দেশে ড্রাগন চাষ করে করোনার ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পারেন কৃষক

প্রকাশিত: ৪:০৪ অপরাহ্ণ, মে ১৩, ২০২০ | আপডেট: ৪:১৩:অপরাহ্ণ, মে ১৩, ২০২০

কি বিষয়ে লিখব, তা চন্তা করছিলাম, শেষ পর্যন্ত ঠিক করলাম এবার কি কৃষির প্রাণ কৃষক কী সরকারী খাদ্য গুদামগুলিতে তাদের কষ্ট করে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে উৎপাদিত ইরি ধান বিক্রি করতে পারবেন, না তৃতীয় প্রভাবশালী অসৎ পক্ষ কৃষক সেঁজে খাদ্য গুদাম গুলি ভর্তি করবেন। কেন না বাংলার কৃষকেরা ইরি ধান চাষ করে ধান উৎপাদন করতে সার, বীজ, কীটনাশক, নিড়ানী, কৃষি শ্রমিক ইত্যাদিতে যে পরিমান ব্যয় করেন এবং বর্তমানে ধানের বাজার মূল্যেতে কি কৃষক লাভবান হবেন না ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ধান চাষে অগ্রহ হারাবেন সেটা একটি মুখ্য বিষয়।

এ সম্পর্কে লিখার জন্য, তথ্য উপাত্ত নিয়ে ল্যাপটপ ওপেন করলাম এমন সময়, ক্লাস ফোর এ পড়া আমার ছোট ছেলে আজিজ আরিফিন জীম বললো আব্বু ড্রাগন ফলের গাছ কত বড় হয়, দেখতে কেমন হয়, আমি বললাম ব্যস্ত আছি, তোমাকে পরে এ সম্পর্কে পরে বলছি, তখন সে বলল তোমার স্মাট ফোনটা দাও আমি নিজেই গুগল থেকে দেখে নিচ্ছি, সে গুগলে সার্চ দিয়ে ড্রাগন ফলের অনেক কিছু বের করলো আমি অবাক হয়ে দেখলাম এ সুস্বাদু ফলের সম্পর্কে অবগত নয় তাই ছেলে কথায়, লেখার থিমটি পরিবর্তন করে ড্রগন ফল, এর ইতিহাস, বাংলাদেশের মাটি ও জলবায়ু ড্রাগন চাষের জন্য উপযোগি কি না লিখার জন্য তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করে লিখা শুরু করলাম।

কৃষক ও কৃষি বাঁচলে বাংলাদেশ বাঁচবে। প্রধান মন্ত্রী, মানবতার মাতা শেখ হাসিনার নির্দেশে কৃষি বিভাগের কর্মকর্তা কর্মচারী দিনরাত কাজ করে যাচ্ছেন, আধুনিক পদ্ধতিতে কৃষকদের ধান কাটা, করোনা ভাইরাসের মাঝে সরকারী সুযোগ সুবিধা কৃষকদের বাড়ীতে পৌঁছে দেয়া, ত্রাণের সাথে সবজি বিতরণ, বসতবাড়ীর আশেপাশে কোন জমি যেন পতিত পড়ে না থাকে সে দিকে দৃষ্টি দিয়ে কৃষি বিভাগের কর্মকর্তা কর্মচারীরা শাক, সবজির বীজ বাড়ী গিয়ে বিতরণ অব্যাহত রেখেছেন। সত্যি বলতে কি কৃষি বিভাগ আশার আলো দেখাচ্ছেন। উচ্চ ফলনশীল বিভিন্ন জাত সফলভাবে উৎভাবণ করছেন। নতুন নতুন ফসল, ফলজ ও বনজ বাগান করার জন্য কৃষকদের আগ্রাহ সৃষ্টি করছেন। এখন দেশে দিনে দিনে ড্রাগন চাষ বেশ জনপ্রিয় হচ্ছে। করোনায় কৃষক ভাইদের যে বড় ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে সে ক্ষতি ড্রাগন ফল চাষ করে কাটিয়ে উঠতে পারেন। এ সম্পর্কে তাদের ভালভাবে জানতে হবে।

