ধনকুবেরদের লাক্সারি ইয়ট, নাকি প্রাইভেট নৌবাহিনী?

টিবিটি টিবিটি

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ৪:১৩ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ৩, ২০১৮ | আপডেট: ৪:১৩:অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ৩, ২০১৮

টিবিটি বিস্ময়কর পৃথিবীঃ কিছু লোক যাচ্ছেন সমুদ্রে, জাহাজ কিনছেন। পাঁচ তারকা হোটেলকে এবার তিনি নিয়ে গেছেন সমুদ্রের মাঝে। সেই জাহাজে অতিথিদের আপ্যায়ন করে সম্মান কুড়াবার চেষ্টা তার। জাহাজগুলোর মাঝেও সবচাইতে ভালো এবং সবচাইতে বড়টা তার চাই; সবচেয়ে বেশি বিলাসবহুল।

এই বিলাসিতার আবার যেন শেষ নেই। জাহাজের উপরে হেলিকপ্টার তো স্বাভাবিক ব্যাপার। স্পিডবোট রাইড, সেইলিং বোট, মাছ ধরা, জেট-স্কি, প্যারা গ্লাইডিং, স্কুবা ডাইভিং– কী নেই!

এর সাথে যোগ হয়েছে সাবমেরিন! পানির নিচের জগত নিজ চোখে দেখার জন্যে এই সাবমেরিন। কিছু জাহাজে ল্যান্ডিং ক্রাফট বা হভারক্রাফটও থাকছে, যাতে করে জাহাজ থেকে স্থলে অবতরণ করা যায়।

মাইক্রোসফটের সহ-প্রতিষ্ঠাতা পল এলেনের ১২৬ মিটার লম্বা ও ১০ হাজার টনের এক্সপ্লোরার ইয়ট ‘অক্টোপাস’। জাহাজটিতে রয়েছে অ্যাডভেঞ্চারের সব উপকরণ।

কিছু জাহাজে ছোটখাটো ফ্লাইং বোট বহন করা হচ্ছে। এতোসব যানবাহন এবং যন্ত্রপাতির জন্যে যে টেকনিক্যাল জ্ঞান এবং রক্ষণাবেক্ষণ দরকার, তার জন্য এই জাহাজে স্পেশালিস্ট লোকজন বহন করতে হচ্ছে। এতোকিছু এক জাহাজে ঢোকানো অনেক সময় বিভিন্ন সমস্যার জন্ম দিচ্ছে। বোট, সাবমেরিন, হেলিকপ্টার– এগুলোর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ দরকার।

বিলাসবহুল জীবনযাপনের জন্যে যে জাহাজ কিনেছেন, সেই জাহাজে যদি সারাদিন যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণের জন্যে ঠুকঠাক খুটখাট শব্দ হতে থাকে, তাহলে সেটাকে বরং ওয়ার্কশপ বলাই ভালো। তাছাড়া এতোসব যন্ত্রপাতি দিয়ে ডেকের উপরটা ভরে ফেললে ডেকের উপরে আরাম করে বসার স্থানটাও তো কমে যাচ্ছে।

কেউবা আবার নিজের অফিসটাকেও সাথে নিতে চাচ্ছেন, একেবারে অফিসের স্টাফসহ। অর্থাৎ তার পুরো জীবনটাকেই জাহাজে চড়িয়ে তিনি তার সাথে নিতে চাচ্ছে। একের ভেতরে সব চাইতে গেলে অনেক প্রশ্নের উত্তর তাকে দিয়ে আসতে হবে।

মাইক্রোসফটের সহ-প্রতিষ্ঠাতা পল এলেনের ১২৬ মিটার লম্বা এবং ১০ হাজার টনের এক্সপ্লোরার ইয়ট ‘অক্টোপাস’। জাহাজটায় রয়েছে দুইটি হেলিডেক। পেছনের হেলিডেকের সাথে রয়েছে বিরাট এক হ্যাঙ্গার, যার ভেতরে দুটি হেলিকপ্টার রাখা যায়। হেলিডেকের নিচে রয়েছে ডক, যার ভেতরে কয়েকটা স্পিডবোট এবং ল্যান্ডিং ক্রাফট রাখা যায়। অ্যাডভেঞ্চার গোছের মানুষদের প্রবৃত্তিকে খুশি করতে এধরনের ইয়টে কী রাখা হয়নি?


