জার্মানির তুরস্ক ঘেরাও ও সিরিয়াকে ভাগ-বাটোয়ারা

টিবিটি টিবিটি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ৩:০৮ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ৬, ২০১৮ | আপডেট: ৩:০৮:অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ৬, ২০১৮

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে মিত্রশক্তির ব্রিটেন চেষ্টা করেছিল তুরস্ককে যুদ্ধে জড়াতে। ১৯৪৩ সালে তুরস্কের শহর আদানা এবং মিশরের কায়রো সম্মেলনে ব্রিটেন এ চেষ্টা করে।

তবে ব্রিটেন আরো আগেই সিরিয়া অভিযানে তুরস্ককে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছিল।

তুরস্ককে ঘিরে ফেলে জার্মান:

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রথম বছরে জার্মানিকে থামানো যায়নি। যুগোস্লাভিয়া ও গ্রীস দখলের পর ১৯৪১ সালের মে মাসে জার্মানি গ্রীসের ‘ক্রিট’ দ্বীপ দখল করে। জার্মানির উদ্দেশ্য ছিল মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব বিস্তার করা।

এছাড়া সে সময় সিরিয়া জার্মানির দখলে ছিল। কারণ ফ্রান্সের মার্শাল ফিলিপ পাতিন তখন সিরিয়া নিয়ন্ত্রণ করছিলেন। ফিলিপ পাতিনের শাসন ‘ভিকি ফ্রান্স’ নামে পরিচিত ।

উল্লেখ্য, ১৯৪০ সালে জার্মানির কাছে আত্নসমর্পণের পর থেকে জার্মানির হয়ে ভূমিকা রাখতে শুরু করেন মার্শাল ফিলিপ পাতিন।

মার্শাল ফিলিপ পাতিন সিরিয়ার আল-আজমের রাজত্ব কেড়ে নিয়ে খালিদ আল-আজমের অধীনে দেশটিতে সরকার গঠন করেন। আল-আজমের পরিবার ছিল সিরিয়ার অনেক প্রভাবশালী। জার্মানি এ সময় ভিকি ফ্রান্স শাসনের অধিনে সিরিয়ায় প্রতিনিধি নিয়োগ দেয়।

জার্মানি তখন থেকে সিরিয়াকে তাদের ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করতে থাকে। ওই সময়ে জার্মান সমর্থকদের দ্বারা ইরাকে অভ্যুত্থান হয়।

ফলে সিরিয়া ও ইরাকে জার্মানির কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। তুরস্কের দক্ষিণের এই দুই দেশ করায়াত্ব হওয়ায় বলা যায়, তুরস্ক জার্মানিদের দ্বারা ঘেরাও হয়ে পড়ে।

ব্রিটেন জার্মানির এই তৎপরতায় ক্ষুব্ধ হয়। মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব হারানোর শঙ্কায় তারা ভীত হয়ে পড়ে।

ব্রিটেন চাচ্ছিলো তুরস্ক যেন সিরিয়া আক্রমণ করে। দেশটিতে প্রভাব পুনরুদ্ধার করতে সিরিয়ার দক্ষিণ দিক থেকে তুরস্ক এবং উত্তর দিক থেকে ব্রিটেন হামলা করবে এমন পরিকল্পনা করে তারা। ব্রিটেন চেয়েছিল তুরস্ক তাদের এই পরিকল্পনায় সাড়া দিক।

সিরিয়া আক্রমণের পরিকল্পনায় রাজি করাতে বৃটিশ রাষ্ট্রদূত তুরস্কের কর্মকর্তাদের সাথে আঙ্কারায় সাক্ষাত করেন। তারা ১৯৪১ সালের জুনের শুরুতে সিরিয়ায় হামলা করতে তুরস্ককে উৎসাহিত করতে থাকেন।

