চিকিৎসা যে সেবা শুধু বাণিজ্য নয় এটিও অমানবিক বিনিয়োগকারীরা ভুলে যান।

টিবিটি টিবিটি

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ৯:৪৬ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ২৮, ২০১৯ | আপডেট: ৯:৪৬:পূর্বাহ্ণ, জুলাই ২৮, ২০১৯
পীর হাবিবুর রহমান। ফাইল ছবি

সিরিজ ধর্ষণ, গুজব ছড়িয়ে গণপিটুনি, মানুষ হত্যা, প্রিয়া সাহার রাষ্ট্রবিরোধী ভূমিকা, পানিবন্দী মানুষের দুর্ভোগ, বরগুনায় মধ্যযুগীয় কায়দায় রিফাত হত্যার রোমহর্ষক ঘটনা, স্থানীয় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাবশালীদের ছায়ায় গড়ে ওঠা সন্ত্রাস, মাদক সিন্ডিকেট বিতর্ক ভুলে গিয়ে গোটা দেশ এখন ডেঙ্গুর মহামারী নিয়ে আতঙ্কিত। ঢাকায় পরিস্থিতি ভয়াবহ। ঢাকার বাইরেও ছড়িয়ে গেছে। ঢাকায় হাসপাতালগুলোতে ঠাঁই নেই ঠাঁই নেই অবস্থা।

সরকারি সব হাসপাতালে স্থান সংকুলান হচ্ছে না। বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসামূল্য অধিক চড়া। যা অনেকের সামর্থ্যরে বাইরে। তবুও জীবন এতই মূল্যবান যে মানুষ যেখানে পারছে সেখানেই ভর্তি হচ্ছে। চিকিৎসক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র ইতিমধ্যে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছে। যার গায়ে জ্বর ও ব্যথা সেই আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হচ্ছে। এক সময় ম্যালেরিয়ার প্রাদুর্ভাব ছিল ঢাকার বাইরে।

৯০ দশকের শুরুতে ডেঙ্গু খবর হয়ে আসে ঢাকা নগরীতে। প্রতি বছর রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকে। গেল বছর ঢাকা নগরীতে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্তের সংখ্যা ছিল অনেক বেশি। প্রায় দশ সহস্রাধিক। সিটি করপোরেশনের দায়িত্ব সারা বছর মশার প্রজননস্থলে ওষুধ স্প্রে করার। সিটি করপোরেশন সেটি করতে ব্যর্থ হয়েছে। মশার উপদ্রব নগরবাসীকে অতিষ্ঠ করেছে সারা বছর।

এডিস মশার প্রজননকাল জুন-জুলাই বর্ষাকাল চরম সময়। আর এডিস মশার কামড়ে ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হওয়ার সময়কাল ধরা হয় জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত। সাধারণত অতীতে সেপ্টেম্বর মাসে আক্রান্তের সংখ্যা বড় আকার নিয়েছিল। কিন্তু এবার জুলাইয়েই মহামারী আকার নিয়েছে।

ঢাকা দক্ষিণের মেয়র সাঈদ খোকন বলেছেন, মহামারী আকার নেয়নি। অঙ্কের হিসাবে মহামারী আকার হয়তো নেয়নি কিন্তু বিদ্যমান পরিস্থিতির দৃশ্যপটে মহামারীর চেয়ে কম নয়। ছেলেধরা গুজবের সঙ্গে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা নিয়ে গুজব ছড়ানো হচ্ছে বলে তিনি অভিযোগ করেছেন।

এডিস মশার প্রজনন নিয়ন্ত্রণে সিটি করপোরেশন দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করার পর যদি মেয়র এ কথা বলতেন তাহলে মানুষ ব্যথিত হতো না। তিনিও সমালোচিত হতেন না। স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক রোহিঙ্গাদের প্রজননের সঙ্গে এডিস মশার প্রজননকে তুলনা করে রসিকতা করেছেন। তিনি বলেছেন, মশার দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের। মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব এখানে নেই।