প্রাচীন রূপকথা জুড়ে আছে ড্রাগন নামক ভয়ংকর শক্তিশালী এক প্রাণীর গল্প। রূপকথার বা কোনো কল্পকাহিনির ড্রাগন নয়, একটা জলজ্যান্ত ফল। হ্যাঁ এখানে কথা বলা হচ্ছে ড্রাগন ফলের। এটি এক ধরনের ফণীমনসা (ক্যাক্টাস) প্রজাতির ফল, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে এর মহাজাতি হায়লোসিরিয়াস (অনেক মিষ্টি)। একে এক এক দেশে এক এক নামে অভিহিত করা হয়। গণচীন -এর লোকেরা এটিকে ফায়ার ড্রাগন ফ্রুট এবং ড্রাগন পার্ল ফ্রুট বলে, থাইল্যান্ডে ড্রাগন ক্রিস্টাল, ভিয়েতনামে সুইট ড্রাগন, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়াতে ড্রাগন ফ্রুট নামে পরিচিত। অন্যান্য স্বদেশীয় নাম হলো স্ট্রবেরি নাশপাতি। ডিম্বাকৃতির উজ্জ্বল গোলাপি রঙের এই ফলের নাম শুনলে কেমন জানি অদ্ভুত মনে হয়। এ আবার কেমন ফল। এটা কি আদৌ খাবার উপযোগী কিনা মনে সন্দেহ জাগে। কিন্তু এই ফল বাংলাদেশে অনেক জনপ্রিয়তা লাভ করছে। এই চাষ করে অনেকেই কোটিপতি হচ্ছে।

কথায় আছে “বৃক্ষরোপণ করে যে, সম্পদশালী হয় সে” এই প্রতিপাদ্য নিয়ে ঢাকার সাভারে আশুলিয়া মরিচকাটা গ্রামে রূম্পা চক্রবর্তী নামে এক ফলচাষি ১০ একর জমিতে সাড়ে ১৬ হাজার ড্রাগন ফলের চাষ করে সাফল্য অর্জন করেছেন। এছাড়া অন্যান্য অনেক চাষিরাও এই ফলের চাষ করে বাণিজ্যিকভাবে লাভবান হচ্ছে।

কেন এ ফলের নাম ড্রাগন? ড্রাগন ফল দেখতে অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও মনোমুগ্ধকর। পাতাবিহীন এই ফলটি দেখতে ডিম্বাকার ও লাল রঙের। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো এই ফলের বাইরের খোসা দেখতে রূপকথার ড্রাগনের পিঠের মতো।

এই রূপকথার ড্রাগনের মতো কিছুটা মিল থাকার জন্য একে ড্রাগন ফল বলে। ড্রাগন গাছ দেখতে কেমন? ড্রাগ গাছ দেখতে একদম ক্যাকটাসের মতো। গাছ দেখে অনেকেই একে চির সবুজ ক্যাকটাস বলেই মনে করেন। এশিয়ার মানুষের কাছে এ ফল অনেক জনপ্রিয়, হালকা মিষ্টি-মিষ্টি। এই ফলের খোসা নরম এটা কাটলে ভিতরটা দেখতে লাল বা সাদা রঙের হয়ে থাকে এবং ফলের মধ্যে কালজিরার মতো ছোট ছোট নরম বীজ আছে। নরম শাঁস ও মিষ্ট গন্ধ যুক্ত গোলাপি বর্ণের এই ফল খেতে অনেক সুস্বাদু। গাছ ১.৫ থেকে ২.৫ মিটার হয়।
ড্রাগন ফলের ইতিহাসঃ

ড্রাগনফলের উদ্ভিদতাত্বিক নাম Hylocereus undatus। এই ফল মূলত সেন্ট্রাল আমেরিকার প্রসিদ্ধ একটা ফল। সেন্ট্রাল আমেরিকাতে এ ফলটি ত্রয়োদশ শতাব্দীতে প্রবর্তন করা হয়। দক্ষিণ এশিয়া বিশেষ করে মালয়েশিয়াতে এ ফলের প্রবর্তন করা হয় বিংশ শতাব্দীর শেষে। তবে ভিয়েতনামে এ ফল সর্বাধিক বাণিজ্যিকভাবে চাষ করা হয়। বর্তমানে এ ফলটি দক্ষিণ আমেরিকা, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, দক্ষিণ চীন, মেক্সিকো, ইসরাইল, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়াসহ বাংলাদেশেও চাষ করা হচ্ছে। বাংলাদেশে এ পর্যন্ত অনেকগুলো বিদেশী ফল প্রবর্তন করা হচ্ছে। তার মধ্যে এ্যাভোকেডো, ম্যাঙ্গোঁস্টিন, কিউই, স্ট্রবেরী, রাম্বুটান, লংগান, ল্যাংসাট, ব্রেড ফ্লুট, চেরী ফল, জাবাটিকাবা, পীচ ফল, ফ্লুট এবং ডুরিয়ান অন্যতম। এদের মধ্যে কিউই ও ডুরিয়ান ছাড়া প্রায় সব ফলই এদেশে কম বেশি হচ্ছে এবং কোন কোনটা থেকে আশানুরূপ ফলন পাওয়া যাচ্ছে। যা দেখে অনেকে এসব বিদেশি ফলের বাণিজ্যিক ভিত্তিতে চাষ করার চিন্তা-ভাবনা করছে।

