চা শ্রমিকের দিন-রজনী

প্রকাশিত: ৮:৩০ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২৯, ২০১৯ | আপডেট: ৮:৩০:অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২৯, ২০১৯

মোঃ ইলিয়াস কাঞ্চন তানহা, মাধবপুর (হবিগঞ্জ) প্রতিনিধি: দুটি পাতা একটি কুড়ি ও সবুজ চা গাছের সঙ্গে চা শ্রমিকের মিতালী শত বছর ধরে। প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠে চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে মন ও শরীরকে চাঙ্গা করে। চা উৎপাদনের পেছনের নিপুন কারিগর হলেন সহজ সরল চা শ্রমিকরা। এই হচ্ছে সুপেয় চায়ের মূল কথা। প্রতিদিন সকালে চায়ে চুমুক দিয়ে যে ক্লান্তি দূর হয় এর পেছনে যাদের ঘামশ্রম রয়েছে এসব শ্রমিকদের জীবনমান এখনো দারিদ্রসীমার নিচে।

বহু বছর আগে ব্রিটিশ শাসনামলে ভারত উপমহাদেশে বিভিন্ন রাজ্য থেকে তাদের আগমন ঘটলেও এখন তারা এ দেশের নাগরিক। তাদের সামাজিক রীতিনীতি ধর্ম, কৃষ্টি, কালচার, জীবনাচরণ, বর্ণ ধর্ম, কথা বলার ঢং, কাজের নিখুুঁত বুনন আমাদের ঐতিহ্য ধারাকে আরো সমৃদ্ধ করে তুলেছে।

চা বাগানে বিভিন্ন গোত্রের লোকজন বসবাস করেন। এর মধ্যে উরিয়া, মুন্ডা, সাঁওতাল, ভুমিজ, উরাং, ভূঁইয়া, সবর, রেলী, তন্ত্রবায় গোত্রের লোকজন রয়েছেন। প্রত্যেক গোত্রের লোকজনের ধর্মীয় রীতিনীতি বিয়ে সাদী পুজা অর্চনায় রয়েছে নিজস্ব রীতিনীতি। বিনোদনপ্রিয় শ্রমিকরা ছোট্টু কুঁড়ে ঘরে ছেলে সন্তান নিয়ে ঠাসাঠাসি করে কোনো রকমে জীবন চালায়। বড় কথা হচ্ছে নারী চা শ্রমিকরা কঠোর পরিশ্রম করে থাকে।

চা বাগানের শ্রমিকরা কেউ অলস সময় কাটায় না। যাদের বাগানে কাজ রয়েছে তারা সকালে ঘুম থেকে বাড়ি ঘরের কাজ শেষে পায়ে হেঁটে দল বেঁধে বাগানে যায়। অবিরাম দুটি পাতা একটি কুঁড়ি উত্তোলন করে এ কচি পাতা মাথায় করে কারখানা অথবা ট্রাক্টরে পৌঁছায়। পুরুষ শ্রমিকরা নতুন চা বাগান সৃজন সহ ভারী কাজ করে থাকেন। নারী শ্রমিকরা বেশির ভাগ পাতা উত্তোলন ও নার্সারীতে কাজ করেন।

চা শ্রমিকরা দুপুরের খাবার সেরে নেয় বাগানের ভিতর। ৫/৭ জন নারী শ্রমিক দল বেধে বসে খাবার প্রস্তুত করে। এ খাবারে কি পরিমাণ খাদ্যপ্রাণ অথবা পুষ্টিগুণ রয়েছে এ সম্পর্কে তাদের আদৌ কোনো ধারণা নেই। ক্ষুধা মেটাতে হবে এই প্রয়োজনে খাবার। খাবার তালিকা থাকে মুড়ি, চানাচুর, কাচামরিচ, কাচা চা পাতা, পেয়াজ, আলু, চটকিয়ে ভর্তা বানিয়ে রুটি দিয়ে এ খাবার খায়। সঙ্গে থাকে বোতল ভর্তি গরম লাল চা।

