জাতিসংঘের ৭৫ বছর: বর্তমান চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনাসমূহ

প্রকাশিত: ৯:০৭ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২০ | আপডেট: ৯:০৭:অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২০

কোভিড-১৯ সংক্রমণের এই ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্য এবার জাতিসংঘের ৭৫ তম বার্ষিকী উদযাপিত হচ্ছে। করোনাভাইরাসের সংক্রমণের কারণে প্রতিদিনে সারাবিশ্বে অনেক মানুষের প্রাণহানি ঘটছে। পাশাপাশি, কোভিড-১৯ এর বিশ্বব্যাপী বিস্তারের কারণে ১৯৩০ সালের পর এবার বিশ্ব অর্থনীতি ভয়াবহ অর্থনৈতিক মন্দার সম্মুখীন হয়েছে। অধিকন্তু, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বন্যা, দাবানল ও নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে মানব জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। করোনকালীন ও করোনা পরবর্তী বিশ্বে তাই জাতিসংঘের মত প্রতিষ্ঠান যার মূল লক্ষ্য বৈশ্বিক ঐক্য ও সম্প্রতি প্রতিষ্ঠা তার গুরুত্ব পরিলক্ষিত হচ্ছে। যদিও সমালোচকদের অনেক প্রশ্ন রয়েছে জাতিসংঘের নানা কার্যক্রম নিয়ে। জাতিসংঘ প্রধানত তিনটি স্তম্ভের উপর গড়ে উঠেছিল। প্রথম স্তম্ভ হচ্ছে, শান্তি। লিগ অব নেশন্সের ধ্বংস স্তূপের ওপর স্নায়ুযুদ্ধের সময় জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠা বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠার আশায়। পর পর দুইটি বিশ্বযুদ্ধ যখন বিশ্বব্যবস্হাকে নাজেহাল করে ফেলেছে তখন শান্তির আশায় জাতিসংঘের আর্বিভাব।

দ্বিতীয় স্তম্ভ হচ্ছে, মানবাধিকার। ১৯৪৮ সালে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে বৈশ্বিক মানবাধিকারের ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষরের মাধ্যমে সদস্যদেশগুলো সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক বিষয়ে জনগণের মৌলিক অধিকারকে স্বীকৃতি দিয়েছিল। যদিও, মাঝে মাঝে কিছু সদস্য রাষ্ট্র বৈশ্বিক মানবাধিকারের চুক্তি থেকে সরে যায় সময় -অসময়ে। তথাপি, বৈশ্বিক মানবাধিকারের যে ঘোষণাপত্র তার গুরুত্ব বিশ্বব্যাপী শান্তি -শৃঙ্খলা রক্ষায় এখনও দৃশ্যমান।

জাতিসংঘের তৃতীয় স্তম্ভ হচ্ছে, উন্নয়ন। জাতিসংঘের সনদ অনুযায়ী, সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সামাজিক অগ্রগতি এবং জীবনযাপনের মান উন্নয়নের জন্য জাতিসংঘ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। উন্নয়নের এই ধারা অনুযায়ী সদস্য রাষ্ট্রগুলোর জনগনের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক সমতা প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করবে জাতিসংঘ। এই লক্ষ্যে বিশ্বব্যাপী উন্নয়নকে সুনিশ্চিত করার জন্য ১৯৪৭ থেকে ১৯৭৩ সালে জাতিসংঘ পাঁচটি আঞ্চলিক কমিশন গঠন করে। উন্নয়নশীল দেশগুলোকে কৌশলগত সহায়তা প্রদানের উদ্দেশ্য জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি বা ইউএনডিপি গঠিত হয়েছে। ইউএনডিপির মূখ্য কাজ হচ্ছে, অনুন্নত, উন্নয়নশীল দেশগুলোকে অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিভিন্নভাবে সহায়তা করা। উন্নয়ন সুনিশ্চিতের লক্ষ্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ. কেনেডির উদ্যোগে জাতিসংঘ ১৯৬০ সালকে উন্নয়নের দশক হিসাবে ঘোষণা করেছিল। এই দশকে উন্নয়নকে সুনিশ্চিত করার জন্য জাতিসংঘ সমতাভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্হার উন্নয়নে কাজ করেছিল। এই সময় ঔপনিবেশিক শাসন থেকে রাষ্ট্রগুলো মুক্তি পেয়ে জাতিসংঘের সদস্য হয়। অর্থনৈতিক উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করার উদ্দেশ্যে

জাতিসংঘ এই সময় ১৯৬৪ সালে বাণিজ্য ও উন্নয়ন সম্মেলনের আয়োজন করেছিল। পরবর্তী সময় থেকে অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য সহায়তা করে যাচ্ছে জাতিসংঘ। এই উদ্দেশ্যে ২০০২ সালে আইএমএফ এবং বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় জাতিসংঘ ” উন্নয়নের জন্য অর্থায়ন” শীর্ষক আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন করে। এরকম আরো দুইটি সম্মেলন পরবর্তীতে ২০০৮ সালে কাতারের দোহায় এবং ২০১৫ সালে ইথিওপিয়ার আদ্দিস আবাবায় আয়োজন করা হয়। আশা থাকবে, অনুরূপভাবে কোভিড-১৯ পরবর্তী অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার কার্যক্রমকে বেগবান করার জন্য জাতিসংঘ উদ্যোগী হবে।

বার্লিন প্রাচীর ধ্বংসের পর জাতিসংঘ মানব উন্নয়নের জন্য নানা উদ্যোগ নিয়েছিল। নারীর ক্ষমতায়ন, উন্নয়নে নারীর অংশগ্রহণ সুনিশ্চিত করার জন্য নানা উদ্যোগ নেয়। পাশাপাশি, জাতিসংঘ তার সামাজিক উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠা করেছে ইউনেস্কো, বিশ্ব স্বাস্হ্য সংস্থা, ইউনিসেফ, বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থার মত সহযোগি সংস্হা। পরবর্তীতে, এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার মত সংগঠন।

জাতিসংঘের পরিবেশ বিষয়ক সংস্থার কথাও না বললে নয়। কেননা, বৈশ্বিক পরিবেশ রক্ষা এবং বাসযোগ্য পৃথিবীর জন্য কাজ করছে এই সংস্হাটি।

কার্যত, এই ৭৫ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর সময়ে সমালোচকদের উদ্দেশ্য বলা যায় যে, জাতিসংঘের পরিব্যাপ্তি নিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। জাতিসংঘ হয়ত নানা বিরোধ মেটাতে পারছে না, এই জন্য আপনারা হতাশ। কিন্তু, এর পিছনে কাজ করছে জাতিসংঘের কিছু সেকেলে নীতিমালা। মূলত, ভেটো ক্ষমতার অপব্যবহার এক্ষেত্রে দায়ী। একারণে, ভেটো ক্ষমতার অপব্যবহার যাতে না হয়, সেক্ষেত্রে কিছু কার্যকর ও গুণগত পরিবর্তন আনা যেতে পারে।

তবে, জাতিসংঘের প্রয়োজনীয়তা এখনও যে রয়েছে তা মেনে নিতেই হবে। জাতিসংঘের সহযোগী সংস্থাগুলোর সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক উন্নয়নের জন্য গৃহীত উদ্যোগগুলোর গুরুত্ব নিঃসন্দেহে দ্বিগুণ গতিতে বৃদ্ধি পেয়েছে।

কোভিড-১৯ পরবর্তী বিশ্বে জাতিসংঘের গুরুত্ব আরো বৃদ্ধি পাবে। কোভিড-১৯ মোকাবিলায় জাতিসংঘের সহযোগী সংস্থা বিশ্ব স্বাস্হ্য সংস্হার উদ্যোগ নিয়ে মার্কিব প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সন্দেহ প্রকাশ করলেও ইউরোপীয় দেশগুলোর সমর্থনে বিশ্ব স্বাস্হ্য সংস্থা কোভিড-১৯ মোকাবিলায় তার কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখে চলেছে। তাছাড়া, কোভিড-১৯ এর কার্যকরী ভ্যাকসিনের সমতার ভিত্তিতে বন্টনকে সুনিশ্চিত করতে হলে জাতিসংঘ এবং বিশ্ব স্বাস্হ্য সংস্থার কার্যকর ভূমিকা আবশ্যক।

করোনা পরবর্তী বিশ্বে অর্থনৈতিক, সামাজিক অগ্রগতিতে জাতিসংঘ ও তার সহযোগী সংস্থাগুলোর অগ্রগামী ভূমিকা অতীব জরুরি। নিঃসন্দেহে, তাই বলা যায় যে, কার্যকরী পরিবর্তন সুনিশ্চিত করার মাধ্যমে জাতিসংঘকে যেমন আরো শক্তিশালী করতে হবে, তেমনিভাবে জাতিসংঘের নানাবিধ ফলপ্রসূ উদ্যোগগুলোর প্রশংসা করে তাকে আরো উৎসাহিত করতে হবে সুন্দর ও সৃজনশীল কাজের জন্য।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। বাংলাদেশ টুডে এবং বাংলাদেশ টুডে-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)