ডাচ শিপবিল্ডার ডামেনের তৈরি করা ইয়ট সাপোর্ট ভেসেল ‘গেম চেঞ্জার’। এধরনের জাহাজগুলো কিছু মানুষের হাতে প্রাইভেট নৌবাহিনী দিয়ে দিচ্ছে।

কিছু লোক তাদের প্রবৃত্তিকে খুশি করতে অজানাকে খুঁজে বেড়াতে চান। যেমন- এন্টার্কটিকা ভ্রমণ, পানির নিচে প্রাচীনকালে ডুবে যাওয়া জাহাজ খুঁজে বের করা, দুর্গম অঞ্চলের জীবজন্তু দেখতে যাওয়া, গুপ্তধনের সন্ধান করা, গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে যাওয়া, ইত্যাদি। এই ভ্রমণগুলো ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জে সূর্যস্নানের মতো নয়।

যারা এগুলো পছন্দ করেন, তাদেরকে অ্যাডভেঞ্চারিস্ট বলছে অনেকে। এসব কর্মকাণ্ডে প্রযুক্তির আধিক্য বেশি এবং যন্ত্রপাতি যথেষ্টই লাগছে সেখানে। কাজেই তাদের জাহাজগুলোতে বহু পদের যন্ত্রপাতি রাখার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। ঠুকঠাক-খুটখাট শব্দও সয়ে নিচ্ছে সে। তবে যথেষ্টই বিলাসবহুল এগুলো।

এধরনের জাহাজগুলোকে ‘এক্সপ্লোরার ইয়ট’ বলা হচ্ছে। তবে যেসব জাহাজে এতোসব যন্ত্রপাতি রাখা হচ্ছে না, তাদেরও কিন্তু ইচ্ছের কমতি নেই। তারাও যন্ত্রপাতি চাইছেন তাদের প্রবৃত্তিকে খুশি করতে; তবে খুটখাট শব্দও চাইছেন না। বাজার মালিকরাও কম যায় না। তারা এধরনের ক্রেতাদের খুশি করতে আরেক ধরনের জাহাজ তৈরি করার চিন্তা করলো। এর নাম দেয়া হলো- ‘ইয়ট সাপোর্ট ভেসেল’।

এর কাজ হলো মূল ইয়ট (মাদার ইয়ট) এর সাথে সাথে যাওয়া এবং যন্ত্রপাতি বহন। দরকারে অতিরিক্তি ক্রু বা অতিথিদের নেয়া, অফিস স্টাফদের নেয়া। যন্ত্রপাতির রক্ষণাবেক্ষণ করা, জ্বালানি, অন্যান্য সাপ্লাই ও স্পেয়ার পার্টস বহন করা, মূল ইয়টের দরকারের জিনিসগুলি বহন করা এবং আরে অন্যান্য কারিগরি সাপোর্ট দেয়া। তবে এধরনের জাহাজের সবচাইতে বড় কাজ হলো মূল ইয়টের নিরাপত্তা দেয়া।

ডাচ শিপবিল্ডার ডামেনের তৈরি করা ইয়ট সাপোর্ট ভেসেল ‘গেম চেঞ্জার’। ৬৯ মিটার লম্বা এই জাহাজের হেলিডেকের নিচে রয়েছে হ্যাঙ্গার। আর এর ডেকের উপরে রয়েছে কয়েক ধরনের স্পিডবোট এবং একটা সাবমেরিন। জাহাজের পেছন দিকে রয়েছে ডাইভিং সাপোর্ট রুম যার সাথে ১২ জন স্কুবা ডাইভারের সরঞ্জামাদি রয়েছে, সাথে রয়েছে ডিকম্প্রেশন চেম্বার। এধরনের জাহাজগুলো কিছু মানুষের হাতে প্রাইভেট নৌবাহিনী দিয়ে দিচ্ছে।

লাক্সারি ইয়টের নিরাপত্তা
যারা এসব ইয়টের মার্কেটিং করছেন, তাদের চিন্তার মাঝে এই নিরাপত্তা ব্যাপারটাই গুরুত্ব পাচ্ছে বেশি। এতো বিত্তশালী এই ব্যক্তির বিত্তের সাথে সাথে নিজের নিরাপত্তার শঙ্কাও বেড়েছে। তাই বিরাট একটা বিলাসবহুল ইয়টকে সমুদ্রে নিয়ে গেলে সেই জাহাজের নিরাপত্তার কথা তাকে আলাদাভাবে চিন্তা করতে হচ্ছে।

