তবে কি সমুদ্র অর্থনীতির পথে অন্তরায় অম্লতা বৃদ্ধি?

টিবিটি টিবিটি

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ৪:৩২ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ৮, ২০২০ | আপডেট: ৪:৩২:অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ৮, ২০২০

ড এ, এস, এম সাইফুল্লাহ: পৃথিবীর প্রায় ৭১ শতাংশ এলাকা জুড়ে রয়েছে সমুদ্র। তাই স্বাভাবিক কারণেই ভূ-ভাগে যে সম্পদ রয়েছে আনুপাতিক হারে হিসাব করলেও তার অনেক অনেক গুণ বেশি সম্পদ সমুদ্রে থাকার কথা এবং রয়েছেও তাই।পৃথিবীতে দ্রুত গতিতে মানুষ বাড়ছে আর বাড়ছে ভূ-ভাগের সম্পদ আহরণ ও ভোগ। স্থলভাগে থাকা সীমিত সম্পদ ফুরিয়ে আসার কারণে মানুষের দৃষ্টি এখন সামুদ্রিক সম্পদ আহরণ ও ব্যবহারের দিকে। পৃথিবীব্যাপি ‘ব্লু ইকোনমি’ নামে অর্থনীতির নতুন ধারার সূত্রপাত হয়েছে যার জোয়ার এসেছে বাংলাদেশেও। কিন্তু, আমাদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন ও ভোগের চাহিদা মেটাতে প্রাকৃতিক সম্পদের যথেচ্ছ ব্যবহার হচ্ছে। এর বাইরে পরিবেশ বিনাশী কর্মকান্ড পৃথিবীর মাটি, পানি বাতাসকে করেছে বিষাক্ত, বাড়িয়ে দিয়েছে তাপমাত্রা, মেরুতে জমে থাকা বরফ যাচ্ছে গলে।এসব কর্মকান্ডের প্রভাব পড়ছে জলজ, বিশেষত সামুদ্রিক পরিবেশ ও এর সম্পদের উপর।

প্রাকৃতিক নিয়মে বায়ুমন্ডল এবং সমুদ্রের মাঝে কার্বন ডাই অক্সাইড বিনিময় হয় অত্যন্ত ধীর গতিতে। কিন্তু, মানুষ শিল্পবিপ্লব শুরুর পরবর্তীতে ১৮ শতকের মাঝামাঝি সময়ে বায়ুমন্ডলে প্রায় ৪০০ বিলিয়ন টন কার্বন যুক্ত করেছে। দুই শতাধিক বছরে মানুষ তার কর্মকান্ডের মাধ্যমে বায়ুমন্ডলে কার্বন ডাইঅক্সাইডের পরিমান বাড়িয়েছে অনেক গুণ। আর এ কারণে সমুদ্রের পানির অম্লতা বেড়েছে প্রায় ৩০ শতাংশ। বায়ু মন্ডলে যে পরিমান কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গত হয়, বলা চলে তার ৩০ শতাংশ শোষন করে সমুদ্র। বায়ুমন্ডলে নির্গত কার্বন ডাই অক্সাইড সমুদ্রের পানি দ্বারা শোষিত হয় এবং পানিতে দ্রবীভূত হয়ে দূর্বল কার্বনিক অ্যাসিড উৎপন্ন করে যা পরবর্তিতে ভেঙে হাইড্রোজেন আয়ন এবং বাই কার্বনেট আয়নে বিভক্ত হয়। এতে হাইড্রোজেন আয়ন গুলোর ঘনত্ব বৃদ্ধির ফলে বিভিন্ন রাসায়নিক বিক্রিয়া সম্পন্ন হয় এবং সমুদ্রের পানির বৈশিষ্ট্য পরিবর্তিত হয়।

