চামড়া কেনায় আগ্রহ নেই ব্যবসায়ীদের, আড়তে সুনসান নীরবতা

প্রকাশিত: ৩:১১ অপরাহ্ণ, আগস্ট ১, ২০২০ | আপডেট: ৩:১১:অপরাহ্ণ, আগস্ট ১, ২০২০
হাজীপাড়ার চামড়াপট্টি এলাকা। ছবি: সংগৃহীত

কোরবানি শুরু পর থেকেই সারাদেশের চামড়ার আড়তগুলোতে কোরবানির পশুর চামড়া সংগ্রহ শুরু হয়েছে।

চামড়া কেনা-বেচার জন্য রংপুরের হাজীপাড়া বিখ্যাত। প্রতি বছর কোরবানির ঈদের সময় এ আড়তে চামড়া বিকিকিনিতে ব্যস্ত থাকে ক্রেতা-বিক্রেতারা। তবে এ বছরের চিত্র ভিন্ন। চামড়া কেনার ব্যাপারে ব্যবসায়ীদের তেমন আগ্রহ নেই। বেশির ভাগ ব্যবসায়ী তাদের গুদাম বন্ধ করে রেখেছেন। চামড়া কেনা-বেচার এই আড়তে এখন সুনসান নীরবতা বিরাজ করছে।

শনিবার (১ আগস্ট) সকাল সাড়ে ৯টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত হাজীপাড়ার চামড়াপট্টি এলাকা ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে।

গত বছরের লোকসান আর বর্তমান অর্থনৈতিক মন্দাভাবের কারণে চামড়াশিল্পে জড়িত বড় বড় ব্যবসায়ীরা এবার হাত গুটিয়ে নিয়েছেন। যেখানে ঈদের দিন নামাজের পরপরই চামড়াপট্টিতে গুদাম খুলে বসতেন ব্যবসায়ীরা। এবার তারা চামড়া না কেনার সিদ্ধান্তে বন্ধ রেখেছেন বেশিরভাগ গুদাম।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সরকার গত বছরের চেয়ে এবার প্রতিবর্গ ফুট চামড়ার দাম ১০ টাকা কমিয়েছে। রাজধানীতে লবণযুক্ত গরুর চামড়া ৩৫ থেকে ৪০ টাকা, ছাগল ১৫ থেকে ১৭ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। ঢাকার বাইরে গরুর চামড়া ২৮ থেকে ৩২ টাকা এবং ছাগলের চামড়ার দাম ১৩ থেকে ১৫ টাকা। এই দামে চামড়া কেনা-বেচা সম্ভব নয় বলে দাবি ব্যবসায়ীদের।

মূলত সুষ্ঠুভাবে মনিটরিং না থাকায় চামড়াশিল্পে ধস নেমেছে বলে ব্যবসায়ীদের অভিযোগ। বর্তমানে ব্যবসায়ীদের আর্থিক অবস্থা ভালো নেই। বিশেষ করে হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি স্থানান্তরে প্রভাব পড়েছে। ১৫০ এর বেশি ট্যানারির মধ্যে সাভারে এখন চালু হয়েছে মাত্র ১০ থেকে ১২টি। এ কারণে ঢাকাতেও চামড়া কেনার চাহিদা কম। আর ঢাকার বাইরের ব্যবসায়ীদের অনেকেই আগের পাওনা টাকা পাননি। এখন নগদ টাকায় চামড়া কিনে নতুন করে লোকসানের ভয়ে আছেন তারা। এ কারণে অনেকেই চামড়া কিনবেন কিনা, তা নিয়ে দোটানায় রয়েছেন।

জানা গেছে, হাজীপাড়া চামড়াপট্টি এলাকার সবচেয়ে বড় ব্যবসায়ী আজগর আলী, আফজাল হোসেন, মাহবুবার রহমান বেলাল, মুরাদ খাঁন, ইব্রাহিম, গফফার হোসেনসহ বেশ কয়েকজন এবছর চামড়া না কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

