দোয়ারাবাজারের শহীদ স্মৃতিসৌধ, যেন পর্যটনের হাতছানি

হাবিবুল্লাহ হেলালি হাবিবুল্লাহ হেলালি

দোয়ারাবাজার(সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ৮:২২ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ৮, ২০১৯ | আপডেট: ৮:২২:অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ৮, ২০১৯

দোয়ারাবাজার উপজেলার বাঁশতলা-হকনগর শহীদ স্মৃতিসৌধ এলাকাটি সর্বমহলে এখন পর্যটন এলাকা হিসেবে পরিচিত। সীমান্তের বাঁশতলা-হকনগর রুচিশীল প্রকৃতি প্রেমিদের মন কেড়েছে। এখানে ভারতীয় সীমানার কোল ঘেঁষে জুমগাঁও পাহাড়ের উপর গারো জাতির বসবাস। তাদের সাজানো-গোছানো ঘর-বাড়ির পরিবেশ অত্যন্ত পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন।

গারো পাহাড়ের পাদদেশে ভারতের সীমান্ত। এখানের চারদিকে সবুজের সমারোহ। বিকেল বেলা পাখিদের কলরব ও বাতাসের মনমাতানো শব্দে প্রাণ জুড়ায়। ছোট ছোট টিলা আর পাহাড়ে সাজানো বিস্তৃর্ণ এলাকা। দেখলে মনে হবে কেউ যেন চারদিকে সবুজ রঙ ছড়িয়ে দিয়েছে। ভারত সীমান্তে পাহাড়ী ঝরনা চোখে পড়ার মত। এখান থেকে ফিরে হকনগরস্থ মৌলা নদীর উপর সুইস গেট দর্শন না করে যাওয়া যায় না।

১ কোটি ২৬ লাখ ১০ হাজার টাকা ব্যয়ে ২০০৫ সালে এটি নির্মিত হয়। যদিও নদী শাসন প্রকৃতি বিরোধী তবুও বয়ে চলা পাহাড়ি ঝর্ণার মাঝে এ সুইস গেট আলাদা সৌন্দর্য্যরে সৃষ্টি করেছে। এখানে ঠান্ডা ও শীতল স্বচ্ছ পানিতে সাঁতার কাটলে সহজেই শরীরের ক্লান্তি দূর করে। সুইস গেটে পানির মনোহারি শব্দে গোটা এলাকা যেন মুখরিত হয়ে আছে। সুইস গেট ছাড়িয়ে কিছুটা সামনে গেলই দেখা মিলবে তৎকালীন মুক্তিযুদ্ধের ৫ নং সদর দপ্তর। এখানে কিছুটা ত্রিভুজ আকৃতির শহীদ মিনারের বেদিতে বসলে প্রাকৃতিক ঠান্ডা বাতাস মন ছুঁয়ে যাওয়ার মত। এখনাকার আশপাশের পরিবেশ খুবই মনোরম। সবুজ পাহাড় আর নীল আকাশের মিতালি দেখে মনে হবে যেন ‘আকাশে হেলান দিয়ে পাহাড় ঘুমায়।

দোয়ারাবাজার উপজেলাটি মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত ও পর্যটকদের আকর্ষণ করার এক অতুলনীয় পরিবেশ এখানে। এখানে রয়েছে টেংরা টিলা গ্যাস ফিল্ড, খাসিয়া মারা নদীর উপর রাবার ড্যাম, মারপসি খালের উপর বক্স সুইস গেট, বাংলাবাজার উপ-প্রকল্পে হাইড্রোলিক ট্রাকচার ও এন্ড এম সেড, বাঁশতলা হক নগর শহীদ স্মৃতি সৌধ, আদিবাসী পাহাড়, মুক্তিযোদ্ধা বীর প্রতীক, বীরাঙ্গনাসহ আরো অনেক দর্শনীয় স্থান রয়েছে।

এখানে যাবার দু’টি রাস্তা হচ্ছে, (১) ছাতক শহরের নোয়ারাই বাজার থেকে এবং (২) দোয়ারাবাজার সদর থেকে সিএনজি অটো রিক্সা, অটো টেম্পু ও ভাড়ায় মোটর সাইকেল পাওয়া যায়।

এখানকার মনোরম পরিবেশ পর্যটকদের আকর্ষণ করে। দোয়ারাবাজারের অদূরে বাংলাবাজার ইউনিয়নের বৃহত্তর গ্রাম হচ্ছে কলাউরা। গ্রামটি পাড়ি দিলেই চোখে পড়ে আকাশের সাথে যেন পাহাড়ের চির মিতালী। এখানে ভারত থেকে নেমে আসা মৌলা নদীর উপর নির্মিত সুইস গেট, ৩দিকে মেঘালয় পাহাড়ে ঘেরা বাঁশতলা স্মৃতি সৌধ, পাহাড়ি ঝরনার কলরব, পাখ-পাখালির কুহু কুহু ডাকে মনের মণিকোঠায় স্পন্দন জাগে। বলতে গেলে বাঁশতলায় মনোমুগ্ধকর অসাধরণ এক পরিবেশ বিরাজমান। যা পর্যটকদের নজর কাড়ার মতো। মুক্তিযুদ্ধের সময় ক্যাপ্টেন হেলাল পাহাড় বেষ্টিত এই এলাকায় ৫নং সাব-সেক্টরের কমান্ডার ছিলেন।

