নিয়ম ভেঙে বুকার পুরস্কার পেলেন দুজন

টিবিটি টিবিটি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: 11:51 AM, October 16, 2019 | আপডেট: 11:52:AM, October 16, 2019

এ বছর যৌথভাবে মর্যাদাপূর্ণ বুকার পুরস্কার পেলেন কানাডিয়ান লেখক মার্গারেট অ্যাটউড এবং অ্যাংলো-নাইজেরিয়ান বার্নারডিন ইভারিস্তো। অ্যাটউড তার ‘দ্য টেক্সামেন্ট’ উপন্যাসের জন্য এই সম্মান অর্জন করেন। এ নিয়ে তিনবার বুকার পুরস্কারে ভূষিত হলেন তিনি। আর ইভারিস্তো ‘গার্ল, ওমেন, আদার্স’ উপন্যাসের জন্য পুরস্কার পান।

বুকারের ৫০তম বার্ষিকীতে লন্ডনের গিন্ডহলে এক অনুষ্ঠানে তাদের এ পুরস্কার হস্তান্তর করা হবে। পুরস্কারের ৫০ হাজার পাউন্ড দুই লেখক সমানভাবে পাবেন। বুকার পুরস্কারের পাঁচ সদস্যের জুরি বোর্ড আজ তাদের নাম ঘোষণা করেছে।

মার্গারেট অ্যাটউড (৭৯) এর আগে ১৯৭৪ ও ১৯৯৭ সালে বুকার পুরস্কার লাভ করেন। এ বছর শর্টলিস্টে যে ছয়জন লেখক বাছাই হয় তাদের চারজনই নারী।

তবে এবারই প্রথম নয়, বুকারের ইতিহাসে যৌথভাবে পুরস্কার পাওয়ার রেকর্ড রয়েছে—১৯৭৪ সালে নাদিন গর্ডিমার ও স্ট্যানলি মিডিলটন এবং ১৯৯২ সালে মাইকেল ওনাদিয়েজি এবং ব্যারি আনসওয়ার্থ যৌথভাবে বুকার জিতেছিলেন। ১৯৯২ সালে যৌথভাবে পুরস্কার বিজয়ী ঘোষণা হওয়ার পর বুকার কমিটি ঘোষণা দিয়ে নতুন নিয়ম করেছিলো যে, পুরস্কার একজনই পাবেন। তবু এবার নিয়ম ভাঙতে হলো।

বিচারকরা বলছেন তারা নিয়ম ভাঙেননি, বরং তারা দু’জনকে পৃথক করতে পারেননি।

বুকার প্রাইজ দেওয়া হয় একটি নির্দিষ্ট সময়ের আগে শুধুমাত্র যুক্তরাজ্য অথবা আয়ারল্যান্ড থেকে ইংরেজি ভাষায় প্রকাশিত উপন্যাস বা গল্পগ্রন্থকে। পুরস্কারের অর্থমূল্য ৫০ হাজার পাউন্ড।

মার্গারেট অ্যাটউড এবারই প্রথম নয়, ২০০০ সালে তার উপন্যাস ‘দ্য ব্লাইন্ড অ্যাসাসিন’ বুকার জেতে। এছাড়া তার উপন্যাস বুকারের সংক্ষিপ্ত তালিকায় জায়গা করে নিয়েছিলো চারবার।

এবারের বুকার জয়ী উপন্যাস ‘দ্য টেস্টামেন্টস : দ্য সিকুয়েল টু দ্য হ্যান্ডমেড’স টেল’ সম্পর্কে বিচারকরা বলেছেন, একই সঙ্গে একটি সুন্দর ও হিংস্র এই উপন্যাসটি আমাদের সমকালীন মানুষের বিশ্বাস ও ক্ষমতা সম্পর্কে কথা বলেছে। লেখক তার একান্ত নিজস্ব ভুবনে আমাদেরকে উড়িয়ে নিতে সক্ষম হয়েছেন এবং সেখানেই আমরা এসব সম্পর্কে কথা শুনেছি।

১৯৮৫ সালে অ্যাটউডের উপন্যাস ‘দ্য হ্যান্ডমেড’স টেল’ প্রকাশিত হওয়ার ৪৪ বছর পর প্রকাশিত হয়েছে ‘দ্য টেস্টামেন্টস : দ্য সিকুয়েল টু দ্য হ্যান্ডমেড’স টেল’ কিন্তু উপন্যাসটির বিষয়বস্তু ‘দ্য হ্যান্ডমেড’স টেল’-এর পনের বছর পরেরকার। উপন্যাসটি শুরু হয় হান্ডমেড’স টেলের কেন্দ্রীয় চরিত্র তরুণী লিডিয়ার বয়ানে। কিন্তু এই উপন্যাসে তিনি আর তরুণী লিডিয়া নন, খালা লিডিয়া। তিনি গিলিড সাম্রাজ্যে বসবাস করেন।

উপন্যাসটি গড়ে উঠেছে তিনজন নারীর বিভিন্ন ঘটনার ওপর ভিত্তি করে। এদের মধ্যে অন্যতম আগ্নেস। তাকে দেখানো হয় একজন গিলিডিয়ান পরিবার বড় হওয়া একজন অনাথ হিসেবে। উপন্যাসের শুরুতে আগ্নেসকে দেখানো হয় একজন সেনাপতির স্ত্রী হিসেবে সে দায়িত্ব গ্রহণ করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