সরেজমিনে এসব ব্যবসায়ীর গুদাম ঘরও তালাবদ্ধ দেখা গেছে। তবে এলাকার প্রায় ১০-১২ জন ফড়িয়া এবং হাতেগোনা ৩-৪ জন ব্যবসায়ী চামড়া কেনার প্রস্তুতি নিয়েছেন। তাদের সকাল থেকে গুদাম ও রাস্তা থেকে চামড়া কিনতে দেখা গেছে।


চামড়া কিনছে ফড়িয়ারা।

স্থানীয় চামড়া ব্যবসায়ী মোখলেছুর রহমান, মশিয়ার রহমান, শামছুল হক ও মজিবর রহমান জানান, চামড়া বিক্রি করতে আসা লোকেরা দাম বেশি চাইছেন। কিন্তু সরকার নির্ধারিত দরে চামড়া কিনতে গেলে একেকটা ভালো গরুর চামড়া দেড়শ থেকে তিনশ টাকার বেশি হবার সম্ভাবনা নেই।

গত বছরের অপ্রত্যাশিত লোকসান আর বর্তমান করোনা পরিস্থিতিতে আর্থিক সমস্যার কারণে ঈদের চামড়া কেনা থেকে বিরত রয়েছেন স্থানীয় ব্যবসায়ী নেতা মাহবুবার রহমান বেলাল। তিনি বলেন, ‘আমরা নগদ টাকায় চামড়া কিনে বাকিতে বিক্রি করি। প্রতি বছর ট্যানারি মালিক ও বড় বড় ব্যবসায়ীদের কাছে আমাদের কোটি কোটি টাকা পাওনা থেকে যায়। এরপরও ঝুঁকি নিয়ে চামড়া কেনা-বেচা চলত। কিন্তু গত বছরের লোকসান সবকিছু শেষ করে দিয়েছে। এ কারণে এবার ঈদে চামড়া না কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’

হাজীপাড়া এলাকায় গরুর চামড়া বিক্রি করতে এসেছিলেন হাবিব রহমান নামে এক ব্যক্তি। তিনি জানান, চামড়া কেনার ব্যাপারে কারো মধ্যে আগ্রহ নেই। কয়েকজন ফড়িয়া চামড়া কিনছেন, তবে তারা দাম অনেক কম বলছেন। তিনি ৭৫ হাজার টাকা দিয়ে গরু কিনেছিলেন। সেই গরুর চামড়া মাত্র সাড়ে ৪০০ টাকায় বিক্রি করেছেন।

এদিকে সকাল সাড়ে ৯টা থেকে দুপুর ২ পর্যন্ত চামড়াপট্টিতে ২৫টি গরুর ও ১৩টি খাসির চামড়া কেনা-বেচা হয়েছে। এসব চামড়া আবার প্রক্রিয়াজাত করতে প্রায় একশ থেকে দেড়শ টাকার মতো খরচ হবে। আবার এই চামড়া বিক্রি করা নিয়েও ঝামেলা পোহাতে হবে। তাই চামড়া কিনতে অনেকেরই আগ্রহ নেই। তবে বিকেলের পর চামড়ার আমদানি হবার সম্ভাবনা রয়েছে।

অন্যদিকে রংপুর জেলা চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি হাজী আব্দুল লতিফ খাঁন জানান, চামড়া কিনে কোথায় বিক্রি করা হবে, এ নিয়েই ব্যবসায়ীরা বেশি চিন্তিত। এখন চামড়ার দাম নেই। তার মধ্যে আর্থিকভাবে সবাই ক্ষতিগ্রস্ত। দেশের প্রায় দুই শতাধিত ট্যানারির মধ্যে এখন হাতে গোনা ১৫ থেকে ২০টি ট্যানারি চালু রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে কেউ চামড়া কিনে নতুন করে লোকসানের বোঝা ভারি করতে চাইছেন না। তারপরেও অনেকেই চামড়া কিনতে শুরু করেছেন। সন্ধ্যার আগ মুহূর্ত ছাড়া চামড়ার বাজার পরিস্থিতি বোঝা যাবে না বলেও মন্তব্য করেন এই ব্যবসায়ী নেতা।

-বার্তা ২৪।