দুই নক্ষত্র অমল বোস ও আনিচের সঙ্গে অজস্র স্মৃতি, আজও হাত বাড়িয়ে পিছনে ডাকে

প্রকাশিত: 8:19 PM, September 2, 2019 | আপডেট: 8:19:PM, September 2, 2019
ছবি: টিবিটি

সময়টা ২০১২ সাল। মাই টিভিতে প্রচারিত “বিয়ের বাজার” নাটকের শ্যুটিং চলাকালিন সময়ের বেশকিছু স্মৃতি; মনের আস্টে-পিস্টে ঘুর ঘুর করছে বড় একটি জায়গা দখল করে। ফেলে আসা সময়ের সঙ্গে যতই মিতালী হোক না কেন, তাকে আপন করে নিজের পকেটে ভরে আবার পিছনের সময়ের কাছে ফিরে যাওয়া সেতো শুধু কল্পনায় সাজে, বাস্তবে নয়।

অতীতে রেখে আসা মধুময় স্মৃতির সঙ্গে আলিঙ্গন করতে আমার মন কড়া নাড়ছে বারং বার। মন তো বোঝেনা অতীত আর বর্তমানের মাঝে যে, বিশাল আকৃতির টেকসই দেয়াল নির্মাণ হয় তা ভেদ করে কোন দিন অতীতের মধুময় সময়ের কাছে কোন অবস্থাতেই পৌঁছানো যায় না।

নাটকে অভিনয়ের সুবাদে দু’জন খ্যাতিমান ব্যক্তিত্বের সঙ্গে প্রথমে দেখা, পরিচয় ও সম্পর্ক। একজন এক সময়ের চলচ্চিত্রের দাপুটে নন্দিন অভিনেতা “অমল বোস” অপরজন কমেডি কিং ও কৌতুকম্যান নামে খ্যাত “আনিচ”। এই দুই নক্ষত্রই আমাদের ছেড়ে চলে গিয়ে, এখন পরপারের বাসিন্দা হয়েছেন।

আগে চলে গেলেন অমল বোস দাদু, আর সেই পথ ধরে চলে গেলেন আনিচ ভাইও। উনাদের মৃত্যুর পরেই ভেবেছিলাম কিছু লিখবো, কিন্তু সময় ও বাস্তবতা অন্যদিকে ব্যস্ততার শিকলে বন্দি রেখেছিলো তাই হয়ে উঠেনি। কিছু না লিখতে পারায় নিজেকে বেশ অপরাধী বোধও করেছি।

খুব কাছ থেকে দু’জনকেই দেখার সুযোগ হয়েছে আমার। অতি সাধারণে, অসাধারণ জীবনের অধিকারী ছিলেন তাঁরা। যতদূর মনে পড়ে ২০০৭ সালে শ্রদ্বেয় মোহাম্মদ আলী রেজা ভাইয়ের হাত ধরে, ঢাকায় টিভি নাটক পাড়ায় আমার ক্ষুদ্র পরিসরে বিচরণ ছিলো। সেই সময় আলী রেজা ভাই যে মিডিয়ার কর্ণধার ছিলেন সেই মিডিয়ার বিটিভির জন্য নির্মিত ১২ পর্বের একটি নাটক সেটি হলো “রাণী মা”। এই নাটকের অন্যতম প্রধান চরিত্রে অভিনয়ের জন্য মনোনিত হয়েছিলেন আমাদের অমল বোস দাদু।

একদিন পড়ন্ত বিকাল বেলায় “রাণী মা” নাটকের স্ক্রীপ্ট দিতে, আমি আর রেজা ভাই হাজির হই অমল বোস দাদুর রামপুরার বাসাতে। অমায়িক বন্ধু সুলভ ব্যবহার ও লোভনীয় মিষ্টি দিয়ে আপ্যায়ন এবং আমাদের নিয়ে সেদিন গল্পেও ডুবে ছিলেন বেশ।