লক্ষ করা যাচ্ছে যে, এদেশের অনেক জায়গাতেই বিশেষ করে উত্তর বঙ্গ ও ময়মনসিংহে বাণিজ্যিকভাবে স্ট্রবেরী চাষ করা হচ্ছে। এছাড়া বিদেশী ফলগুলোর মধ্যে ড্রাগন ফলের চাষ সম্ভাবনাময়। গবেষকরা মনে করেছেন, এ ফলটি এদেশে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে চাষ করা সম্ভব হবে। বাংলাদেশে এ ফল প্রথম প্রবর্তন করে ২০০৭ সালে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাউ জার্মপ্লাজম সেন্টার। এ সেন্টারের পরিচালক প্রফেসর ড. এম. এ রহিম এ ফলের জাত নিয়ে আসেন থাইল্যান্ড, ফ্লোরিডা ও ভিয়েতনাম থেকে। এখন এ সেন্টার থেকে এ ফলটি বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য বংশ বিস্তার করা হচ্ছে

রাতের রাণী ড্রাগন ফুল : ড্রাগন গাছে শুধুমাত্র রাতে ফুল দেয়। ফুল লম্বাটে সাদা ও হলুদ রঙের হয়। অনেকটা ‘নাইট কুইন’ ফুলের মত। এ কারণে ড্রাগন ফুলকে ‘রাতের রাণী’ নামে অভিহিত করা হয়ে থাকে । ড্রাগন ফলের গাছ লতানো ইউফোরবিয়া গোত্রের ক্যাকটাসের মত কিন্তু এর কোন পাতা নেই। ফুল স্বপরাগায়িত; তবে মাছি, মৌমাছি ও পোকা-মাকড় এর পরাগায়ণ ত্বরানবিত করে এবং কৃত্রিম পরাগায়নও করা যেতে পারে। ড্রাগন ফুলকে বলা হয় ‘মুন ফ্লাওয়ার’ বা ‘কুইন অব দ্য নাইট’। ফুল থেকে ডিম্বাকার ফল গঠিত।

ড্রাগন ফলের ব্যবহার : ড্রাগন ফল কাঁচা বা পাঁকা অবস্থায় খাওয়া যায়। ড্রাগন ফল ফ্রিজে রেখে ঠাণ্ডা করে খেলে ভালো লাগে। ফলকে লম্বালম্বিভাবে কেটে ২/৪ টুকরা করে চামচ দিয়ে কুরে এর শাঁস খাওয়া যায়। এ ছাড়াও খোসা ছাড়িয়ে ছোট ছোট টুকরো করে কেটে কাঁটা চামচ দিয়ে খাওয়া যায়। এটা মুলত ফ্রুট সালাদ হিসেবে, মিল্ক শেক তৈরিতে, জুস তৈরির জন্যও ফলটি অত্যন্ত উপযোগী। এর ফুলও খাওয়া হয়।

এ ফলের পুষ্টি উপাদান : এ ফলটি প্রচুর পরিমানে ভিটামিন সি, মিনারেল এবং উচ্চ ফাইবার যুক্ত। জুস তৈরিতে জন্যও ফলটি অত্যন্ত উপযোগী।
প্রতি ১০০ গ্রাম ফলে — ফাইবার ০.৯ গ্রাম, ফ্যাট ০.৬১ গ্রাম, ক্যারোটিন ০.০১২ গ্রাম, পানি ৮৩.০ গ্রাম, ফসফরাস ৩৬.১ মি. গ্রাম, এসকোরবিক এসিড ৯.০ মি. গ্রাম, রিবোফাবিন ০.০৪৫ মি. গ্রাম, ক্যালসিয়াম ৮.৮ গ্রাম, নায়াসিন ০.৪৩০ মি.গ্রাম, আয়রন ০.৬৫ মি. গ্রাম, কার্বোহাইড্রেট ৯ থেকে ১৪ গ্রাম, প্রোটিন ০.১৫ থেকে ০.৫ গ্রাম, চর্বি ০.১ থেকে ০.৬ গ্রাম, অ্যাশ ০.৪ থেকে ০.৭ গ্রাম ক্যালরি ৩৫ থেকে ৫০ থাকে। এই লাল শাঁসের ড্রাগন ফলে ভিটামিন সি থাকে বেশি।

