাঞ্চলের সক্ষম দম্পতিরা

প্রকাশিত: ৯:২৪ অপরাহ্ণ, জুলাই ১০, ২০২০ | আপডেট: ৯:২৪:অপরাহ্ণ, জুলাই ১০, ২০২০

সাইফুল ইসলাম, বাউফল (পটুয়াখালী) প্রতিনিধি: গর্ভাবস্থায় একজন নারীর জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়। গর্ভকালীন সেবার সাক্ষাত সূচী অনুযায়ী মা ও গর্ভস্থ শিশুর অবস্থা পর্যবেক্ষণ করার জন্য গর্ভকালীন অবস্থায় বেশ কয়েক বার স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ভিজিট আসতে হবে। গর্ভের ৫-৭ মাস সময়ের নিকটবর্তী স্বাস্থ্যকেন্দ্র অন্তত ৪ বার প্রসবপূর্ণ পরীক্ষা করাতে হবে। ১ম ভিজিট (১৬ সপ্তাহ) ৪ মাস। ২য় ভিজিট (২৪-২৮ সপ্তাহ) ৬-৭ মাস। ৩য় ভিজিট (৩২সপ্তাহ) ৮ মাস। ৪র্থ ভিজিট (৩৬ সপ্তাহ) অর্থাৎ ৯ মাস। যার প্রথমটি চতুর্থ মাসের পূর্বেই হতে হবে।

এ সময়ে গর্ভবতী মায়ের শারীরিক অবস্থা সর্ম্পকে মা ও তার পরিবারকে কাউন্সেলিং করা পরামর্শ দেয়া। সন্তানের বৃদ্ধির অবস্থা জানার জন্য মায়ের ওজন নেয়া এবং জরায়ুর উচ্চতা, বøাড প্রেসার মাপাসহ হিমোগøাবিন পরিমাপ করা। কোন জটিলতা থাকলে তার জন্য সেবা দেয়া। প্রসাবে সুগার এবং এ্যালবুমিন আছে কিনা পরীক্ষা করা। তাই গ্রামাঞ্চলে গর্ভকালীন সময়ে স্বাস্থ্য পরীক্ষা এগিয়ে আসছে সক্ষম দম্পতিরা।

পরিবার পরিকল্পনা মিডিয়া ফেলোশিপ-২০২০ আওতায় গ্রামাঞ্চলে নারীর স্বাস্থ্য ও প্রজনন অধিকার প্রতিবেদনের সরেজমিন তথ্যসংগ্রহে করতে গিয়ে দেখা গেছে, বাউফল উপজেলার নাজিরপুর স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র। আধা কিলোমিটার দূরত্ব ধান্দী থেকে স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য এসেছেন গর্ভবতী মা রুনিয়া বেগম। সাথে রয়েছেন ছোট বোন নাজমা। দ্বিতীয় সন্তান নেয়ার গর্ভকালীন এ সময়। গর্ভের বয়স প্রায় ৭ মাস। তৃতীয় ভিজিট সময় উপস্থিত হয়েছেন। আরো ২ বার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করেছেন স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে। উপসহকারি মেডিকেল অফিসার মহিউদ্দিন স্বাস্থ্য পরীক্ষা করলেন গর্ভবতী মা রুনিয়কে। ওজন, চোখ, প্রসার এবং হাত পায়ের অবস্থা দেখলেন। কিছুর প্রশ্নের উত্তর নিয়ে খাবার প্রতি জোর দিতে বলেছেন।