সে সময় এই পরিস্থিতি গণমাধ্যমে বেশ আলোচিত হয়। যারা এই পরিকল্পনার পক্ষে সমর্থন দেন তারা এটাকে শুধু সিরিয়া জয় করা নয়; সেই সাথে প্রতিবেশি দেশকে শত্রুমুক্ত করার বিষয়টিও প্রাধান্য দিচ্ছিলেন।

যাইহোক, এটা করলে তুরস্ক যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নিজেদের জড়িয়ে ফেলতো সে ব্যাপারে কোন সন্দেহ ছিল না। এছাড়া এর মাধ্যমে জার্মানির বিরুদ্ধে নতুন হুমকি হিসেবে তুরস্কের আবির্ভাব ঘটতো।

নতুন বিশ্বযুদ্ধে তুরস্ক:

সাংবাদিক ইউনুস নাদী এ ধরণের পরিকল্পনার সমালোচনা করে পত্রিকায় নিবন্ধ লিখেছিলেন। ১৯৪১ সালের ২৫ মে ‘নতুন বিশ্বযুদ্ধে তুরস্ক’ শিরোনামে কামহারিয়েত পত্রিকায় তিনি ওই নিবন্ধ লেখেন।

সেখানে তিনি লিখেছিলেন, ‘সিরিয়া অভিযানে আমাদের অংশগ্রহণ যারা চাচ্ছেন, তাদের জানা দরকার যে, শুধু দক্ষিণ সীমান্তে বা সিরিয়াতে অভিযান চালিয়ে দেশটিকে শত্রুমুক্ত করা যাবে না।’

ইস্তাম্বুল থেকে তুর্কি মুখপাত্র লন্ডন রেডিওতে যুদ্ধ সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেছেন, ‘তুরস্কের নিরাপদ স্থানগুলো এখন ঝুঁকির মধ্যে। জাতির নিরাপত্তার বিষয়ে আমরা চিন্তিত।’

‘সেজন্য বিশ্বযুদ্ধ সম্পর্কে আমরা নীতি পরিবর্তন চাই। যারা সিরিয়ায় আক্রমণের পক্ষপাতি নন তারা জনগণের স্বাধীন মত প্রকাশের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন।’

‘সিরিয়ার স্বাধীনতার কথা বলে আমরা কি যুদ্ধে জড়াবো? আমরা মনে করি তুরস্ক তার সতর্ক এবং শক্তিশালী নীতি থেকে সরে আসবে না।’

ব্রিটেনের সিরিয়া দখল:

ব্রিটেনের চেষ্টা সত্ত্বেও তুরস্কের প্রেসিডেন্ট ইসমেত ইনোনু সিরিয়ায় অভিযান চালিয়ে বিশ্বযুদ্ধে জড়াতে রাজি হননি।

এদিকে গণমাধ্যম ও কুটনীতিক পর্যায়ে ব্রিটেন ও তুরস্কের সমঝোতার আলাপ চলমান অবস্থাতেই ব্রিটেন ও ফ্রান্সের ‘ভিকি ফ্রান্সের’ বিরোধী সেনারা সিরিয়া ও লেবাননে হামলা করে।

১৯৪১ সালের জুন ও জুলাই মাসে সিরিয়ায় তারা মার্শাল ফিলিপ পাতিনের সেনাদের পরাজিত করে।

সিরিয়াকে ভাগাভাগি ও সাইকস-পিকট সমঝোতা:

একটু পেছনে ফেরা যাক। প্রথম বিশ্বযুদ্ধকালীন সময়ের ঘটনা।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে পরাজিত অটোমান সাম্রাজ্যের ভূখন্ড ব্রিটেন ও ফ্রান্স নিজেদের মধ্যে ভাগ বাটোয়ারা করতে ১৯১৬ সালে একটি চুক্তি করে।

ফ্রান্সের পক্ষ থেকে ফ্রান্সিস জর্জ পিকট ও ব্রিটেনের পক্ষ থেকে মার্ক সাইকস আলোচনায় অংশ নিয়ে সমঝোতায় উপনিত হন। এই দুই জনের নাম অনুসারে এই চুক্তির নাম দেয়া হয় ‘সাইকস-পিকট চুক্তি’।