কিছু দিন পরে গাজীপুরের পূবাইলে “রানী মা” নাটকের শ্যুটিং। নাটকটি মূলত মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে। এই নাটকে আমিও একটি চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পেলাম। আমাকে দেয়া হলো পাকিস্তানি মেলেটারী অফিসারের চরিত্রে। এই কঠিন চরিত্রে অভিনয় করতে গেলে আমাকে সম্পূর্ণ উর্দু ভাষায় কথা বলতে হবে। চরম বিব্রতকর পরিস্থির মুখোমুখি হলাম।

উর্দু ভাষার সেই ডায়ালগগুলো বলতে সার্বিকভাবে সহযোগিতা করেছিলেন অমল বোস দাদু, হারুন কিচিঞ্জার ভাই, চলচ্চিত্রের মুখ ববি ভাই ও ঐ নাটকের হিরো এবং এক সময়ের টিভি নাটকের অত্যন্ত জনপ্রিয় অভিনেতা আজিজুল হাকিম ভাই। খ্যাতিমান এই অভিনেতাদের সঙ্গে ক্যামেরা বন্দি হওয়া সেকি এক অবর্ণনীয় সুখানুভুতি।

তারপর একেরপর এক আলী রেজা ভাইয়ের পরিচালনায় বেশ কিছু টিভি নাটক নির্মাণের সঙ্গে সহকারী পরিচালক হিসেবে আমি ও প্রিয় শামীম ভাই যুক্ত হলাম, শ্রদ্ধেয় রেজা ভাইয়ের সবগুলো নাটকে সহকারী পরিচালকের দায়িত্বভার আমার আর শামীম ভাইয়ের কাঁধেই থাকতো।

এরই মাঝে নারায়নগঞ্জের এক প্রযোজকের নাটক নির্মাণের দায়িত্ব পেলাম আমরা। নাটকের নাম “বিয়ের বাজার”। নাটকের স্ক্রীপ্ট, আর্টিস্ট, শ্যুটিং স্থান ও দিনক্ষণ সব প্রস্তুত। এই নাটকের অন্যতম দুটি সেরা চরিত্রে অভিনয় করবেন প্রিয় দাদু অমল বোস ও কৌতুকম্যান আনিচ ভাই।

প্রযোজকের বিশাল আবদার শ্যুটিং হওয়ার আগের রাতেই নারায়নগঞ্জ তাঁর জন্মস্থানেই সকল আর্টিস্টদের নিয়ে এই নাটকের “শুভ মহরত” করার। রেজা ভাই তাদের আবদার মেটাতে রাতেই অমল দাদু ও আনিচ ভাইসহ একটি বহর নিয়ে আমরা গিয়েছিলাম নারায়নগঞ্জে। সৌভাগ্যক্রমে সেই আড়ম্বর শুভ মহরত অনুষ্ঠানটির উপস্থাপনার দায়িত্বটা আমার কাঁধেই বর্তায়।

আমার স্মৃতির কুঠিরে আজও স্থান করে আছে সেই দিনের সেই উপস্থাপনার কথা। আমি অসম্ভব আত্মতৃপ্তি অনুভব করেছিলাম সেই দিনের সেই না ভোলা উপস্থাপনার জন্য। প্রোগ্রাম শেষ করে ফেরার পথে গাড়ীর ভিতর অমল বোস দাদু কথার মাঝে আমার সম্পর্কে একটি কথা বলেছিলেন তা হলো “এই দাদু, তুই উপস্থাপনার মধ্যে আমাকে যেভাবে হাইলাইটস করলি, এমন হাইলাইটস হানিফ সংকেতও আমাকে ইত্যাদিতে করেনা। তুই তো দারুন বলিস”।

(তখন তিনি ইত্যাদিতে নানার চরিত্রে অভিনয় করতেন, পরবর্তীতে বিশেষ কারণে ছেড়ে দিয়েছিলেন)। আমি হয়ত ভালো উপস্থাপনা করিনি, কিন্তু অবাক ও বিস্ময়ের ব্যাপার যে, একজন ক্ষুদ্র মানুষকে প্রেরণা দিয়ে এগিয়ে নিতে, আরেকজন বৃহৎ মানুষের মুখে এমন কথা বিরল ও দূভেদ্য।