কিন্তু মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব এড়ানোর সুযোগ কোথায়? আইসিডিডিআরবি মার্চ মাসে গবেষণা করে দুই সিটি করপোরেশনকে জানিয়ে দিয়েছিল এডিস মশার প্রজনন কোথায় কোথায় বেশি হবে। সিটি করপোরেশনের মশক নিধনের ওষুধ যে কাজ করছে না সেটি জানাতেও ভুলেনি। এবার এডিস মশার লার্ভা বেশি হবে এটিও তারা সতর্ক করেছিল। কিন্তু ঢাকা সিটি করপোরেশনের দায়িত্বশীলরা পদক্ষেপ গ্রহণে চরম ব্যর্থ হয়েছেন।

আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের যথার্থই বলেছেন, বেশি কথা না বলে যার যার কাজ করুন। এডিস মশার বংশ বিস্তার রোধে কার্যকর ওষুধ চিহ্নিত করে তা আনার ব্যবস্থা এখনো গ্রহণ করা হয়নি। মহামান্য হাই কোর্ট অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেছেন, ওষুধে ভেজাল থাকায় মশা মরেনি।

চলতি অর্থ বছরে ঢাকা দক্ষিণ ও উত্তর সিটি করপোরেশনের মশা নিধনের বাজেট প্রায় অর্ধ শত কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছিল। সেই টাকা গেল কোথায়? ঢাকার এমপি রাশেদ খান মেনন বলেছেন, মশা মারার বাজেটের দুর্নীতি ঢাকতে গুজব বলে প্রচার করা হচ্ছে।

আমাদের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও সিটি করপোরেশন বছরের পর বছর মানুষ ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হলেও এর থেকে মানুষকে রক্ষার ও ডেঙ্গু রোগ প্রতিরোধে কোনো গবেষণা ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। ডেঙ্গু প্রকোপ দেশগুলোতে সারা বছর গবেষণা ও প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম রাখা হলেও এখানে কর্তৃপক্ষ সে বিষয়ে উদাসীন।

ডেঙ্গু এডিস মশাবাহিত রোগ ও তার প্রজনন এবং ভয়াবহ পরিস্থিতি জেনেও আমরা জনগণও সচেতনভাবে দায়িত্বপালনে উদাসীন। নাগরিক দায়িত্ব পালনেও আমাদের মধ্যে অনীহা রয়েছে। বাড়ির আনাচে কানাচে পানি জমে থাকে। পরিষ্কার করার প্রয়োজন বোধ করি না।

এমনকি ঢাকা নগরীতে বহুতল ফ্ল্যাটের একটুকুন বারান্দায় ফুলের টব লাগাতে লাগাতে এডিস মশার প্রজননস্থল তৈরি করে দেই। এমনকি বাড়ির ছাদে বাগান করার ব্যাপক প্রচারণা চালাই। একবারও ভাবী না ছাদবাগান থেকে এডিস মশার প্রজনন ও ডেঙ্গুর প্রকোপ কতটা বাড়তে পারে। সরকার, সিটি করপোরেশন ও জনগণকে সচেতনতাই নয় দায়িত্বশীল ভূমিকাও রাখতে হবে। আর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে সিটি করপোরেশন ডেঙ্গু পরিস্থিতির এই ভয়াবহতার দায় বা নিজেদের ব্যর্থতার দায় কখনোই এড়িয়ে যেতে পারবেন না।

নড়াইল জেলা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ও সদর উপজেলা চেয়ারম্যান নিজামউদ্দিন খান নিলুর বড় ভাই দিলু আমার বন্ধু। এই পরিবারের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকে পারিবারিক সম্পর্ক। সেদিন খবর দিল তার মেজো ভাই আসলাম খান লুলুর স্ত্রী ঢাকা থেকে জ্বর ও গা ব্যথা নিয়ে নড়াইল গিয়েছিলেন। সেখানে অবস্থার অবনতি হলে ডেঙ্গু রোগ ধরা পড়ে।

