গাছের সব ডাব নিয়ে যায় পাকিস্তান আর্মি : প্রফুল্ল কুমার রায় ভক্ত

শরণার্থীর খোজে: পর্ব-১৬

শাহজাদা এমরান শাহজাদা এমরান

কুমিল্লা প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ৯:০৪ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ২১, ২০২০ | আপডেট: ৯:০৪:অপরাহ্ণ, নভেম্বর ২১, ২০২০

শাহাজাদা এমরান, লালমনিরহাট থেকে ফিরে। আমাদের এলাকাটি বিহারী অধ্যুষিত এলাকা ছিল। রিফিউজিদের সংখ্যাও কম ছিল না। দেশে স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হলে বিহারী আর রিফিউজিরা এক হয়ে পাকিস্তান আর্মির চামচামি করা শুরু করে। এলাকা এলাকা ঘুরে ঘুরে সেনাবাহিনীর ভয় দেখিয়ে লুটপাট করত। কেউ বাঁধা দিলে শুরু হতো নির্যাতন। নির্যাতন এক দিকে যেমন নিজেরা করত আবার অপর দিকে সেনাবাহিনীকে লেলিয়ে দিত এই ঘরে মুক্তি আছে এই কথা বলে। পরে চলত রিফিউজি, বিহারী ও পাকিস্তান আর্মির যৌথ নির্যাতন।

একদিন পাকিস্তান সেনা বাহিনী আমাদের বাড়ির উপর দিয়ে যাওয়ার সময় উপরের দিকে তাকিয়ে দেখল বড় বড় ডাব আছে। ব্যস। সাথে থাকা বিহারীদের বলল, ডাব পাড়। গাছের সব ডাব তারা পেড়ে নিয়ে গেল। যাওয়ার সময় আমাদের ঘরের ভিতর তল্লাসী করে গেল কেউ আছে কিনা। তখন ঘরে কেউ ছিল না। কারণ, সেই সময়ে পাকিস্তান সেনা বাহিনী কোন গ্রামে আসছে এ কথা শুনলে সবাই যে যেভাবে পাড়ছে পালিয়ে গিয়েছে। ঠিক ঐ দিনও আমরা পাশের একটি বাগানে গিয়ে পালিয়ে থাকি। তারা যাওয়ার পর বাড়ি এসে দেখি গাছের ডাব একটাও নেই। ঘরের ভাত তরকারী ছড়ানো ছিটানো।ঘরে তল্লাশীর সময় তারা ভাত তরকারী গুলোও মাটিতে ফেলে যায়। কথাগুলো বললেন, ১৯৭১ সালে শরণার্থী হয়ে ভারত যাওয়া প্রফুল্ল কুমার রায় ভক্ত। গত ৩ নভেম্বর ২০২০ লালমনিরহাট জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে বসে এই প্রতিবেদকের সাথে একান্ত সাক্ষাৎকারে এই কথা বলেন তিনি।

প্রফুল্ল কুমার রায় ভক্ত। পিতা নিল কান্ত রায় ও মাতা কম্পময়ী রায়। পিতা মাতার একমাত্র সন্তান তিনি। ১৯৫৪ সালের ১৩ জানুয়ারি লালমনিরহাট জেলার সদর উপজেলার বড় বাড়ি ইউনিয়নের বলিরামপুর গ্রামে তিনি জন্ম গ্রহন করেন।

স্বাধীনতা যুদ্ধের শুরুটা আপনার এলাকায় কেমন ছিল জানতে চাইলে প্রফুল্ল কুমার রায় ভক্ত বলেন, তখন আমার বয়স ১৭ বছর ছিল। আমি স্থানীয় পাংগারানী প্রিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের এস এস সি পরীক্ষার্থী ছিলাম। আমাদের এলাকায় তখন বিহারী বেশী ছিল। লালমনিরহাট শহরেও বিহারী ছিল। বিহারীদের মত বেশী না হলেও রিফিউজিদের সংখ্যাও কম ছিল না। যুদ্ধ শুরুর আগে তাদের খুব একটা কারো সাথে ঝগড়া বিবাদ করত দেখতাম না। বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণের পর এই দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে অনেকটা ভীতি আমরা লক্ষ্য করেছি। কিন্তু অত্যন্ত বিস্ময়কর বিষয় হলো, ২৬ মার্চ সকাল থেকেই তাদের আচার আচরণ সম্পূর্ন বিপরীতমুখী হয়ে উঠল। সকালেই আমাদের সারা গ্রাম ছড়িয়ে গেল যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। রাজধানী ঢাকায় গতরাতে (২৫ মার্চ) ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে পাকিস্তানী সেনারা। শহরের মানুষ গ্রামে আসতে লাগল। এদিকে, খবর পেলাম রংপুর ক্যান্টনমেন্ট ঘেরাও করে রেখেছে স্থানীয় জনতা। যে যার মত করে খবর ছড়াচ্ছে আর সারা গ্রামময় আতংক ছড়াচ্ছে। গ্রামের বিহারীদের হঠাৎ করে উগ্র মনোভাব দেখে মা আমাকে মামার বাড়ি লালমনিরহাটের মোগলহাটে পাঠিয়ে দিলেন নিরাপদ থাকার জন্য। আমার নানার নাম ছিল দেরেন্দ্রনাথ আর মামার নাম ছিল যোগেন্দ্র নাথ। মামার বাড়িতে আমি এক মাস থাকি। পরে মামাদের গ্রামের অবস্থা যখন খারাপ হয়ে উঠল তখন মামারা ভারতে চলে যায় আমি আমাদের বাড়ি চলে আসি। মামা আমাকে নিতে চাইছিল কিন্তু আমি রাজি হইনি। আমি বাড়ি আসাতে বাবা মা কেউ খুশি হননি।

