চুয়াডাঙ্গার কৃষি জমিতে ছড়িয়ে পড়েছে বিষাক্ত পার্থেনিয়াম গাছ

প্রকাশিত: ৮:৫৬ অপরাহ্ণ, জুলাই ১০, ২০২০ | আপডেট: ৮:৫৯:অপরাহ্ণ, জুলাই ১০, ২০২০
ছবি: টিবিটি

চুয়াডাঙ্গা সংবাদদাতা: চুয়াডাঙ্গার রাস্তাঘাটের দুপাশের পতিত জমি থেকে শুরু করে কৃষি জমিতে ছড়িয়ে পড়েছে মানুষের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর বিষাক্ত পার্থেনিয়াম গাছ। গত কয়েক বছরধরে চুয়াডাঙ্গায় এ বিষাক্ত উদ্ভিদটির বিস্তার দিনদিন বেড়েই চলেছে। ফলে কৃষিজমির উর্বরতা নষ্টসহ ফসল উৎপাদন হুমকীর মুখে পতিত হচ্ছে।

দেখতে অনেকটা প্রাপ্তবয়স্ক ধনেগাছের মত ছোট সাদা ফুল ও চিকন পাতা এর প্রধান বৈশিষ্ট্য। কোনরকম যত্ন ছাড়াই এ আগাছা বাড়তে থাকে এবং প্রতিকুল পরিবেশে এ আগাছা বেঁচে থাকতে সক্ষম বলে জানা গেছে। উচু এবং নিচু সব ধরনের মাটিতেই জন্মায় এ উদ্ভিদ।

জানা গেছে, এই বিষাক্ত আগাছা জাতীয় উদ্ভিদ টি মেক্সিকো থেকে গম বিজের মাধ্যমে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। আমাদের পাশ্ববর্তী দেশগুলোতে ও এর বিস্তার রয়েছেও অনেক। আমাদের দেশেও তুলনামুলক ভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে এ বিষাক্ত উদ্ভিদটি।

চুয়াডাঙ্গার পাশ্ববর্তী জেলা কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, যশোর ও ঝিনাইদাহের সড়কের পাশে তাকালে এ বিষাক্ত গাছটির দেখা মেলে। চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলার উথলী, শাখারিয়া ও সীমান্ত ইউনিয়নের চ্যাংখালী রাস্তার পাশে অধিকহারে বৃদ্ধি পাচ্ছে পার্থেনিয়াম গাছ। এছাড়াও দামুড়হুদা উপজেলার দর্শনার বিভিন্ন এলাকাসহ চিৎলা ও জুরানপুর এবং কার্পাসডাঙ্গা ইনিয়নের সীামান্তবর্তী গ্রামের আবাদি জমিতে দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে এ উদ্ভিদ টি। চুয়াডাঙ্গার সদর উপজেলার বিভিন্ন রাস্তার পাশে এবং আলমডাঙ্গা উপজেলার আবাদি জমিসহ রেললাইনের ধারেও দেখা মিলছে বিষাক্ত উদ্ভিদটির।

বিষাক্ত এ আগাছাটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে এক জেলা থেকে আরেক জেলাতে। ফসলের ক্ষেতে একবার হয়ে গেলে তা নিধন করা খুব কঠিন হয়ে পড়ছে। কৃষি জমিতে যেকোন ফসল ফলাতে গেলে কৃষকরা এ বিষাক্ত আগাছাটির সম্মুক্ষীন হচ্ছে। যত নিধন করা হয় পুনারায় ফসলের চারা গজানোর সাথে পার্থেনিয়াম এর চারাও বেড়ে ওঠে। তাই পার্থেনিয়াম থেকে কৃষিজমি রক্ষা করতে হলে প্রয়োজন কিছু সচেতনতা ও কয়েকটি পদক্ষেপ। তা নাহলে ফসলের উন্নয়ন ব্যাহত হতে পারে বলে জানান কৃষি বিভাগ।

চুয়াডাঙ্গা জেলার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ- পরিচালক আলী হাসান জানান পার্থেনিয়ামের বীজ খুবই ক্ষুদ্র তাই ছড়িয়ে পড়ছে বিভিন্নভাবে । গরুর গোবর, গাড়ির চাকায় , সেচের মাধ্যমে এবং জুতার তলার কাদার সঙ্গে লেপটে ছড়িয়ে পড়ছে বিভিন্ন জায়গায়। এ গাছ সাধারণত এক থেকে দেড় মিটার উচ্চতার হয়। গাছটির আয়ুষ্কাল মাত্র তিন-চার মাস। আয়ুষ্কালের মধ্যে তিনবার ফুল ও বীজ দেয় গাছটি। ফুল সাধারণত গোলাকার, সাদা, পিচ্ছিল হয়। এ গাছ তিন-চার মাসের মধ্যে ৪ হাজার থেকে ২৫ হাজার বীজের জন্ম দিতে সক্ষম।আগাছাটি অত্যন্ত ভয়ংকর ও মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকারক।

গবাদি পশু চরানোর সময় গায়ে লাগলে পশুর শরীর ফুলে যায়। এ ছাড়াও তীব্র জ্বর, বদহজমসহ নানা রোগে আক্রান্ত হয়। আর পশুর পেটে গেলে বিষক্রিয়া হতে পারে। শুধু পশুই নয়, আগাছাটি মানুষের হাতে পায়ে লাগলে চুলকে লাল হয়ে ফুলে যায়। পাশাপাশি ত্বক ক্যানসার সৃষ্টি করে। আক্রান্ত মানুষটির ঘনঘন জ্বর, অসহ্য মাথাব্যথা ও উচ্চ রক্তচাপে ভুগতে থাকে। এমনকি মারাও যেতে পারে।