বিশেষত সমুদ্রে জলদস্যু দ্বারা আক্রান্ত হলে তিনি কী করবেন? নিরাপত্তাও এখন কেনাবেচার বিষয়। বিশ্বের বহু প্রান্তে অবসরপ্রাপ্ত সেনারা এখন ভাড়াটে সেনা হিসেবে খাটছেন। এরা এই ‘ইয়ট সাপোর্ট ভেসেল’-এ স্থান নিচ্ছেন মূল লাক্সারি ইয়ট বা মাদার ইয়টের নিরাপত্তা দিতে। তারা স্পিডবোট, হেলিকপ্টার, সাবমেরিন, ল্যান্ডিং ক্রাফট, হোভারক্রাফট, ফ্লাইং বোট, ইত্যাদি চালাচ্ছেন এবং সেগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ করছেন। জাহাজগুলোর ক্রু-ই শুধু নয়, জাহাজের ডিজাইন এবং কন্সট্রাকশনও মিলিটারি গ্রেডের। এসব জাহাজে কী কী দেয়া হচ্ছে, তার একটা ফিরিস্তি দিলেই সেটা পরিষ্কার হয়ে যাবে।

কিছু জাহাজে শুধু হেলিকপ্টার ল্যান্ডিং প্যাডই নয়, হেলিকপ্টার রাখার জন্যে হ্যাঙ্গারও দেয়া হচ্ছে। সেখানে হেলিকপ্টার মেইনটেন্যান্সের সুবিধাও থাকছে। আগুস্টা এডব্লিউ-১০৯ বা ইউরোকপ্টার ইসি-১৩৫ হেলিকপ্টার এসব জাহাজে দেখা যাচ্ছে নিয়মিত। বিভিন্ন দেশের নিরাপত্তা বাহিনীও এধরনের হেলিকপ্টার ব্যবহার করে থাকে।


সুপার ইয়ট ‘গোল্ডেন শ্যাডো’। এসব জাহাজের মালিকদের রাজনৈতিক সচেতনতা হয়ে দাঁড়াবে বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্য মাইলফলক।

ছোটবড় বিভিন্ন প্রকারের ৪-৫টা স্পিডবোট এসব জাহাজে থাকছেই। স্পিডবোটগুলোর মাঝে মিলিটারি গ্রেডের ইন্টারসেপ্টর বোটও থাকছে যা কিনা স্পেশাল ফোর্সের সেনারা ব্যবহার করে।

সাবমেরিন থাকছে অনেক ক্ষেত্রেই। কখনো কখনো মনুষ্যবিহীন সাবমেরিনও থাকছে, যা কিনা অতি-গভীর সমুদ্র থেকে ভিডিও পাঠাতে পারে।

স্কুভা ডাইভার অপারেশনের জন্যে সকল ব্যবস্থা দেয়া হচ্ছে। ডজনখানেক স্কুবা অপারেট করতে পারার মতো যন্ত্রপাতি দিচ্ছে কেউ কেউ। ডিকম্প্রেশন চেম্বারও দেয়া হচ্ছে ডাইভারদের জন্যে। স্কুবা ডাইভারদের অভিজ্ঞতা শেয়ারের জন্যে বড়সড় রুম দেয়া হচ্ছে ডিজিটাল ডিসপ্লেসহ, যাতে পানির নিচে ধারণ করা ভিডিও শেয়ার করতে পারে সবাই।

কিছু ক্ষেত্রে ছোট ফ্লাইং বোট রাখা হচ্ছে এই ইয়ট সাপোর্ট ভেসেলে। এর ডানাগুলো গুটিয়ে ডেকের উপরে স্বল্প জায়গায় রেখে দেয়া যায়। গাড়ি বা মোটরসাইকেল রাখা হচ্ছে কিছু জাহাজে। দরকার বিশেষে ল্যান্ডিং ক্রাফট বা হোভারক্রাফটের মাধ্যমে এই যানবাহন উপকূলে নামিয়ে দেয়া হচ্ছে। ক্রাফটগুলো বেশিরভাগ সময়েই জাহাজের ডেকের উপরে বহন করা হচ্ছে।

স্পিডবোট, সাবমেরিন, ল্যান্ডিং ক্রাফট, হোভারক্রাফট, ফ্লাইং বোট, ইত্যাদি ডেকের উপর থেকে পানিতে নামাবার জন্যে শক্তিশালী ক্রেন রাখা হচ্ছে ডেকে।