তারা বরং নতুন করে আতংকিত হয়ে পড়ছেন আমাকে নিয়ে।আমি আসার কয়েক দিনের মধ্যে পাকিস্তান আর্মি আমাদের গ্রামে আক্রমন করে। যাওয়ার সময় আমাদের গাছের সব ডাব পেড়ে নিয়ে যায়। স্থানীয় বিহারীদের প্ররোচনায় আমাদের ঘরে গিয়ে আমাকে খোঁজ করে। তখন আমরা পাশের একটি বাগানে পালিয়েছিলাম। এই ঘটনার পর বাবা বললেন আর এক মুহুর্তেও এখানে থাকবনা। একটা কথা না বললেই নয়। আর সেটা হলো,আমাদের গ্রামে পাকিস্তান আর্মি যতটুকু অত্যাচার, নির্যাতন করেছে,যুবতী মেয়েদের ধর্ষন করেছে তার চেয়ে বেশী অপরাধ করেছের এলাকার বিহারী ও রিফিউজিরা। সুতরাং পাকিস্তান দানববাহিনীকে ক্ষমা করলেও বিহারীদের কখনো ক্ষমা করব না আমরা।

এর পর দিন সকালেই আমরা ভারতের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেই।বাড়ি থেকে নারিকেল বাড়ি পুকুর হয়ে ধরলা নদীর কলাখাওয়াঘাট নৌকা যোগে পার হয়ে বিকালের দিকে বড় ভিটায় যাই। সন্ধ্যায় ফুলবাড়ি সীমান্ত এলাকায় আসি। বর্ডার পার হয়ে ভারতের পশ্চিম বঙ্গ রাজ্যের কুচবিহার জেলার দিনহাটা থানার কুর্শার হাটে যখন পৌঁছি তখন রাত। এখানে একটি স্কুল মাঠে স্থানীয়রা আমাদের থাকার ব্যবস্থা করেন। পরদিন সকালে আমাদের দিনহাটা থানায় পাঠানো হলো। থানা থেকে পুুলিশ ক্লিয়ারেন্স নিয়ে পরিমারী ক্যাম্পে যাই। এই ক্যাম্পে আমাদের মুডিফাইড শরণার্থী হিসেবে তালিকা ভুক্ত করে। কারণ, তখন শরণার্থীদের দুই ভাগে ভাগ করেছিল। যারা মুডিফাইড তারা ক্যাম্পের বাহিরে থাকবে ক্যাম্প থেকে শুধু চাল আর ডাল পাবে। আর জানা মোনাফাইড তারা ক্যাম্পে থাকবে এবং চাল, ডাল, তেল রসুন থেকে শুরু করে যাবতীয় সুযোগ সুবিধা ভোগ করবে। যেহেতু আমরা পরে গিয়েছি ফলে ক্যাম্পে রাখার মত জায়গা নেই। তাই আমাদের মোডিফাইড শরণার্থী হিসেবে তালিকাভুক্ত করে। ক্যাম্পের পাশেই একটি খালি জায়গায় আমরা ছালা টালা দিয়ে কোন মতে একটি ছাবড়াঘর উঠিয়ে থাকি। দেশ স্বাধীন হওয়ার আগ পর্যন্ত, এখানেই আমরা ছিলাম।

যেহেতু আমরা চাল আর ডাল ছাড়া কিছুই পেতাম না তাই বেঁচে থাকার জন্য আমরা ঐখানকার বিভিন্ন গ্রামে কিংবা হাট বাজারে বিভিন্ন কাজ করতাম। কখনো কৃষি কাজ কখনওবা গরুর গাড়ি বা ঠেলাগাড়ি চালাতাম। খুব কষ্ট করে জীবন চালিয়েছি।

শরণার্থী জীবনের সবচেয়ে কষ্টকর কোন স্মৃতি আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, সবচেয়ে কষ্ট লাগত তখন যখন ভারতীয়রা আমাদের জয় বাংলা বলে গালি দিত। তাদের সাথে কাজ করতে গেলে কোন কিছু হলেই বকা দিয়ে বলত এই জয়বাংলা এদিক আস। সব কিছু শুনতে পারি কিন্তু কেউ যদি জয় বাংলা বলে গালি দেয় সেটা কেন জানি সহ্য হতো না। এটা সম্মানে লাগত । কারণ, জয় বাংলা ¯েøাগান দিয়েই তো আমাদের স্বাধীনতার যুদ্ধ শুরু হয়েছে।

দেশ স্বাধীনের পর কবে দেশে আসলেন জানতে চাইলে প্রফুল্ল কুমার রায় ভক্ত বলেন, আমরা ১৮ই ডিসেম্বর রাতেই দেশে চলে আসি। দেশে এসে দেখি, ঘরের চালটা ছাড়া আর কিছুই নেই। সব কিছু নিয়ে গেছে। জমির ধান গুলোও নেই। আর সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো স্থানীয় বিহারী ও রিফিউজি মানুষ গুলো এলাকায় নেই। তাদের ঘর আছে কিন্তু কোন মালামাল নেই। পরে শুনেছি, ৬ ডিসেম্বর যখন লালমনির হাট মুক্ত হয় তখন এর আগের দিনই আমাদের এলাকার বিহারীরা গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে যায়। পরে শুনেছি আমাদের এলাকা থেকে পালিয়ে যাওয়া বিহারীদের বড় একটি অংশ ঢাকার মিরপুরে আশ্রয় নেয়।

শরণার্থী প্রফুল্ল কুমার রায় ভক্ত সরকারের কাছে শরণার্থী হিসেবে উপাধি চান। যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম জানতে পারে এই দেশের জন্মের ইতিহাসের সঙ্গে আমাদের বেদনার ইতিহাসও জড়িত আছে।