জীবনের বাজি রেখে ‘শীর্ষ জঙ্গি’কে গ্রেফতার করে পুরষ্কারের বদলে চাকরি হারালেন এসআই সাজু

টিবিটি টিবিটি

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ১০:৪৮ পূর্বাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ২, ২০১৯ | আপডেট: ৮:৫৬:অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ৪, ২০১৯
ফাইল ছবি

মানুষের নিরাপত্তা ও জানমাল রক্ষার শপথ নিয়ে পুলিশের চাকরিতে ঢুকেছিলেন শফিকুল ইসলাম সাজু। তিনি তার শপথ রেখেছেন। কিন্তু তার এই শপথ রাখার মূল্য দিতে পারেনি রাষ্ট্র। বাংলাদেশে জেএমবি উত্থানের তথ্য সর্বপ্রথম তিনিই প্রকাশ্যে এনেছিলেন।

জীবনবাজি রেখে যুদ্ধ করেছিলেন ভয়ঙ্কর জঙ্গিদের সঙ্গে। গ্রেফতার করেছিলেন বাংলাভাইয়ের মতো শীর্ষ জঙ্গি নেতাদের। মামলার বাদীও ছিলেন তিনি। সাহসী এই পুলিশ কর্মকর্তা পুরস্কৃত হওয়ার পরিবর্তে চাকরি হারিয়েছেন।

তিনি বলেছেন, শীর্ষ জঙ্গি নেতা ছিদ্দিকুর রহমান বাংলাভাই, আতাউর রহমান সানি, আবদুল আউয়াল, আনোয়ার সাদাতসহ ৩৩ জঙ্গিকে গ্রেফতার এবং তাদের বিরুদ্ধে মামলার বাদী হওয়াটাই আমার জীবনের কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সেদিন জীবন বাজি রেখে শীর্ষ জঙ্গি নেতাদের গ্রেফতার না করলে হয়তো আজ আমাকে পরিবার-পরিজন নিয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরতে হতো না। ২০০৯ সালের জাতীয় নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর আলোর মুখ দেখতে পাই।

প্রধানমন্ত্রীর এক ঘোষণার পর রিভিউ আবেদন করি। কিন্তু চাকরির বিষয়ে আমার করা সেই রিভিউ আবেদন বিগত ১০ বছর ধরেই মন্ত্রণালয়ে পড়ে আছে। উল্লেখ্য, চাকরিচ্যুত হওয়ার আগে বিগত আট বছরের চাকরি জীবনে ৩৬ বার পুরস্কার পান শফিকুল ইসলাম সাজু।

২০০৩ সালের ১৪ আগস্ট গভীর রাতে পুলিশের কাছে খবর আসে- জয়পুরহাট জেলার ক্ষেতলাল থানা এলাকার মহেশপুর গ্রামের মন্তেজার রহমানের বাড়িতে জঙ্গিদের প্রশিক্ষণ চলছে। সারা দেশ থেকে জঙ্গিরা সমবেত হয়েছে সেই বাড়িতে।

এমন খবর পেয়ে সদর থানা পুলিশ জেলা পুলিশের নির্দেশনায় সেই গ্রামে অভিযান চালায়। যদিও এলাকাটি ছিল ক্ষেতলাল থানা এলাকার। সদর থানার ওসি ইকবাল শফি ও একই থানার এসআই শফিকুল ইসলাম সাজুর নেতৃত্বে ১০/১২ জন অভিযানে অংশ নেয়।

গভীর রাতে মন্তেজার রহমানের বাড়ির প্রাচীর টপকিয়ে প্রবেশ করে বাড়ির দরজা খুলে দেয় এসআই শফিকুল। এক পর্যায়ে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ বাধে। ওসি ফোনে এসপির সঙ্গে কথা বলেন। এসপি তাদের কৌশলে আটকে রাখতে বলেন।

অতিরিক্ত পুলিশ পাঠানো হবে বলে এসপি আশ্বাস দেন। কিন্তু দীর্ঘ সময়ে পুলিশ আসে না। স্বল্প সংখ্যক পুলিশ জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করতে থাকে। দুই কনস্টেবল আহত হলে জঙ্গিরা তাদের শর্টগান ছিনিয়ে নেয়। অতিরিক্ত পুলিশ ইতিমধ্যে চলে আসে।