এ সময় রুনিয়াসহ উপস্থিত আরো কয়েকজন রোগীকে জানালেন, গর্ভকালীন জটিলতা বিপজ্জনক ও জীবনের জন্য ঝুকিপূর্ন একজন মা যতই সুস্থ সবল থাকুক না কেন। সন্তান ধারনের ফলে যে কোন সময় গর্ভবর্তী মায়ের যে কোন সময়ে যে কোন জটিলতা দেখা দিতে পারে। গর্ভাবস্থায় প্রসবকালীন সময়ে এবং প্রসব পরবর্তী ৬ সপ্তাহ বা ৪২ দিন সময়ের মধ্যে এ ধরনের জটিলতা দেখা দিতে পারে। গর্ভকালীন বিপদ চিহ্নিত সমূহ হচ্ছে, মাথা ব্যাথা ও চোঁখে ঝাপসা দেখা, গর্ভাবস্থায় রক্ত¯্রাব। প্রসবের সময় বা প্রসবের পরে খুব বেশি রক্ত¯্রাব গর্ভফুল না পড়া। ভীষন জ্বর। গর্ভাবস্থায় বা প্রসবের পর তিন দিনের বেশি জ্বর হলে বা দুর্গন্ধযুক্ত ¯্রাব হলে। বিলম্বিত প্রসব প্রসব ব্যথা ১২ ঘন্টার বেশি হলে থাকা এবং প্রসবের সময় বাচ্চার মাথা ছাড়া অন্য কোন অঙ্গ আগে বের হলে। খিচুনি গর্ভাবস্থায় প্রসবের সময় বা প্রসবের পর খিচুনি।

সমগ্র গর্ভকালীন সময়ে কমপক্ষে ৪ বার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে হবে। ১ম ভিজিট (১৬ সপ্তাহ) ৪ মাস। এ সময় রক্তস্বল্পতা নিরুপণ করা ও চিকিৎসা করা। সিফিলিস ও অন্যান্য যৌনবাহিতরোগ আছে কিনা পরীক্ষা করা। গর্ভকালীন বিপজ্জনক লক্ষণসমূহ ও জরুরী প্রসূতি সেবা ব্যাখ্যা করা। গর্ভকালীন স্বাস্থ্য শিক্ষা সর্ম্পকিত পরামর্শ প্রদান করা। ২য় ভিজিট (২৪-২৮ সপ্তাহ) ৬-৭ মাস। এ সময়ে ১ম ডোজ টিটি টিকা নেয়া। গর্ভস্থ শিশু সঠিকমত বাড়ছে কিনা নিরুপন করা। ৩য় ভিজিট (৩২ সপ্তাহ) ৮ মাস সময় দেখা হবে প্রি একলাম্পশিয়া, একাধিক গর্ভস্থ সন্তান রক্তস্বল্পতা আছে কিনা পরীক্ষা করা বিশেষ ক্ষেত্রে প্রসব পরীকল্পনা করা। ৪র্থ ভিজিট (৩৬ সপ্তাহ) অর্থাৎ ৯ মাস সময়ে গর্ভস্থ শিশুর অবস্থা নির্নয় করা। মায়ের শারীরিক অবস্থার উন্নয়ন সাধন এবং সেই অনুযায়ী প্রসব পরিকল্পনা করা।

গর্ভবর্তী মায়ের স্বাস্থ্য পরীক্ষা নিয়ে জানা যায়, এফডাবিøউ এ আকলিমা গর্ভবতী মায়ের রেজিষ্টার তথ্যানুসারে মোট ২১ জন গর্ভবতী মা রয়েছে। উপজেলার যৌতা গ্রামে কমিউনিটি ক্লিনিক মোট ১৭ জন মা স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য স্বাস্থ্যকেন্দ্রে উপস্থিত হয়েছেন। এর মধ্যে প্রথম ভিজিটের ৫ জন, ২য় ভিজিরে ৭ জন এবং তৃতীয় ভিজিটের ৪ জন এবং ৪র্থ ভিজিটের ১ জন। এবং ৫ জন্য সাটেলাইট কেন্দ্র মাধ্যমে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করেছে।