ড্রাগন ফলের উপকারিতা : এই ফল দেখতে খুব আকর্ষনীয়, এর কার্যকারিতা ও সুফলতা অনেক বেশি। এশিয়ার মানুষের কাছে এ ফল অনেক জনপ্রিয়, হালকা মিষ্টি-মিষ্টি, কোনোটা আবার হালকা টক।

ক) ড্রাগন ফলে ক্যালোরির পরিমাণ খুব কম থাকে। তাই ডায়াবেটিস ও হৃদরোগীরা খেতে পারবেন।
খ) ড্রাগন ফলে ভিটামিন সি বেশি থাকার ফলে এই ফল খেলে আমাদের শরীরের ভিটামিন সি এর চাহিদা পূরণ হয়। লাল শাঁসের ড্রাগন ফল থেকে বেশি পরিমানে ভিটামিন সি থাকে।
গ) ড্রাগন ফলে আয়রন থাকার কারনে রক্ত শূন্যতা দূর হয়।
ঘ) ড্রাগন ফলে প্রচুর পরিমানে পানি থাকার কারনে এই ফল জুস আকারে খেলে শরীরের পানি শূন্যতা সহজেই দূর হয়ে যায়।
ঙ) নিয়মিত ড্রাগন ফল খেলে রক্তের গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণে থাকে। তাই এই ফল ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য উত্তম।
চ) ড্রাগন ফলের শাঁস পিচ্ছিল হওয়ায় এই ফল খেলে কোষ্ঠ কাঠিন্য দূর হয়।
ছ) ড্রাগন ফলে প্রচুর ফাইবার থাকে যা পেটের পীড়া এবং লিভার এর জন্য ভালো।

জাত : বাণিজ্যিক ভিত্তিতে সফলভাবে চাষ করার জন্য বাউ ড্রাগন ফল – ১ (সাদা), বাউ ড্রাগন ফল – ২ (লাল) নির্বাচন করা যেতে পারে। এছাড়া হলুদ ড্রাগন ফল, কালচে লাল ড্রাগন ফল চাষ করা যেতে পারে। দুটি জাত বাংলাদেশে চাষ করা হচ্ছে। ড্রাগন চাষের জন্য কাটিং চারাই বেশি উপযোগী। কাটিং থেকে উৎপাদিত গাছে ফল ধরতে ১২ থেকে ১৮ মাস সময় লাগে।

উপযুক্ত সময় : ড্রাগন ফল সাধারণত সারা বছরেই চাষ করা যায়। এটি মোটামুটি শক্ত প্রজাতির গাছ হওয়ায় প্রায় সব ঋতুতেই চারা রোপন করতে পারেন। তবে ছাদে ড্রাগন ফল চাষ করে ভালো ফলন পেতে এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর মাসে চারা রোপন করলে আপনি অবশ্যই সুফল পাবেন।

ড্রাগন কেন এত উপকারী : ক্যাকটাস গোত্রের ড্রাগন ফল বাংলাদেশে তেমন প্রচলিত না হলেও সারা পৃথিবীতে অনেক জনপ্রিয় একটা ফল। এই ফলটি কয়েক রঙের হয়ে থাকে। ড্রাগন ফলের তিনটি প্রজাতি রয়েছে লাল ড্রাগন ফল বা পিটাইয়া, কোস্টারিকা ড্রাগন ফল এবং হলুদ ড্রাগন ফল। লাল ড্রাগন ফলের খোসার রঙ লাল কিন্তু শাঁস সাদা। এ প্রজাতির ফলই বাংলাদেশে বেশি দেখা যায়। কোস্টারিকা ড্রাগন ফলের খোসা ও শাঁসের রঙ লাল। হলুদ ড্রাগন ফলের খোসা হলুদ রঙের কিন্তু শাঁসের রঙ সাদা।

