জাবি ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকের পদত্যাগের নেপথ্যে!

প্রকাশিত: ৫:৫৯ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ৮, ২০১৯ | আপডেট: ৫:৫৯:অপরাহ্ণ, নভেম্বর ৮, ২০১৯

শাহাদাত সুমন, জাবি প্রতিনিধি: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) ভিসি অধ্যাপক ফারজানা ইসলামের অপসারণ দাবিতে ক্যাম্পাস উত্তাল। এর মধ্যে জাবি ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক এসএম আবু সুফিয়ান চঞ্চল পদত্যাগ করেছেন বলে জানা গেছে। তার এই পদত্যাগের নেপথ্য কী কারণ থাকতে পারে তা নিয়ে এখন জাবি ক্যম্পাস আলোচলনায় শীর্ষে।

মঙ্গলবার কেন্দ্রীয় দফতর সেলে তিনি পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন। ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় দফতর সম্পাদক আহসান হাবিব এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তবে কি কারণ দেখিয়ে পদত্যাপত্র জামা দিয়েছেন সেটি নিশ্চিত করেননি আহসান হাবিব।কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্য বিষয়টি শুনেছেন বলে নিশ্চিত করেছেন।

কী কারণে পদত্যাগ করেছেন সে বিষয়ে কিছুই জানাতে চায়নি কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ। তবে অনেকেই বলেছেন তার পদত্যাগের পিছনে ২৫ লক্ষ টাকার ইদ সালামীর অভিযোগটি থাকতে পারে।

জাবির অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্পে ছাত্রলীগকে দেওয়া ২ কোটি টাকা মধ্যে চঞ্চল ২৫ লক্ষ টাকা নিয়ে নিজ গ্রামের বাড়ি দিনাজপুর চলে যায় বলে জানিয়েছে জাবির একাধিক নেতাকর্মীরা। দিনাজপুরে খোজ নিলে অনেকেই জানান তিনি সেখানে ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েছে। ক্যাম্পাসের অনেকেরই দাবি করে ২৫ লক্ষ টাকা দিয়ে সে ব্যবসা শুরু করেছে। তিনি আর ক্যাম্পাসে ফিরবেন না বলেও জানিয়েছিল ছাত্রলীগের একাধিক নেতারা।

এদিকে গত আগস্টে বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘উপাচার্য অধ্যাপক ফারজানা ইসলাম ছাত্রলীগকে ২ কোটি টাকা দিয়েছেন’ বলে অভিযোগ উঠে। এ নিয়ে কয়েকটি জাতীয় দৈনিকে খবর প্রকাশিত হয়। এমন সময়ই ক্যাম্পাস থেকে সটকে পড়েন আবু সুফিয়ান চঞ্চল। এরপর উপাচার্যের কাছ থেকে ‘ঈদ সালামির নামে কোটি টাকা’ পাওয়ার কথা স্বীকার করে ছাত্রলীগের একটি অংশ। এতে ইমেজ সংকটে পড়ে ছাত্রলীগ। নিজেকে বাচাঁতে চঞ্চল পদত্যাগ করছে বলেও মনে করেন অনেকে।

এদিকে চঞ্চল টাকার ভাগ নিজ গ্রুপের নেতাকর্মীকে না দেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করে অনেকে। দীর্ঘদিন ক্যাম্পাসে না থাকায় সাংগঠনিক কার্যক্রমে হতাশা দেখা দেয় তার গ্রুপের নেতাকর্মীর মাঝে। অভিযোগ আছে ক্যাম্পাস ছেড়ে যাওয়ার পর তিনি নেতাকর্মীর ফোন আর রিসিভ করেননি। সাংবাদিকরাও ফোন দিলে তিনি ফোন রিসিভ করেন না।

এদিকে জাবি শাখার ছাত্রলীগের তিন নেতা ইদ সেলামী কথা গনমাধ্যমে স্বীকার ও সাদ্দাম রব্বানির ফোনালাপ ফাঁস হলে বিপাকে পড়েছে চঞ্চল এবং এজন্য তিনি আর ক্যাম্পাসে ফিরেননি দীর্ঘদিন এবং সর্বশেষ তিনি পদত্যাগ করলেন।

এছাড়া ৪ নভেম্বর উপাচার্য পতনের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষক শিক্ষার্থীদের একাংশ ভিসির বাসা অবরোধ করলে সভাপতি জুয়েল রানার নেতৃত্বে ছাত্রলীগ হামলায় চালায়। সেখানে ৩৫ জন আহত হওয়ার পর কমিটি ভেঙ্গে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। কমিটি ভেঙ্গে দেওয়ার আগে নিজের সম্মান রক্ষায় চঞ্চল পদত্যাগপত্র জমা দিতে পারে বলে মনে করে অনেকে।