কিছু জাহাজের পেছন দিকে ডক থাকছে, যেখানে পাম্পের মাধ্যমে পানি পাম্প করে ঢুকিয়ে দেয়া যায় আবার বেরও করে দেয়া যায়। বোটগুলো পানিতে নামাতে হলে বা পানি থেকে তোলার দরকার হলে পাম্প করে পানি ঢোকানো হয়। তবে এধরনের ডক থাকে মূলতঃ বড় এক্সপ্লোরার ইয়টগুলোতে।

জাহাজের ডিজাইন মিলিটারি গ্রেডের। এগুলোর গতি ঘণ্টায় ২০ নটিক্যাল মাইল থেকে ২৮ নটিক্যাল মাইল। সব ধরনের আবহাওয়ায় এগুলো চলমান রাখা সম্ভব হচ্ছে। জাহাজগুলোর ইলেকট্রনিক্স এবং কমিউনিকেশন যন্ত্রপাতি একেবারেই অত্যাধুনিক এবং মিলিটারি গ্রেডের। জাহাজগুলোর ব্রিজ যেকোন মিলিটারি জাহাজের ব্রিজের মতোই মনে হবে।

চার হাজার থেকে ৯ হাজার নটিক্যাল মাইল এসব জাহাজের পাল্লা, যা কিনা একে লম্বা সময় সমুদ্রে থাকার পথ খুলে দিয়েছে।

হল্যান্ডের শিপবিল্ডিং কোম্পানি ডামেন সাম্প্রতিককালে মিলিটারি জাহাজ তৈরি করে বেশ নাম করেছে। তাদের কয়েকটা ডিজাইন বহু দেশের কাছে বিক্রি হয়েছে। তাদের প্যাট্রোল বোটগুলো বিভিন্ন কোম্পানির কাছেও বিক্রি হয়েছে, যারা সমুদ্রে বিভিন্ন স্থাপনার নিরাপত্তা দিতে সেগুলোকে ব্যবহার করে।

সেসব জাহাজের ডিজাইন পরিবর্তন করেই ইয়ট সাপোর্ট ভেসেলের ডিজাইন করা হয়েছে। অর্থাৎ মিলিটারি জাহাজকেই তারা ‘সুগার-কোট’ করে বিক্রি করছে। ডজনখানেক ইয়ট সাপোর্ট ভেসেল ইতোমধ্যেই বিক্রি করেছে ডামেন। অন্যরাও বানাচ্ছে।

জাহাজগুলোতে কোনো সমস্যা ছাড়াই একটা শক্তিশালী স্পেশাল ফোর্স ইউনিট বহন করা সম্ভব। তাদের হেলিকপ্টার, স্পিডবোট, ডাইভিং গিয়ার, ইত্যাদিও সাথে রাখা যাবে। খুব বেশি একটা মোডিফিকেশন ছাড়াই এতে বিভিন্ন প্রকারের অস্ত্র বহন করা সম্ভব। ড্রোনও অপারেট করা সম্ভব যার জন্যে যথেষ্ট স্থান এসব জাহাজের বেশ কয়েকটাতেই রয়েছে।

সুপার ইয়ট ‘গোল্ডেন শ্যাডো’। এর পেছনে দেখা যাচ্ছে বেশ কয়েকটা স্পিডবোট এবং একটা সী-প্লেন। পরিবর্তিত বিশ্বের পরিবর্তিত নিয়মে ইয়ট মালিকদের হাতে থাকা সম্পদ রাষ্ট্রীয় কাজে ব্যবহার হবার মতো। তাই পুঁজিবাদের এই ক্ষয়িষ্ণু সময়ে পরিবর্তনের হাইওয়েতে এদের রাজনৈতিক সচেতনতা হয়ে দাঁড়াবে বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্যে উল্লেখযোগ্য মাইলফলক।

পরিবর্তিত বিশ্বে ইয়টের মালিকদের স্থান
ধনকুবের ব্যক্তিরা তাদের প্রবৃত্তিকে খুশি করতে গিয়ে যুদ্ধাস্ত্র নির্মাতাদের জন্য নতুন বাজারের সৃষ্টি করেছে। নিজের একটা প্রাইভেট আর্মি, প্রাইভেট নেভি এবং প্রাইভেট এয়ার ফোর্স তারা চাইতেই পারে। তবে দরকার বিশেষে তাদের এই মিলিটারি প্ল্যাটফর্মগুলো কোথায়, কী করবে সেটাই হবে মূল পরীক্ষা।