এফডাব্লিউএ নাফিসা কাওছার বলেন,সন্তানের বৃদ্ধির অবস্থা জানার জন্য মায়ের ওজন নেয়া এবং জরায়ুর উচ্চতা মাপা। বøাড প্রেসার মাপা। হিমোগøাবিন পরিমাপ করা। কোন জটিলতা থাকলে তার জন্য সেবা দেয়া। প্রসাবে সুগার এবং এ্যালবুমিন আছে কিনা পরীক্ষা করা। একজন মা যতই সুস্থ সবল থাকুক না কেন, সন্তান ধারনের ফলে যে কোন সময় গর্ভবতী মায়ের যে কোন সময়ে যে কোন জটিলতা দেখা দিতে পারে। গর্ভাবস্থায় প্রসবকালীন সময়ে এবং প্রসব পরবর্তী ৬ সপ্তাহ বা ৪২ দিন সময়ের মধ্যে এ ধরনের জটিলতা দেখা দিতে পারে। এ জটিলতা অনেক সময় বিপজ্জনক বা জীবনের জন্য ঝুকিপূর্ণ। গর্ভকালীন বিপদ চিহ্ন সর্ম্পকে সেবা প্রদানকারী গর্ভবর্তী মা এবং গর্ভবতী মহিলারা স্বামী পরিবারের সদস্যদের জানা থাকা খুবই প্রয়োজন।

গর্ভীবতী মায়ের স্বাস্থ্য সচেতনতা জানতে গিয়ে বিলবিলাস গ্রামে ২৩ জনের সাথে কথা হয়। ১৯ জন বিপজ্জনক বিষয়টি জানে। ১ জন আল্লাহ ওপর সবুর থাকার কথা বলেন। ৩ জন কোন কথা মন্তব্য করেনি। ২৩ জনের মধ্যে ১৩ জন নারী এবং ১০ জন পুরুষ ছিল। বিষয়টি সাথে সরাসরি নারী সম্পৃক্ত হলেও পুরুষ দম্পতিদের মতামত নেওয়া হয়েছে। শুশুর-শাশুরীসহ পরিবারের অন্যান্য সদস্য এ বিপজ্জনক মুহর্তটি কতটুকু গুরুত্ব সহকারে দেখেন তা জানতে গিয়ে ২৩ জনের মধ্যে ৫জন শুশুর-শাশুরী স্তরে রয়েছে। তারা মুহুর্তটি খবুই ঝুকিপূর্ণ সময়। এ সময়কে পরিবারের সবাই সহযোগিতা চিকিৎসা করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন। একজন গর্ভকালীন সময় বেশি উদ্দিগ্ন থাকেন পরিবারের পুরুষ সমস্য মধ্যে স্বামী এবং দেবর ও মহিলা সদস্যদের শাশুরীকে।

কালাইয়া স্বাস্থ্যকেন্দ্রে উপসহকারি মেডিকেল অফিসার নাছিমা বেগম বলেন, জরুরী প্রসূতি সেবা হলো, জরুরী ভিত্তিতে জীবন রক্ষাকারী চিকিৎসা সেবা যার মাধ্যমে প্রসবজনিত জটিলতার কারনে মা শিশুর মৃত্যু রোধ করা যায়। গর্ভজনিত জটিলতার সময় অনেক গর্ভবতী মহিলার চিকিৎসা সেবা না পাওয়ার কারনে মারা যায়। সাধারনত তিন ধরন বিলম্ব গর্ভজনিত জটিলতার আক্রান্ত মহিলাদের সময়মত জরুরী প্রসূতি সেবা পেতে বাধার সৃষ্টি করে। গর্ভকালীন সময়ে স্বাস্থ্য পরীক্ষার বিষয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন হচ্ছে, প্রতিটি ভিজিটে গর্ভস্থ শিশু বৃদ্ধি বোঝার জন্য জরায়ুর উচ্চতা মাপতে হবে এবং আগের বারের উচ্চতার সঙ্গে তুলনা করতে হবে।