যেভাবে ভাগাভাগি করা হয়:

চুক্তি অনুযায়ী ফ্রান্স নেয় সিরিয়া, লেবানন এবং তুরস্কের আদানা ও মারসিন প্রদেশ। ইরাকের বাগদাদ-বসরা থেকে ভূমধ্য সাগরের হাইফা বন্দর (বর্তমানে ইসরাইলের অন্তর্গত) পর্যন্ত মধ্যবর্তী সকল অঞ্চল নেয় ব্রিটেন।

অর্থাৎ বর্তমান ইসরাইলের ‘একর বন্দর’ থেকে ‘ইরাকের কিরকুক’ পর্যন্ত লাইনের উত্তর অংশ নেয় ফ্রান্স এবং লাইনের দক্ষিণ অংশ নেয় ব্রিটেন।

ব্রিটেন ও ফ্রান্স ঐক্যমতে আসার পর রাশিয়াকে চুক্তির বিষয়ে জানায়। এই তিন দেশের মধ্যে আলোচনা শুরু হয় ১৯১৬ সালে। রাশিয়ার পক্ষে আলোচনায় ভূমিকা রাখতেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী সার্জেই সাজনভ।

রাশিয়া আনাতোলিয়ার (তুরস্ক) উত্তর-পশ্চিমাংশ দাবি করে। ইস্তাম্বুল ও বসফরাস প্রণালীর যে অংশগুলো ব্রিটেন ও ফ্রান্স নিতে চেয়েছে সেটা রাশিয়া নিতে চেয়েছিল।

কিন্তু ১৯১৭ সালে রাশিয়াতে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব হলে এই আলোচনা থেকে রাশিয়া বের হয়ে যায়।

অবশ্য চুক্তির শর্তে ফ্রান্স ও ব্রিটেন অটল থাকতে পারেনি। সিরিয়া ছাড়তে অপারগতা দেখায় ব্রিটেন। অন্যদিকে ফ্রান্স দাবি করতে থাকে চুক্তি অনুযায়ী ব্রিটেনকে সিরিয়া ছাড়তে হবে।

পরবর্তীতে অবশ্য সিরিয়া ও লেবাননের ওপর ফ্রান্সের অধিকার মেনে নিয়ে ব্রিটেন ঐ এলাকা ছেড়ে চলে যায়।

ফ্রেন্স ম্যান্ডেড ইন সিরিয়া:

১৯১৮ সালে অটোমান সম্রাজ্যের পতন হলে সিরিয়া ২ বছর ব্রিটেন ও ফ্রান্স থেকে মুক্ত ছিল। ১৯২০ সালে ফ্রান্সের সৈন্যরা সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কে প্রবেশ করে। ১৯২২ সালে ফ্রান্স ম্যান্ডেট অফ সিরিয়া সরকার লীগ অফ নেশনের অন্তর্ভুক্ত হয়।

স্বাধীন সিরিয়া:

১৯৪১ সালের জুন মাসে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মিত্রশক্তি সিরিয়ায় প্রবেশ করে। ফ্রান্সের জেনারেল চার্লস ডি গলি স্থানীয় জনগণকে স্বাধীন সিরিয়ার প্রতিশ্রুতি দেন।

১৭ এপ্রিল ১৯৪৬ সালে ফ্রান্স সিরিয়া থেকে বিদায় নেয়। সেজন্য ১৭ এপ্রিল সিরিয়ার জাতীয় দিবস হিসেবে পালিত হয়।

লেখক: এরহান আফিয়ুনসু, তুর্কি ইতিহাসবিদ।
তুরস্কের গণমাধ্যম ডেইলি সাবাহ’য় ‘Power struggles in Syria for the last century’ শিরোনামে প্রকাশিত নিবন্ধ অবলম্বনে।