অমল বোস দাদুর এই কথা আমি আজও ভুলিনি ও ভুলবো না, হৃদয় পটে খোদাই হয়ে থাকবে তাঁর কথা প্রেরণা হয়ে। এতো বড় মাপের মানুষের বলা মুখের কথা আজও আমাকে ফিরিয়ে নিয়ে যায় স্মৃতির সুতো বেয়ে, রেখে আসা সময়ের কাছে। খুব সাদা মাটা মনের ছিলেন অমল দাদু। আর তাই তো আমাদের মতো সাধারণের কথা তার মুখ দিয়ে বেরিয়ে এলো অবলিলায়।

নারায়নগঞ্জে যাওয়ার পথে আনিচ ভাইকে রাজধানীর টিকাটুলী তাঁর নিজ বাসা থেকে, ভরা সন্ধ্যায় আমাদের গাড়ীতে তুলে নিয়েছিলাম। তিনি অত্যান্ত সাদা-সিধে, সচেতন, গোছালো ও স্বল্পভাষী মানুষ। কথা ও কাজের সঙ্গে রয়েছে অসাধারণ ছন্দ মিল। উনার অভিনয় জীবন ও পরিবারের সবাইকে নিয়ে নানা বিষয়ে একটু আদটি কথা হয়েছিলো।

শুভ মহরতে উনার নাম আমি ঘোষনার পরে, অত্যন্ত গোছালো, প্রাসঙ্গিক ও গঠন মূলক বক্তব্য রেখেছিলেন এবং সমবেত দর্শক মুহুর্মুহু করতালিতে অভিনন্দনে সিক্ত করেছিলেন আনিচ ভাইকে। সময়কে প্রচন্ড মূল্যায়ন করতেন তিনি, আর সময়ের কাজ সময়ে করতে পছন্দ করতেন। সময়ের ব্যত্যয় হলে প্রচন্ড অভিমান সূলভ; অবয়ব ফুটে উঠতো তাঁর। অত্যন্ত মার্জিত ভাষায় যে কোন অসংগতি ধরিয়ে দিতেন।

“বিয়ের বাজার” নাটকের শ্যুটিংয়ের জন্য পুরো টিম সরাসরি আমরা চলে গেলাম পূবাইলে। আমাদের টিম লিডার ও নাটকের পরিচালক শ্রদ্ধেয় রেজা ভাইয়ের আমি এবং শামীম ভাই বেশি কাছের লোক হওয়াতে, অভিনয় শিল্পীদের বিশেষ লক্ষ্য রাখার দায়িত্বটা বেশিরভাগ আমাদেরকেই দিতেন।

এই টিমে সম্ভবত শামীম ভাই শ্যুটিংয়ের দিন সকালেই যুক্ত হয়েছিলেন আমাদের সঙ্গে। রাতে অমলবোস দাদু ও আনিচ ভাইয়ের অভিনয় জীবন নিয়ে অতিতের অজানা গল্পে গল্পে রাত বেশ গভীর হলো। যতদূর স্মরণে আছে অমল দাদুর কপাল টিপে ও চুল টেনে দিয়ে ঘুম পড়তে সহায়তা করেছিলাম আমি।

এতো বড় গুনিদের সঙ্গে বিচরণ করতে করতে অনুভবে ধরা দিলো যে, বড় বড় শিল্পীদের বহুমুখী গুন থাকে। তারমধ্যে আনিচ ভাইয়ের কয়েকটি গুন বেশ লক্ষ্যণীয় ছিলো, ওয়াক্ত মতো নামাজ আদায় করা, কাজ ছাড়া রুম থেকে বের না হওয়া, মেকাপ নেওয়ার পরে অভিনয়ের চরিত্রের অতলে ডুবে থাকা, সময় মতো খাওয়া-দাওয়া করা ও নিজের প্রতি অধিক যত্নবান।