মিষ্টি স্বাদের ফলবিশিষ্ট ড্রাগন গাছে ফুল ফোটে রাতে যা দেখতে অনেকটা নাইট কুইন ফুলের মতো, লম্বাটে, সাদা ও হলুদ। এই ফল দেখতেও অত্যন্ত আকর্ষণীয় এবং এটি কাঁচা অবস্থাতেই খাওয়া হয়। বিদেশি এই ফল চাষ করা খুব সহজ। কাটিং পদ্ধতিতে লাগালেই গাছ হয়ে গাছ। বাড়ির ছাদে ড্রাম/বালতিতে/গ্রো ব্যাগে কিংবা মাটিতে অনায়াসে লাগানো যায় এবং আমাদের দেশের আবহাওয়ায় দারুণ হয় এই ড্রাগন ফল।

এতে ক্যালোরির পরিমাণ কম থাকে তাই ‘ডায়েট’ এর জন্য উত্তম। ডায়াবেটিস ও হৃদরোগীরা খেতে পারেন অনায়াসেই। ড্রাগন ফলে প্রচুর ভিটামিন সি থাকার ফলে এই ফল খেলে শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে ও ত্বক হয়। অন্যান্য প্রজাতির তুলনায় লাল শাঁসের ড্রাগন ফলে বেশি পরিমানে ভিটামিন সি পাওয়া যায়। পিচ্ছিল হওয়ায় ও আঁশ থাকার কারনে কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে এই ফল। এই ফল পেটের পীড়া দূর করতে সহায়তা করে এবং লিভার এর জন্যও উপকারী। এই ফলের কালো বীজ হজমে সাহায্য করে। আয়রন থাকার কারনে ড্রাগন ফল খেলে রক্ত শূন্যতা দূর হয়।

ড্রাগন ফল চাষ করে একর প্রতি বছরে ১০ থেকে ১২ লাখ টাকা আয় করা সম্ভাব। আর অল্প সময়েই অল্প পুঁজিতে ড্রগন ফল চাষ করে বেকার যুবকদের কোটিপতি হওয়ার বিশাল সুযোগ রয়েছে।

বিদেশে সুস্বাদু দামি ফল ড্রাগন ফল এখন বাংলাদেশে উৎপাদিত হচ্ছে। বিভিন্ন প্রাপ্ত তথ্য থেকে জানা যায়, ২০০৭ সালে বাংলাদেশে পরীক্ষামূলকভাবে ড্রাগন ফলের চাষ করা হয়। ড্রাগন ফলের চাষের জন্য বাংলাদেশের আবহাওয়া এবং মাটি উপযোগী হওয়ায় এর ফলন ভালো হচ্ছে। বর্তমানে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে ড্রাগন ফলের চাষ হচ্ছে। বিশেষ করে ঢাকার সাভার, রাজশাহীর বরেন্দ্র অঞ্চর, নাটোর, পাবনা, বগুড়া, চট্টগ্রামের পার্বত্য অঞ্চলে ড্রাগন ফলের চাষ করা হচ্ছে।

দেশের প্রায় দুই হাজার বাগানে ড্রাগন ফল চাষ হচ্ছে। ড্রাগন ফল চাষ লাভজনক হওয়ায় এর চাষ ক্রমেই বাড়ছে। বর্তমানে দেশের বড় বড় শহরগুলোর বাজার, সুপার শপগুলোতে এমনকি ফেরি ভ্যানেও ড্রাগন ফল পাওয়া যাচ্ছে। প্রতি কেজি ড্রাগন ফলের দাম ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা।

ড্রাগন ফলের আদি স্থান হচ্ছে থাইল্যান্ড। থাইল্যান্ডের জনপ্রিয় ফল ড্রাগন ফল বাংলাদেশে উৎপাদিত হওয়ায় এদেশের মানুষ ড্রাগন ফলের স্বাদ নিতে পারছে। ড্রাগন ফল অত্যন্ত সুস্বাদু মিষ্টি হয়ে থাকে। ড্রাগন ফলে ঔষধি গুণ রয়েছে। এতে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি রয়েছে। ড্রাগন ফল হার্টের রোগ, ব্লাড প্রেসার, ক্যান্সার রোগ প্রতিরোধে সহায়ক। উঁচু মাটিতে, অল্প জায়গায় দীঘর্জীবী ড্রাগন ফলের চাষ করা যায়। ড্রাগন ফুল নাইট কুইনের মতোই রাতে ফোটে। ফুলের আকার লম্বাটে এবং রং সাদা ও হলুদ।

প্রতি বিঘা জমিতে ২০০টি ড্রাগন ফলের গাছ রোপণ করা যায়। বীজ ও কাটিং পদ্ধতিতে ড্রাগন ফলের চাষ করা যায়। ফুল থেকে ডিম্বাকৃতি ফল উৎপন্ন হয়। ফলটি হালকা মিষ্টি ও ক্যালরি কমযুক্ত এবং এতে কালোজিরার মতো অসংখ্য বীজ থাকে। একটি গাছ থেকে বছরে ৬০ থেকে ১০০ কেজি ফল পাওয়া যায়। ড্রাগন গাছ শতকরা ৫০ ভাগ খাবার বায়ুমন্ডল থেকেই সংগ্রহ করে। বাকি খাবার সংগ্রহ করে জৈব সার থেকে। দেশে এখন এই ফলের চারাও পাওয়া যাচ্ছে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্রুট জার্মপ্লাজম সেন্টারে।

ড্রাগন ফলের গাছ দেখতে একদম ক্যাকটাসের মতো। ডিম্বাকৃতির উজ্জ্বল গোলাপি রঙের এই ফলের নামটিও অদ্ভুত। সাধারণত ডায়াবেটিস রোগ নিবারণে ড্রাগন ফল বেশ উপকারী। এতে ভিটামিন ‘সি’র পরিমাণ খুবই বেশি। তথ্যানুসন্ধানে আরও জানা যায়, ড্রাগন ফলের জন্ম দক্ষিণ আমেরিকার জঙ্গলে। ১০০ বছর আগে এই ফলের বীজ ভিয়েতনামে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকেই ড্রাগন ফলের চাষ বিস্তারলাভ করে। ড্রাগন ফলের চাষ সবচেয়ে বেশি হয় ভিয়েতনামে। এ ছাড়া তাইওয়ান, থাইল্যান্ড, ফিলিপাইন, শ্রীলঙ্কা, মালয়েশিয়া, চীন, ইসরাইল, অস্ট্রেলিয়াতেও ড্রাগন ফলের চাষ হচ্ছে। আমাদের দেশে ড্রাগন চাষ ও এর সম্প্রসারণ ঘটাতে চাষাবাদ কৌশল জানতে কৃষি মন্ত্রণালয় তদানীন্তন বড়াইগ্রাম উপজেলা কৃষি অফিসার দেশের প্রখ্যাত ফল গবেষক ও উদ্ভাবক এস এম কামরুজ্জামানকে ভিয়েতনাম পাঠানো হয়।

এ প্রসঙ্গে কামরুজ্জামান বলেন, দেশে প্রথম বারের মতো তিনি বিদেশ থেকে উন্নত জাতের কিছু ড্রাগন ফলের চারা নিয়ে আসেন। পরবর্তী সময়ে আমরা বিদেশে গিয়ে হাতে-কলমে এর চাষ শিখে দেশে চাষ শুরু করি।’ এখন মডার্ন টির্কালচার সেন্টারে থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, শ্রীলঙ্কা এবং চায়না থেকে আনা বিভিন্ন জাত ছাড়াও উদ্ভাবিত সবাির্ধক ১২টি জাতের দুই হাজার গাছে সবাির্ধক লাল, সাদা, গোলাপি, হলুদ এবং মাল্টি কালার এই পাঁচ রঙে ড্রাগন ফল উৎপাদন হচ্ছে।

উৎপাদিত ড্রাগন যাচ্ছে রাজধানীর কাওরান বাজার আর শ্যাম বাজারে। ওখান থেকে পাঁচ তারা হোটেল, অভিজাত ডিপাটের্মন্টাল স্টোর এবং সারা দেশে।

ড্রাগন চাষে লাভ বেশি: জৈব পদার্থসমৃদ্ধ বেলে দোআঁশ মাটিই ড্রাগন চাষের জন্য উত্তম হলেও প্রায় সব ধরনের মাটিতেই ড্রাগন ফল চাষ করা যায়। ড্রাগন গাছের কা- লতানো প্রকৃতির। ড্রাগন ফল চাষ খুব সহজ। অন্যান্য ফসলের চেয়ে চাষিদের পরিশ্রম অনেক কম, আয় বেশি। ড্রাগন ফলের চারা লাগানোর উপযুক্ত সময় হলো জুন-জুলাই মাস।

আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে মে মাস থেকে অক্টোবর মাসে ফল সংগ্রহ করা যায়। বাউ ড্রাগন ফল-১ (সাদা) ও বাউ ড্রাগন ফল-২ (লাল)। এ দুটি জাত বাংলাদেশে চাষ করা হচ্ছে। ড্রাগন চাষের জন্য কাটিং চারাই বেশি উপযোগী। কাটিং থেকে উৎপাদিত গাছে ফল ধরতে ১২ থেকে ১৮ মাস সময় লাগে। উপযুক্ত যত্ন নিলে একরপ্রতি ৬ থেকে ৭ টন ফলন পাওয়া যায়। কেজিপ্রতি দাম ২০০ টাকা হলেও, যার বাজর মূল্য ১২ থেকে ১৪ লাখ টাকা। খরচ ৬ থেকে ৭ লাখ টাকা বাদ দিলেও নীট লাভ হবে ৬ থেকে ৭ লাখ টাকা। আমাদের দেশে ড্রাগন ফল চাষের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে।

ড্রাগন ফল চাষে সফল হচ্ছেন অনেকে : ঢাকার সাভারে আশুলিয়ার মরিচকাটা গ্রামের রুম্পা চক্রবর্তী নামে শৌখিন এক ফলচাষি বাণিজ্যিকভাবে ১০ একর জমিতে ড্রাগন ফলের চাষ করে রীতিমতো হইচই সৃষ্টি করে ফেলেছেন। ঢাকার সাভারে আশুলিয়ার মরিচকাটা গ্রামে ওই ফলচাষি প্রায় সাড়ে ১৬ হাজার গাছ লাগিয়ে এরই মধ্যে সাফল্যের মুখ দেখতে শুরু করেছেন। মাত্র এক বছরের মধ্যে গাছগুলো ফলবতী হয়ে উঠছে। এ বছরই তিনি ৮ থেকে ১০ হাজার ফল পাওয়ার আশা করছেন।

ড্রাগন ফলের দেশ হিসেবে পরিচিত থাইল্যান্ডে একটি গাছ পরিপূর্ণ ফলবান হতে সময় লাগে তিন বছর। ২০০৯ সালে থাইল্যান্ড থেকে ড্রাগন ফলের চারা এনে জমিতে লাগানোর মাত্র এক বছরের মধ্যে ফল ধরতে দেখে তিনি নিজেই হতবাক হয়ে যান। তাই তিনি রফতানিযোগ্য এই ফলের ভবিষ্যৎ বাণিজ্যিক সম্ভাবনা নিয়ে বেশি আশাবাদী। দেশে এখন এই ফলের চারাও পাওয়া যাচ্ছে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্রুট জার্মপ্লাজম সেন্টারে। সাভারের জিরানীতেও বাণিজ্যিকভাবে চাষ হচ্ছে এই ফল। এল আর এগ্রোর স্বত্বাধিকারী লুৎফর রহমানও গড়ে তুলেছেন ড্রাগন ফলের বাগান।

পাহাড়ে ড্রাগন চাষ: আশার খবরটি হলো, রাঙামাটির কাপ্তাই কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের বিজ্ঞানীরা ড্রাগন ফলের পরীক্ষামূলক গবেষণায় সফল হয়েছেন। তাদের মতে, পাহাড়ের মাটি এই ফল চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। বাংলাদেশের পাহাড়ি অঞ্চলে এই ফলের ব্যাপক চাষাবাদ সম্ভব। পাহাড়ে বাড়ছে বিদেশি ফল ড্রাগনের চাষ। বান্দরবান কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য মতে, বিদেশী ফল হলেও পাহাড়ের জলবায়ু এবং মাটি দুটিই ড্রাগন চাষের জন্য খুবই উপযোগী। পাহাড়ে ড্রাগন ফল চাষের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে।

পোকামাকড়ের আক্রমণ কম এবং পানির সেচ কম লাগায় এ চাষে আগ্রহী হচ্ছে পাহাড়িরা। স্বল্প সময়ে অধিক লাভজনক হওয়ায় বান্দরবানে জুমচাষ ছেড়ে ড্রাগন ফল চাষে ঝুঁকছেন পাহাড়িরা। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চিম্বুক পাহাড়ের বসন্ত পাড়ায় বাণিজ্যিকভাবে ড্রাগন ফলের চাষ করে লাভবান হয়েছেন তারা।