পাকড়াও হয় শীর্ষ জঙ্গিদের ৩৩ জন। বাকিরা পালাতে সমর্থ হয়। ক্ষেতলাল থানায় হাজির হয়ে এসআই শফিকুল বাদী হয়ে মামলা করেন। মামলা নং-৬(৮)২০০৩। গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে আতাউর রহমান সানি (জামালপুর), ছিদ্দিকুর রহমান বাংলা ভাই (বগুড়া), মামুনুর রশিদ (গাইবান্ধা) ও আবদুল আউয়ালসহ (নাটোর) ময়মনসিংহের ত্রিশালে পুলিশের ভ্যান থেকে পলাতক আসামি সালাউদ্দিন সালেহীনও ছিল।
Add Image
যদিও এরা প্রত্যেকেই পরে ছাড়া পান। পরে আবারও গ্রেফতার হয়। প্রথম চারজনের ফাঁসির রায় কার্যকর হয়। ঘটনাটি সে সময়ে দেশ-বিদেশে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করলেও কয়েক দিনের মধ্যে প্রেক্ষাপট বদলে যায়।

প্রথমে অস্ত্র হারানোর অপরাধে দুই কনস্টেবলকে চাকুরিচ্যুত করা হয়। কিন্তু তারা বিশেষ জেলার লোক হওয়ায় কিছুদিনের মধ্যেই চাকরি ফিরে পান। অন্যদিকে ওসি ইকবাল শফির ওয়াকিটকি হারানোর অপরাধে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হলেও তা থেকে তিনি খালাস পান।

অথচ সমস্ত কৃতিত্ব এসআই শফিকুলের, তদুপরি অদৃশ্য শক্তির রোষানলে পড়তে হয় তাকে। কয়েক দিনের মধ্যে তার পঞ্চগড়, খাগড়াছড়ি ও ডিএমপিতে একই সঙ্গে বদলি আদেশ হয়, যা নিয়মনীতি পরিপন্থী।

এসআই শফিকুল ডিএমপিতে যোগদান করলে জয়পুরহাট জেলার পুলিশ সুপার এসআই শফিকুলকে ওই ঘটনায় বিভাগীয় মামলার দণ্ডস্বরূপ ‘ব্লাক মার্ক’ দিয়ে ডিএমপিতে পাঠান। যার ফলে ডিএমপির ঊর্ধ্বতন পুলিশের কাছে এসআই শফিকুল চোখের বালি হয়ে যায়।

এসআই শফিকুল মিরপুর থানায় কর্মরত থাকা অবস্থায় থানার ওসি ছিলেন ইন্তেজার রহমান। যিনি ঢাকাস্থ বগুড়া সমিতির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ২০০৪ সালে ইন্তেজার রহমান ছিলেন একজন ক্ষমতাধর ওসি। নানাভাবে তাকে সমস্যায় ফেলার চেষ্টা করা হয়।

অবশেষে একটি ঘটনার সঙ্গে তাকে জড়িয়ে অভিযুক্ত করা হয়। একই ঘটনায় ওসি ও আরেক এসআই অভিযুক্ত হলেও তারা ছাড় পেয়ে যান। তাদের স্থলে শফিকুলের নাম যুক্ত করে দেওয়া হয়। যে ঘটনার আশপাশেই ছিলেন শফিকুল।

ওই ঘটনায় এসআই শফিকুলের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা নং-৫৩/২০০৫, তাং-১০/০৩/২০০৫ (পিআরবি মূলে) রুজু করান। ডিসি কোহিনুর মিয়া এসআই শফিকুলকে পিআরবি আইনে বাৎসরিক ইনক্রিমেন্ট কর্তনের দ- প্রদান করেন।

এসআই শফিকুল ইসলাম সাজু সরাসরি এসআই পদে নিযুক্ত। তাই দণ্ডটি বাংলাদেশ সংবিধানের ১৩৫(১) অনুচ্ছেদ পরিপন্থী। এসআই শফিকুল বলেন, তিনি ডিএমপি পুলিশ কমিশনার বরাবরে আপিল করেন। ডিএমপি হেডকোয়ার্টারে যার মাধ্যমে আপিল করতে হয় তিনি ছিলেন আর আই ইউনুস আলী।

তিনিও ছিলেন বগুড়ার লোক এবং ওসি ইন্তেজারের পরম বন্ধু। ফলে আপিলে তার সাজা মওকুফ না করে বরং তাকে চাকরি হতে সরিয়ে দেওয়া হয়। পরে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর তিনি রিভিউ করেন। কিন্তু সেটিও আর আলোর মুখ দেখেনি।সুত্রঃবাংলাদেশ প্রতিদিন