আরেকটি বিষয় না বললেই নয়, আনিচ ভাই সাধারণত ঘটকের চরিত্রে অভিনয়ে পটু ছিলেন। আমাদের নাটকেও তিনি ঘটকের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। ঘটকের চরিত্রে অভিনয় করতে যা যা প্রয়োজন সবই উনার নিজের সংগ্রহে থাকতো। বিশেষ করে মেকাপে ব্যবহারিত গোফ ও দাড়ি উনার সঙ্গে একটি বইয়ের পাতার মধ্যে সংরক্ষণ করে রাখতেন।

“বিয়ের বাজার” নাটকে বেশিরভাগ সময় আমি আর শামীম ভাই অমল বোস দাদু ও আনিচ ভাইয়ের আড্ডার সঙ্গী ছিলাম। হঠাৎ দু’জনেই কাঁঠাল আর মুড়ি খাওয়ার আবদার করলেন, সঙ্গে সঙ্গে প্রোডাক্টশনকে জানিয়ে ব্যবস্থা করা হলো। কাঁঠালের সঙ্গে মুড়ি খাওয়া যায় এটা আমার জানা ছিলোনা। তাঁদের দু’জনের সঙ্গে আমি ও শামীম ভাই সমান তালে কাঠাল ও মুড়ি খেয়েছিলাম।

অমল বোস দাদুর একটা বিশেষ স্মৃতি আমার মনে এখনো দাগ কেটে যায় এবং তা কোন অবস্থাতেই ভুলার নয়; সেটি হলো- অমল দাদুর তখন শর্ট, লাইট ও ক্যামেরা রেডি। হঠাৎ দেখলাম ক্যামেরা ছুঁয়ে সালাম করছে, পরিচালকের হাতে হাত দিলেন এরপর আমরা যারা সহকারী পরিচালক প্যানেলে ছিলাম আমাদেরকেও খুঁজে নিয়ে হ্যান্ডশেক করে বললেন “দাদু আশির্বাদ করিস যেন তোদের মন মতো অভিনয় করতে পারি”।

বিস্ময়ের ব্যাপার যে, এতো বড় মাপের দাপুটে অভিনেতা আমাদের মতো অতি নগন্য, কাজ না জানা সহকারী পরিচালকের প্রতি সম্মান প্রদর্শন জানিয়েই ক্যামেরার সামনে দাঁড়লো! পরে জানলাম আমাদের এই নাটকটিই নাকি তাঁর জীবনের শেষ নাটক ছিলো। গুনে ভরা এসব মানুষদের কখনও মৃত্যু হয়না। রেখে যাওয়া সৃষ্টির মধ্যে এবং আমাদের মতো কোটি কোটি ভক্ত কুলের হৃদয়ে তাঁরা জীবিত থাকেন যুগ থেকে যুগান্তরে।

যে সময়টুকু অমল বোস দাদু ও আনিচ ভাইয়ের সঙ্গে একইফ্রেমে আবদ্ধ হলাম তা আজ শুধুই সুগন্ধময় স্মৃতির মালা হয়ে জড়িয়ে আছে সমস্ত দেহ জুড়ে। এই মহাগুনিদের সঙ্গে সম্পর্কের বন্ধন যেটুকু অটুট ছিলো তাতেই বার বার বিবেক তাড়িত করেছিলো তাঁদের সম্পর্কে কিছু লেখার জন্য।

এসব গুনিরা যুগে-যুগে, কালে-কালে আসেন, জয় করেন; আবার এই পৃথিবীকে কিছু দিয়ে চলেন যান, নিজে নি:স্ব হয়ে সবার চোখের আড়ালে। অমল দাদু ও আনিচ ভাই আপনারা দু’জনেই যেখানেই থাকেন না কেন, অনেক অনেক ভালো থাকবেন এই প্রত্যাশা রইলো আমার।