বরেন্দ্র অঞ্চলে ড্রাগন চাষ: খরাপ্রবণ এলাকা হিসেবে বরেন্দ্র অঞ্চলে খরাসহিষ্ণু ক্যাকটাস প্রজাতির এ ফলের ফলন ভালো হওয়ায় ‘ড্রাগন’ চাষের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। রাজশাহীর কিছু অঞ্চলে স্থানীয়দের মধ্যে অপরিচিত এ ফল চাষ করা হয়েছে। কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, সীমিত পরিসরে রাজশাহী অঞ্চলে ড্রাগন ফলের আবাদ শুরু হয়েছে। বিঘাপ্রতি খরচ পড়ছে ২ লাখ টাকা বছরে আয় ৫ লাখ টাকা।

ছাদে ড্রাগন চাষ : ড্রাগন ফলটি জমির পাশাপাশি বাড়ির ছাদেও চাষ করা য়ায়। বাড়ির ছাদে টবে চাষ করে সাফল্য লাভ করেছেন উপজেলা কৃষি অফিসার আব্দুস ছালাম। আব্দুস ছালাম ২০১১ সালে এপ্রিল মাসে গাজীপুর জাতীয় কৃষি প্রশিক্ষণ একাডেমি (নাটা) হতে ৩টি চারা নিয়ে টবে লাগান। ২০১২ সালে ফূল ফোটে ফল হয়। টবে লাগানো একেকটি ফলের ওজন ১৫০ গ্রাম হতে ৩০০ গ্রাম পযর্ন্ত হয়। সাঁথিয়া তথা পাবনা জেলার মধ্যে তিনিই প্রথম দালানের ছাদে সফলভাবে ড্রাগন ফল চাষ করেছেন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, থাইল্যান্ড, ফ্লোরিডা ও ভিয়েতনাম থেকে ড্রাগনের জাত এনে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাউ জার্মপ্লাজম সেন্টারের পরিচালক অধ্যাপক ড. এমএ রহিম বাংলাদেশে ড্রাগন ফলের ওপর নিরলস গবেষণার মাধ্যমে দেশে ফলটির আবাদ উপযোগী নতুন জাতের উদ্ভাবন করেন। পরবর্তীতে ড্রাগন চাষে সফলতা অর্জনের ফলে জার্মপ্লাজম সেন্টারের পক্ষ থেকে নাটোর, রাজবাড়ী, রাঙামাটিসহ এখন দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ড্রাগন চাষ সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেয়া হয়। ২০০৯ সালে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বড়াইগ্রামে হবিদুল ইসলামের বাড়িতে বাংলাদেশে প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে ড্রাগন ফলের চাষ উদ্বোধন করেন। ২০০৭ সালে বাংলাদেশে প্রথম ড্রাগন ফলের গাছ নিয়ে আসা হয়। দেশে বাণিজ্যিক ড্রাগন চাষ করা সম্ভব হলে পুষ্টি চাহিদা পূরণে বিরাট অবদান রাখবে বলেও কৃষি বিশেষজ্ঞদের অভিমত।

তাদের মতে দেশে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে আবাদের জন্য বাউ ড্রাগন ফল-১ (সাদা), বাউ ড্রাগন ফল-২ (লাল), হলুদ ও কালচে লাল ড্রাগন ফলে চাষ বাড়ানো যেতে পারে। খেতে সুস্বাদু পুষ্টিকর এ ফলের চাষ ব্যাপকভাবে গড়ে উঠলে দেশের চাহিদা মিটিয়ে ড্রাগন ফল বিদেশে রপ্তানি করা সম্ভব বলে কৃষিবিদরা মনে করছেন। বাউ ড্রাগন ফল-১ (সাদ) ও বাউ ড্রাগন ফল-২ (লাল)। এ দুটি জাত বাংলাদেশে চাষ করা হচ্ছে। বীজ ও কাটিং পদ্ধতিতে ড্রাগন ফলের চাষ করা যায়। তবে বীজের গাছে মাতৃগাছের মতো ফলের গুণাগুণ না-ও থাকতে পারে। এতে ফল ধরতে বেশি সময় লাগে। ড্রাগন চাষের জন্য কাটিংয়ের চারাই বেশি উপযোগী। কাটিং থেকে উৎপাদিত গাছে ফল ধরতে ১২ থেকে ১৮ মাস সময় লাগে। উপযুক্ত যত্ন নিলে একর প্রতি ৬ থেকে ৭ টন ফলন পাওয়া যায়।

 

লেখক: মো. হায়দার আলী
প্রধান শিক্ষক, মহিশালবাড়ী মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়
সাধারণ সম্পাদক
গোদাগাড়ী প্রেস ক্লাব, গোদাগাড়ী, রাজশাহী।