শিল্প বিপ্লবের পর থেকে সমুদ্রের পানির পিএইচ(অম্লতা কিংবা ক্ষারত্ব নির্দেশক) ৮ দশমিক ২ থেকে ৮ দশমিক ১ এ নেমেছে অর্থাৎ ১ ইউনিট কমেছে। পিএইচ স্কেলটি লগারিদম ভিত্তিক তাই ১ ইউনিট কমে যাওয়া মানে পানির প্রায় ২৮ শতাংশ অম্লতা বেড়ে যাওয়া। বিভিন্ন গবেষনায় দেখা যায়, সাগরের পানির পিএইচ বর্তমানে ৮.১ যা ক্ষারীয় কিন্তু ক্রমাগত সমুদ্রের পানিতে কার্বন ডাই অক্সাইড যোগ হওয়ার কারণে বৃদ্ধি পাচ্ছে অম্লতা। বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করেন যে, সমুদ্রের পানিতে অম্লতা বাড়ার সাথে সাথে তার কার্বন ডাই অক্সাইড গ্রহনের ক্ষমতা কমে যায়। সেক্ষেত্রে, বায়ূমন্ডলে কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমান নিয়ন্ত্রণও কঠিন হয়ে পড়বে। সমুদ্রের পানির অম্লতা বৃদ্ধির সাথে রয়েছে তাপমাত্রা বাড়ারও সম্পর্ক। আর বিশ্ব উষ্ণায়নে কার্বন ডাই অক্সাইডের ভূমিকার কথা তো আমাদের জানা।

সমুদ্রের পানির অম্লতা বেড়ে যাওয়ার কারণে সবচেয়ে বেশি হুমকির মুখে সামুদ্রিক জীব। যে সব সামুদ্রিক জীব বহিরাবরন বা খোলস দ্বারা বেষ্টিত যেমন কাঁকড়া, চিংড়ি, স্ক্যালোপ, অধিক অম্লতা এদের খোলস দূর্বল কিংবা নরম করে ফেলে। পানির অম্লতা বৃদ্ধি প্রবালের অস্তিত্বের জন্যও হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিজ্ঞানীরা মনে করেন সমুদ্রের অম্লতা বৃদ্ধির কারণে মাছের ঘ্রান শক্তি পরিবর্তিত হয় এবং এদের চলাচলে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়, এমনকি পানিতে শব্দ পরিবহনের প্রক্রিয়ায় বিঘ্ন সৃষ্টি হয় এবং পানির নীচের পরিবেশ দিন দিন কোলাহল পূর্ন হয়ে ওঠে। বিজ্ঞানীরা আরও মনে করেন যে, ২০৫০ সালের মধ্যে সমুদ্রের পানি হবে আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে উষ্ণ ও অম্লীয়। এমনটাও মনে করা হয় যে, ২১০০ সালের দিকে সমুদ্রের পানির পিএইচ ৭.৮ এ নেমে আসতে পারে, যা বর্তমানের তুলনায় প্রায় ১৫০ শতাংশ কিংবা তারও বেশী কম। মধ্য মায়োসিন কালে অর্থাৎ, ১৪ থেকে ১৭ মিলিয়ন বছর পূর্বে সমুদ্রের পানির পিএইচ ছিল এমন, তাপমাত্রা ছিল কয়েক ডিগ্রী বেশী এবং তাতে করে বিলুপ্ত হয়েছিল সমুদ্রের অনেক প্রানী।

শুরুতে বলেছিলাম, মানুষ এখন তার খাবার থেকে শুরু করে খনিজ সম্পদের জন্যও সমুদ্রের দিকে হাত বাড়াচ্ছে। বর্তমানে বিশ্বব্যাপী এক বিলিয়নেরও বেশি মানুষ প্রোটিনের উৎসের জন্য সামুদ্রিক খাদ্যের উপর নির্ভর করে।সাগর-মহাসাগরের পানির অম্লতা বৃদ্ধির কারণে সমুদ্রের বিভিন্ন প্রজাতি যা মানুষ খাবার হিসেবে গ্রহন করে, তা বিভিন্ন মাত্রায় প্রভাবিত হবে বলে মনে করা হচ্ছে। যেমন, সামুদ্রিক শৈবাল কিংবা সমুদ্র ঘাস (সি-গ্রাস) যারা সালোকসংশ্লেষন প্রক্রিয়ায় খাদ্য উৎপাদন করে এবং প্রাথমিক উৎপাদক হিসেবে পরিচিত, তাদের জন্য কার্বন ডাই অক্সাইড অতি প্রয়োজনীয় কিন্তু কিছু ক্যালসিফাইং প্রানী যেমন, সামুদ্রিক ঝিনুক, সি-আর্চিন, গভীর ও অগভীর সমুদ্রের প্রবাল, ক্যালকেরিয়াস প্লাঙ্কটন, কার্বন ডাই অক্সাইড সৃষ্ট অম্লতার কারণে হুমকির মুখে পড়বে। অন্যান্য কারণের সাথে সমুদ্রের পানির অম্লতা বৃদ্ধিকেও সামুদ্রিক ঝিনুকের প্রজননে বাঁধার কারন বলে মনে করা হয়।

প্রবাল নিয়ে যারা গবেষনা করেন তাদের মতে, সমুদ্রের পানিতে অম্লতা বেড়ে যাওয়ার কারণে প্রবালের কংকাল গঠন ও নিষেক বাঁধাপ্রাপ্ত হচ্ছে, যা তাদের অস্তিত্বের জন্য বড় হুমকি। গবেষকগন এটাও মনে করেন যে, এই শতকের শেষের দিকে প্রবাল প্রাচীর সৃষ্টির পরিবর্তে ক্ষয়ের হার বেড়ে যাবে এবং ক্ষতিপ্রস্ত হবে প্রবাল দ্বারা তৈরি রীফ গুলো। প্রবাল রীফকে কেন্দ্র করে বেঁচে থাকা সমুদ্রের প্রায় ১০ মিলিয়ন প্রজাতি অস্তিত্ব সংকটে পড়তে পারে। বিশ্বব্যাপী প্রবাল রীফ গুলোকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে বিশাল পর্যটন, খাদ্য এবং উপকূল রক্ষার মত বিষয়, যা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।আর্থিক ক্ষতির প্রাক্কলন কঠিন হলেও ধারণা করা হয় এর পরিমান হতে পারে ১ ট্রিলিয়ন ডলার, যেটা অর্থনীতির জন্য বড় এক হোঁচট।

যে কোনো বাস্তুসংস্থানের জন্য তার খাদ্যশৃঙ্খল একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সমুদ্রের পানির অম্লতা বেড়ে গেলে অনেক প্রজাতি পরিবর্তিত পরিবেশে বেঁচে থাকতে পারবেনা, যা সামুদ্রিক খাদ্যশৃঙ্খলের জন্য বড় হুমকি। ‘সমুদ্রের প্রজাপতি’ নামে পরিচিত টেরোপড গুলো দেখতে অনেকটা ছোট মটর দানার মত, অথচ আশ্চর্যের বিষয় এরা হচ্ছে বিশালকায় তিমি কিংবা মাঝারী বয়সের স্যামন এর খাবার। আশংকার কথা, সাগর মহাসাগরের পানির অম্লতা বেড়ে গেলে এসব ছোট ছোট জীবের টিকে থাকা অসম্ভব হতে পারে। সমুদ্রের পানিতে অম্লতা বেড়ে গেলে কি প্রভাব পড়তে পারে এ নিয়ে অনেক গবেষণা হচ্ছে এবং এর যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হবে সেটা মোটামুটি ধরে নেয়া যায়। এমনি এক গবেষনায় দেখা গেছে পানির অম্লতা বেড়ে যাওয়ায় পোলক কিংবা ক্লাউনফিশ শিকারীকে সনাক্ত করতে অক্ষম হয়। জীবের এমন পরিবর্তন যে কোনো বাস্তুসংস্থানের জন্য অশনিসংকেত।

বিশ্ব অর্থনীতির বিশাল এক যায়গা দখল করে আছে সামুদ্রিক সম্পদ। সারা বিশ্বের সমুদ্র নির্ভর অর্থনীতির বার্ষিক মূল্য বলতে গেলে ৩ থেকে ৬ ট্রিলিয়ন ডলার এবং বিশ্বব্যাপী ৩ বিলিয়নেরও অধিক লোকের জীবিকা সমুদ্রের উপর নির্ভরশীল।সমুদ্র একটি দেশের জন্য বিশাল আশীর্বাদ। বাংলাদেশের দক্ষিন কোল ঘেঁষে বঙ্গোপসাগর থাকায় দেশটিও এ আশীর্বাদের বড় ভাগীদার। প্রতিবেশী দেশ মায়ানমার এর সাথে সমুদ্র সীমা নিয়ে বিরোধ মিটে, বাংলাদেশ ২০১২ সালে যখন সমুদ্র সীমায় আন্তর্জাতিক আদালতের রায় পেল তার পর থেকেই সমুদ্র অর্থনীতিকে (ব্লু ইকোনমি)চাঙ্গা করার জন্য নানান পদক্ষেপ গ্রহন করা শুরু করে দেশটি। বাংলাদেশের আওতায় এখন বঙ্গোপসাগরের ১,১৮,৮১৩ বর্গকিলোমিটার এলাকা। এ বিশাল অঞ্চল জুড়ে মাৎস্য ও অন্যান্য সম্পদ আহরনের এখতিয়ার এখন বাংলাদেশের। সে মাফিক, প্রাপ্ত এলাকাজুড়ে অর্থনৈতিক উন্নয়নে বাংলাদেশ গ্রহন করছে নানামুখি পরিকল্পনা।বাংলাদোশের অর্থনীতিতে সমুদ্র সম্পদের বার্ষিক অবদান ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং ভবিষ্যতে তা আরো বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। এমনি ভাবে উন্নত কিংবা উন্নয়নশীল অথবা অনুন্নত দেশ আছে যাদের অর্থনীতির বিরাট অংশ জুড়ে রয়েছে সমুদ্রের অবদান।এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের অনেক দেশ যেমন থাইল্যান্ড, ফিলিপিন্স, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়ায় সামুদ্রিক চাষাবাদ বেশ জনপ্রিয় এবং তাদের অর্থনীতিতে এর অবদান অনেক।

সমুদ্র অম্লীকরনের বিরাট প্রভাব পড়তে পারে সংশ্লিষ্ট দেশ ও বিশ্ব অর্থনীতিতে। এক গবেষণার মডেল থেকে দেখা যায়, সমুদ্রে অম্লতা বেড়ে গেলে খোলযুক্ত মাছ(শেল ফিস)চাষের সাথে জড়িত দেশ গুলো ও যারা বানিজ্যিক ভাকে সমুদ্র থেকে মাছ আহরণ করেন তারা ব্যাপক ক্ষতির সন্মুখীন হবে। নেট প্রেজেন্ট ভ্যালু (এন পি ভি)পদ্ধতি ব্যবহার করে প্রাপ্ত এক প্রাক্কলনের ফলাফলে দেখা যায়, সমুদ্রের পানিতে অম্লতা বেড়ে গেলে, যুক্তরাজ্যে খোলযুক্ত মাছের(শেল ফিস)উৎপাদন হ্রাসের কারণে সম্ভাব্য ক্ষতির পরিমান দাড়াতে পারে ১৪ থেকে ২৮ শতাংশ যা ২০১৩ সালে যুক্তরাজ্যের জিডিপি হিসাবে ৩ থেকে ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। যদিও এ প্রাক্কলন পরিস্থিতির পরিবর্তনের সাথে ভিন্নতা পেতে পারে। একই গবেষনার গবেষকগন মনে করেন যে, সমুদ্রের এসব সম্পদ বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করার জন্য বায়ূমন্ডলে কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গমন হ্রাস করতে হবে এবং এর জন্য জাতীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিকভাবে সমাধান খুঁজে বের করতে হবে। এ ছাড়াও সমুদ্রের পানির অম্লতা বৃদ্ধির কারণে কম হুমকির মুখে যে সব মৎস্য প্রজাতি, সে গুলোকে অপেক্ষাকৃত বেশী আহরণ করে হুমকির সন্মুখীনদের উপর চাপ কমাতে হবে।

মোদ্দা কথা, আমরা আমাদের ভোগবাদী স্বভাবের কারণে নিজেদের আরাম আয়েশ নিশ্চিত করতে গিয়ে পৃথিবীর স্থলভাগ, জলভাগ এবং বায়ূ মণ্ডলকে বিষিয়ে তুলছি। আমরা স্থলভাগের সম্পদের যথেচ্ছ ব্যবহার করে মোটামুটি সাবাড় করে ফেলেছি, বাকী যে সম্পদ পানির নীচে আছে তাও এখন পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণে হুমকির মুখে পড়তে যাচ্ছে। অন্তত মানব প্রজাতির অস্তিত্বের স্বার্থে হলেও কার্বন ডাই অক্সাইডের নির্গমন কমিয়ে বায়ূমন্ডলকে দূষন এবং সমুদ্রকে অম্লায়নের হাত থেকে রক্ষা করতে হবে।

ড এ, এস, এম সাইফুল্লাহ

অধ্যাপক, এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট বিভাগ

মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, টাঙ্গাইল।