তিনি আরও জানান এতসব বিষয়াদি জানতে পেরে পরিবেশবিদেরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। আতঙ্কিত হয়েছেন কৃষিবিদরাও।

কৃষিবিদরা এ আগাছা নিয়ে বেশ শঙ্কিত। তারা এটিকে বিষাক্ত আগাছা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এটি শুধু বিষাক্তই নয় যে কোনো ধরনের ফসলের ব্যাপক ক্ষতিও করে। প্রায় ৪০ শতাংশ ফসল কম ফলে যদি কোনো ক্ষেতে পার্থেনিয়াম থাকে। এসব ক্ষতিকর দিকগুলো পর্যালোচনা করে গাছটি পুড়িয়ে ফেলতে জেলার কৃষকদের পরামর্শ দেন তিনি। কিন্তু সেক্ষেত্রেও সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। যেমন এটি কেউ কাটতে গেলে ব্যক্তির হাতে-পায়ে লাগতে পারে। পোড়াতে গেলে ফুলের রেণু দূরে উড়ে বংশবিস্তার ঘটাতে পারে। আবার ব্যক্তির নাকে, মুখেও লাগতে পারে। তাতে করে তিনি মারাত্মক বিষক্রিয়ায় পড়তে পারেন। এ ক্ষেত্রে খুব সতর্কতার সঙ্গে প্রথমে গাছটিকে কাটতে হবে। হাতে গ্লাভস, চোখে চশমা থাকলে ভালো হয়। পা ভালোমতো ঢেকে রাখতে হবে। মোটা কাপড়ের প্যান্টের সঙ্গে বুটজুতা পরা যেতে পারে, সঙ্গে মোটা কাপড়ের জামাও পরতে হবে।

গাছকাটা হলে গভীর গর্তে পুঁতে ফেলতে হবে। এ ছাড়াও রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় আগাছানাশক ব্যবহার করে এ গাছ দমন করা যায়। সেক্ষেত্রে ডায়ইউরোন, টারবাসিল, ব্রোমাসিল ৫০০ লিটার পানিতে মিশিয়ে হেক্টরপ্রতি প্রয়োগ করতে হবে। আবার প্রতি হেক্টরে দুই কেজি ২.৪ সোডিয়াম লবণ অথবা এমসিপি ৪০০ লিটার পানিতে মিশিয়ে স্প্রে করেও এ আগাছা দমন করা যেতে পারে।

সবচেয়ে ভালো হচ্ছে জৈবিক প্রক্রিয়ায় দমন করলে। তাতে করে ক্ষতির সমূহ সম্ভবনা নেই বললেই চলে। এই পদ্ধতিতে নানা ধরনের পাতাখেকো অথবা ঘাসখেকো পোকার মাধ্যমে পার্থেনিয়াম দমন করা সম্ভব।

কাজেই আমাদের উচিত এখনই সতর্ক হওয়া যেসব জায়গায় পার্থেনিয়াম গাছ দেখা যাবে সেখানে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা মাধ্যমে কৃষকদের অবহিত করে এবং গাছ নিধনের জন্য পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছে কৃষিবিভাগ। তিনি জানান কৃষি জমি বেশিদিন পড়ে থাকলে পার্থেনিয়াম গাছ বিস্তার লাভ করে এক সময় জমটি ফসল অনোপযোগী হয়ে পড়ে। তাই জমিতে ফসল ফলানো বন্ধ রাখা যাবে না।

গুগল অনুসন্ধানে পার্থেনিয়াম সম্পর্কে আরো কিছু তথ্য পাওয়া যায় যা না জানালেই নয়। আগাছাটি মানুষ ও গবাদি পশুর যেমন ক্ষতি করে তেমনি আবার উপকারও করে। এর রয়েছে কিছু ঔষুধি গুণ। এই আগাছা থেকে মানুষের জ্বর, বদহজম, টিউমার, আমাশয়সহ নানা ধরনের জটিল রোগের প্রতিষেধক তৈরি হচ্ছে। এমনকি গবেষকরা মরণব্যাধি ক্যানসারেরও প্রতিষেক তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন। ফলে আমরা ধরে নিতে পারি, উপকার কিংবা অপকার দুটিতে সক্ষম পার্থেনিয়াম। তাই বলে যত্রতত্র এ আগাছার বংশ বিস্তার কারো কাম্য নয়।

ওষুধের প্রয়োজনে সংরক্ষিত এলাকায় এটি চাষাবাদ হতে পারে কিন্তু সেটি আমাদের দেশের জন্য মোটেই নিরাপদ নয়। সুতরাং আমরা এটিকে নিধন করাই শ্রেয় মনে করি। আমাদের কৃষকদেরও সেই পরামর্শ দেব আমরা। প্রয়োজনে এ ব্যাপারে কাউন্সিলিং করতে হবে ব্যাপকভাবে। তবে পার্থেনিয়াম থেকে রেহাই পাওয়া যাবে। অন্যথায় এটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়বে আমাদের দেশে। যেমনি ছড়িয়েছে ব্রাজিল থেকে আগত কুচুরিপানা। যেটি এখন দেশের সমস্ত জলাশয় গ্রাস করে নিয়েছে। সুতরাং পরিত্রাণ পেতে আমাদের এখনই সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে।