জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ায় অনৈক্যের সুর!

টিবিটি টিবিটি

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ৯:১৩ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২৫, ২০১৮ | আপডেট: ৯:১৩:অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২৫, ২০১৮
ফাইল ছবি

সাম্প্রদায়িক শক্তি জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গ ছাড়া-না ছাড়া, ওয়ান ইলেভেনের কুশীলবদের আনাগোনা, মূল পাঁচ দাবির সাথে বিএনপির চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়াসহ রাজবন্দীদের মুক্তির দাবি সামনে আনা— এসব কারণে জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ায় অনৈক্যের সুর বেজে উঠেছে।

সংশ্লিষ্টদের অনেকেই প্রকাশ্যে ঐক্যের কথা জোর দিয়ে বললেও, ভেতরে ভেতরে গুজুরগুজুর-ফুসুরফুসুর চলছে। অনেকেই বলছেন, সর্বোতভাবে, সুনির্দিষ্ট পয়েন্টে একমত না হলে জাতীয় ঐক্য সম্ভব নয়। আর সে ঐক্য থেকে বড় কিছু অর্জনও করা যাবে না।

এরই মধ্যে উঠেছে নানা প্রশ্ন। বৈঠকগুলোতে ঐক্য প্রক্রিয়ার প্রধানতমদের কোনোটিতে উপস্থিত থাকা কোনোটিতে না থাকা— এসব নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। ফলে প্রক্রিয়ার মধ্যম পর্যায়ের নেতারা খুব একটা আস্থা পাচ্ছেন না।

সবশেষ বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়েছে মঙ্গলবার (২৫ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় যুক্তফ্রন্টের চেয়ারম্যান, ঐক্যের অন্যতম উদ্যোক্তা বদরুদ্দোজা চৌধুরীর বাসায়। তাতে অনুপস্থিত ছিলেন প্রক্রিয়ার অপর অন্যতম প্রধান গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন।

এর আগে একটি কর্মসূচিতে যুক্তফ্রন্টের চেয়ারম্যান বদরুদ্দোজা অনুষ্ঠান শুরুর দেড় ঘণ্টা পর হাজির হয়েও প্রশ্নের জন্ম দেন। এরই মধ্যে একটি কর্মসূচিতে একসময় দেশকে বিরাজনীতিকীকরণের অন্যতম কুশীলব হিসেবে পরিচিত ব্যারিস্টার মঈনুল হোসেনের উপস্থিতিকে রাজনৈতিক দলগুলো ভালোভাবে নেয়নি। আর সর্বোপরি, জামায়াতের গন্ধ যেন এই ঐক্যে না থাকে, সেটা গোড়া থেকে বলে আসছেন এর মূল উদ্যোক্তরা। কিন্তু বিএনপি এই ঐক্য প্রক্রিয়ায় আসার পর সে কথা আর ধোপে টিকছে না। বিএনপি জামায়াতের সঙ্গ ছাড়বে, এমন কথা কোথাও কেউ বলছেন না। অথচ মঙ্গলবার সন্ধ্যার বৈঠকে মাহী বি চৌধুরী স্পষ্ট করে বলেছেন, জামায়াতের সঙ্গে যোগাযোগ আছে, এমন দলকে বাদ দিয়েই ঐক্য করতে হবে। শেষ পর্যন্ত বিএনপি এই ঐক্যে টিকে থাকবে কি না— সে প্রশ্নও উঠে গেছে। আর সে সন্দেহ আরও জোরদার হয়েছে যখন মঙ্গলবার সন্ধ্যার বৈঠকে দলের ভাইস চেয়ারম্যান ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু ছাড়া সিনিয়র আর কাউকে দেখা যায়নি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলেছে, গণফোরাম ও যুক্তফ্রন্টের নিজস্ব তেমন দৃশ্যমান জনবল শক্তি-সমর্থন নেই। জাসদের দলীয় নেতাকর্মী থাকলেও তারা তেমন তৎপর নন। নাগরিক ঐক্যের জনবল ও সমর্থক নেই। ফলে এই ঐক্যে শক্তির অন্যতম উৎসই হতে পারে বিএনপি। নাগরিক ঐক্যের আহবায়ক মাহামুদুর রহমান মান্না আগেই এমন একটি কথা বলেছিলেন সারাবাংলার এই প্রতিবেদককে। কিন্তু বিএনপি এই ঐক্যে ঠিক কতটা সক্রিয় থাকবে বা থাকতে পারবে, তা এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে।