উপন্যাসের আরেকটি প্রধান চরিত্র হল ‘ডেইজি’। ডেইজি গিলিডের বাইরে পাচার হয়েছিলেন এবং পরে কুইন স্ট্রিটের পশ্চিম পাড়ার একটি পোশাকের ব্যবসায়ী তাকে দত্তক নেয়, এইভাবে তার টরন্টোতে বসবাস। অ্যাগনেস এবং ডেইজি উভয়ই লেখকের আগের উপন্যাস দ্য হ্যান্ডমেড’স টেলের নায়ক অফ্রেডের কন্যা। কিন্তু এই দুই নারী তাদের জন্মস্থান বা পিতামাতা সম্পর্কে অবগত নয়।

তৃতীয় চরিত্র হলো ‘দ্য স্টেটমেন্ট’ উপন্যাসের বয়ানকারি লিডিয়া—দেখানো হয় তিনি তার জীবনের ইতিহাস লিখেছেন, যার মধ্যে গিলিয়েডের আগে তার জীবনের বিবরণ এবং কীভাবে তাকে খালা বানানো হয়েছিল, এসব অন্যতম। তিনি গিলিয়েডের আধ্যাত্মিকতা, ভণ্ডামি এবং স্থানীয় দুর্নীতিতে অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলো নিয়ে যে ধ্যান করে থাকেন সেগুলোই তার পাণ্ডুলিপিতে লেখেন। লিডিয়ার পাণ্ডুলিপিটিই পরে ‘দ্য স্টেটমেন্ট’ হিসেবে প্রকাশিত হয়। একজন দাসী হিসেবে অফ্রেডের অভিজ্ঞতার বিভিন্ন বর্ণনা উঠে এসেছে এতে।

তিনজন নারী চরিত্রকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই উপন্যাস সম্পূর্ণ নতুন একটি জগতে পাঠককে নিয়ে গিয়ে লেখক আমাদের যাপিত জীবনের বিভিন্ন সমস্যার বর্ণনা করেছেন। এবং বিশ্লেষণ করেছেন আমাদের সমকালীন সময়ের বিশ্বাস এবং আস্থা ভিত্তিভূমি।

ব্রিটিশ লেখক বার্নার্ডাইন এভারিস্টোর ‘গার্ল, ওম্যান, আদারস’-এ কালো, ব্রিটিশ, জীবনযুদ্ধে জয়ী, পরাজিত এমন ১২ জন নারীর পরিবার, বন্ধু এবং প্রেমের গল্প নিয়ে গড়ে উঠেছে এই উপন্যাসটি। আনন্দ এবং শব্দময়তায় ভরা প্রাণবন্তভাবে সাময়িক এই উপন্যাসটি যেন আমাদের সমকালীন ব্রিটিশ নারীদের হৃদয়ের ইতিহাস ধারণ করে আছে। ১২ জন নারী চরিত্রের মধ্য দিয়ে আমাদের সমকালীন সামাজিক জীবনের উদযাপন, অপ্রতিরোধ্য জীবনযাপন আর গতিময়তাকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

বিচারকরা উপন্যাসটি সম্পর্কে বলেছেন, বর্তমান সময়ের ব্রিটিশ নারীবাদী উপন্যাস হিসেবে এটি অতুলনীয়। আমাদের বর্তমান ব্রিটিশ সমাজের প্রত্যেকটি ধ্বনি এই উপন্যাসের মাধ্যমে প্রতিধ্বনিত হয়েছে। একটি কৃষ্ণাঙ্গ ব্রিটিশ পরিবারের জীবন, তাদের সংগ্রাম, বেদনা, হাসি, আকাঙ্ক্ষা এবং ভালোবাসা একই সঙ্গে একটি চিত্তাকর্ষক ও উগ্র হয়ে উঠেছে উপন্যাসটিতে। চমকপ্রদ বয়ানে এভারিস্টো আমাদেরকে বিভিন্ন স্থান এবং ঐতিহ্যের মধ্য দিয়ে চলমান আন্তঃজন্মের গল্পের যাত্রায় নিয়ে যান আফ্রিকান, ক্যারিবিয়ান, ইউরোপীয় অঞ্চলগুলোতে। তার ১২টি প্রধান চরিত্র আমাদের সামাজিক জীবনের আপস অ্যান্ড ডাউন উভয়ই প্রকাশ করে। শিল্পী, ব্যাংকার, শিক্ষক, ক্লিনার, গৃহিণী, কৈশোর থেকে বৃদ্ধ বয়স পর্যন্ত নারীত্বের বিভিন্ন পর্যায়কে তিনি দারুণভাবে বিশ্লেষণ করেছেন উপন্যাসের গল্পটির মধ্য দিয়ে। তার গদ্য আবেগময়, ক্ষুর-ধারালো।

এই উপন্যাসটি একঘেয়ে হওয়ার কোনও এক মুহূর্তও সময় দেয় না। মৌখিক ট্র্যাডিশনাল ঐতিহ্য এবং বলার ধরণ পাঠককে জোর করে জড়িয়ে ফেলে উপন্যাসের ঘটনার মধ্যে। এটি এমন এক উপন্যাস যা উচ্চস্বরে পড়া যায় কিংবা এবং সমস্ত ধরনের মিডিয়ায় পরিবেশন করা যায়।

লন্ডনের ক্রিয়েটিভ রাইটিংস বিভাগের অধ্যাপক বার্নার্ডাইন এভারিস্টোর নবম এই উপন্যাসটি বুকার জিতে পেছনে ফেলেছে শর্টলিস্টে থাকা সালমান রুশদীর ‘কিইশোট’, লুসি এলম্যানের ‘ডাকস, নিউবারিপোর্ট’, চিগোজি ওবিওমার ‘অ্যান অর্কেস্ট্রা অব মাইনরিটিস’ এবং এল শাফাকের উপন্যাস ‘টেন মিনিটস অ্যান্ড থার্টি এইট সেকেন্ড ইন দিজ স্ট্রেইঞ্জ’কে।