জানা গেছে, বাঁশতলাসহ এর পার্শ্ববর্তী এলাকায় যারা শহীদ হয়েছেন এখানেই তাদের সমাহিত করা হয়। এসব শহীদের স্মৃতি অমøান করে রাখার জন্যে হকনগর স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হয়। স্থানীয় সংসদ সদস্য মুহিবুর রহমান মানিকের আপ্রাণ প্রচেষ্ঠায় সরকারী অর্থায়নে হকনগর স্মৃতি সৌধ এলাকায় পর্যটকদের জন্যে নির্মাণ করা হয়েছে, একটি রেষ্ট হাউজ, হকনগর কমিউনিটি ক্লিনিক, মসজিদসহ বিভিন্ন স্থাপনা। স্মৃতি সৌধের পাশে রয়েছে দু’শতাধিক বছরের পুরোনো আদিবাসী পাহাড়। এখানে রয়েছে গারোদের বসবাস। পাহাড়ে উঠলে প্রকৃতির প্রকৃত চেহারা অবলোকন করতে প্রত্যহ হাজারো প্রকৃতি প্রেমীরা এখানে এসে জড়ো হয়। ঝুমগাঁও এলাকায় বসবাস করে আদিবাসী গারো স¤প্রদায়ের প্রায় ২৫টি পরিবার। তারা নিজ হাতে তৈরী করে নিজেদের ব্যবহার্য যাবতীয় আসবাবপত্র। গারো পাহাড়ে রয়েছে একটি মিশনারী স্কুল, একটি উপাসনালয় ও পাহাড়ের চূড়ায় উঠার জন্যে সরকারী অর্থায়নে নির্মিত একটি সিঁড়ি। সব মিলিয়ে পর্যটকদের মন কাড়ার মতো এখানকার পরিবেশ।

কিন্তু সুরমা ব্রিজের কাজ সম্পন্ন না হওয়ায় গোবিন্দগঞ্জ-ছাতক-দোয়ারাবাজার ও ছাতক-বাংলাবাজার-বাঁশতলা সড়কে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ স্থাপিত হয়নি। এখানে সীমান্তর্তী এলাকার মানুষ খুবই অতিথি পরায়ণ। যুদ্ধের সময়ে যেভাবে তারা মুক্তিযোদ্ধাদের সার্বিক সহযোগিতা দিয়েছেন সেই ধারাবাহিকতায় এখনো তাদের মধ্যে পর্যটকদের আদর-আপ্যায়নে সদা হাস্যোজ্জ্বল পরিবেশ লক্ষ্য করা যায়। দেখলে তাদেরকে অত্যন্ত সহজ-সরল প্রকৃতির মনে হয়।

ছাতকের জিয়াপুর নিবাসী তৎকালীন এমএলএ মরহুম আব্দুল হকের মুক্তিযুদ্ধে বিশেষ অবদানের জন্যে তার জীবদ্দশায়ই এলাকাবাসী তার নামানুসারে গ্রামের নাম হকনগর রাখেন। এসময় মহান মুক্তিযুদ্ধ চলছিল। যুদ্ধচলাকালীন সময়ে তিনি এখানে প্রতিষ্ঠা করেন একটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। এখানে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাসহ এলাকার বিপুল সংখ্যক রোগীর চিকিৎসা সেবা দেয়া হতো। হকনগর প্রাথমিক বিদ্যালয় নামেও তিনি একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। এখনও মরহুম আব্দুল হকের নামানুসারে হকনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, হকনগর গ্রাম ও হকনগর স্মৃতিসৌধসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থাকলেও কালেরগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে হকনগর হাসপাতালটি।

একসময়ে হকনগর হাসপাতালে নরসিংপুর, বাংলাবাজার, বগুলা, লক্ষীপুরসহ বিভিন্ন ইউনিয়নের বিপুল সংখ্যক রোগীর চিকিৎসা সেবার একমাত্র আশ্রয়স্থল ছিল। কিন্তু এখন এটি বন্ধ করে হকনগর কমিউনিটি ক্লিনিক প্রতিষ্ঠা করলেও প্রায়ই এটির দরজায় তালা ঝুলে। এখানে পরিবার পরিকল্পনাসহ অন্যান্য বিষয়ে পরামর্শ দেয়া হলেও চিকিৎসা সেবার জন্যে কোন ডাক্তার নেই। এজন্যে এলাকার বিপুল সংখ্যক লোক চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত রয়েছে।

এলাকাবাসী মরহুম এমএলএ আব্দুল হক প্রতিষ্ঠিত অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের ন্যায় এখানে হকনগর হাসপাতাল পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্যে সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষে আশু হস্তক্ষেপ কামনা করছেন। তাদের দাবি, যুদ্ধকালীন সময়ে শুধু ক্যাপ্টেন হেলাল ও এমএলএ আব্দুল হকের বর্ণাঢ্য অবদানের সাথে এলাকাবাসীর ও সার্বিক সহযোগিতা ছিল চোখে পড়ার মতো।