ঢাকা ছেড়ে আসা শত শত মানুষকে মতলবে ১৫দিন খাওয়াই : সুবোধ রঞ্জন সাহা

শরণার্থীর খোজে: পর্ব-১৯

শাহজাদা এমরান শাহজাদা এমরান

কুমিল্লা প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ৯:৩৫ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ২৪, ২০২০ | আপডেট: ৯:৩৫:অপরাহ্ণ, নভেম্বর ২৪, ২০২০

শাহাজাদা এমরান: ২৫ মার্চের কালো রাতে ঢাকার ঘুমন্ত শান্তিপ্রিয় মানুষ গুলোর উপর পাকিস্থানী হায়না হানাদার বাহিনীর ইতিহাসের বর্বরতম নির্মম হামলা হত্যাযজ্ঞের পর ২৬ মার্চ সকাল থেকে সদর ঘাট দিয়ে হাজার হাজার মানুষ ঢাকা ছাড়তে শুরু করে। জীবন বাঁচাতে সেই সময় অসহায় মানুষগুলোর সে যে কি আর্তনাদ তা নদীর পার ছিলাম বলেই নিজ চোখে অবলোকন করেছি। মতলব দক্ষিণের আমাদের মাছোয়া খাল বাজারে এসে ঢাকার লঞ্চ গুলো যখন আসত তখন ক্ষুধার্থ, ঘুমহীন অসহায় মানুষগুলোর চোখে মুখে ছিল এক ভয়ার্ত চিহ্ন। নায়ের গাঁও ইউনিয়নের খরগপুর গ্রামের বিশিষ্ট সমাজ সেবক আবদুল মান্নান ভাই তাৎক্ষণিক বাজারে বসে সিদ্ধান্ত নিলেন ঢাকা সদর ঘাট ও নারায়নগঞ্জ থেকে ছেড়ে আসা যে লঞ্চগুলি আমাদের এখানে থামবে প্রত্যেক যাত্রীকে আমরা এক বেলা খাওয়াবো। যেই কথা সেই কাজ। সাথে সাথে মাছুয়াখাল বাজারের আশেপাশের গ্রাম গুলোর তরুণ ছেলেদের খবর দেওয়া হলো। তখন আমিও ডাকে সাড়া দিয়ে আসলাম।

মান্নান ভাই বললেন, তোমরা ছেলেরা কয়েকটা দলে ভাগ হয়ে গ্রামে গ্রামে গিয়ে চাল, ডাল, পেঁয়াজ ও মরিচ যে যা দেয় উঠাও। আমি বাজারটা দেখছি। তিনি সাথে সাথে ডেকোরেটার থেকে পাতিল এনে বাবুর্চিকে খবর দিলেন। শুরু হলো খিচুরী রান্না করা। আমার স্পস্ট মনে আছে ২৬ মার্চ থেকে ১০ এপ্রিল পর্যন্ত এই ১৫ দিন আমরা হাজার হাজার ঢাকা ও নারায়নগঞ্জ ফেরত অসহায় মানুষ গুলোকে খাওয়ায়েছিলাম। কারণ, যে যেভাবে পাড়ছে শহর ছেড়ে আসছে। লঞ্চেও কোন খাবার ছিল না। সবাই ছিল ক্ষুধার্থ। সেদিনের সেই ক্ষুধার্থ মানুষ গুলোর মুখে খাবার তুলে দেওয়ার স্মৃতি আমার জীবনের সেরা স্মৃতি হয়ে আছে। কথাগুলো বললেন কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারের সাবেক সিনিয়র জেল সুপার সুবোধ রঞ্জন সাহা। গত ১৪ নভেম্বর সকালে দৈনিক আমাদের কুমিল্লা অফিসে শরণার্থী হিসেবে তার একান্ত সাক্ষাৎকার গ্রহন করা হয়।

সুবোধ রঞ্জন সাহা। পিতা হরেন্দ্র চন্দ্র সাহা ও মাতা ভাষণা রাণী সাহা। ১৯৫৬ সালে চাঁদপুর জেলার মতলব দক্ষিণ উপজেলার খাদের গাঁও ইউনিয়নের মাছোয়া খাল গ্রামে তিনি জন্ম গ্রহন করেন। পিতা মাতার পাঁচ ছেলে ও তিন মেয়ের মধ্যে তার অবস্থান চতুর্থ। দেশে যখন যুদ্ধের দামামা বেজে উঠেছে তখন তিনি নারায়নপুর পপুলার হাই স্কুলের এসএসসি পরীক্ষার্থী ছিলেন।

যুদ্ধ শুরুর পর আর শরণার্থী হয়ে ভারত যাওয়ার আগ পর্যন্ত মতলবের অবস্থা কেমন ছিল জানতে চাইলে সুবোধ রঞ্জন সাহা বলেন, তখন মতলব একটাই ছিল। উত্তর দক্ষিণ ভাগ হয়নি। আমরা দেশের অন্যান্য এলাকার জনগণ থেকে অনেক আপডেট থাকতাম। কারণ, ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ থেকে যে সকল লঞ্চ ছেড়ে আসত প্রত্যেকটি লঞ্চ আমাদের মাছোয়া খাল বাজারে স্টপ দিত। আর ঢাকার সকল পত্রিকা আমরা সকালেই লঞ্চঘাটে এসে পেয়ে যেতাম। ফলে, আমরা পত্রিকা পড়ে সব সময় আপডেট থাকতাম। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের পরই দেশের পরিস্থিতি যুদ্ধের দিকে মোড় নিতে থাকে। ২৬ মার্চ সকালে ঘুম থেকে উঠেই দেখি সবাই বাজারের দিকে যাচ্ছে। পরে জানলাম, গেল রাতে পাকিস্থান হানাদার বাহিনী ঢাকায় অসংখ্য মানুষকে মেরে ফেলছে। নির্বিচারে বাসায় বাসায় হামলা চালিয়েছে। আগুন দিয়ে জ¦ালিয়ে দিয়েছে অসংখ্য স্থাপনা। যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। তাই ঢাকা নারায়ণগঞ্জ শহরের মানুষ যে যেভাবে পারছে শহর ছাড়ছে। লঞ্চ এসে যখন আমাদের মাছোয়াখাল বাজারে ষ্টপ করত তখন ক্ষুধার্থ যাত্রী গুলো বাজারে ঘুরে খাবারের জন্য অস্থির হয়ে যেত। গ্রামের বাজার তো আর এত মানুষের খাবারের চাহিদা মেটাতে পারবে না। তাই আমাদের সমাজ সেবক আবদুল মান্নান ভাইয়ের নেতৃত্বে আমরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে চাল ডাল উঠিয়ে আনতাম। আর নেতারা খিচুরী রান্না করে লঞ্চ যাত্রীদের খাওয়াতেন। এটি ১০ এপ্রিল পর্যন্ত আমরা চালাতে পেরেছি। পরে যুদ্ধের ভয়াবহতা বেড়ে গেলে এক পর্যায়ে লঞ্চ চলাও বন্ধ হয়ে যায় এবং পাকিস্থান হানাদার বাহিনী গ্রাম পর্যায়ে চলে আসে।

শরণার্থী হয়ে কবে ভারত গেলেন জানতে চাইলে সুবোধ রঞ্জন সাহা বলেন, মে মাসের শুরুতে আমাদের গ্রাম পর্যায়ে যখন সেনাবাহিনী চলে আসল তখন আমরা ভয় পেয়ে যাই। আমাদের পাশের গ্রামের কয়েকটি বাড়ি পুড়িয়ে দিল। এরপরই আমরা ভারতে চলে যাওয়ার চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিলাম। একদিন রাতে বাড়ি থেকে একটি বড় নৌকা রিজার্ভ করে আমরা পরিবারের সবাই রওয়ানা হয়ে কুমিল্লার চান্দিনার মহিচাইল আসি আমাদের এক আত্মীয়ের বাড়িতে। এই বাড়িতে দিনে থেকে আবার রাতে আমরা রওয়ানা দেই। চান্দিনা থেকে কখনো রিক্সায় কখনো পায়ে হেঁটে আমরা কুমিল্লা শহরের উত্তর দিক দিয়ে ভারতের মেলাঘর যাই। কোন রাস্থা দিয়ে কিভাবে গিয়েছি এটা এখন বলতে পারব না। তবে আমরা মেলাঘর গিয়েছি। মেলাঘর গিয়ে দেখি হাজার হাজার লোক। এক চুল পরিমান খালি জায়গায় নেই। সবাই বাংলাদেশ থেকে এসেছে। কোথায় যাবে এটাই অনেকে বুঝতে পারতেছে না। আমার বাবা ও ভাইয়েরা আমাদের এক স্থানে বসিয়ে আশেপাশের কয়েকটি শরণার্থী শিবিরে গেলেন। কিন্তু সব ক্যাম্পেই বলে এখানে কোন সিট খালি নেই। অন্য ক্যাম্পে যোগাযোগ করেন। এখানে থাকার ব্যবস্থা না পেয়ে আমরা এরপর চলে গেলাম আগড়তলা। আগড়তলা থেকে পরদিন ট্রাকে করে আসামের ধর্মনগর যাই। ধর্মনগর থেকে ট্রেনে করে আসামেরই লামাডিং স্টেশনে যাই। এখান থেকে পশ্চিমবঙ্গের শিয়ালদহ যাই ট্রেনে। তবে ট্রেনে কোন ভাড়া নেইনি। বাংলাদেশের শরণার্থীদের সে সময়ে ভারতের ট্রেন গুলো কোন ভাড়া রাখত না। শিয়ালদহ আসার পরও যখন কোন থাকার ব্যবস্থা হল না তখন ঐ রাতটি আমরা খোলা আকাশের নিচে কাটাই। সারাদিন কোন কিছু খাওয়া হয়নি। রাতে কিছু একটা খেয়েই রাস্থার উপর আমরা শুয়ে পড়েছিলাম। খবর পেয়ে পরদিন আমাদের এখান থেকে বড় মামা রঞ্জিত সাহা এসে নিয়ে যান মামার বাড়ি মুর্শিদাবাদ জেলার জিয়াগঞ্জে। এখানে আমাদের মাশি পিসিরা ছিল।

জিয়াগঞ্জের পশ্চিম পাড়ে নদীর ওপারে আজিমগঞ্জ রেলষ্টেশনের পাশে একটি ধর্মশালা ছিল। এই ধর্মশালাটিকে পরবর্তীতে শরণার্থী ক্যাম্পের মর্যাদা দেওয়া হয়। এই ধর্মশালার দোতালায় আমাদের পরিবারসহ আর চারটি পরিবারকে জায়গায় দেওয়া হয়। অন্য তিনটি পরিবার ছিল রংপুর,পাবনা ও সিরাজগঞ্জের। আর নিচতলা জায়গায় দেওয়া হয় সাঁওতাল সম্প্রদায়ের মানুষদের। এখানে আসার ১০/১২ দিন পর আমরা রেশমকার্ড পাই। আমরা মোটামোটি রেশমে চাল ডাল,তৈল সবজি থেকে শুরু করে সব কিছুই পেতাম। আরেকটু ভালোভাবে থাকার জন্য আমার বাবা ও ভাইয়েরা মিলে স্থানীয় বাজারে চকলেট বিক্রি করেছে। আর একটি কথা না বললেই নয়, আমাদের এই ধর্মশালা শরণার্থী শিবিরটি কিন্তু সরকারী না। এটা ঐখানকার স্থানীয় মানুষ চাঁদা তুলে এই ক্যাম্পটি পরিচালনা করেছে। আামি প্রায় প্রতিদিন সকালে ট্রেনে করে মামার বাড়ি মুর্শিদিবাদে চলে যেতাম আবার বিকেলের ট্রেনে চলে আসতাম।

শরণার্থী জীবনের সবচেয়ে কষ্টের স্মৃতি কি জানতে চাইলে কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারের সাবেক সিনিয়র জেল সুপার সুবোধ রঞ্জন সাহা বলেন, আসলে শরণার্থী জীবন পুরোটাই কষ্টের আর দু:খের। এখানে কোন আনন্দ নেই। কেউ হয়তো কষ্ট কম করেছে তার আত্মীয় স্বজন থাকার কারণে আর কেউ বেশী করেছে। কষ্ট ভাই সবাই করেছে। আমার সবচেয়ে কষ্ট লাগত তখন, যখন দেখতাম শরণার্থী শিবির গুলোতে চিকিৎসার অভাবে, ওষুধের অভাবে মানুষগুলো মারা যাচ্ছে। আবার ঐ মৃত মানুষগুলোর কপালে জুটে না কোন ধর্মীয় শেষ বিদায়। হিন্দু মুসলমান যেই মারা যায় হয় তাকে মাটিতে পুঁতে রাখত না হয় কোন বন জঙ্গলে কিংবা নদীতে ভাসিয়ে দিত। এই দৃশ্যগুলো মনে হলে এখনো চোখের পানি মুছি।
কবে দেশে আসলেন জানতে চাইলে সুবোধ রঞ্জন সাহা বলেন, ১৬ ডিসেম্বর রাতেই আমরা খবর পাই দেশ স্বাধীন হয়েছে। ২০ ডিসেম্বর ফরিদপুরের গোয়ালন্দ হয়ে আমি আর আমার ভাই বাড়ি চলে আসি। এসে দেখি আমাদের বাড়ি ঘর যেমন রেখে গিয়েছিলাম ঠিক তেমনি রয়েছে। কোন লুটপাট বা ভাংচুর হয়নি। তবে দীর্ঘ দিন না থাকলে যা হয় তেমন হয়েছে আর কি। ৩০ ডিসেম্বর বাবা মাসহ অন্যরা সবাই চলে আসে।

আপনি তো সরকারী পর্যায়ের একজন বড় কর্মকর্তা ছিলেন। এখন অবসর জীবন যাপন করছেন। আপনার কাছে জানতে চাই, একজন শরণার্থী হিসেবে আপনার চাওয়া পাওয়া কি সরকারের কাছে। এই প্রসঙ্গে সুবোধ রঞ্জন সাহা প্রথমেই প্রতিবেদককে ধন্যবাদ দিয়ে বলেন, দেশ স্বাধীন হয়েছে আজ পঞ্চাশ বছর হলো মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অনেক বই হয়েছে। কিন্তু আজ পর্যন্ত শরণার্থী নিয়ে কেউ কাজ করেছে আমি শুনিনি। বাংলাদেশের ইতিহাসে আপনি শাহাজাদা এমরানই একমাত্র গবেষক যিনি এই কাজটি করলেন তাও আবার নিজের পয়সায়। কোন দান কিংবা অনুদান না নিয়ে। শুধু এই কাজটির জন্যই দেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস রচনাকারীদের সাথে আপনার নামটিও স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

শরণার্থী সুবোধ রঞ্জন সাহা বলেন, আমি মুক্তিযুদ্ধের ধারক বাহক জাতীর জনক বঙ্গবন্ধুর কণ্যা মাননীয় প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে বিনীত অনুরোধ করব, আপনি আমরা যারা সেদিন জীবন বাঁচাতে বাড়িঘর ফেলে ভারতে চলে গিয়েছিলাম। দীর্ঘ নয়মাস নানা দূর্ভোগের মধ্যে থেকে আবারো দেশে ফিরে এসেছি তখন দেখেছি আমাদের বাড়ি ঘর বলতে কিছুই নেই। আবার শূন্য থেকে আমরা শুরু করি। সুতরাং রাষ্ট্রীয় ভাবে আমাদের শরণার্থী স্বীকৃতি দেওয়া হোক। যাতে আগামী প্রজন্ম জানতে পারে এই দেশের জন্মের ইতিহাসের সাথে আমাদেরও অবদান আছে।