ঢাবিতে সুযোগ পেয়েও ভর্তি হতে পারছেন না জাকিয়া

টিবিটি টিবিটি

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ৭:৪১ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২, ২০১৮ | আপডেট: ৭:৪১:অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২, ২০১৮

এসএসসি ও এইচএসসিতে জিপিএ-৫ পেয়ে মেধার স্বাক্ষর রাখার পরে এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘খ’ ইউনিট থেকে পরীক্ষা দিয়ে ভর্তির সুযোগ পেয়েছেন মেধাবী ও হতদরিদ্র জাকিয়া খাতুন। কিন্তু এই সুযোগ পাওয়ার পরও অর্থের অভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পারবেন কিনা তা নিয়ে দেখা দিয়েছে শঙ্কা রয়েছেন তিনি।

জাকিয়া খাতুনের বাবা মো. জাহিদুল ইসলাম একজন কাঠমিস্ত্রি। যিনি বগুড়া শহরে একটি ফার্নিচার হাউজে কাঠমিস্ত্রির কাজ করে সামান্য মজুরি পান। সে মজুরি দিয়ে ২ মেয়ে ও ১ ছেলে পড়াশোনা-ভরণপোষণে হিমশিম খেতে হয়। প্রতিমাসে লোন করতে হয়। জাকিয়ার অন্য বোন ইয়ামিন আকতার ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে ও ভাই আরিফুল ইসলাম ৩য় শ্রেণির মেধাবী শিক্ষার্থী। দরিদ্র প্রতিকূলতা, শিক্ষা উপকরণের অভাব, এমনকি খাবারের অভাব তাদেরকে কোনভাবে দমাতে পারেনি।

বাবার সামান্য আয় ছাড়া আর কিছুই নেই তার। বাড়ি ভিটার আড়াই শতাংশ জায়গা ছাড়া আর কোন জমিও নেই। অত্যন্ত মেধাবী হওয়ায় সকল দারিদ্রতা ও প্রতিকূলতাকে জয় করে সকল পাবলিক পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পান। তার স্বপ্ন ছিল একজন আদর্শ শিক্ষক হবেন। শিক্ষক হয়ে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে শিক্ষার আলো ছড়াবেন। সেই আলোকে প্রচণ্ড সাহস ও অদম্য ধর্য্য নিয়ে পড়াশোনা করেছে দিনে গড়ে ১২/১৩ ঘণ্টা।

জাকিয়া নিজ গ্রামে অবস্থিত শিতলাই দাখিল মাদ্রাসা থেকে ২০১৬ সালে দাখিল (এসএসসি) জিপিএ-৫ পাওয়ার পর কাহালু আদর্শ মহিলা ডিগ্রি কলেজে মানবিক বিভাগে ভর্তি হন। শিক্ষকদের সহযোগিতায় অনেক কষ্ট করে ২০১৮ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পায় এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি হওয়ার স্বপ্ন দেখেন। যাতে জাকিয়া একজন আদর্শবান শিক্ষক হতে পারেন।

তাই এইচএসসি পরীক্ষা দেওয়ার পরপরই বগুড়া শহরের একটি কোচিং সেন্টারে ভর্তি হন জাকিয়া। উপবৃত্তি টাকা ও অন্যের কাছে থেকে ধার করে টাকা নিয়ে কোচিং ভর্তি ফি জোগান।

প্রতিটি পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করলেও দিনে দিনে তার মনে চিন্তার দানা বাঁধে, যতই ভর্তি পরীক্ষা সন্নিকটে আসে ততই তার সেই চিন্তার ভাবনা তাকে দুর্বল করে।

এরমধ্যে একদিন পত্রিকায় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার বিজ্ঞপ্তি দেখে। এরপর ধার করে টাকা নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে খ ইউনিটে এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি ইউনিটে ফরম তোলেন জাকিয়া। কারণ তার অন্য কোথাও ফরম তোলার সম্বল ছিল না।

এমনি একটি মুহূর্তে তার কলেজের ইংরেজি বিভাগের প্রভাষক মো. মামুন- উর-রশিদ জাকিয়াকে ফরম তোলার জন্য আর্থিক সহযোগিতার ব্যবস্থা করে দেন। পরে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফরম তুলতে পারেন।

কয়েকদিন পরই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘খ’ ইউনিটের পরীক্ষা হয় এবং তার ৩ দিন পরে ভর্তি পরীক্ষার ফলাফলে মেধাক্রম ১০২৮ নিয়ে ভর্তির সুযোগ পান। এরপর থেকেই জাকিয়ার পরিবার তার ভর্তি নিয়ে দুশ্চিন্তা শুরু হয়। কীভাবে ভর্তি হবে, কীভাবে মেসে থাকবে, কীভাবে তার পড়ালেখা হবে ইত্যাদি চিন্তায় তার পরিবার নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছে।

জাকিয়া জানান, আবাসিক ফি ও ভর্তি ফি এবং অন্যান্য যে সকল খরচাদি কিভাবে বহন করবে তা সে ভেবে পাচ্ছে না। তার বাবার সামান্য আয় দিয়ে তার সংসার চলবে নাকি তার পড়াশোনা হবে। যে কোন মূল্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে পরিশ্রম করে তার পড়াশোনা শেষ করতে চায় এবং হতে চায় একজন আদর্শ শিক্ষক। তার এক আপন চাচাও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের ৩য় বর্ষের ছাত্র অনেক কষ্ট করে সেখানে পড়াশোনা করছে।

জাকিয়ার বাবা জাহিদুল ইসলাম জানান, তার আর্থিক অবস্থা খুব খারাপ। তার পক্ষে মেয়েকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানো খুবই অসম্ভব। তাই সমাজের বিত্তবান কেউ যদি তার মেয়ের পড়াশোনার জন্য সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন তাহলে, জাকিয়ার স্বপ্ন পুরণ হবে।

প্রভাষক মো. মামুন-উর-রশিদ জানান, জাকিয়া কলেজের পড়াকালীন তার মেধা সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেয়ে শিক্ষক এবং কলেজকে গর্বিত করেছে। তাই আমরাও চেষ্টা করবো তাকে সকল প্রকার সাহায্য সহযোগিতা করার।

কলেজের অধ্যক্ষ একেএম রেজাউল আখলাক জানান, দরিদ্র হওয়া সত্ত্বেও জাকিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সুযোগ পেয়েছে। যা অন্যান্য ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য দৃষ্টান্তমূলক। আশা করি সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি জাকিয়ার পড়াশোনায় তার পাশে দাঁড়াবে।