একটি বিষয় এরই মধ্যে নিশ্চিত হওয়া গেছে— বিএনপি কোনোভাবেই চাইছে না যে জাতীয় ঐক্যের মধ্যে ওয়ান-ইলেভেনের কুশীলবরা যুক্ত থাকুক। মাইনাস-টু ফর্মুলার দগদগে ক্ষত তাদের দলের প্রত্যেকের সামনে ভাসছে।

অন্যদিকে ঐক্যের অন্য অনেকে ব্যারিস্টার মঈনুল, তথা ওয়ান ইলেভেনের কুশীলবদের উপস্থিতিতে কোনো ক্ষতি দেখছেন না। তাদের মধ্যে ঐক্যকে জামায়াতের গন্ধমুক্ত রাখা একটা প্রধান চাওয়া। আর বিএনপিকে ঐক্যে রেখে সেটা সম্ভব নয়— সেটা রাজনীতির সকল মহলই এখন ওয়াকিবহাল। গণফোরাম প্রধান ড. কামাল হোসেন ঠিক এভাবেই ভাবছেন ও তার মত তুলে ধরছেন প্রায় সব বক্তৃতা ও সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে আলোচনায়।

অন্যদিকে, ড. কামাল হোসেনের প্রস্তাবে সরাসরি রাজি নন বিকল্পধারা প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক এ কিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী। তিনি এরই মধ্যে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াসহ সকল রাজবন্দিদের মুক্তির প্রস্তাব করেছেন। দল ও ঐক্য সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানাচ্ছে, এক্ষেত্রে ড. কামাল হোসেনের স্পষ্ট কথা— যেসব নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে সুনির্দ্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে এবং যেসব নেতাকর্মী জেলখানায় বন্দি রয়েছেন— তাদের মুক্তি চাওয়া যাবে না। মুক্তি চাইলে আইনের শাসন থাকে না।

এসব নিয়ে জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ায় টানাপড়েন চলছে।

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, গত ২৪ সেপ্টেম্বর মতিঝিলে ড. কামাল হোসেনের চেম্বারে যুক্তফ্রন্টের নেতাদের সঙ্গে জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার নেতাদের একটি বৈঠক হয়। ওই বৈঠকে বদরুদ্দোজা চৌধুরী নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদর রহমান মান্না যোগ দেননি। আবার মঙ্গলবার বিকেল ৪টায় ড. কামাল হোসেনের বেইলি রোডের বাসায় যুক্তফ্রন্টসহ বিএনপির নেতাদের বৈঠক হওয়ার কথা থাকলেও তা হয়নি। বৈঠকটি পরে সন্ধ্যা ৬টায় বসে বি চৌধুরীর বাসায়। এবার ড. কামাল হোসেন ওই বৈঠকে যাননি।

এ বিষয় নিয়ে তার সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা হলে তিনি জানান, অসুস্থতার কারণে বৈঠকে যাননি।

তবে এসব বিষয় নিয়ে বিকল্পধারার সিনিয়র যুগ্ম-সচিব মাহি বি চৌধুরী সারাবাংলাকে বৈঠকের আগেই বলেছিলেন, জামায়াতকে কেন্দ্র করে ঐক্য প্রক্রিয়ায় টানাপড়েন চলছে— এমনটা অস্বীকার করা যাবে না। আর পরে বৈঠকেই তিনি জামায়াত বিষয়ে অবস্থান স্পষ্ট করেছেন।

এ বিষয় জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার সদস্য সচিব আ ব ম মোস্তফা আমিন সারাবাংলাকে বলেন, জাতীয় ঐক্যপ্রক্রিয়া টানাপড়েন নেই। কাল ২৬ সেপ্টেম্বর ইঞ্জিনিয়ারর্স ইনস্টিটিউশনে সুশীল সমাজের সঙ্গে মতবিনিময় হবে। তার মধ্য দিয়ে প্রক্রিয়া এগিয়ে যাবে।

আরেক রাজনীতিক সুলতান মোহাম্মদ মনসুর বলছেন, ফ্রন্টে ফ্রন্টে, দলে-দলে অনৈক্য, মতানৈক্য থাকতে পারে। তবে তার মধ্য দিয়েই জাতীয় ঐক্য এগিয়ে যাবে।