অ্যাম্বুলেন্সে করে ঢাকা আনার পথে ইন্তেকাল করেন। নড়াইলের আরেক তরুণের ডেঙ্গু রোগে গাড়িতে মৃত্যুর ছবি ভাইরাল হয়েছে। অস্ট্রেলিয়া থেকে এক সময়ের ছাত্রলীগ নেত্রী সেলিমা বেগম দুই ছেলেকে নিয়ে ঢাকায় এসেছিলেন। ছোট ছেলে ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হলে বড়টিকে ভয়ে সিডনিতে তার স্বামী অনুজ প্রতিম আবু তারিকের কাছে পাঠিয়ে দেন। ছেলে সুস্থ হয়ে এখন হাসপাতাল ছেড়েছে।

সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা সেবা নামমাত্র মূল্যে পাওয়া গেলেও বেসরকারি হাসপাতালে সুস্থ হয়ে ফিরুন আর নাই ফিরুন মোটা অঙ্কের বিল দিয়ে আসতে হয়। পান্থপথের বিখ্যাত বেসরকারি হাসপাতালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ফিরোজ কবীর ২২ ঘণ্টার চিকিৎসা নিয়ে বিল গুনেছেন ১ লাখ ৮৬ হাজার টাকা। কিন্তু বাড়িতে ফিরেছেন নিথর লাশ হয়ে।

পৃথিবীর সব দেশে আগে রোগীর চিকিৎসা পরে খরচের বিল আসে। আমাদের দেশে অমানবিক বেসরকারি হাসপাতালে বিলের জন্য লাশ আটকে দেওয়ার নজিরও রয়েছে। চিকিৎসা যে সেবা শুধু বাণিজ্য নয় এটিও অমানবিক বিনিয়োগকারীরা ভুলে যান।

ডেঙ্গু এবার ইতিহাসের সব রেকর্ড ভঙ্গ করে ভয়াবহ পরিস্থিতি নিয়েছে। কেউ রেহাই পাচ্ছেন না। এডিস মশা কে বিত্তশালী কে গরিব, কে ডাক্তার কে সাধারণ ছাত্র বা পথশিশু মানছে না। মানবদেহে এডিস মশা ডেঙ্গুর ভাইরাস ছড়িয়ে দিচ্ছে। মানুষ বাঁচাতে ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে আজ সবাইকে মিলে যুদ্ধ করতে হবে। এই যুদ্ধ মানুষ বাঁচানোর মানবিক যুদ্ধ।

এই খানে মুনাফা লাভের চিন্তা করবেন না। বেসরকারি হাসপাতালের মালিকরা ডেঙ্গুর টেস্ট থেকে চিকিৎসা সেবা পর্যন্ত সমুদয় বিল কমিয়ে আনুন। যতটুকু না রাখলেই নয় ততটুকু রাখুন। মানবিকতার নজির স্থাপন করুন। মানুষের জীবনের চেয়ে অঢেল বিত্ত বৈভবের মূল্য কখনো বেশি হতে পারে না।

সরকারকেও ডেঙ্গু রোগীদের জন্য বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক মালিকদের চিকিৎসা মূল্য নির্ধারণ করে দেওয়ার এখনি সময়। একই সঙ্গে ডেঙ্গু প্রতিরোধক ইনজেকশন ও এডিস মশা নিধনের প্রয়োজনীয় ওষুধ যে কোনো মূল্যে যে কোনোভাবে অতিদ্রুত এনে মানুষের সেবায় পাশে দাঁড়ান। জনগণ নগরভবনে ট্যাক্স জমা দেয় তার প্রাপ্য নাগরিক সেবা লাভের জন্য। মশার কামড়ে মৃত্যুর মুখে পতিত হওয়ার জন্য নয়।

লেখক :পীর হাবিবুর রহমান

নির্বাহী সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন।

সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন।