দিনাজপুরের মহিলা কসাই জমিলার গল্প

প্রকাশিত: 8:52 PM, October 3, 2019 | আপডেট: 8:52:PM, October 3, 2019
ছবি; সংগৃহীত

কসাই শব্দটির সঙ্গে একজন নারীর সম্পর্ক খানিকটা অবাক করে আমাদের। কারণ, কসাই বলতে আমাদের চোখে ভেসে ওঠে একজন পুরুষের ছবি। কিন্তু দীর্ঘ প্রায় কুড়ি বছর ধরে কসাইয়ের তকমা গায়ে লাগিয়ে মাংস বিক্রি করে চলেছেন একজন নারী। শুধু মাংস বিক্রিই নয়, হাটে গিয়ে গরু কেনা, গরু জবাই করা, মাংস কাটা, ওজন দেওয়া প্রায় সব কাজই করেন এই নারী।

এই নারীর নাম জমিলা বেগম (৪৭)। তাঁর বাড়ি দিনাজপুরের বীরগঞ্জ উপজেলার শেষ সীমান্তে ৩ নম্বর শতগ্রাম ইউনিয়নের ঝাড়বাড়ি গ্রাম। বাড়ির পাশেই ঝাড়বাড়ি বাজারে মায়ের দোয়া মাংস ভান্ডার। দোকানের ভেতরে টাঙানো ব্যানার। ব্যানারে লেখা, ‘এখানে স্বাস্থ্যসম্মত দেশি আড়িয়া গরুর মাংস সঠিক ওজনে পাওয়া যায়’। মালিক হিসেবে রয়েছেন জমিলা আর পরিচালনা করছেন জমিলার ছেলে জহুরুল ইসলাম (৩৩)।

সরেজমিনে দেখা যায়, ঝাড়বাড়ি বাজারে নিজের দোকানে বসে মাংস কাটছেন জমিলা বেগম। বাইরে অপেক্ষমাণ ক্রেতা। জমিলা বেগম মাংস কাটছেন, ডিজিটাল পাল্লায় মাপছেন, টাকা গুনছেন। কেউ ৫ কেজি, কেউ ৩ কেজি আবার কেউ ১০ কেজি পর্যন্ত মাংসের ক্রেতা রয়েছেন। তাঁকে দেখেই বোঝা যায় পুরোদস্তুর একজন মাংস বিক্রেতা তিনি।

জমিলা বেগম জানান, প্রতি সপ্তাহের সোমবার বাদে ৬ দিনই মাংস বিক্রি করেন তিনি। তবে শুক্রবারে মাংস বিক্রি বেশি হয়। অন্যান্য দিনে মাংস বিক্রি হয় ৭ থেকে ১০ মণ। কিন্তু শুক্রবারে বিক্রি হয় ২০ থেকে ২৫ মণ মাংস। গড়ে প্রতিদিন ৪–৫টি গরু জবাই করে মাংস বিক্রি করেন তিনি। ক্রেতারা আসেন দূর-দূরান্ত থেকে। বিশেষ করে বীরগঞ্জের গড়েয়া, গোলাপগঞ্জ, কাহারোল উপজেলার বসুনিয়া, লাহিড়ী, কালমেঘ, পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জ, খানসামা উপজেলা এমনকি ঠাকুরগাঁও ও নীলফামারী থেকেও ক্রেতা আসেন জমিলার দোকানে মাংস কিনতে।

মহিলা মানুষ, বাজারের কসাইয়ের দোকান দিয়েছেন এই বলে অন্য কসাইরা আরো কয়েকজন ব্যবসায়ীকে নিয়ে তার নামে বাজার কমিটি কাছে নালিশ নিয়ে যায়, পরে না পেরে থানা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদেও অভিযোগ করলেন। নারী হয়ে কসাইয়ের ব্যবসা করবেন, ধর্ম সইবে না।

কিন্তু দমে যাননি বীরগঞ্জ উপজেলার ৩ নং শতগ্রাম ইউনিয়নের ঝাড়বাড়ী বাজারের জমিলা কসাই। মায়ের প্রেরণায় জমিলা বেগম এখন সফল ব্যবসায়ী। তার “মায়ের দোয়া মাংস ভান্ডার” দোকানের বৈশিষ্ঠ মাংস হাড় থেকে আলাদা করে বিক্রি করেন। এরপর নিজের হাতে জমিলা আধুনিক মেশিনে মাপ দেন। বিয়ে বাড়ি, ছেলেদের আকিকা, খতনাসহ আশপাশের গ্রাম-শহরের বিভিন্ন অনুষ্ঠানেও তার দোকানের মাংস যায়। দুই দশকের টানা অভিজ্ঞতায় তিনি ক্রেতাদের কাছে হয়ে উঠেছেন বিশ্বস্ত।

জমিলা বেগম এখন এলাকায় জমিলা কসাই হিসাবে পরিচিত । এ নিয়ে কথা হয় তার সঙ্গে। তিনি বলেন, স্বামী কসাই হওয়ায় খুব কাছ থেকে দেখা, সহযোগীতা করা আর অভাবই আমাকে এই ব্যবসা শিখিয়েছে। প্রথমের দিকে অনেক প্রতিবন্ধকতা এসেছে। কুসংস্কার ছড়িয়ে নালিশ করে আমার ব্যবসা বন্ধ করতে চেয়েছিল অনেকে। কিন্তু মায়ের প্রেরণায় সব প্রতিবন্ধকতা দুর করে আমি টিকে আছি। কোন পেশার পাশে লিখা নেই কোনটা ছেলে করবে,কোনটা মেয়ে করবে । সততার সঙ্গে ব্যবসা করে সফলতা পাওয়াটাই বড় কথা।

জমিলা বলেন, চারপাশে ইট, সিমেন্টের দেয়াল, মাথার ওপরে টিনের ছাউনি। দোকানের সামনে কোনো ঝাঁপ নেই। প্রতিদিন সকালে মাছি মারার ওষুধ দিয়ে দোকানটি মাছি ও জীবানুমুক্ত করি। কর্মচারীরা প্রতিদিন নিয়ম করে এই নির্দেশ পালন করেন। পাশের দেবারু পাড়া গ্রামের পশু চিকিৎসক দিয়ে প্রতিটি গরু রোগমুক্ত আছে কি না পরীক্ষা করা হয়। নিয়ম মেনে গরু মৌলভী দিয়ে জবাই করা হয়। এ জন্য পশু চিকিৎসত, মৌলভী ও ইউনিয়ন পরিষদে টাকা দিয়ে থাকেন তিনি।

প্রতিদিন ফজরের নামাজ পড়েই দোকানে চলে আসেন জমিলা। মাঝে খাওয়া ও সামান্য বিশ্রাম বাদে রাত ১০টা পর্যন্ত টানা কাজ করেন। আগের মতো শরীরে এখন আর বল পান না ৪৮ বছরের এই নারী। তারপরও না এসে পারেন না। এবার রোজার ঈদেও তাকে অনেকগুলো গরু কেটেছেন। এবার ৮০টি গরু কিনেছেন। ৪০ লাখ টাকার বাজেট ছিল। প্রতিবারের মতো ১৫ রোজার পর থেকে গড়েয়া, কাহারোল, পাকের হাট, রেলবাজার ও বীরগঞ্জের হাটে হাটে হাটে ঘুরে বেড়িয়েছেন। গরুর ব্যাপারীরা তাকে বাকিতে গরু দিয়ে থাকেন। নিময়মত টাকাও পরিশোধ করেন।

প্রতি কেজি মাংসের গড় দাম ৫০০ টাকা। হাড় বা হাড্ডি এখানে বিক্রি হয় না। সেগুলো আলাদা করে কেজি দরে হালিমের দোকানদারের কাছে চলে যায়। এই দোকানে দেশি, আড়িয়া গরুর মাংস কাটা হয়। গায়ের রং, খাবারের অভ্যাস, চামড়া ও পা দেখেই তিনি দেশি গরু চিনে ফেলেন। বলেন, আড়িয়া বা সুস্বাস্থ্যবান ষাঁড় গরুর চাহিদাই বেশি। এই গরুর মাংসে লাভ বেশি, মাংসও বেশি।

তিনি একসময় ৪০ টাকা থেকে মাংস বিক্রি শুরু করে আজকের এ পর্যায়ে এসেছেন। বাজারের ১৫টি মাংসের দোকানের মাত্র চারটি তার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে আছে। বাকিগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। তার এই সাফল্যের একমাত্র রহস্য ‘সততা’। বলেন, ‘মানুষকে ঠকিয়ে ব্যবসা করলে ক্ষতি হয়। তবে সৎ থাকলে ব্যবসায় সফলতা আসে। একমাত্র ছেলে ৩৩ বছরের জহিরুল ইসলাম ও কর্মচারীরা তাকে সহযোগীতা করেন। গরু কেনা থেকে সব কাজ করেন।

ক্রেতাদের এখনো জমিলা বেগমের ওপর খুব আস্থা। তিনি ক্রেতাদের সঙ্গে ভালো আচরণ করেন। শুরুতে যেখানে ৩০ থেকে ৪০ জন ক্রেতা আসতেন, এখন দিনে গড়ে দেড় শ ক্রেতা তার দোকান থেকে মাংস কেনেন। শুক্রবারে তারা হয়ে যান ডাবল।

জমিলা এখন খুব আস্থাবান কসাই । তিনি দোকানে না থাকলে অনেক ক্রেতা মাংস না কিনেই চলে যান। জমিলার হাতে মেপে দেয়া মাংস এখন সবার পছন্দ। বিদ্যালয়ের শিক্ষক মতিউল ইসলাম বললেন ১৫ বছরের পুরনো ক্রেতা তিনি। তার মত অনেকে রয়েছেন। দোকানের ট্রেড লাইসেন্স করেছেন ‘মায়ের দোয়া মাংস ভান্ডার’। এই নামটি তার মা ফুল বেওয়া খাতুনের নামে রাখা। আরও লিখেছেন ব্যানারে ‘সততাই ব্যবসার মূলধন’। ফলে এখনো তার নিজের গরু কোরবানি দেওয়ার সামর্থ্য হয়নি। এই কোরবানির ঈদে দেওয়ার ইচ্ছা আছে। কর্মচারীদের বেতন, গরু রাখার জন্য ইউনিয়ন পরিষদের দিনে খরচ বাদে হাজার দু-এক থাকে। এখন দোকানে আছেন পাঁচ কর্মচারী। তারা ২১ বছরের নয়ন ইসলাম, ২২ বছরের নাসির হোসেন, ২৫ বছরের ফরিদ হোসেন, ২৯ বছরের শামীম রানা ও ৩০ বছরের কাবেল উদ্দিন। তারই আত্মীয়, অভাবে পড়েছেন। তাদের চাকরি দিয়ে রেখেছেন। বেতন ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা।

জমিলার সংসার জীবন শুরু সুখময় ছিলনা। চার বোন ও এক ভাইয়ের তৃতীয়। বাবা জাকির হোসেন ছিলেন পাইকারি পান বিক্রেতা। অভাবের কারণে লেখাপড়া শেখা হয়নি । ১৫ বছর বয়সেই বিয়ে হয়ে যায়। পাত্র বগুড়ার ছেলে, পেশা কসাই। নাম রফিকুল ইসলাম ভান্ডারি। তাদের বাজারেই তার দোকান। বাড়ি বগুড়ার গোকুল গ্রামের উত্তর পাড়ায়। বিয়ের পর স্বামীর সঙ্গে দোকানে অবসরে বসতে বসতে চোখে দেখে অনেকটাই কসাইয়ের কাজ শিখে ফেললেন জমিলা। দেড় বছরের মধ্যে সংসার আলো করে ছেলে জহিরের জন্ম হয়। এরপর দ্বিতীয় সন্তানের কামনা করছিলেন স্ত্রী। তবে তত দিনে জমিলা জেনে গেছেন, তার স্বামীটি মাদকাসক্ত। মাদক খেয়ে স্ত্রীকে বাড়িতে এসে মারধর করতেন। পরে জানা গেল, তার আরও একটি স্ত্রী আছে। বিভিন্নভাবে মানুষের কাছ থেকে আড়াই লাখ টাকা ধার করে রফিক নিখোঁজ। এরপর গর্ভবতী জামিলা বেগম তার সন্তান নিয়ে বাবার বাড়িতে আশ্রয় নিলেন । বাবার ৫ শতাংশ জমি মায়ের অনুমতি নিয়ে বিক্রি করে বাজারে এই জায়গা নিয়ে কসাইয়ের কাজ শুরু করলেন জমিলা বেগম। মেয়ে কসাইয়ের কাজ করেন, মা নাতি-নাতনি সামলান। মা তার সর্বক্ষণের উৎসাহ।
নিজেকে আস্তে আস্তে প্রমাণ করেছেন মেয়েরাও সব করতে পারেন। ছেলেমেয়েরাও বড় হয়েছেন। স্বামীর কোনো খোঁজ পাননি জমিলা। মাংস বিক্রির টাকা দিয়েই দোকানের কয়েক গজ দূরে জমি কিনে বাড়ি করেছেন জমিলা বেগম। জমিলা এখন ১৫ শতাংশ জমির মালিক। ছেলেকে ছোট থেকে ব্যবসায় সঙ্গী করতে হয়েছে বলে লেখাপড়া করাতে পারেননি। তবে মেয়ে সোহাগী আক্তার নবম শ্রেণীতে পড়ে।

মেয়ে সোহাগী আক্তার জানায়,সে ঝাড়বাড়ি উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্রী। “শুরুতে ‘তোর মা কসাই’ অনেকে বলত, মিশতেও চাইত না কেউ কেউ। তবে ভালো ছাত্রী হয়ে সে সমস্যার সমাধান করেছি বললেন সোহাগী।

মেয়েকে প্রতিক্ষণ সময় দিতে না পারলেও বিদ্যালয়ে যাচ্ছে কী, পড়ছে কী না খবর রাখতে ভুল হয় না জামিলার। মেয়েকে উচ্চশিক্ষিত করতে চান। স্বামী বেঁচে থাকলেও সম্পর্ক নেই। আজীবন কসাইয়ের ব্যবসা চালিয়ে যাবেন। কারণ এখনো ক্রেতারা তাকে না দেখলে মাংস কিনতে চান না। ২০ বছরের অন্য এই সংসারে আসতে না পারলে তারও ভালো লাগে না।

সুত্র: বিডি২৪ লাইভ।