এদিকে কেউ কেউ মনে করেছে কমিটির মেয়াদ শেষ হতে চলেছে প্রায় দুই বছর। ক্ষোভ, হতাশা আর রাজনৈতিক কোন্দলে ক্যাম্পাস ছেড়েছেন অনেক শীর্ষ নেতা। তা ছাড়া নিজেদের মধ্যে নিত্যনৈমিত্তিক মারামারি তো রয়েছেই।

এ ছাড়া অন্য সিনিয়র নেতারাও রাজনীতি থেকে নিষ্ক্রিয়। এমন অবস্থায় নেতৃত্ব সংকট প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগে। ছাত্রলীগের এই সংকট নিরসনে নতুন কমিটির জন্য তার এই পদত্যাগ হতে পারে বলে মনে করেছে ক্যাম্পাসের নেতাকর্মীরা।

জানা যায়, কমিটির মেয়াদ অনেক আগে শেষ হওয়ায় সংগঠনের শীর্ষ নেতাদের অধিকাংশই রাজনীতি থেকে দূরে আছেন।জাবি ছাত্রলীগের ৪৪ জন সহসভাপতির মধ্যে ২২ জনের কেউ কেউ ক্যাম্পাস ছেড়েছেন, কেউ বিবাহিত ও কেউবা চাকরিতে যোগ দিয়েছেন।

পদ পাওয়ার পর থেকে ১নং সহসভাপতি মিনহাজুল আবেদীন মিনহাজকে রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয় করে রাখা হয়েছে। আর ভিসির কাছ থেকে ‘কোটি টাকা ঈদ সালামি’ পেয়েছেন এমন স্বীকারোক্তির পর চাপের মুখে ক্যাম্পাস ছেড়েছেন ১নং যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. সাদ্দাম হোসেন।

এ ছাড়া ৯ জন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের মধ্যে চাকরিজীবী দুজনসহ পাঁচজন ক্যাম্পাস ছেড়েছেন। আর ৯ জন সাংগঠনিক সম্পাদকের মধ্যে পাঁচজন চাকরিজীবী ও বিবাহিত। সভাপতি-সম্পাদকের বাইরে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রচার সম্পাদক ও দফতর সম্পাদকের দুজনই ক্যাম্পাস ছেড়েছেন। এ ছাড়া অন্যান্য অন্তত ১১ সম্পাদক পদধারী নেতার কেউ চাকরিজীবী, কেউ বিবাহিত ও কেউ ক্যাম্পাস ছাড়া।

এই ভঙ্গুর কমিটির ভেঙ্গে নতুন কমিটি গঠনের জন্যও তার পদত্যাগ হতে পারে।
শাখা ছাত্রলীগের একাধিক নেতা অভিযোগ করে বলেন, চঞ্চলকে সাধারণ সম্পাদক করা হলেও তিনি সাংগঠনিকভাবে দক্ষ নন। ছাত্রলীগের সংকটকালীন মুহূর্তে তিনি বারবার ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন। তিনি নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রাখতেন। সংগঠনের কর্মসূচি পালনেও তার তেমন আগ্রহ ছিল না।

এ বছর শোকাবহ আগস্টের হলভিত্তিক অনুষ্ঠানের মাত্র দুটিতে উপস্থিত ছিলেন তিনি। এমনকি হলে উপস্থিত থেকেও তিনি নিজ হলে আয়োজিত কর্মসূচিতেও অংশগ্রহণ করেননি। তার এই সাংগঠনিক দুর্বলতার কারণেও পদত্যাগ নতুন নেতৃত্ব তৈরি করার জন্য পদত্যাগ করতে পারেন।

জানা যায়, ২০১৬ সালের ২৭ ডিসেম্বর ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের মো. জুয়েল রানাকে সভাপতি এবং নৃবিজ্ঞান বিভাগের এস এম আবু সুফিয়ান চঞ্চলকে সাধারণ সম্পাদক করে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি) শাখা ছাত্রলীগের দুই সদস্যবিশিষ্ট আংশিক কমিটি ঘোষণা করে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটি। পরের বছরের ২৮ এপ্রিল ২১৪ সদস্য বিশিষ্ট পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষিত হয়। এক বছর মেয়াদি সেই কমিটি এরই মধ্যে পার করেছে দুই বছর ১০ মাস।