‘গিজ গিজ করছে পোকা’ তাও এই খাবারের এত দাম!

টিবিটি টিবিটি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ৬:৫৪ অপরাহ্ণ, মার্চ ২০, ২০২১ | আপডেট: ৬:৫৪:অপরাহ্ণ, মার্চ ২০, ২০২১

পৃথিবীতে বিভিন্ন জাতি-বর্ণ নির্বিশেষে খাবারের বৈচিত্রতা রয়েছে। খাবার নিয়ে মজার মজার গল্পেরও শেষ নেই। যেমন রোমনরা নাকি মাছের কলিজার স্যুপ খেতে পছন্দ করতো। যেটা গারুম নামে পরিচিত। আমাদের মেশেও রয়েছে হরেক রকম খাবারের বৈচিত্রতা। তবে কেউ কি কখনো শুনেছেন পরিবেশনা করা খাবারের মধ্যে জ্যান্ত পোকা গিজ গিজ করে!

শুনতেই গা গুলিয়ে আসছে, তাই না? তবে, হ্যাঁ ঘটনা সত্যি। শুধিু সত্যি না এই খাবার পৃথিবীর দামি খাবারগুলোর মধ্যে অন্যতম।

ঠিকই পড়ছেন। এই চিজের মধ্যে ছোট ছোট সাদা রঙের ম্যাগট ঘোরাফেরা করে। পোকাগুলি জ্যান্ত থাকা অবস্থাতেই খেতে হয় এই চিজ। কোনও চিজে থাকা ম্যাগট মরে গেলে সেটি আর খাওয়া হয় না।

বিশ্ব বিখ্যাত এই চিজের পোশাকি নাম কাসু মার্টজু। ভূমধ্যসাগরের একটি ছোট দ্বীপ সারডিনিয়া। ইটালির অন্তর্গত সারডিনিয়া দ্বীপের মানুষের কাছে আজও প্রিয় খাবার এই পোকা ধরা চিজ!

ইটালির পেকোরিনো চিজ থেকেই কাসু মার্টজুর উদ্ভব। ভেড়ার দুধ থেকে তৈরি করা হয় এই পেকোরিনো চিজ। পার্থক্য একটাই, অন্যান্য চিজের প্রস্তুতি প্রণালীর সন্ধান প্রক্রিয়াটি (ফার্মেন্টেশন) এ ক্ষেত্রে একটু ভিন্ন। যাকে সন্ধান প্রক্রিয়া না বলে পচন প্রক্রিয়া বলাই শ্রেয়।

সাধারণ সন্ধান প্রক্রিয়ায় দুধ থেকে চিজ তৈরি না করে ভেড়ার দুধ থেকে তৈরি পেকোরিনো চিজকে খোলা অবস্থাতেই রেখে দেওয়া হয়। উদ্দেশ্য হল তাতে মাছি বসতে দেওয়া।

চিজ ফ্লাই নামে এক বিশেষ ধরনের মাছি ওই চিজে ডিম পাড়ে। চিজের মধ্যেই ডিম ফুটে লার্ভা বেরিয়ে আসে। তার পর চিজের সমস্ত স্নেহজাতীয় পদার্থকে (ফ্যাট) ভেঙে ফেলতে থাকে তারা। লার্ভার শরীরের মধ্যে থাকা অ্যাসিড চিজের স্নেহজাতীয় পদার্থকে ভেঙে ফেলে।

খাবার দীর্ঘ দিন মুক্ত ভাবে ফেলে রাখলে তাতে মাছি বসে যেমন পোকা ধরে যায়, একইসঙ্গে সেই খাবার নরম ও রসালো হয়ে যায়। সে ভাবে ওই চিজেও মূলত পচন ধরে যায়।

নরম, রসালো, থকথকে পোকা ধরা ওই চিজই কাসু মার্টজু। আর চিজের মধ্যে ঘোরাফেরা করে জ্যান্ত পোকাগুলিও।

পোকা-সহ চিজ বাজারে বিক্রি হয় এবং এই চিজ পোকা-সহ খেতে হয়। যদি কোনও চিজের মধ্যের পোকা মারা গিয়ে থাকে তা হলে ওই চিজ খারাপ বলে ধরে নেওয়া হয়। তা আর খাওয়া যায় না।

এই পোকাগুলি সাধারণত ৮ মিলিমিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। কোনও ক্রেতা যদি পোকা ছাড়া চিজ খেতে চান তা হলে প্রথমে চিজটিকে একটি বায়ুরুদ্ধ প্যাকেটের মধ্যে ঢুকিয়ে কিছু ক্ষণ রাখতে হবে।

অক্সিজেনের অভাবে সমস্ত পোকা চিজ থেকে বেরিয়ে ওই প্যাকেটের গায়ে চলে আসবে। প্যাকেটের গায়ে পোকাগুলির লাফানোর শব্দও শোনা যাবে। শব্দ বন্ধ হলে ধরে নিতে হবে চিজের মধ্যে আর পোকা নেই। তার পর সেটি বার করে খেতে হবে।

কোনওরকম বিপদের আভাস পেলে পোকাগুলি প্রায় ১৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লাফাতে পারে। তাই খাওয়ার সময় চিজটিকে ভাল ভাবে হাতের মধ্যে চেপে ধরে খেতে হয়। তা না হলে মুখে যাওয়ার আগেই বিপদ বুঝে লাফিয়ে পালাতে পারে পোকাগুলি।

স্বাভাবিক ভাবেই এই চিজ অস্বাস্থ্যকর। নিষিদ্ধও করে দেওয়া হয়েছে এর প্রস্তুতি। কাউকে বিক্রি বা কিনতে দেখলে জরিমানা করা হয় বহু দেশে। তা সত্ত্বেও কালো বাজারে কাসু মার্টজুর কেনাবেচা চলছেই। একটি সাধারণ পেকোরিনো চিজের প্রায় দ্বিগুণ দামে বিক্রি হয় কাসু মার্টজু।

খাদ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, পোকাগুলি মানুষের শরীরেও বেঁচে থাকে। পাকস্থলীয় গাঢ় অ্যাসিডেও এদের কোনও ক্ষতি হয় না। শরীরে প্রবেশ করে এরা মানুষের কোষগুলিকেও খেতে থাকে। ফলে নানারকম শারীরিক সমস্যা দেখা যায়।

ইটালি এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিষেধাজ্ঞা তুলে এটিকে ইটালির ঐতিহ্যবাহী খাবার হিসাবে তুলে ধরার চেষ্টাও করা হয়েছে বহু বার। কিন্তু এর ক্ষতির কথা বিবেচনা করেই তাতে সায় মেলেনি।

বছরের পর বছর ধরে ওই একই ভাবে কাসু মার্টজু প্রস্তুত করা হয়। আইনত যাতে চিজ বিক্রি করা যেতে পারে তার জন্য ভেড়া খামারের মালিকদের সঙ্গে কাজ করে ইটালির সাসারি বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক ২০০৫ সালে কাসু মার্টজু প্রস্তুতির একটি অভিনব এবং স্বাস্থ্যকর উপায় বার করেছিলেন। কিন্তু তাতে আবার সায় মেলেনি কাসু মার্টজু প্রস্তুতকারকদের।

সূত্র: আনন্দবাজার।