কাজ সেরে সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে শ্রমিকরা। ক্লান্ত শরীর মলিন মুখ ক্ষুধার্ত হাড্ডিসার দেহখানা নিয়ে ঘরে ফেরার পর আবার শুরু হয় পারিবারিক কাজ। রাতের খাবার শেষে চট-ছালা বিছিয়ে মশারী বিহীন অন্ধকার ঘরে ঠাসাঠাসি ঘরে ছেলে সন্তান নিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। নারী চা শ্রমিকদের মাতৃত্বকালীন ছুটি ৬ মাস হলেও অনেক সময় দেখা যায় নব জাতক শিশুকে নিয়ে নারী শ্রমিকরা কাজে যোগ দেয়। অবুঝ শিশুকে গাছের নিচে রেখে নারী শ্রমিকরা কাজ করে। অভাব অনটন নারী শ্রমিকদের এখন নিত্য দিনের সঙ্গী।

মাধবপুর উপজেলার তেলিয়াপাড়া, সুরমা, জগদীশপুর, বৈকুণ্ঠপুর, নোয়াপাড়া চা বাগানের নারী শ্রমিকদের সঙ্গে কথাবলে জানা গেছে, তারা সকাল সন্ধ্যা রোদে পুড়ে বৃষ্টিতে ভিজে চা বাগানের ভিতরে কাজ করেন। কিন্তু ১০৫ টাকা দৈনিক মজুরীতে তাদের জীবন জীবিকা চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। চা বাগানের পক্ষ থেকে যেটুকু স্বাস্থ্য সেবা দেওয়া হয় তা পর্যাপ্ত নয়। এ কারণে অনেক শ্রমিক নানা রোগে আক্রান্ত। অর্থাভাবে তাদের চিকিৎসা হয় না।

তাদের অভিযোগ, চা বাগানের পক্ষ থেকে যতটুকু সহযোগিতা করা হয় সরকারিভাবেও তাদের বিভিন্ন সুবিধা দেওয়া হয়। কিন্তু এগুলো প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম। চা বাগানে অনেক বেকার লোক রয়েছে। যাদের বাগানের ভিতরে কাজের কোন ব্যবস্থা নেই। হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলায় বিভিন্ন স্থানে শিল্প কারখানায় চা বাগানের লোকজন কাজ করে দক্ষতার স্বাক্ষর রাখছে।

লস্করপুর ভ্যালীর সভাপতি রবীন্দ্র গৌড় বলেন, চা বাগানে শ্রমিকদের শিক্ষা, গৃহ নির্মাণ, বিশুদ্ধ পানি মজুরী ও রেশনের স্বল্পতা, পর্যাপ্ত স্বাস্থ্য সেবা সহ নানাবিধ সমস্যা রয়েছে। সরকার ও মালিকপক্ষ যৌথভাবে শ্রমিকদের সমস্যা চিহ্নিত করে এগুলো সমস্যা সমাধান করলে চা শ্রমিকদের জীবনমান উন্নত হবে।

চা শ্রমিক নেত্রী গীতা রানী কানু বলেন, যুগযুগ ধরে চা শ্রমিকরা নানা ভাবে বঞ্চিত হয়ে আসছে। অধিকার হারা এসব শ্রমিকদের উন্নয়নের মূল স্রোতে না আনতে পারলে টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) পূরণ হবে না।

মাধবপুর উপজেলা সমাজ সেবা কর্মকর্তা সুলায়মান মজুমদার বলেন, ইউনিসেফের অর্থায়নে ২০১১ সন থেকে চা বাগানে বিনা মূল্যে খাদ্য সামগ্রী বিতরণ করা হয়। এখন রাজস্ব খাত থেকে পর্যায়ক্রমে সকল চা শ্রমিকদের মধ্যে খাদ্য সামগ্রী বিতরণ করা হচ্ছে। এছাড়া চা শ্রমিক সন্তানদের লেখাপড়ার জন্য উপবৃত্তি সহ শিক্ষা উপকরণ দেওয়া হচ্ছে।

মাধবপুর মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা জান্নাত সুলতানা বলেন, সুবিধা বঞ্চিত নারী শ্রমিকদের জন্য সরকার বিশেষ প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এ প্রকল্পের পক্ষ থেকে নারী শ্রমিকদের বিভিন্ন আর্থিক ও কারিগরি সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে।